ঢাকায় কেউ মারা গেলে কোথায় কীভাবে কবর দেবেন?

ফখরুল ইসলাম।।

ঢাকায় কেউ মারা গেলে কী করবেন? কোথায় কীভাবে কবর দিবেন? এদেশের দোলনা থেকে কবর সব জায়গায় ‘স্পিড মানি’ লাগে।
মায়ের শারিরীক অবস্থা এক মাস আগে থেকেই খারাপ ছিল। বুঝতে পেরেছিলাম আর বেশিদিন নেই। মাস খানেক আগে মীর তারিকুল ইসলাম ভাইয়ের মা মারা গিয়েছিল। ওনার মাকে আজিমপুর গোরস্থানে কবর দেয়া হয়েছিল। আমি যেহেতু বুঝতে পেরেছি মায়ের আয়ু আর বেশিদিন নেই তাই তারিকুল ভাইকে জিজ্ঞেস করেছি “আজিমপুরে কবর দিতে হলে কী কী লাগে?”

তরিকুল ভাই বললেন “কোন টাকা লাগবে না। আপনি শুধু লাশ নিয়ে যাবেন আর সেখানে অবস্থিত নির্দিষ্ট কবরে গিয়ে দাফন করবেন। আর খুব বেশি ইচ্ছা হলে সেখানকার লেবারদের মানে যারা কবর খুঁড়ে তাদেরকে বখশিস দিতে পারেন। আর ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে।” তার মানে কোন টাকা লাগছে না।

বিজ্ঞাপন

৩ তারিখ দুপুরে মা মারা গেলেন। আমার আব্বা আমাকে মনে করিয়ে দিল মায়ের ইচ্ছা ছিল বসিলা কবরস্থানে ওনাকে যেন কবর দেয়া হয়। আমারও তখন মনে পড়ল।

কল দিলাম আব্দুর রাজ্জাক রাজ ভাইকে, বললাম “আপনার বাসা তো বসিলার কাছে, সেখানে গিয়ে খোঁজ নেন কী কী লাগবে? কোন এডভান্স দিতে হবে না।” বসিলা যে আজিমপুরের মত একই নিয়মে চলে সেটা তখন মাথায় কাজ করছিল না। মায়ের সাথে দুনিয়ার সকল স্মৃতি চোখের সামনে ভাসছে। তাই কয়েকদিন আগে তরিকুল ভাইয়ের কথাটা মনে হচ্ছিল না।

রাজ ভাই জীবনেও এই কাজ করেননি, তাই অভিজ্ঞতা নেই। তাই তিনি বসিলা কবরস্থানে গিয়ে খোঁজ নিলেন। ওনাকে বলা হলো “সরকারী ফী ৫০০ টাকা দিতে হবে, এছাড়া বাঁশ, চাটাই আর লেবার চার্জ ১৫০০ টাকা দিতে হবে। সব মিলিয়ে মোট ২০০০ টাকায় কমপ্লিট। এর বাইরে লেবারদেরকে যা বখশিস দেন আর কি! ডেথ সার্টিফিকেট আর মৃতের ভোটার আইডি কার্ড লাগবে।”

আমি বললাম “সমস্যা নাই, চলবে”।

মায়ের লাশ নিয়ে গেলাম বাবর রোডের আল-মারকাজুল ইসলামী হাসপাতালে। ঢাকা সিটিতে যে কয়টা স্থানে ফ্রী লাশ গোসল করায় তার মধ্যে আল-মারকাজুল ইসলামী একটা। এই হাসপাতালের ঠিক সামনেই আমার শোরুম! প্রতিদিন এখানে অনেক লাশ আসে গোসল করানোর জন্য আর আমার মাকে আজ এখানে নিয়ে আসলাম। আমার দুঃখ ছিল, আমার শোরুমে মা’কে আনতে পারলাম না। শোরুম চালু হবার পর পরই করোনা শুরু হয়।
আল-মারকাজুলে ফ্রী গোসল করানো হয়। তবে গোসলের সাথে কিছু জিনিস আপনাকে কিনে দিতে হবে। যেহেতু ঐ মুহুর্তে কোথাও যাওয়ার মত পরিস্থিতি থাকে না তাই আল-মারকাজুল থেকে কেনাই ভালো। মহিলাদের প্যাকেজ ২৫৫০ টাকা ও পুরুষদের প্যাকেজ ১৮৫০ টাকা। মহিলাদের অতিরিক্ত কাপড় দেয়া হয় তাই বেশি টাকা লাগে। কাফনের কাপড় ছাড়াও কর্পুর, সাবান, আতর সহ আরো কিছু জিনিস কিনে দিতে হয়। এখানে চাইলেও আপনি কাউকে বখশিস দিতে পারবেন না। খুব কড়া আইন এখানে। গোসল করানোর আগে আপনাকে অবশ্যই ডেথ সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। যারা দূরে যাবেন তারা চাইলে এখান থেকে কফিন/বক্স কিনে নিতে পারেন। দুইটা মাপের কফিন পাওয়া যায়।

মাগরিবের নামাজের পরে জানাযার পরে মাকে নিয়ে গেলাম বসিলা রায়েরবাগ কবরস্থানে। এটা সেই কবরস্থান যেখানে বুদ্ধিজীবিদের সৃতিস্তম্ভ আছে। মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে বসিলার দিকে এগিয়ে হাতের বাম দিকে বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে যাওয়া যায়। আমরা মেইন গেইট দিয়ে ঢুকেছি। আমার সাথে আমার এক অভিজ্ঞ বন্ধু ছিল। মাত্র দুই মাস আগে তার স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তার লাশ সেখানেই কবর দেয়া হয়েছে। সে আমাকে বলল “মেইন গেইট দিয়ে ঢুকে ডান দিকের রাস্তায় আগাতে হবে।”

এদিকে রাজ ভাই প্রথমে যার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন সেখানে ১০০ টাকা স্পীড মানি দিয়ে এসেছিলেন। ওনাকে ফোন করতেও উনি একই কথা বললেন।

ডান দিকের রাস্তায় সামান্য এগোতেই আমাদেরকে থামতে বলা হলো। এটা ৪ নম্বর ব্লক। একেকটা ব্লকে অনেকগুলো কবর। এ বছর এত লাশ তারা কখনো দেখেনি। করোনা হোক কিংবা অন্য কোন কারণে হোক এ বছর লাশের সংখ্যা দুই তিন গুণ বেশি হয়েছে। ৪ নম্বর ব্লকের একটা রোডে আমরা নামলাম। আমাদের বলা হলো “লাশ নিয়ে আসেন”। দুপুরে যে মানুষ ছিল রাতে তিনি “লাশ”! এটাই মানুষের জীবন, কিছু করার নেই।

এই গোরস্থানে সব ব্লকে অনেকগুলো রাস্তা আছে। রাস্তাগুলো ৩ ফুটের মত প্রস্থ হবে। রাস্তাগুলো পাকা, রাস্তার দুইপাশে সারিবদ্ধ কবর। আমার মাকে নিয়ে অল্প দূরে যেতে হলো। একটা গাছের নীচে আমাদেরকে ইশারা করা হলো। আগের দিন ভাল বৃষ্টি হয়েছিল, তাই মাটি নরম হয়ে গেছে। যে কবরটা সিরিয়ালে ছিল সেটা ভেঙ্গে গেছে, তার পরের কবরটা মায়ের জন্য বরাদ্দ করা হলো, মায়ের স্থান হলো গাছের পাশেই।

কবর দেয়ার পরে ঢুকলাম গোরস্থানের অফিসে। এর মধ্যে আমার বন্ধু তার স্ত্রীর কবর জেয়ারত করতে আরেকদিকে চলে গেল।

অফিসে ঢুকতেই বলা হল সরকারী চার্জ ৫০০ আর লেবার চার্জ ১৫০০ মোট ২ হাজার টাকা দেন। আর সিটি কর্পোরেশন থেকে ডেথ সারটিফিকেট ইস্যু হবে সেটার জন্য ১৫০০ টাকা লাগবে। সব মিলিয়ে ৩৫০০ টাকা। এ সময় আমার সাথে থাকা কারোরই মনে ছিল না ডেথ সার্টিফিকেট সরকার ফ্রী দেয়! সবারই মন খারাপ, এছাড়া এ সময় কে কার সাথে দামাদামি করে। আমি ৩৫০০ টাকা দিয়ে আসলাম। কাগজ হিসেবে আমার মায়ের ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি আর হাসপাতাল থেকে ইস্যু কৃত ডেথ সার্টিফিকেট দিতে হয়েছিল। ভোটার আইডি কার্ড এই প্রথম কাজে লাগল!

নিচে নামার পরে লেবারদের একজন এসে হাত কচলাতে থাকল। বোঝা গেল তাদের বখশিস কম হয়েছে। একবার ১ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল। এখন আবার ২০০ টাকা দেয়া হলো।

এরপরে আমার বন্ধু কবর জেয়ারত করে ফিরে এসে যখন শুনল আমরা ৩৫০০ টাকা দিয়েছি তখন সে আমাদেরকে বলল “পুর টাকাটাই ফাও নিয়েছে। ৫০০ টাকার বেশি নেয়ার কথা না।”

শুধুমাত্র লেবার চার্জ বাবদ ৫০০ টাকার রশিদ দেয়া হলো আমাদেরকে, বাকী টাকা রশিদ ছাড়া মানে ঐ টাকা গুলো স্পীড মানি হিসেবে চলে গেল! একেকজনের কাছ থেকে ২/৩ হাজার টাকা করে যদি নেয় তাহলে দিনে ১০ টা লাশের জন্য ৩০ হাজার টাকা ইনকাম। লাশ নিইয়ে ইনকাম, মানুষের আবেগ অনুভূতি নিইয়ে ইনকাম! এদেশের উপর আল্লাহ রহমত বর্ষনের সকল সুযোগ আমরা এভাবেই বন্ধ করে দিয়েছি।

আপনি মনে করেছেন খরচ এখানেই শেষ? আরো খরচ আছে। সেই কবরস্থানে গেলে দেখতে পাবেন ৯০% কবরের উপর ঘাস দেয়া। কবরের চারিদিকে ফুল গাছ লাগানো। এইসব কবর মেইন্টেইনেন্স করা হয়। বাকী কবরগুলোর বেইল নেই, সেগুলো ভেঙ্গে গেছে! আপনি টাকা না দিলে জীবনেও সেই কবরের দিকে লেবাররা তাকাবে না।

এখন আপনাকে ওদের সাথে চুক্তিতে যেতে হবে।
চুক্তিটা হলো, ওরা আপনার কবরের উপরে ঘাসের কার্পেট লাগাবে আর চারিদিকে ছোট ছোট ফুল গাছ লাগাবে। কবরের মাটি কোন কারনে ভেঙ্গে গেলে সেখানে অতিরিক্ত মাটি দিবে। সেই কন্ট্রাক্টের জন্য আপনাকে এক কালীন ৬ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে ৫০০ টাকা দিতে হবে। এই টাকা না পেলে আপনার স্বজনের কবর অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকবে। আমরা সেই কন্ট্রাক্টও করলাম।

এতদিন শুনেছি মানে হুজুররা বলতেন “কবরের জন্য প্রস্তুত হও!” ওনারা পরকালের জন্য বললেও আমিও আপনাদেরকে ইহকালের জন্য বলছি “কবরের জন্য প্রস্তুত হও” মানে এই পোষ্ট পড়ে অভিজ্ঞতা নেন।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে