একটি কোরবানির পশুর আত্মকথা

সাইফ নূর ।।

‘‘আজ পবিত্র ঈদুল আযহার প্রথম দিন। আর আমার জীবনের শেষদিন। এই তো, একটু পরেই আমাকে কোরবানি করে ফেলা হবে।

বিজ্ঞাপন

আপনারা ভাবছেন, আমি কিভাবে কথা বলছি! মানুষদের মতো আমাদেরকে কথা বলার ক্ষমতা দেয়া হয়নি। আমরা অবুঝ প্রাণি। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না যে, আমাদের অন্তরে কথা জাগে না। আমাদেরও অন্তর আছে। আমাদেরও ক্ষুধা-পিপাসা লাগে। আমরাও শীতে কাতর হই। গরমে অস্থির হই। আনন্দ-ভালোলাগা, দুঃখ- বেদনা আমাদের পশুদেরও হয়। আমরাও আনন্দে উল্লাস করি। দুঃখে চিৎকার জুড়ে দেই। আমাদের দু’চোখের অশ্রু কখনো আপনারাও দেখেছেন হয়ত।

হ্যাঁ, আমরা আপনাদের মতো পরিপূর্ণ নই। আপনাদের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি নেই আমাদের। আপনাদেরকে আল্লাহ সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। আমরা অবুঝ চতুষ্পদ জন্তু। কিন্তু আমাদেরও যে একটা অন্তর আছে। আমাদেরও হৃদয়ে ভাবের উদয় হয়। হয়ত সেটা আপনাদের মতো অত পরিণত এবং গোছালো নয়। কিন্তু আমরাও আল্লাহর যিকির করি। তাসবীহ পাঠ করি। যেটা আপনারা বুঝতে ভুল করেন। আপনারা অনেকে ভাবেন, অকারণেই আমরা সবসময় হাম্বা হাম্বা, ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করি।

শুরুতেই অনেক অগোছালো কথা বলে ফেললাম। অন্তিম মুহূর্ত তো…!                                                            আমার বয়স খুব বেশি নয়। তিন বছরের যুবক আমি। জী হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে যৌবনকাল একটু তাড়াতাড়িই শুরু হয়ে যায়। ভাগ্যে থাকলে বুড়ো হতেও বেশি সময় লাগে না। তাই আমাকে যুবকই ধরতে পারেন। আমার জন্ম হয়েছে কুষ্টিয়া জেলার আইলচারা গ্রামের চাচা বুরহানুদ্দীনের গোয়ালে। চাচা বুরহানুদ্দীনকে বলতে শুনেছিলাম, আমি নাকি খুবই উন্নত জাতের গরু। আমার বংশের গরুরা নাকি খুবই হৃষ্টপুষ্ট ও শান্তশিষ্ট স্বভাবের। এজন্যই মনে হয় ঘাস খেতে গেলে পাড়ার ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা আমাকে আদর করতে আসত। আমার মনিব আদর করে আমার নাম রেখেছিলেন ‘ভোলা’।

যদিও আমি অতটা ভোলা ছিলাম না। অনেক ব্যাপার-স্যাপারই বুঝতাম। একটু চুপচাপ করে থাকতাম আরকি। তাছাড়া আমরা গরুরা আর কি ঝগড়া করব! চাচা আর চাচীর ঝগড়াই ফুরাতো না কখনো। কোনদিন চাল নেই, কখনো তরকারি শেষ। এখন তো চাচাদের ঘরটাই বন্যায় ভেসে গেছে। চাচা-চাচী বড় কষ্ট করে আমাদেরকে সেদিন কোমর-পানি ভেঙ্গে ডাঙায় তুলেছিলেন। সেদিন দেখেছিলাম, তারা দু’জন একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলেন। আমি তাদের কান্নার কারণটা একটু একটু ধরতে পেরেছিলাম।

চাচা আমাকে আর আমার দুই বন্ধুকে ঘাস, পাতা, কচুরিপানা আর ভুষি খাইয়ে বড় করেছেন। ছোলা কিনে দেওয়ার সাধ্য ছিল না তার। অবশ্য কাঁঠালের মৌসুমে প্রতিবছর কপালে সুস্বাদু কাঁঠালও জুটত । আমি আবার একটু ভোজনরসিক। সারাদিন ঘুরে ঘুরে জাবর কাটতাম । ঢাকায় আসার পর তো কোনো ঘাসই দেখছি না। মাটি কেমন শক্ত শক্ত। হাটতে কেমন ভয় করে। কাল সারারাত কাটিয়েছি পুরনো কিছু ঘাস পাতা আর পানি খেয়ে।

কয়েক মাস ধরেই শুনছিলাম, কোরবানি উপলক্ষ্যে আমাদেরকে এবার ভালো দামে বিক্রি করা হবে। কোরবানি ঈদের কথাবার্তাও শুনছিলাম। এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদেরকে গোয়াল ছেড়ে চলে যেতে হবে। চাচা আমাদেরকে বিক্রি করে দিবেন। এরপর কুরবানি হতে হবে। কোরবানির হাটে গিয়ে পুরোপুরি বুঝতে পারলাম। যাক, কতদিন আর এভাবে থাকতাম। নিজেকে প্রস্তুত করেই নিলাম আল্লাহর রাস্তায় কোরবান হওয়ার জন্য।

হাটে যাওয়ার গল্পটাও বেশ মজাদার ছিল। প্রথমে গ্রাম থেকে হেঁটে হেঁটে বড় রাস্তায় আনা হলো। এরপর একটা ট্রাকে উঠালো হলো। আমি আগে কখনো ট্রাকে উঠিনি। প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। বুরহান চাচা ট্রাকওয়ালার সঙ্গেও ঝগড়া করেছেন। ভাগ্য ভালো যে, হাতাহাতি হয়নি। ট্রাকওয়ালা গরুপ্রতি ১২০০ টাকা চাইছিল। কিন্তু চাচা ৮০০ তে অনড়। দামাদামি করতে করতে শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৯৫০ তে রফা হলো। চাচা বলেছিলেন, গতবার তিনি ৮০০ টাকা দিয়েছিলেন।

চাচা বারবার জিনিসপত্রের দাম বাড়তির কথা বলেন। আর কী একটা শব্দ বলেন ‘করোনা’-‘করোনা’! মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। একারণেই মনে হয় কয়েক মাস ধরে চাচা আমাদের ভুষির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলেন। হয়ত সেগুলোর দাম বেড়ে গিয়েছিল বলে বেশি কিনতে পারেননি।

যাহোক, ট্রাকের সেই ভ্রমণ তেমন সুখকর ছিল না। ধাক্কা-ঝাঁকুনির মধ্যে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে থাকা- ওফ! তার ওপর বিভিন্ন শহরের মোড়ে ট্রাফিক পুলিশরা প্রায়ই থামিয়ে দিত। কিন্তু চাচা তাদেরকে একটা কানাকড়িও দেয়নি। চাচাকে কেউ একজন স্মার্ট মোবাইল দিয়েছিল। তিনি বলছিলেন, যেই বাড়াবাড়ি করবে তাকে নেটে চড়িয়ে দেব। হয়ত ফেসবুকের কথা বলছিলেন। আজকাল আমরাও শুনেছি এ অদ্ভুত জায়গায় নাম। যেখানেই ঘাস খেতে গিয়েছি সবার মুখে মুখে শুধু ‘ফেসবুক-ফেসবুক’। কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। শুনেছি, সেখানে সব ধরনের অভিযোগ শোনা হয়।

কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা ঢাকায় এসে পৌঁছাই। চাচা গাবতলী গরুর হাটে যাওয়ার চিন্তা করেন। শুনেছিলাম, আমার বাবাকেও এখানে বিক্রি করা হয়েছিল। গ্রাহকরা আমাদেরকে দেখতে আসতে লাগল। চাচাও আমাদের গুণাগুন বেশ জমিয়ে বলে যেতে লাগলেন।

চাচা আমার দাম ৬০ হাজার টাকা ধার্য করেন। আমি মনে মনে বেশ খুশি হই। হাটের দামি গরুর সারিতে জায়গা পাব ভেবে পুলক অনুভব করি। ঈদের একদিন আগে একজন গাড়িওয়ালা লোক আসে। যার হাতে বড় মোবাইল ছিল। গলায় সোনার চেইন। চোখে ছিল চশমা। হাটের ভিড়ে অন্যদের চাইতে তিনি ঘামছিলেনও একটু বেশি। চাচা আনুমানিক ৫০ হাজার টাকায় আমাকে তার কাছে বিক্রি করেন।

ভদ্রলোক আমাকে পিকআপে করে ঘরে নিয়ে আসেন। মনের কথা আর কী বলব, গ্রাম ছেড়ে ঢাকার ‘মাম্মি ডেডি’র পরিবেশে এসে আমি খুশি হয়ে গেলাম। বিরাট এক লনে আমাকে বাঁধা হলো। পরিষ্কার-রঙ-বেরঙের জামা কাপড় পরা ছেলে মেয়েরা আমাকে দেখে সে কী খুশি! তারা আমাকে এটা খাওয়ায়, ওটা খাওয়ায়। কেউ আমাকে টফি চকলেট দিচ্ছে, কেউ আইসক্রিম সাধছে।
কিন্তু এ ঘরের লোকদের ব্যাপার-স্যাপার আমার প্রথম মনিব চাচা-চাচীর চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। বুঝতে পারিনি তাই। ঘরের ছেলেরা জোর আওয়াজে গান শোনে আর মোবাইলে কী যেন খেলে সারাক্ষণ। আর বড়রা কেউ বিএনপি আওয়ামীলীগের রাজনীতি নিয়ে ঝগড়া-তর্ক করে। এরপর প্রত্যেকে রাগে গজরাতে গজরাতে নিজেদের মোবাইলে কিছু একটা লেখা শুরু করে দেয়।

এখানকার মহিলাদের কথাবার্তাও ঈদের শাড়ী, জুতো, মেহেদি, মেকাপ এবং গহনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর বাইরে কোরবানির গোশত কে কীভাবে রান্না করবে, সংরক্ষণ করবে- সেই আলোচনা। আমি বেশ চিন্তায় পড়ে যাই যে, কোরবানির গোশত যদি সংরক্ষণই করতে হয় তাহলে বারবার ত্যাগের আলোচনা কেন করা হয়?
অ্যাঁ, একটু দাঁড়ান। সামনে দিয়ে কেউ একজন আসছে।

আরে, মনে হয় এ ব্যাটা কসাই। …. শেষমেষ লোকটা আমাকে খুঁজেই নিল।
কী জানি এই লোক আমার চামড়া আগে তুলবে না আমার মালিকের চামড়া তুলে এসেছে। যেটাই হোক, সে এখনই মনে হয় আমাকে কেটে ফেলতে চায়…।

কিন্তু আপনারা আমার শেষ কথাটি শুনে যান! আমি কোরবানি হওয়ার আগে আগে।
শোনেন মুসলমানেরা, গরু-ছাগল শতশত বছর ধরে জবাই হচ্ছে এবং প্রতি বছর জবাই হতে থাকবে। এটা আল্লাহর বিধান। আমাদেরকে তো আপনাদের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু আপনারা? আপনারা কী করছেন? আমাদের গোশত-চামড়া নিয়েই মেতে আছেন? আপনারা যে আমাদেরকে জবাই করেন, এটার অধিকার কি আপনারা নিজ থেকে পেয়েছেন? যিনি এই অনুমতি দিয়েছেন তাকে আপনারা কিভাবে ভুলে থাকতে পারেন?

আহ, লোকটা খুব জোরেই টানছে। হাতে-পায়ে দড়ি লাগাচ্ছে…। মসজিদের ইমাম সাহেবও চলে আসছেন দেখছি।
আমার কথা শেষ হয়নি। আমি আবারও বলছি, আপনারা যদি সত্যিকার কোরবানির ইচ্ছা করেন, আপনারা যদি চান আপনাদের জীবন, আপনাদের পরিবার ও সমাজে শান্তি আসুক, তবে এবার নিজেদের ভেতরের পশুটাকেও আমার সঙ্গে কোরবানি দিয়ে ফেলুন। জানেন তো, আমাদের রক্ত-মাংস, আমাদের হাড়, কলকব্জা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় আপনাদের আত্মার শুদ্ধতা, আপনাদের খোদাভীতি।

ইস, কসাই আমাকে টেনে ফেলে দিচ্ছে। মাওলানা সাহেব ছুরি উঁচু করে ধরে আছেন। সবাই আমাকে চেপে ধরছেন…। আ.. আ. আ. বি… বি.. বিস……..।’’
(কাল্পনিক)

বিজ্ঞাপন