শাইখ ইউনুস জৌনপুরী : হাদীসের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ এক মনীষী

মাওলানা আবদুল আযিয মাহবুব।।

হাদীস-উলুমুল হাদীসের খেদমত করে যে সকল মনীষী সোনালী ইতিহাস গড়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন নিকট অতীতের শীর্ষস্থানীয় হাদিস বিশারদ, ভারতস্থ জামিআ মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরের সাবেক শাইখুল হাদীস, আল্লামা শাইখ ইউনুস জৌনপুরী রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা।

বিজ্ঞাপন

শাইখ রাহি. ছিলেন ইলমের ভালোবাসায় চিরকুমার আলেম। ছিলেন যুহদ ও তাকওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদ, শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহি. এর হাতেগড়া ছাত্র। দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত সহীহ বুখারির দরসে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন। ইলমুল হাদীসে তাঁর পান্ডিত্য কতটুকু ছিল তা সদ্যপ্রয়াত দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রাহি. এর একটি মন্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়। আরবের প্রখ্যাত আলেম, শাইখ ওয়াইল আল হাম্বলী হাফি.(যিনি শাইখ ইউনুস রাহি. থেকে হাদীস শুনেছেন এবং হাদীসের ইজাযত নিয়েছেন) বলেন,  মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রাহি. কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনার মতে বর্তমান সময়ে আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস উপাধির উপযুক্ত কে? উত্তরে তিনি বলেছেন, আমার মতে বর্তমান সময়ের আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস হলেন শাইখুল হাদীস ইউনুস জৌনপুরী রাহি.”।

শাইখ ওয়াইল আল হাম্বলী হাফি. আরও বলেন,

ومن عجائب شيخنا أنه قرأ مسند الإمام أحمد أربع مرات للبحث عن كلمة واحدة خلال تخريج حديث

 

“আমাদের শাইখের আশ্চর্যজনক বিষয়ের মধ্যে একটি হলো, তিনি হাদীসে উদ্ধৃত একটি শব্দ তালাশ করতে গিয়ে মোট চার বার “মুসনাদে আহমদ”(যে কিতাবে প্রায় ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি হাদীস রয়েছে) অধ্যয়ন করেছেন”।(শাইখ ওয়াইল আল হাম্বলী হাফি. এর ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত)

ইলমুল হাদীসে তাঁর পাণ্ডিত্য ও গভীরতা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের আরও অনেক মন্তব্য রয়েছে।এখানে তাঁর সম্পর্কে বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হাদীস বিশারদ, জামেআ উম্মুল কুরা মক্কা মুকাররামার আস সুন্নাহ বিভাগের অধ্যাপক,শাইখ শরীফ হাতেম আল আউনী হাফি. এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য উল্লেখ করছি।তিনি তাঁর ফেসবুক পেইজে ১১/৭/২০১৭ তারিখে শাইখ রাহি. এর ইন্তেকালের পর এক শোকবার্তায় লেখেন,

“توفي قبل قليل في الهند العلامة المحدث الشيخ محمد يونس الجونفوري ، وهو من أكابر علماء الحديث في الهند ….”

“তিনি ছিলেন ভারত উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় হাদিস বিশারদ”।

শাইখ রাহি. ১৩৫৫ হিজরী মুতাবেক ১৯৩৭ ঈসায়ী সনে ভারতের জৌনপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম “কুরীনী”তে জন্মগ্রহণ করেন।মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মমতাময়ী মা ইন্তেকাল করেন। এরপর তাঁর নানী তাঁকে লালন পালন করেন। ছয় অথবা সাত বছর বয়সে তিনি জৌনপুরের পাশে এক মক্তবে ভর্তি হন।সেখানে তিনি এবং তাঁর মামা বাগদাদী কায়দা পড়েন। এরপর তাঁর মামা এই মক্তব থেকে চলে আসলে তিনিও তার সাথে চলে আসেন।অতপর তাঁর গ্রামে অবস্থিত প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন।এরপর জিয়াউল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হয়ে সেখানে দরসে নেযামীর অধিকাংশ কিতাব অধ্যয়ন করেন। সারফ নাহু এবং ফিকহে হানাফীর কিতাবাদি মাওলানা জিয়াউল হক রাহি. এর নিকট আর শরহে বেকায়া, শরহে জামী এবং নূরুল আনওয়ার শাইখ আবদুল হালীম জৌনপুরী রাহি. এর কাছে অধ্যয়ন করেন। এরপর ১৩৭৭ হিজরী সনে ১৩ বছর বয়সে মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরে ভর্তি হন। সেখানে প্রবীণ শাইখদের থেকে জালালাইন, হেদায়া, মেশকাত, তাফসীরে বাইযাবী,আদ দুররুল মুখতার, কুতুবে সিত্তাহ (হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয় কিতাব) , মুআত্তাইন (মুআত্তা মালেক, মুআত্তা মুহাম্মাদ), শরহু মা’আনিল আসার সহ প্রভৃতি কিতাব অধ্যয়ন করেন।

আরো পড়ুন: হযরত মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তৈয়ব রহ., উপমহাদেশের এক বরেণ্য মনীষী

হযরত মাওলানা কারী বেলায়েত হুসাইন রাহ. : কুরআনের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ মনীষী

শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহি. এর কাছে সহীহ বুখারী, মুকাদ্দিমায়ে সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদের একাংশ পড়েন।

আল্লামা আসআদুল্লাহ রামপুরী রাহি. এর কাছে সুনানে আবু দাউদ, শরহু মা’আনিল আসার এবং সহীহ বুখারির প্রথমাংশ পড়েন। শাইখ মানযুর আহমদ সাহারানপুরী রাহি. এর কাছে সহীহ মুসলিম এবং মুআত্তা মুহাম্মাদ পড়েন।

শাইখ আমীর আহমদ ইবনে আবদুল গনী কান্দলভী রাহি. এর কাছে সুনানে তিরমিযী, শামাইলে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুআত্তা মালেক এবং মেশকাত সহ প্রভৃতি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। উল্লেখ্য যে, তাঁর হাদীসের সকল উস্তাযরাই তাকে তাদের সকল বর্ণনার ইজাযত প্রদান করেছেন। এমনিভাবে শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহি. এবং শাইখ আবদুর রহমান ইবনে আবদুল হাই আল কাত্তানী রাহি. এর মতো ব্যক্তিত্বরা তাঁকে হাদীসের ইজাযত প্রদান করেন।

আরো পড়ুন: হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ., উম্মাহর মহান আধ্যাত্মিক চিকিৎসক

মুফতী কেফায়াতুল্লাহ রাহ. : লক্ষ কোটি শিশুর হাতে খড়ি হয় যার কিতাব দিয়ে

১৩৮১হিজরী সনে মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরে উস্তায হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে ১৩৮৫ হিজরী পর্যন্ত শরহে বেকায়া, হেদায়া, মেশকাত সহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি দরস প্রদান করেন। ১৩৮৬ হিজরী থেকে ১৩৮৭ হিজরি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সুনানে আবু দাউদ, সহীহ মুসলিম এবং সুনানে ইবনে মাজাহ দরস প্রদান করেন।

১৩৮৮ হিজরি সনে যখন শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহি. মদীনা মুনাওয়ারার সান্নিধ্য অর্জনের ইচ্ছা করলেন তখন শাইখ রাহি. কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ করে যান। তখন থেকে নিয়ে মৃত্যু অবধি প্রায় পঞ্চাশ বছর তিনি সহীহ বুখারীর দরস প্রদান করেন।

শাইখ রাহি. দরস-তাদরীসের পাশাপাশি হাদীস-উলুমুল হাদীস নিয়ে উর্দু ও আরবি ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিতাব লিখেছেন।শাইখ মুহাম্মাদ আইয়ুব সুরাতী হাফি. শাইখ রাহি. এর তাহকীককৃত ও লিখিত অনেকগুলো রেসালা একত্রিত করে “اليواقيت الغالية” নামে লন্ডনের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বড় বড় চার ভলিয়মে প্রকাশ করেছেন। এছাড়া তাঁর গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে, ১. نبراس الساري إلى رياض البخاري ২. الفرائد في عوالي الأسانيد وغوالي الفوائد ( এটি ড. আকরাম নদভী হাফি. তাহকীক করে প্রকাশ করেছেন) ৩. اليواقيت الغالية في تحقيق وتخريج الأحاديث العالية

১৭ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরি মুতাবেক ১১ জুলাই ২০১৭ ঈসায়ী সনে এই মহা মনীষী ইন্তেকাল করেন। শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহি. এর ছেলে শাইখ তালহা কান্দলভী রাহি. তাঁর জানাযার ইমামতি করেন।লক্ষ্য লক্ষ্য লোকের অংশগ্রহণে তাঁর জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। আল্লাহ্ তা’আলা শাইখ রাহি. কে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন।আমাদেরকে তার রেখে যাওয়া তুরাস থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দিন।আমীন।

তথ্যসূত্র: শাইখ রাহি. এর বিশিষ্ট ছাত্র শাইখ আবদুল আহাদ ইবনে ইউসুফ হাফি. লিখিত শাইখ রাহি. এর জীবনী।এটি জনপ্রিয় ওয়েবসাইট “শাবাকাতুল আলুকায়” ২৯/৭/২০১৭ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।

আরো পড়ুন: হযরত মাওলানা রহমতুল্লাহ ছাহেব রাহ.: কুরআনের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ মনীষী

মুফতী মুহাম্মদ নাঈম রহ.: ‘একজন শীর্ষ আলেমে দ্বীনকে হারিয়েছি আমরা!’

বিজ্ঞাপন