কোরবানি ইসলামের অন্যতম শিআর, মহামারির অজুহাতে বিকল্প চিন্তার সুযোগ নেই

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

[করোনা মহামারির সময় কুরবানী করার প্রয়োজন রয়েছে কি না- এজাতীয় বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা করছে অবুঝ ও বক্র বিভিন্ন মহল। সম্প্রতি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর রঈস, মাসিক আলকাউসারের সম্পাদক মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেবের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারে তিনি করোনা মহামারির অজুহাতে কুরবানী স্থগিত রাখা, কুরবানীর ‘বিকল্প’ প্রস্তাব, ইবাদতের ‘বিকল্প’ দাবিতে অহেতুক যুক্তিতর্ক ইত্যাদির জবাব দিয়েছেন এবং কুরবানী নিয়ে ফিকহী কিছু প্রশ্নেরও মীমাংসামূলক আলোচনা পেশ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ।]

প্রসঙ্গ: কুরবানির স্বরূপ ও গুরুত্ব

ইসলাম টাইমস : বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে করোনা পরিস্থিতি চলছে, এর ওপর ভিত্তি করে একশ্রেণির লোকজন গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন যে, এ পরিস্থিতিতে ঈদুল আযহার কুরবানী করা উচিত নয়; বরং এ মহামারির সময় সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কুরবানী থেকে বিরত থাকা উচিত। এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের দিকনির্দেশনা আসলে কী?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ : কুরবানী ইসলামের শিআরসমূহের অন্যতম। শিআর বা শাআইর বলা হয়, ইসলামের মৌলিক নিদর্শনগুলোকে। দেখুন, ইসলামের তো কোনো বাহ্যিক অবয়ব নেই। ইসলাম প্রকাশ পায় তার নিদর্শনসমূহের মধ্য দিয়ে। মসজিদ, নামায, রোযা, রমযান, রমযানের  রোযা, দুই ঈদ, হজ¦ পালন, যাকাত প্রদান, কুরবানী করা, এজাতীয় মৌলিক নিদর্শন ও আলামতগুলোর মধ্য দিয়ে ইসলামের রূপ ও অবয়বটি প্রকাশ পায়। এই শিআরগুলোর অন্যতম হল, আলউযহিয়্যা তথা কুরবানী।

কুরবানী এমন একটি ইবাদত যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর যখন থেকে কুরবানী করা শুরু করেন, তারপর থেকে আর কখনো বাদ দেননি। অর্থাৎ কোনো ঈদুল আযহার সময় কুরবানী না করে থাকেননি। যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের অনেক ফযীলতের কথা হাদীস শরীফে আছে। যিলহজের নবম তারিখের রোযার ফযীলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। কিন্তু যিলহজের দশম তারিখ বা ইয়াওমুন নাহর সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই দিনটিতে কুরবানী করার চেয়ে উত্তম আমল আর নেই।

কুরবানী বা উযহিয়্যা ইসলামের অন্যতম প্রতীক। কুরবানীর ইতিহাস সম্পর্কে যারা জানেন, তারা এর উৎসের ঘটনাটি সম্পর্কেও অবগত। আল্লাহ তাআলা তাঁর খলীল হযরত ইবরাহীম আ.-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর ছেলেকে কুরবানী করার জন্য। তিনি তাঁর হুকুমের সামনে সমর্পিত হয়েছিলেন, সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কুরবানীর জন্য পশু যবেহ করার নির্দেশ আসে। সেখান থেকেই পশু কুরবানী করার বিধান এসেছে। এই কুরবানী অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ইবাদত। এটি কোনো সাধারণ পর্যায়ের নফল আমল কিংবা সাধারণ পর্যায়ের সুন্নত আমল নয় যে, সুযোগ হলে পালন করলাম, মনে চাইল না পালন করলাম না। কুরবানীর ইবাদতটি এমন নয়।

এই ঈদের নামই দেওয়া হয়েছে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। ইসলামের দুটি ঈদের প্রথমটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর, যা রমযানের পর পহেলা শাওয়াল আদায় করা হয়। এটা এক দিন। আর দ্বিতীয়টি ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহার সময়কাল তিন দিন। একে বলে, আইয়ামুল আযহা। কুরবানীর ঈদের জন্য এই তিন দিন মেয়াদ নির্ধারণেরও একটি হেকমত এটি যে,  পৃথিবীর সব অঞ্চলের মুসলমানরা যেন প্রথম দিন না পারলে দ্বিতীয় দিন, দ্বিতীয় দিন না পারলে তৃতীয় দিন হলেও কুরবানী আদায় করতে পারেন।  কুরবানী করতে পারার সুবিধার্থেই এই ঈদে দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ থেকেও কুরবানীর আমলের গুরুত্ব বুঝে আসে।

আরো পড়ুন, কুরবানি: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে

প্রসঙ্গ: ইবাদত সম্পর্কে নিজস্ব মতামতের স্বরূপ

ইসলাম টাইমস: কুরবানী কিংবা বিভিন্ন ইবাদত সম্পর্কে যারা নিজেদের মতো করে মতামত দিয়ে থাকেন, আপনার দৃষ্টিতে তাদের এসব মতামতের ফলাফল বা সঙ্কটের রূপটি কেমন?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ : কুরবানী নিয়ে যারা ভিন্ন কথা বলতে চান কুরবানীর ইতিহাস, এর প্রাণ, এ ইবাদতের তাৎপর্য নিয়ে তাদের ভেবে দেখা উচিত। একইসঙ্গে সব ইবাদতের বিষয়েই তাদের গভীরভাবে জেনে-বুঝে কথা বলা উচিত। এ ধরনের উদ্ভট মতামত দিতে গিয়ে যারা ফরয নামায, রমযান-রোযা, যাকাত-হজ নিয়ে কথা বলতে চান তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এসব ইবাদতের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ দেখিয়ে দেওয়া চিন্তার ক্ষেত্রে একটা সর্বাত্মক নৈরাজ্য উসকে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে এবং করতে পারে।

যেমন দেখুন, নামাযের ব্যাপারে কোনো ‘বুদ্ধিজীবী’ যদি বলে দেন, নামাযের উদ্দেশ্য তো আল্লাহকে স্মরণ করা, তো এর জন্য কষ্ট করে মসজিদে গিয়ে পদ্ধতিগতভাবে সব বিধি-বিধান পালন করে নামায পড়ার কী দরকার! ঘরে বসে একটু ধ্যান করে নিলে অথবা এক-দু শ বার কিংবা এক-দুই হাজার বার আল্লাহর যিকির-তাসবীহ পড়ে নিলেই তো হয়! সেই বুদ্ধিজীবীর কথা আপনি কীভাবে নেবেন! তার এই কু-মতামত কি গ্রহণ করা আপনার উচিত হবে? একইভাবে হজ-ওমরা নিয়েও কারো কারো মতামত এমন থাকতে পারে যে, কষ্ট করে এত অর্থ খরচ করে মক্কায় যাওয়ার কী দরকার? টাকাটা গরিবদের মধ্যে দান করে দিলেই তো হয়। দুঃখজনক হল, হজ-ওমরা নিয়ে কেউ কেউ এমন কথা এখন বলেও থাকে। তো ইবাদত নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবীদের’ এসব অন্তঃসারশূন্য ও নৈরাজ্যকর মতামতের কোনো মূল্য নেই। এবং তাদের এসব মতামতের পেছনে কোনো সুফল বা সদুদ্দেশ্যও নেই।

আরো পড়ুন, কুরবানীর পশু সংক্রান্ত জরুরি মাসায়েল

প্রসঙ্গ: কুরবানির বিকল্প প্রস্তাব ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ

ইসলাম টাইমস : আমাদের সমাজে একশ্রেণির লোক ইসলামের বিভিন্ন আর্থিক ইবাদত সম্পর্কে ‘বিকল্প’ কিছু করার ‘বুদ্ধিজীবী মতামত’ ও যুক্তিতর্ক তুলে ধরে থাকেন। এবার কুরবানী না করে বিকল্প কিছু করার প্রস্তাবও তারা দিচ্ছেন নানা রকম যুক্তিতর্কের মাধ্যমে । এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ : কুরবানী না করে অন্য খাতে টাকা খরচ করার এজাতীয় উদ্ভট ‘বিকল্প প্রস্তাব’ আমরা শুধু এবছরই দেখছি না, প্রায় প্রতি বছরই এজাতীয় আওয়াজ শোনা যায়। অথচ এজাতীয় প্রস্তাব উত্থাপনকারীদেরকে সংকটগ্রস্ত মুসলমানদের নিয়ে কখনো কথা বলতে দেখা যায় না। ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালনেও তাদের অনেকের কোনো আগ্রহ বা অনুশীলনের নজির পাওয়া যায় না। কিন্তু দেখবেন, কুরবানী নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবী মতামত’ দিতে এরাই চলে আসেন গণমাধ্যমে। তাদের চরিত্র ও বক্তব্যে এসব বিষয় মিলিয়ে দেখলে এদের উদ্দেশ্য ও মতামতের ফাঁকটা ধরতে পারবেন। এসব প্রস্তাব ও যুক্তিতর্কের অবতারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষকে দ্বীন থেকে, ইসলামের শিআর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার গভীর একটা পাঁয়তারা। তবে এসব পাঁয়তারা চালিয়ে তারা অতীতে সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও ইনশাআল্লাহ সফল হতে পারবে না। এসব মতলবী যুক্তিতর্কের পরেও শিআরে ইসলাম ঠিক থাকবে। কোনো রকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যুক্তিতর্কে বিশ্বাস করে এসব ইবাদতে মুসলমানরা কোনো ছাড় দেবেন না ইনশাআল্লাহ।

কোনো ব্যক্তির প্রতি বিশেষ কোনো মনোযোগ দিয়ে নয়, সাধারণভাবেই বলতে চাই যে, যারা এমন মনে করেন যে, হজে¦র বিকল্প হিসেবে টাকা দান করে দেওয়া যায়, কুরবানীর বিকল্প হিসেবে গরিব মানুষকে অর্থ দান করে দেওয়া যায়, তারা দ্বীনী বিষয়ে নিতান্তই মূর্খতা থেকে এমন ভাবনা ভেবে থাকেন এবং এজাতীয় কথা বলে থাকেন।

তারা জানেন না, কুরবানী বা উযহিয়্যার হাকীকত ও প্রাণ কী? কুরবানীর শিক্ষার যে প্রাণ, তা সাধারণ স্তরের জ্ঞান ও চিন্তার ঊর্ধ্বের একটি বিষয়। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ইবরাহীম আ. তাঁর সন্তানকে যবেহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এমন কাজ কে কার হুকুমে করতে পারে! বাহ্যিক চিন্তাশক্তির ঊর্ধ্বের একটি বিষয়। খালেক আল্লাহর হুকুমের সামনে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন ইবরাহীম আ.। কোনো কিন্তু, কেন, কীভাবে- এজাতীয় প্রশ্নের মধ্যে তিনি পড়েননি। বরং আল্লাহ তাআলার হুকুমের সামনে একনিষ্ঠতার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছেন। ছেলে ইসমাঈল আ.-ও ছিলেন নিবেদিত বান্দা ও ধৈর্যের পাহাড়। তিনিও কুরবানী হওয়ার জন্য নিজেকে পেশ করেছেন; আল্লাহ তাআলার পরীক্ষায় তাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছেন। পরে কুরবানীর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পশু বরাদ্দ হয়েছে।

এখন আমাদের জন্য সহজ হয়েছে কুরবানীর আমল। নিজের বা নিজের সন্তানের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পশু কুরবানী করতে পারছি। কুরবানী করার পক্ষের সত্য ও সঠিক যুক্তি অনেক। দ্বীনী যুক্তি ও প্রেরণা রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, রয়েছে বিভিন্ন যৌক্তিক বিশ্লেষণ। কেউ কেউ অবশ্য বাহ্যিক-সামাজিক অন্য যুক্তিগুলোর কথা এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বলেছেন। আমি তাদেরকে মোবারকবাদ জানাই। তবে আমি বলব, কুরবানীর পক্ষে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য যুক্তিগুলোর প্রসঙ্গ পরের ব্যাপার, প্রধান বিষয় হচ্ছে, আমার খালেক ও স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মান্য করা। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ

…সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর। -সূরা কাউসার (১০৮) : ২

মুফাসসিরীনে কেরাম বলেছেন, এই আয়াতের মর্ম হচ্ছে, ‘ঈদের নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।’ আমাদের নবী, ইনসানিয়াতের রাহবার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কুরবানী করেছেন, মানুষকে কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আমাদের জন্য কুরবানীর বিধান, প্রেরণা ও প্রাণের এসব ইতিহাস ও প্রেক্ষাপটই যথেষ্ট। আরোপিত কূটতর্কের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কোনো আগ্রহ আমাদের নেই। আমাদের দ্বীন ও শরীয়তের অনুসারী বড় বড় ব্যক্তিত্বের মাঝে যুক্তি-তর্ক ও ফালসাফার যোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। এখনকার যুক্তি ও তর্কবিদেরা তাদের ধারেকাছেও যেতে পারবে না। কিন্তু দ্বীনের বরেণ্য সেই মনীষীরা কুরবানীর ‘বিকল্প’ প্রস্তাবনার যুক্তি-তর্কে যাননি এবং প্রয়োজনও মনে করেননি। কারণ, তারা জানতেন, শরীয়তের মেযাজ কী। তারা জানতেন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নির্দেশের মহত্ব কী। এজন্য আমার অনুরোধ, কুরবানীসহ বিভিন্ন ইবাদতের ‘বিকল্প’ প্রস্তাব যারা করতে চান, তারা এসব প্রস্তাব করা থেকে বিরত হোন। প্রতি বছর হজ-কুরবানী নিয়ে আপনাদের এসব উদ্ভট চিৎকারে মানুষ কান দেয় না,  দেবেও না।

আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই যে, কুরবানীর  ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার কথা, তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও আমলকেই মুসলমানরা অনুসরণ করবেন, অন্য কোনো কূটযুক্তিতে তারা কান দেবেন না। কুরবানী-হজ ইত্যাদি ইবাদতের অর্থ গরিবের মাঝে দান করে দেওয়ার ‘বিকল্প’ প্রস্তাব না দিয়ে তারা বরং ইসলামে দানের যে স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে, সেটার ওপর আমল করুন। কুরবানী বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা না করে সেই নফল দান তাদের করতে দেখা যায় না কেন?

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে বিত্তবানের হার দ্রুত বর্ধনশীল। এমনকি সাম্প্রতিক প্রচার পাওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী তা বিশ্বের অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের চেয়ে ঊর্ধ্বগামী। আবার অপর দিকে বলা হচ্ছে, নতুন করে দেড় কোটি লোক গরিব হয়ে যাচ্ছে। তো এই বিত্তবানদের কিছু অর্থ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিলেই তো দারিদ্র্য সংকটের সমাধান হওয়ার কথা। মানুষের কুরবানী আটকে দেয়ার প্রস্তাব করার প্রয়োজন কী! দেশের অসংখ্য মিলিয়নার-বিলিয়নারদের কিছু টাকা দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিলেই তো দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে। যেসব বিত্তবানের প্রচারযন্ত্রে বসে কুরবানী না করে কুরবানীর টাকা গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার ‘বুদ্ধিজীবীসুলভ’ পরামর্শ বিতরণ করা হয়, এসব প্রচারযন্ত্রের মালিকদের টাকার ভাণ্ডার থেকে কত টাকা গরিবদের দান করা হয়? এসব প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে মনে ঘুরছে।

কুরবানী কিংবা অন্য কোনো  ইবাদতের অর্থ গরিবদের খাতে দেওয়ার প্রস্তাবনার প্রয়োজন নেই। ইসলামের বিধানেই যাকাত-সদাকাসহ সাধারণ দানের বহু খাত বরাদ্দ আছে। নির্দেশনাও আছে। বিত্তবান নাগরিকদের উদ্যোগে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্য থেকে সেসব খাতে দান করতে হবে। ইসলামী অনুশাসন যথাযথভাবে অনুসরণ করলে গরিবকে সহযোগিতা করার যেসব উৎস ও খাত রয়েছে তারা সে সম্পর্কে জানতে পারবে। আমাদের পাঠকরা জেনে থাকবেন, বাজেট আলোচনার সময়ও আমরা বলেছি, ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য আলাদা খাত বরাদ্দ আছে, এর জন্য কুরবানীর খাতের টাকার দিকে চোখ দেওয়ার দরকার নেই। ইসলামী অনুশাসন নিয়ে পড়াশোনা করলে এবং তা অনুশীলন করার আগ্রহ থাকলে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতামূলক অনেক নির্দেশনা পাওয়া যাবে। খালেকের হুকুমের সামনে কোনো যুক্তিতর্ক ছাড়া মাখলুকের আত্মসমপর্ণের সবক দেয় কুরবানী। কুরবানীর এ প্রাণ ও তাৎপর্যের সামনে অন্য কোনো যুক্তিতর্কের কোনো অবস্থান থাকতে পারে না।

আরো পড়ুন, ফিকহী মতভেদের প্রসঙ্গ তুলে এই সময়ে কোরবানি থেকে বিরত থাকা যাবে না

প্রসঙ্গ : পরিস্থিতির কারণে কুরবানি না করার ভাবনা 

ইসলাম টাইমস: বর্তমানে কেউ কেউ এমনও আছেন, যারা করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ভাবনা থেকেই এবছর কুরবানী না করার কথা ভাবছেন অথবা বলছেন; তাদের এই ভাবনা নিয়ে আপনি কিছু বলবেন? বর্তমান পরিস্থিতিতে কি কুরবানীর ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতার সুযোগ রয়েছে?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ : এক্ষেত্রে বলতে চাই, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সুন্দরভাবে কুরবানী আদায় করা সম্ভব এবং বর্তমান পরিস্থিতিতেও কুরবানীর হুকুম বহাল আছে। দেশের উলামায়ে কেরামও এ কথাগুলো বলেছেন। ঢাকা মোহাম্মাদপুরে একটি এপার্টমেন্ট এলাকায় কুরবানী এবং কুরবানীর উযহিয়্যাহ (প্রাণী) প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার খবর আসার পর তার প্রতিবাদ করে উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এ পরিস্থিতিতেও কুরবানীর হুকুম মুসলমানদের ওপর বহাল আছে। আমিও মনে করি, উলামায়ে কেরামের এই মতামত ও অবস্থান যথাযথ।

একটি ব্যাপার দেখুন, গোটা পৃথিবীতেই কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রা এখন সচল। কঠোর লকডাউনে মানুষ কিছুদিন আবদ্ধ ছিল। এখন সবকিছুই অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে চলছে। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের মধ্যে নানা কারণে তাকে চলতে হবে, হচ্ছেও তাই। যার অঢেল সম্পদ আছে অথবা যারা অতিরিক্ত ভীতি বা আতঙ্কে ভুগছে, তারা হয়ত ঘরবন্দি সময় পার করছে। কিন্তু এখন বেশিরভাগ মানুষ নিজ নিজ কাজে সক্রিয়। মহামারি থেকে শিক্ষাও নিতে হবে, আল্লাহ্মুখী হতে হবে এবং হালাল জীবন-জীবিকার কাজেও যুক্ত হতে হবে। এখন সেটাই হচ্ছে। ভয়ে-আতঙ্কে বিভিন্ন দেশে যারা কঠোর লকডাউন দিয়েছিল তারাও স্বাভাবিক জীবনে চলে এসেছে। রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তবুও জীবনযাত্রা থেমে নেই। কিন্তু জীবনযাত্রার এই স্বাভাবিক ধারার মধ্যেও ধর্মীয় বিষয়ে এসে অতি সতর্কতা ও আতঙ্কের কথাগুলো বেশি বলা হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক হাস্যকর ঘটনাও ঘটছে। ইস্তেফতা-ইফতার দায়িত্বে থাকার কারণে আমাদের কাছে মানুষের বিভিন্ন চিত্র ও প্রশ্ন আসে।

এমন কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে, বাজারে যাচ্ছে ভিড় করে, হোটেলে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে মানুষের সঙ্গে মিলে মিশে, কিন্তু মসজিদে এসে তিন ফিট দূরত্বে দাঁড়ানো নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে; কেউ কাছে এসে দাঁড়ালে রেগে যাচ্ছে। এমনটা ঘটছে ধর্মীয় বিষয়ে অতিরিক্ত ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে। এ চিত্রটি অনেকটা ডায়াবেটিসের রোগীর  পেটভরে মিষ্টি খাওয়ার পর চায়ে চিনি না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বনের মত হয়ে গেছে। এরকমই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন এপার্টমেন্টে দেখা গেছে, মসজিদে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত জামাতে নামায আদায়কারী অনেক মানুষ কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছে। এভাবে কুরবানীর ক্ষেত্রেও নানারকম নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ধর্মীয় বিষয়ে এভাবে বাধাদান ন্যক্কারজনক ও ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজ। যিনি মসজিদে যেতে চাচ্ছেন, যিনি কুরবানী করতে চাচ্ছেন, তাকে তা করতে দিন। আপনার ভয় ও শঙ্কা বেশি থাকলে আপনি তার সঙ্গে মিশবেন না, তার বাসায় যাবেন না, তার থেকে দূরত্ব রক্ষা করে চলবেন। তাকে বাধা দেবেন কেন?

এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও যেহেতু সবকিছু সচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত চালু, সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কুরবানী করুন। এটা খুব ভালোভাবেই সম্ভব। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে থেকে সতর্কতা অবলম্বনে ইসলামের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কুরবানী স্বাস্থ্যবিধি মেনে আদায় করা সম্ভব। কুরবানীর সময় গায়ে গায়ে লেগে থাকার তো দরকার নেই। জবাইয়ের সময় তিন-চারজন লোকের সহায়তার দরকার হয়। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরে তারা কাজে সহায়তা করুক। এরপর থাকে গোশত বানানোর কাজ। সেটাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে করা সম্ভব। লকডাউনের পর থেকে গোশত বানানো, বিক্রি ও কেনা কি বন্ধ ছিল? করোনার ভয়ে গরু-ছাগল যবেহ বা এসবের গোশত কেনাবেচা তো বন্ধ হয়নি। ঐ বিতর্ক উত্থাপনকারীগণ কি এ কয়মাস গোশত খাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। তখন তো তারা এগুলোর প্রসেসের সাথে জড়িতদের বিষয়ে চিন্তা করেননি। এখন কুরবানীর সময় এ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা ও ভীতির কথা কেন বলা হচ্ছে? এতদিন যদি এসব ক্ষেত্রে সংক্রমণের ভয় কাজ না করে থাকে, এখন কেন করবে?

হাঁ, স্বাস্থ্যবিধি মানা ও উদাসীন না থাকার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে। তারপরও যাদের অসুস্থতা আছে, কিংবা যারা অতিরিক্ত আতঙ্কিত তারা নিজের বাসায় না করেও তো অন্য কোনো ব্যবস্থাপনায় কুরবানী করতে পারেন। দূর থেকে বিভিন্ন সংস্থা, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান, গরিব আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে কুরবানী করিয়ে নিতে পারেন। তবে দূর থেকে এভাবে কুরবানী করানোর কথাটা সবার জন্য বলছি না, এটাকে ব্যাপক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়; এ পদ্ধতি শুধু তাদের জন্য, যারা বেশি আতঙ্কিত। তারা চাইলে দূর থেকেও কুরবানী করিয়ে নিতে পারেন।

স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলে সবকিছু আগের মতো করে চললেও কুরবানী এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে নানারকম নিয়ন্ত্রণ এসে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে। খবরে এসেছে, পশুর হাটের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তাঘাট আটকে পশুর হাট করা উচিত নয়; স্বাভাবিক সময়েও নয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে হাটের সংখ্যা না কমিয়ে বড় বড় মহল্লাগুলোর বিভিন্ন মাঠে নির্দিষ্টসংখ্যক পশু নিয়ে হাট বসালে বেশি ভালো হত। হাটে ভিড় কম হত, দূর থেকে হাটে যাওয়া-আসা করা লাগত না।

ঈদুল ফিতরের নামাযের ক্ষেত্রেও যে ব্যবস্থাপনার কথা এসেছে, এবারের ঈদেও সেটি এসেছে। সবাইকে মসজিদে গিয়ে ঈদের নামায পড়তে হবে; মাঠে পড়া যাবে না। অথচ ঈদের মাঠ খোলা রাখলে বেশি ভালো হত। কারণ, মসজিদগুলোতে প্রবেশ ও ওঠা-নামার সময় ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেটা মাঠে থাকে না। মাঠ থাকে অধিকতর ফাঁকা। সেখানে চারদিক থেকে ভিড় করা ছাড়াই মানুষ সমবেত হতে পারত। বাহ্যিকভাবে যতটুকু বোঝা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে ঈদের নামাযের জন্য ঈদের মাঠগুলো উন্মুক্ত রাখলে সেটাই বেশি উপযোগী হত। মসজিদেও মুসল্লির চাপ কমত।

আর কেউ কেউ কুরবানীর সময় কুরবানী-পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে কথা বলছেন। এটা ইসলামেরই প্রেরণা। অন্য সবকিছুর সাথে নিজের আঙিনাও পরিচ্ছন্ন রাখা। কুরবানী যারা করবেন সবারই নৈতিক ও দ্বীনী দায়িত্ব- কুরবানীর পর যার যার স্থান পরিচ্ছন্ন করে ফেলা। এক্ষেত্রে সমাজপতি ও সরকারের দায়িত্বশীলেরাও বড় ভ‚মিকা রাখতে পারেন। মানুষকে বারবার সচেতন করা ও দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু কোনো অজুহাতেই কুরবানী বন্ধ রাখা বা স্থগিত রাখার চিন্তা করার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গ: কুরবানি না করে গরিবকে টাকা দান

ইসলাম টাইমস: কেউ কেউ মনে করেন, এই মহামারি ও সংকটের সময়ে কুরবানী না করে টাকাটা দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিলে তাদের উপকার হত, দারিদ্র্য কমত। এ বিষয়ে আপনার কোনো বক্তব্য?

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ : এ প্রশ্নের উত্তর আগেই চলে এসেছে। তারপরও বলছি, কুরবানীর টাকা বিলিয়ে দিলেই কি দারিদ্র্যের সংকট দূর হয়ে যাবে? ভেবে দেখা দরকার, কুরবানীর টাকা কি এ সংকটের সমাধান, নাকি দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের যে স্বতন্ত্র দিকনির্দেশনা রয়েছে- সেই পদ্ধতিতে কাজ করা প্রয়োজন। লকডাউন শুরু হওয়ার পর অনেকেই এজাতীয় সেবার উদ্যোগ নিয়েছেন। বহু মানুষ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন; যদিও দেশের দরিদ্র মানুষের অনুপাতে এ সাহায্যের পরিমাণ খুবই কম ছিল। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক পর্যায়ে আরো বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কিন্তু ইবাদতের (কুরবানীর) ‘অর্থ’ তো সেক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে না। বরং দারিদ্র্য বিমোচনে শরীয়তের যে নীতি, ইসলামী অর্থনীতির যে নির্দেশনা এবং আকস্মিক দারিদ্র্য ও দুর্যোগ নেমে এলে শরীয়ত সেক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নিতে বলে- সেই নীতি অনুসরণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন