এরদোগান: আগামী দিনে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হবে

সাবিনা আহমদ।।

এরদোগান এই মুহূর্তে বিশ্বের সাধারন মুসলমানদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম নেতা। কিন্তু এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বা তার বিরুদ্ধে আছে প্রচুর ক্ষমতাবান সংগঠন আর রাষ্ট্র। যেমন:

বিজ্ঞাপন

১) গুলেনিস্টস – সাপোর্টেড বাই আমেরিকা, ইসরায়েল। এক সময় এরদোগানের সহকর্মি হলেও এদেরকেই এরদোগান তুরস্কের অভ্যন্তরে এরদোগানের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। ২০১৬ সালের ক্যু এর পর এরদোগান সরকার সমাজের প্রতি স্তর থেকে গুলেনিস্টদের পার্জ করেছে, যাতে তারা নতুন করে কোন ঝামেলা না করে।

২) পিকেকে – সাপোর্টেড বাই আমেরিকা, ইসরায়েল। পিকেকের সিরিয়ান ব্রাঞ্চ ওয়াইপিজি সিরিয়ায় আইসিস বিরোধী যুদ্ধে আর কুর্দিদের জন্য নিজেদের ভূখন্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমেরিকার সহযোদ্ধা। পিকেকে কে তুরস্ক, জাতিসংঘ, আমেরিকা, ইউরোপ সবাই জঙ্গি সংগঠন ঘোষণা দিলেও, বাস্তবে তাদের সাথে এরদোগানের বিরুদ্ধে আমেরিকা, ইউরোপ, ইসরায়েল সবাই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সিরিয়ায় তুরস্কের সরাসরি জড়ানোর প্রধান কারন পিকেকে/ওয়াইপিজি কে নজরে রাখা আর নিজ সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩) কেমালিস্টস – সাপোর্টেড বাই আমেরিকা, ইসরায়েল, ইউরোপ। ইউরোপ কখনই তাদের সীমান্তে মুসলিম কোন রাষ্ট্র চায় না, সেই কারণেই তারা তুরস্কের আবেদন আর অনুরোধ স্বত্বেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মেম্বার রাষ্ট্র করে নাই। সেক্যুলার (এন্টাই ইসলাম) কেমালিস্টরা সবসময় ইউরোপ আমেরিকা, ইসরায়েলের সাপোর্ট পেয়ে আসছে।

৪)আসাদ – সাপোর্টেড বাই রাশিয়া। প্রথম থেকে আমেরিকা, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, তুরস্ক আসাদের বিরোধিতা করে আসাদ-বিরোধী সেনাদের ট্রেইনিং, অস্ত্র, টাকা দিয়ে মদদ করলেও গত ৩ বছরে যুদ্ধের মোড় ঘুড়ে আসাদের পক্ষে গেলে তারা তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে চেঞ্জ করেছে, কেবল তুরস্ক ছাড়া। এখানে খুব জটিল সমীকরনে আছে তুরস্ক, আর তাদের অবস্থা মুলত জটিল করেছে আমেরিকা ওয়াইপিজি কে সরাসরি যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সাপোর্ট করা শুরু করে। ওয়াইপিজির সাপোর্ট তুরস্কের কাছে রেড লাইন ছিল, যা আমেরিকা অতিক্রম করে তাদের ন্যাটো এলাই তুরস্ককে সরাসরি অবজ্ঞা করলে, এরদোয়ান সিরিয়াতে কঠিন অবস্থান নিয়ে নেয়।

৫) ইসরায়েল – অতীতে কেমালিস্ট সরকার ক্ষমতায় থাকা কালে ইসরায়েলের সাথে তুরস্কের ভালো সম্পর্ক থাকলেও, এরদোগান ক্ষমতায় আসলে ধীরে ধীরে তা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। ইসরায়েলের সিক্রেট ইন্টালিইজেন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী তারা এখন তুরস্ককে তাদের জন্য বড় ধরনের থ্রেট মনে করে। ভুমধ্যসাগরের অয়েল এন্ড গ্যাস বানিজ্যেও তুরস্ক ইসরায়েলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

৬) আমেরিকা – ওবামা ক্ষমতায় থাকার শেষ কয়েক বছর থেকেই তুরস্কের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ফাটল ধরে। উপরেই বলেছি আমেরিকার সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ফাটল হওয়ার কারন। তুরস্ক আমেরিকাকে অফার করেছিল তারা সরাসরি সেনা পাঠিয়ে সিরিয়ায় আইসিস দমন করবে । আমেরিকা তা শোনে নাই। এটা ওবামা কালের ঘটনা। এস-৪০০ কেবল সুপারফিশিয়াল কারন। যদিও স-৪০০ চালু করলে ন্যাটোর কিছু সিক্রেট রাশিয়ার হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেই কারনে আজ পর্যন্ত তুরস্ক স-৪০০ পুরাপুরি ভাবে চালু করে নাই। কিন্তু মুল কারন আমেরিকা-ইসরায়েল তুরস্ক-ইরানের সীমান্তে স্বাধীন কুর্দিস্থান বানিয়ে তাদের উপর নজর রাখবে আর সীমান্ত দিয়ে ক্যাওস লাগিয়ে নিজেদের সুবিধা তুলে নিবে।

৭) রাশিয়া – জটিল সমিকরন তবে মুলে আছে ভুমধ্যসাগরে রাশিয়ার অয়েল গ্যাস বাণিজ্য, যার থ্রেট তুরস্ক। এসব নি য়েই লিবিয়ায় তুরস্কের অবস্থান, ভুমধ্য সাগরে লিবিয়ার সাথে মেরিটাইম চুক্তি, নানান বাণিজ্য চুক্তি। তুরস্কের সাথে এই মুহূর্তে দুইটা ফ্রন্টে মুখোমুখি অবস্থানে আছে রাশিয়া- সিরিয়ায় ইদলিব আর লিবিয়ার সার্ট (সিরত)। অত্যন্ত থিন লাইনে দুই দেশের মাঝে একটা মিলিটারি সমঝোতা থাকলেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। দুই দেশই একসাথে রাস্তা টহল দেয়, আবার একে অপরের পক্ষে অস্ত্র , সরঞ্জাম, সেনা মোতায়েন করে নিজেদের অবস্থান জরালো করে। রাশিয়া আর্মেনিয়ায়কে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে উস্কে আজারবাইজানের মিত্র তুরস্ককে সেই ফ্রন্টে ব্যতিব্যস্ত রাখার পরিকল্পনায় আগাচ্ছে।

৮) মিশর – এরদোয়ান মুরসি আর মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সাপোর্ট দিয়েছিল, এখনও সেই ব্যাপারে সোচ্চার। সিসি মিশরের ডেমোক্রেটিক্যালি ইলেক্টেড মুরসিকে ক্যু করে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এরদোয়ান মুরসিকে তুরস্কে পাঠিয়ে দিতেও বললেও সিসি তা প্রত্যাখান করে। পরে মুরসিকে কারাগারে অবহেলায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মিসরের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হলেও আরব আমিরাত আর ফ্রান্সের জোরে তারা তুরস্ককে লিবিয়ায় চ্যালেঞ্জ করছে নিজেদের সীমান্ত সিকিউরিটির নামে। সিমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে।

৯) গ্রিস – যদিও অর্থনৈতিক ভাবে মাজা ভাঙা, কিন্তু আমেরিকা আর ফ্রান্স জোর সাপোর্ট দিয়ে গ্রিসকে তুরস্কের বিরুদ্ধে নাচাচ্ছে। ভুমধ্যসাগরের তেল আর গ্যাস নিয়ে বিরোধ আছে তুরস্কের সাথে, আছে গ্রিক সাইপ্রোয়েট নিয়েও।

১০) ফ্রান্স – নিজেদের আফ্রিকার কলোনিয়াল মাস্টার মনে করে। সেখানে ফ্রান্স ছাড়া অন্য কোন ক্ষমতার বলয় তারা হতে দিতে নারাজ। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে প্রথম বোমারু বিমান থেকে বোমা বর্ষণ ফ্রান্সই করেছিল। নিজেরা লিবিয়ায় ওয়ার লর্ড হাফাতারকে অস্ত্র, সমরজান ইত্যাদি পাঠিয়ে জাতিসংঘ সাপোর্টেড লিবিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও এখন তুরস্কের সেরাজ সাপোর্ট কে ইলিগ্যাল বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হৈচৈ করে।

১১) সৌদি আরব – তাদের কাতার প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারন তুরস্ক। ইরানের পর তারাও তুরস্ককে নিজেদের হেজেমন খেলার বিরুদ্ধি শক্তি মনে করে, যার কারনে পদে পদে তুরস্কের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়।

১২) আরব আমিরাত – এরদোয়ানের সবচেয়ে বড় শত্রু আমিরাতের মুহম্মদ বিন জায়েদ। সৌদি-ইরান যেমন একে অপরের শত্রু তেমন আবুধাবি-তুরস্ক। এরদোয়ান ক্ষমতায় থাকলে এই বিরোধ বাড়তেই থাকবে। এমবিজেড একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইবে। 20১৬ সালে তুরস্কে এরদোয়ান কে ক্ষমতাচ্যুত করতে যেই ক্যু হয়েছিল তুরস্ক তার পিছনে আমিরাতকেও দায়ী করে।

এই যে এতো এতো দেশ আর সংগঠন এরদোগানের বিরুদ্ধে, আর তারা যে সর্বক্ষণ এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে, তুরস্ককে দুর্বল করতে চাইছে সেটা এরদোগান সরকার খুব ভালো করেই জানে। তুরস্কের কারনে সৌদি আরব যেমন কাতারকে তাদের দাবী মানতে বাধ্য করতে পারেনি, তেমন তুরস্কের কারনে রাশিয়া-আসাদ আজ পর্যন্ত ইদলিব দখল করতে পারেনি, যেমন হাফতার পারছে না ত্রিপোলি তথা লিবিয়া দখল।

অভ্যন্তরে আর বাহিরে শত্রু পরিবেষ্টিত তুরস্ক তথা এরদোগান আগামিতে আরও কঠোর হয়ে উঠবে তুরস্ককে ফ্রান্স-আমেরিকা-ইসরায়েল-সৌদি-আমিরাতের হাতে ছেড়ে দেয়ার আগে। আমার ধারনা অভ্যন্তরে যত এরদোগান বিরোধী দল আছে তাদের শক্ত হাতে দমন করবে । সেখানে অনেক ফ্রিডম হ্রাস পাবে, যেমন ফ্রিডোম অফ স্পীচ, ফ্রিডোম অফ প্রেস ইত্যাদি। ফ্রিডমের নামে ফ্রান্স-আমিরাতকে নিজের দেশের আভ্যন্তরীণ পানি ঘোলা করতে দিবে না এরদোগান।

এরদোগান অত্যন্ত ডিসাইসিভ আর সাহসী। দূরদর্শীয় বটে। তবে তার দূরদর্শন পশ্চিমাদের দূরদর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক। আর সেই সংঘর্ষই এরদোগান তথা তুরস্ককে অনেক ফ্রন্টে মোকবেলার সম্মুখীন করছে। তুরস্কের কিছু ব্যাপার রাশিয়া মানলেও আমেরিকা মানছে না; আমেরিকা মানলেও ইসরায়েল মানছে না; ইসরায়েল মানলেও সৌদি-আমিরাত মানছে না। তাই সর্বদাই তুরস্ককে শত্রুর মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

কাতার হচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্র যারা তুরস্কের সাথে আছে। কাতার অত্যন্ত ধনী একটি রাষ্ট্র। আর সেই কারনে কাতার -তুরস্ক এলায়েন্স এর ক্ষমতা বেশ জোরালো। যার ইমপ্যাক্ট আমরা স্বয়ং কাতার আর লিবিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। এছাড়া পাকিস্তান আর মালয়েশিয়া তুরস্ক পন্থী। কিন্তু এই দুই দেশ সরাসরি মিলিটারি সাপোর্ট তুরস্ককে দেয়ার উপায় নাই।

এসব বিবেচনায় আয়াসোফিয়াকে ফের মসজিদকরন তুরস্কের অভ্যন্তরে এবং বাইরে দুর্দান্ত প্রতীকী একটি ঘটনা । আভ্যন্তরে সম্ভাব্য বিদ্রোহের বীজগুলিকে কঠিন বার্তা দিল যে এই তুরস্ক এরদোগানের তুরস্ক, কেমালিস্ট তুরস্ক নয়, কোন বিরুদ্ধাচারনের আগে তারা যেন কঠিনভাবে হিসাব করে; আর বাইরের জন্য বার্তা ছিল যে এই তুরস্ক নিজেদের আইডেন্টিটি নিয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, গত ১০০ বছরের ইউরোপিয়ান হতে চাওয়া সেই তুরস্ক নয়।

কিন্তু বাইরে তুরস্কের আরও ক্ষমতাবান মিত্র দরকার। ইরান যার ভালো একটি উদাহরণ। এতো অর্থনৈতিক স্যানকশানের পরেও ইরানের রেজিমকে আজ পর্যন্ত আমেরিকা-ইরায়েল-সৌদি ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। ইরানের রেজিম যত খারাপ হোক না কেনো, তারা কেবল তাদের প্র্যাগমেটিক পলিসির কারনে আজও টিকে আছে।

সারা বিশ্বের সাধারন মুসলমান এরদোগানের গুনগান গাইছে, তার জন্য দোয়া করছে , তার সাহসিকতার বাহবা দিচ্ছে; আর এরদোগানের সামনে প্রচুর চ্যালেঞ্জ। সেই  চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই  এরদোগানকে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখিকার ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন