হেনস্থার শিকার নারী পুলিশ সদস্য, বিচার চাইতে গেলেও পান কুপ্রস্তাব

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: আগেও নিপীড়নের প্রতিকার চেয়ে জুটেছিল শাস্তিমূলক বদলি। অভিযুক্ত পুলিশের এক এসআই আবু সুফিয়ানের সঙ্গে একই জায়গায় বদলি করা হয়েছিল নিপীড়নের শিকার নারী পুলিশ সদস্যকে। সেখান থেকে বাঁচানোর নাম করে পুলিশের তিন পুরুষ সদস্যের সঙ্গে ‘একান্তে সময় কাটানো’র অশালীন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। ভুক্তভোগী নারী বিষয়টি নিজ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েও কোনো সুবিচার পাননি। উল্টো তাকেই ‘খারাপ মেয়ে’ বলে গালমন্দ করা হয়।

সর্বশেষ নিপীড়নের ঘটনায় এই নারী পুলিশ সদস্যকে আবারও নিপীড়কের বাড়ির পাশে বদলি করায় তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার কারণে কর্মস্থলেও যোগ দিতে পারছেন না। এরই মধ্যে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে কাজে যোগদান না করার কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে তার কাছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত নারী সদস্যদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রেখে সবাইকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা রয়েছে। বাহিনীর কেউ যদি কোনো নারী সদস্যের জন্য অমর্যাদাকর, অশালীন আচরণ করে থাকেন সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী সদস্য ২০১৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। বছর তিনেক প্রায় নির্বিঘ্নে চাকরি করেন। এরপর ২০১৮ সালের রমজান মাসে নীলফামারী সদর থানায় দায়িত্ব পালনকালে একই থানার এসআই আবু সুফিয়ানের হাতে প্রথম নিপীড়নের শিকার হন। সেই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু ঈদের ছুটি কাটিয়ে থানায় যোগদানের পর জানতে পারেন, অভিযুক্ত এসআই আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তাকেও কুড়িগ্রাম পুলিশ লাইনে প্রশাসনিক কারণে বদলির আদেশ এসেছে।

ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্য বলেন, সেদিনের ঘটনার বিচার হলে পরবর্তী সময়ে আর কেউ নিপীড়ন করার সাহস পেতেন না। শুধু তাই নয়, আমাকেই খারাপ মেয়ে হিসেবে সব জায়গায় উপস্থাপন করা হয়েছে। একজন নারী হিসেবে এ অপবাদ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তিনি বেঁচে নেই। ছোট ভাই আর মাকে নিয়ে এ চাকরি করেই সংসার চালাই। তাই আত্মহত্যার চিন্তা থেকে সরে এসে আমি প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমার কাছে চাকরির চেয়ে ইজ্জত বড়। তাই নিজ বাহিনী থেকে সুবিচার না পাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দিয়েছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের তথ্যানুযায়ী, নীলফামারী সদর থানায় কর্মরত থাকাকালে থানার এসআই আবু সুফিয়ান বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে অসদাচরণ করতে থাকেন। বিভিন্ন মাধ্যমে অসংগত প্রস্তাব দিতে থাকেন। মেয়েটি তখন তার ছোট ভাই ও মাকে নিয়ে থানার পাশেই ভাড়া বাসায় থাকতেন। সে সময় রমজান মাসের শেষের দিকে বাসায় মেয়েটির মা না থাকার সুযোগে এসআই আবু সুফিয়ান গিয়ে হাত ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করেন। এতে তিনি বাঁচার জন্য চিৎকার দিলে আবু সুফিয়ান সেখান থেকে সটকে পড়েন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়ে প্রতিকার চাইলে কোনো তদন্ত না করেই অভিযুক্ত আবু সুফিয়ান ও ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্যকে কুড়িগ্রাম রিজার্ভ পুলিশে বদলি করা হয়। মেয়েটির অভিযোগ, এরপর আবু সুফিয়ানের প্ররোচনায় এক সপ্তাহের মধ্যে সেখান থেকে ঢাকার উত্তরায় শিল্প পুলিশে বদলি করা হয় তাকে। এ সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থেকে চাকরি করার জন্য নীলফামারীতে বদলির আবেদন করেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। এরই মধ্যে শিশির নামে এক পুলিশ সদস্য তার বদলির জন্য ওই নারীর মোবাইল ফোনে পুলিশের তিনজনের সঙ্গে এক ঘণ্টা সময় কাটানোর প্রস্তাব দিয়ে মেসেজ পাঠান। এমন বিকৃত মেসেজ পেয়ে তিনি আবারও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন। তাতেও তিনি কোনো সুবিচার পাননি।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, মেয়েটিকে যারা ধারাবাহিকভাবে নিপীড়ন করেছিলেন তাদের কেউই শাস্তি পাননি। তারা তাদের কর্মস্থলে চাকরি করছেন। এ নিপীড়নকারী পুলিশ সদস্যরা হলেন কনস্টেবল শিশির, শিশিরের দুই ব্যাচমেট এসআই আবু সুফিয়ান ও সর্বশেষ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলম। এদের মধ্যে অনলাইন পোর্টাল দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে কনস্টেবল শিশিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি এখন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে চাকরি করছি। চাকরিজীবনে আমি কখনো কোনো নারী সহকর্মীর সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ করিনি। শাস্তিও পাইনি।

গাইবান্ধা সিআইডিতে কর্মরত এসআই আবু সুফিয়ান সেদিনের নিপীড়নের কথা স্বীকার করে বলেন, মেয়েটির সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন এসপি আশরাফ স্যার মীমাংসাও করে দিয়েছিলেন। মীমাংসা না, শাস্তিও দিয়েছিলেন। কী ধরনের শাস্তি পেয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কুড়িগ্রামে বদলি করা হয়েছিল। কুড়িগ্রামে আপনার সঙ্গে তো নিপীড়নের শিকার মেয়েটিকেও বদলি করা হয়, এমন প্রসঙ্গে সুফিয়ান বলেন, একসঙ্গে নয়, আলাদা ডিও লেটারে তাকে বদলি করা হয়।

ধারাবাহিক নিপীড়নের সর্বশেষ পর্যায়ে সম্প্রতি যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে নীলফামারী ডোমার থানার পুরুষ পুলিশ সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম অশালীন প্রস্তাব দেন ওই নারী পুলিশ সদস্যকে। এর প্রতিকার চেয়ে তিনি নালিশ করেছিলেন নীলফামারী জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে। ফলাফল হিসাবে, গত ৪ জুন একই আদেশে অভিযুক্ত পুরুষ পুলিশ সদস্য জাহাঙ্গীর আলমকে পঞ্চগড়ে ও ভিকটিম নারী পুলিশ সদস্যকে প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে লালমনিরহাট পুলিশ লাইনে বদলি করা হয়। শুধু তাই নয়, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি লালমনিরহাট পুলিশ লাইনের পাশে কুড়িগ্রামে। এ সুযোগে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম ও তার সহযোগীরা ভিকটিম নারী পুলিশ সদস্যকে বিভিন্নভাবে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে তিনি কর্মস্থলে যোগদান করেননি। এর মধ্যে গত বুধবার নিপীড়নের শিকার সেই নারী পুলিশ সদস্যের ঠিকানায় কৈফিয়ত তলবের চিঠি পাঠানো হয়। তাতে যোগদান না করার কারণ জানতে চাওয়া হয়। তবে নিপীড়নের শিকার সেই নারী পুলিশ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, অসুস্থজনিত ছুটি, হয়রানির শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছি না।

মেয়েটির সহকর্মী একাধিক নারী পুলিশ সদস্য জানান, ভুক্তভোগী এই নারী পুলিশ সদস্য প্রতিবাদী স্বভাবের। যার কারণে তার একাধিক লিখিত অভিযোগের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার তদন্ত কিংবা বিচার না করে উল্টো অভিযুক্তের সঙ্গে একই কর্মস্থলে পাঠানোর আদেশে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে কৈফিয়ত চেয়ে বসেন। তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার এহেন প্রতিবাদী আচরণ স্বাভাবিকভাবে না নিয়ে উল্টো তাকেই ‘খারাপ মেয়ে’ হিসেবে পুলিশ সুপার ও ডিআইজির কাছে উপস্থাপন করেন। আর এ সুযোগ নিয়েই বাহিনীর পুরুষ সদস্যরা হেনস্থা করে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও বাংলাদেশ পুলিশ ওমেন নেটওয়ার্কের (বিপিডব্লিউএন) প্রেসিডেন্ট আমেনা বেগম  বলেন, ভুক্তভোগী নারী সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ ওমেন নেটওয়ার্ক শাখায় লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।