আয়া সোফিয়ায় মুসলমানেদের মালিকানা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হল?: মুতায আল খতিবের তাত্ত্বিক বয়ান

মুতায আল খতিব ।।

আয়া সোফিয়া কে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তর করার প্রসঙ্গে তুরস্ক যে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। সুলতান মোহাম্মদ আল ফাতিহ আয়া সুফিয়া কে মসজিদ হিসেবে ওয়াকফ করার যে দলিল রয়েছে-তার বিচার বিশ্লেষণ ও সম্পন্ন হয়েছে। ১৬৮ পৃষ্ঠার প্রাচীন এই নথির সাথে বেশ কিছু ছবি ও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট এরদোগান এ রায়ের বৈধতা দানের জন্য এই দলিলের উপর নির্ভর করেছেন। এই যুগান্তকারী রায়ের আইনগত এবং ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও অন্যান্য বেশ কিছু দিক থেকে যেমন-ধর্মীয়, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভাবে এর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আমি আমার পূর্বের একটি প্রবন্ধে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি যে, এটা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা কোন রাজনৈতিক ঘটনা নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো রায়ও নয়। কিন্তু তারপরও বাস্তবে এই রায়কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা যাচ্ছেনা।

কেননা, কালের পরিক্রমায় সর্বদাই কোন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের উপযোগিতা বিবেচনা করার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা- প্রভাবের প্রতি লক্ষ্য করা হয়। তবে কোনো মতাদর্শ রাজনৈতিক উপায়ে সৃষ্টি করা যায় না। সুতরাং জনমতের ভিত্তিতে যদি রায় প্রদান করতে হয় তাহলে তার জন্য একটি উপযুক্ত সময়ের প্রয়োজন। যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। অতএব প্রতিটা রায় অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈধতার মুখাপেক্ষি। সুতরাং আয়াসোফিয়া কে মসজিদ থেকে জাদুঘরে পরিবর্তন করার রায় বাতিল সাব্যস্ত করে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তর করার আইনগত বৈধতা প্রমাণ করার জন্য কিছু দালিলিক প্রমাণপত্র উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

এই কর্মপন্থা প্রথমে উসমানী শাসনামলে এবং এরপর আধুনিক তুরস্ক গঠন হওয়ার পরেও অনুসরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা যেন এই রায়ের আইনগত এবং ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিস্মৃত না হয়ে যাই। বরং এই রায় প্রদানের ক্ষেত্রে যে ফিকহী এবং শক্তিশালী আইনগত বৈধতা রয়েছে-যার সাথে রাজনীতির দূরতম সম্পর্ক‌ও নেই-তার প্রতি আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখব। এজন্যই আমি কিছু শাস্ত্রীয় তথ্যবহুল আলোচনা করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

ফিকহী ও আইনগতভাবে এই রায়ের বৈধতার দলিলের তিনটি রূপ হতে পারে:

এক. আয়া সুফিয়া সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তিনি এটা ওয়াকফ করে দিয়েছেন এবং তার মালিকানার প্রমাণপত্র তিনি ওয়াকফের রেকর্ডভুক্ত করেছেন। এরদোগান এই মালিকানা এবং ওয়াকফ; এই দুটিতে একত্র করে এই ফলাফলে পৌঁছেছেন যে, যদি এটা সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হতো তাহলে তিনি কিছুতেই আইনগত ভাবে ওয়াকফ করতে পারতেন না। অতএব এটা রাষ্ট্রের বা কোন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়।

দুই. যখন সুলতানের মালিকানা এবং ওয়াকফ সাব্যস্ত হয়ে গেল তখন এখানে আর কোন প্রকারের পরিবর্তন – পরিবর্ধনের সুযোগ নেই। কেননা সে অধিকার একমাত্র ওয়াকফকারীর জন্য সংরক্ষিত। এর স্বপক্ষে দলিল হিসেবে এরদোগান তার বক্তব্যে বলেছেন, মুহাম্মদ আল ফাতিহ ওয়াকফের রেজিস্টারে একটি কঠিন বার্তা দিয়েছেন-যে আমার ওয়াকফ কৃত মসজিদ আয়াসোফিয়া কে কোন প্রকার পরিবর্তন করবে সে মারাত্মক অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং কেয়ামত পর্যন্ত তার উপর লা’নত। এই ওয়াকফের তারিখ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ।

তিন. মুহাম্মদ আল ফাতিহ যখন ইস্তাম্বুল বিজয় করেন তখন তিনি রোমান সম্রাটের উপাধি ধারণ করেছিলেন।এরই ধারাবাহিকতায় তিনি বাইজেন্টাইন রাজবংশের জন্য রেজিস্ট্রিকৃত সকল সম্পদের অধিকারী হন। অর্থাৎ, বাইজেন্টাইন সম্রাটের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তাঁর কর্তৃত্বের ভিত্তিতে তিনি এর সকল সম্পদের মালিক হন। সুতরাং তিনি নিজ সম্পদে হস্তক্ষেপ করেছেন মাত্র । এর বেশি কিছু নয়।

এসকল প্রমাণাদির উপর বেশ কিছু আপত্তি দেখা দেয়। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এটাকে সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওয়াকফ সাব্যস্ত করে “রাষ্ট্রীয়” বলয়ের বাহিরে নিয়ে “ব্যক্তিগত” সম্পত্তির গন্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলেছেন। তিনি এটা করেছেন কামাল আতাতুর্কের জাদুঘরে পরিণত করার রায়ের অযৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য। আয়া সোফিয়া কে জাদুঘরে পরিণত করার যে রায় আতাতুর্ক সরকার দিয়েছিল তার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করতেই তিনি এই কাজটি করেছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মুহাম্মদ আল ফাতিহ যে শুধুমাত্র আয়া সুফিয়াই ওয়াকফ করেছিলেন- তা নয়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পরে আসছে। আর এক্ষেত্রে সুলতানের দুটি সত্তাগত দিক রয়েছে। একটি হচ্ছে তার “ব্যক্তিসত্তা” অপরটি হল তার “শাসকসত্তা”। সুতরাং আমরা কিভাবে এই দুই “সত্তাগত বৈশিষ্ট্যের” মাঝে পার্থক্য করতে পারি অথচ যেখানে তার প্রতিটি ওয়াকফের মধ্যেই এই উভয় বৈশিষ্ট্যের প্রভাব রয়েছে? তিনি কি আয়া সুফিয়া কেবলই একজন ব্যক্তি হিসেবে ওয়াকফ করেছিলেন নাকি মুসলমানদের তৎকালীন সুলতান হিসেবে ওয়াকফ করেছিলেন?

দ্বিতীয় আরেকটি প্রশ্ন এখানে থেকে যায়। সুলতান বাইজেন্টাইন সম্রাটের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার মালিকানাধীন সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি এই রদবদল একজন “ব্যক্তি” হিসেবে করেননি। যদি তাই করতেন তাহলে তা তার জন্য বৈধ হতো না। সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে আয়া সোফিয়া কে ওয়াকফ করার যেই কথা বলা হচ্ছে, তা এই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা পূর্ববর্তী সম্রাটের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বর্তমান সুলতান এই সম্পদের মালিক হয়েছেন, তিনি কেবলমাত্র একজন “ব্যক্তি” হিসাবে এই মালিকানা অর্জন করেননি। এমনকি বিজিত অঞ্চল সংশ্লিষ্ট (সন্ধি চুক্তির মাধ্যমে হোক অথবা যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে প্রতিটির বিধান ভিন্ন ভিন্ন) ইসলামী বিধান অনুযায়ীও পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় কোন সম্পত্তিতে ব্যক্তির হস্তক্ষেপ বৈধ নয়।

সুতরাং কিভাবে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ সেন্ট আয়া সোফিয়া কে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে গ্রহণ করে মসজিদের জন্য ওয়াকফ করতে পারেন! অথচ তিনি সর্বদাই বড় বড় আলেমদের এক জামাতের সাহচর্য গ্রহণ করে আসছেন।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী “মাওলুদ জাওয়েস উগলু”এই বিষয়ে এরদোগানের সম্পূর্ণ বিপরীত মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য জয় এবং উসমানীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আয়া সোফিয়া ওসমানী সালতানাতের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হয়।”

অর্থাৎ, তিনি আয়া সোফিয়াকে উসমানী সাম্রাজ্যের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে সুলতান আল ফাতিহ এর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। তবে এখানে রাষ্ট্রের ধারণা টা অস্পষ্ট। কেননা এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৎকালীন সময় বিদ্যমান ছিল না। সুতরাং ‘রাষ্ট্র’ বলে নামকরণ করা হয়েছে এমন অঞ্চলে একজন রাষ্ট্রপক্ষের মালিক নির্ধারণ করা আমাদের জন্য আবশ্যক। এই মালিক কে হবে? রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির মালিক কি সকল মুসলমান এবং সুলতান তাদের পক্ষ থেকে নিযুক্ত উকিল বা প্রতিনিধি হবেন? নাকি ব্যক্তিগতভাবে সুলতান-ই সম্পত্তির মালিক হবেন?

যদি আমরা সকল মুসলমানকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির মালিক ধরে নেই তাহলে “ব্যক্তিগত” ওয়াকফের আলোচনার পরিবর্তে “শাসনকর্তা” হিসেবে ওয়াকফের বিধান নিয়ে আলোচনা করা উচিত। যার বৈধতা সকল ফুকাহায়ে কেরাম দিয়েছেন। তবে এর ব্যাখ্যায় তাঁদের কিছু মতভিন্নতা রয়েছে।

 

এই রায়ের ব্যাপারে কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তিরা এ কথা প্রচার করেছে যে, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ সুফিয়াকে নিজ পয়সা দিয়ে ক্রয় করে ওয়াকফ করেছেন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ওয়াকফ করেছেন বলে যে কথাটা প্রচার করা হচ্ছে, তা থেকেই এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এই রায় প্রকাশের পূর্বে এ ধরনের কথার কোন অস্তিত্ব ছিল না। এর স্বপক্ষে কোন দলিল না ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্য কোন গ্রন্থে রয়েছে আর না বর্তমানে যে সকল নথিপত্র পেশ করা হচ্ছে তাতে রয়েছে। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং ধারণাপ্রসূত। বরং প্রেসিডেন্ট এরদোগান তো বলেছেন যে, সুলতান বাইজানটাইন সম্রাটের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সাম্রাজ্যের সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছেন। তাই যদি হয়, তাহলে সেই সম্পদ নতুন করে কয় করার তো প্রশ্নই আসে না।

অধিকন্তু যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে অধিকৃত অঞ্চলের মালিকানা লাভের কি কি মাধ্যম হতে পারে তা ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্ট করে লিখেছেন এবং যুগের পর যুগ মুসলমানরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিজিত এলাকা সমূহে এর উপর আমল করেছেন। তাতে স্পষ্ট বলা আছে,বিজিত অঞ্চলের সম্পত্তির মালিক হওয়ার জন্য নতুন করে ক্রয় করার প্রয়োজন নেই। তবে অধিকৃত অঞ্চলের সম্পত্তির বন্টন নীতি, মালিকানা পরিবর্তন এবং হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের মতানৈক্য রয়েছে।

মালেকী মাযহাবের অনুসারী আলেমগণ মনে করেন, মুসলমানরা কোন অঞ্চল যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করলে সেই এলাকার অধিবাসীদের সকল সম্পত্তি যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে মুসলমানদের মালিকানাধীন হয়ে যায়।

হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেছেন, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তের ভার সুলতানের নিকট অর্পণ করা হবে। তিনি যদি চান তাহলে ওই অঞ্চলের মালিকানা তার অধিবাসীদের জন্য বহাল রাখবেন। এটা তাদের প্রতি অনুগ্রহ হবে। আর চাইলে তাদের থেকে নিয়ে মুসলমানদের দিয়ে দিতে পারেন। মোটকথা, যেখানে পরাজিত জাতির তাদের নিজ অঞ্চলের মালিকানা-ই থাকছে না সেখানে তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয়ের তো প্রশ্নই আসে না। এজন্যই ইমাম মালেক রহ. বলেছেন,যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে অধিকৃত অঞ্চলের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ। কেননা, বিজয়ের মাধ্যমে এ সকল সম্পত্তি মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ হয়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বক্তব্যের আরেকটি অসঙ্গতিপূর্ণ দিক হলো, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ কেবলমাত্র আয়া সোফিয়া-ই ওয়াকফ করেছেন। এবং সেটা হয়েছে বিজয়ের বছরে। তবে যদি আমরা ওয়াকফের প্রচলিত আরবি অনুলিপিটি ভালো করে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব এই নথির শেষ পৃষ্ঠা টি নেই। যেখানে তারিখ উল্লেখ করা ছিল। এবং নথিটি পর্যালোচনা করলে আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আয়া সোফিয়ার ওয়াকফ বিজয়ের বছরের অনেক পরে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আমরা আরো লক্ষ্য করবো যে, তখন আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ওয়াকফ করা হয়েছিল। কোনটা ছিল খ্রিস্টান রাজার সম্পত্তি আবার কোন টি ইহুদি শাসনকর্তার মালিকানাধীন। আর্মেনীয় সম্রাটের শাসনাধীন এলাকার স্থাপনাও রয়েছে এই ওয়াকফের তালিকায়।

মোদ্দাকথা হল,আমাদের হাতে যে অনুলিপি রয়েছে তার ভাষ্য অনুযায়ী বিজয়ের বছরের বেশ পরে ওসমানী সালতানাতের ক্ষমতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবার পর আয়া সোফিয়া ওয়াকফ করা হয়েছে। সুতরাং আমরা প্রেসিডেন্ট এরদোগানের কথার সাথে বাস্তবতার কোন মিল পেলাম না। অতএব এই প্রসঙ্গে আমাদের নিকট সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের ওয়াকফের যেই আরবি অনুলিপি টি রয়েছে, তাতে শুধুমাত্র আয়া সোফিয়ার বিষয়টি উল্লেখ আছে; এমন নয়। যদিও প্রথমেই আয়া সোফিয়াকে একটি “সুরম্য গির্জা”উল্লেখ করে ওয়াকফের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

আর‌ও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই নথিতে মসজিদ, মাদরাসা, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়, বাজার – ঘাট, শস্য ক্ষেত্র, চারণভূমি, ফসল প্রক্রিয়াজাত ‌ও সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত স্থান, হাসপাতালসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন স্থাপনা ওয়াকফের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। এ সকল স্থাপনার অবস্থানস্থল, এর বৈশিষ্ট্যসমূহ, এগুলোর দেখাশোনায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের গুণাবলী, তাদের জন্য নির্ধারিত ভাতার পরিমাণ, এর থেকে যে মুনাফা আসবে তা ব্যয়ের খাত, সুলতানের জীবদ্দশায় এবং তার মৃত্যুর পরে এর পরিচালনাকারীর নাম এবং তাদের উত্তরাধিকারীদের অনুপস্থিতিতে তারা দেখাশোনা করবে তাদের তালিকা সহ খুঁটিনাটি প্রত্যেকটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবরণ দেয়া হয়েছে।

ওয়াকফ কেন্দ্রিক আলোচনায় আয়া সুফিয়া কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং সুলতানের পক্ষ থেকে বিশাল ওয়াকফিয়া সম্পত্তির একটি অংশ মাত্র। তবে এরদোগান হয়তো আরবি অনুলিপি থেকে সূত্র উল্লেখ করতে গিয়ে আলাদাভাবে আয়া সোফিয়া কে বিশেষ একটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ধরে নিয়েছেন। কেননা এই প্রচলিত আরবি অনুলিপির শুরুতে লেখা আছে, “সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ এর পক্ষ থেকে আয়াসোফিয়ার ওয়াকফনামা” । এমনিভাবে এই নথিটির শেষেই সুলতানের পক্ষ থেকে সেই কঠিন সতর্কবার্তা টি উল্লেখ রয়েছে। যা তিনি তার বিশাল ওয়াকফ সম্পত্তির মাঝে কোন প্রকার পরিবর্তন কারীদের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন। অথচ এরদোগান এই হুঁশিয়ারি বার্তাকে শুধুমাত্র আয়াসোফিয়ার ব্যাপারে ধারণা করেছেন। সুতরাং সুলতানের ওয়াকফ সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এই তালিকার সকল সম্পদের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত।

ধারণা করা হয়, উসমানী সালতানাত এর মধ্যে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ এর ওয়াকফ সম্পত্তি সর্ববৃহৎ এবং সুপ্রসিদ্ধ। যার সংখ্যা প্রায় ১৮২৮। এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্র, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছাড়াও ১৩৪৫ টি ভূ-সম্পত্তি এবং স্থাপনা রয়েছে। এসকল ওয়াকফ সম্পত্তির দীর্ঘ তালিকা সূত্র এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি না।

তুরস্ক প্রজাতন্ত্র স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে যে, সুলতান আল ফাতিহের ওয়াকফকৃত সম্পত্তির তালিকা ওসমানী ভাষায় 370 পৃষ্ঠায় নথিভূক্ত করা হয়েছিল। আমার ধারণা, আমরা এখন যেই আরবি অনুলিপি টি দেখতে পাচ্ছি তা ওই মূল নথির অনুবাদকৃত। আর এই ওয়াকফের ধারাবাহিকতা ১৪৬২/৬৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৮৬৭ হিজরী থেকে ১৪৭০ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৮৭৫ হিজরী পর্যন্ত চলমান ছিল। সুতরাং আয়া সোফিয়ার ওয়াকফ এর মধ্যবর্তী কোন এক সময় হয়েছে। যা বিজয়ের আনুমানিক নয় বছর পর।

সুলতানের মুহাম্মদ আল-ফাতিহের এই বিশাল ওয়াকফ সম্পত্তির তালিকা দেখলে এটা অবাস্তব বলে মনে হয় যে, তিনি এ সব সম্পত্তি নিজস্ব মালিকানা থেকে অথবা ব্যক্তিগত পয়সায় ক্রয় করে ওয়াকফ করেছিলেন। বরং স্পষ্টতই বোঝা যায় তিনি সুলতান হিসেবে রাষ্ট্রের পদাধিকারবলে এসব সম্পত্তি ওয়াকফ করেছিলেন। তার ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে নয়।

ওয়াকফের নথিপত্রে এ জাতীয় কথা কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে- “এই সম্পত্তি ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক যথাযথ প্রক্রিয়ায় সকল সংশোধনীসহ ত্রুটিমুক্ত করে চূড়ান্তভাবে ওয়াকফ করা হলো।” আরেক জায়গায় বলা হয়েছে- “মুজতাহিদ ইমামগণের শর্তের প্রতি পূর্ণ লক্ষ রেখে কেয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী ভাবে এ সকল সম্পত্তি ওয়াকফ করা হলো।”এবং বিচারপতি এই ওয়াকফের বৈধতা এবং চূড়ান্ত হওয়ার ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হয়েছে মর্মে ফায়সালা দিয়েছেন। এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি সত্যায়ন করেছেন। আরো উল্লেখ আছে যে- ” এ সকল সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না, উপহার দেওয়া যাবে না, বন্ধক রাখা যাবে না, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এমন কোন কাজ করা যাবে না এবং কোনরূপ পরিবর্তন বা যথেচ্ছা হস্তক্ষেপ করা যাবে না।”

“এ সকল সম্পত্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং চিরস্থায়ী নেয়ামত লাভের আশায় ওয়াকফ করা হলো।”

এই বাক্যগুলো পড়লে যে কেউ নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, সুলতান আল ফাতিহ ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান কতটা গুরুত্বের সাথে মেনে চলতেন। এখানের শব্দচয়ন থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, এই ওয়াকফ হানাফী মাযহাব অনুযায়ী করা হয়েছে। কেননা হানাফী মাযহাবে দুই অবস্থায় ওয়াকফকে চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।

এক. যখন বিচারকের ফায়সালার মাধ্যমে কোন কিছু করা।

দুই. যখন মসজিদ হিসেবে কোন কিছু ওয়াকফ করা হয়।

এখানে বারবার “চূড়ান্তভাবে ওয়াকফ করা হয়েছে” বলে; সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিচারপতির ফায়সালায় ওয়াকফের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

আমি আগেই পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছি যে, এটা মুহাম্মদ আল ফাতিহ সুলতান হিসাবে ওয়াকফ করেছেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে নয়। আর এটা অসম্ভব যে, এত বিশাল সম্পত্তি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে সুলতানের মালিকানায় চলে আসবে। বাস্তবতা হলো, কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের অল্প দিনের মধ্যেই সুলতান সকল স্থাপনা কে যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য ঘোষণা দিয়েছিলেন। যাতে তিনি এগুলোকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে বন্টন করতে পারেন।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ি যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে অধিকৃত অঞ্চলে সম্পত্তির উপর সুলতানের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে এসকল সম্পদ বিজয় জাতির মাঝে বন্টন করে দিতে পারেন। আবার চাইলে ওই এলাকার অধিবাসীদের উপর ট্যাক্স ধার্য করে এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের থেকে ভূমিকর আদায় করার শর্তে তাদের মালিকানা বহাল রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে সুলতানের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকিহ ইমাম তহাবীর (মৃত্যু: ৩৭০) বক্তব্য থেকে এমনটাই বোঝা যায়। তৎকালীন আরেকজন হানাফী আলেম শায়েখ মোল্লা খসরু (মৃত্যু: ৮৮৫) সহ অন্যান্য আরো বহু ওলামায়ে কেরাম হুবহু এই মত ব্যক্ত করেছেন। কনস্টান্টিনোপল আলেমদের বড় একটি জামাত সুলতান এর সাথে ছিলেন। সুলতান শায়েখ মোল্লা খসরুকে অত্যন্ত সমীহ করতেন। ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি “শাইখুল ইসলাম” বা ইসলামী জ্ঞানবৃদ্ধ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অতএব কনস্টান্টিনোপল জয় করার পরপরই আয়া সোফিয়া ওয়াকফ করা হোক অথবা যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি বন্টন হওয়ার পর বাইতুল মাল (সরকারি কোষাগার) থেকে ওয়াকফ করা হোক; হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সর্বাবস্থাতেই বৈধ হবে। কেননা, সুলতানের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তির আংশিক ওয়াকফ করার অথবা এর লভ্যাংশ মুসলমানদের কোন কাজে ব্যয় করার অধিকার রয়েছে। এমনকি বাইতুল মাল থেকে কোন সম্পত্তি ব্যাপক জনস্বার্থে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেয়াও সুলতান এর জন্য বৈধ আছে। বিশেষ করে যদি পরবর্তী শাসনকর্তাদের ব্যাপারে এসব সম্পত্তি শরীয়ত পরিপন্থী উপায় ব্যবহারের আশঙ্কা করে সুলতান এগুলো চিরস্থায়ী ভাবে ওয়াকফ করে দেন তাহলে তিনি সওয়াবের অধিকারী হবেন।

হানাফী ফকিহ ইবনে আবেদীন শামী স্পষ্ট বলেছেন, “ওয়াকফের কোন শর্তের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করা জায়েজ নাই যদিও সেটা সরকারি কোষাগার থেকে সুলতানের পক্ষ থেকে ওয়াকফকৃত হোক না কেন।” কারণ, এই সুযোগ রাখলে পরবর্তীতে কেউ অবৈধ ফায়দা গ্রহণ করবে।

আমরা সুলতানের ওয়াকফের নথিতে দেখেছি, পরবর্তীতে এই অঞ্চলে দখলদারিত্ব চালাতে পারে এমন কেউ যেন তার ওয়াকফকৃত সম্পত্তির মাঝে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করে; এ ব্যাপারে তিনি সাবধান করে দিয়েছেন। এবং এই ওয়াকফকৃত সম্পত্তির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন কাজ ছাড়া কোন ধরনের পরিবর্তন না করার জন্য তিনি কঠোরভাবে আদেশ করেছেন। অন্যথায় জনস্বার্থ ব্যাহত হবে।

সুতরাং তিনি এসকল জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিজয়ী শাসক “আল ফাতিহ” হিসাবে, ব্যক্তি “মুহাম্মদ” হিসাবে নয়।

অনুবাদ: আহমাদ তামজীদ

বিজ্ঞাপন