রেজিস্তান স্কয়ার: স্থাপত্যশৈলি এবং সমরকন্দে মুসলিম জ্ঞানচর্চার অনন্য নিদর্শন

ওলিউর রহমান ।।

সমরকন্দ। বোখারা শব্দের প্রায় প্রতিশব্দ এটি। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পরিভাষার সাথে যারা মোটামুটি পরিচিত তারা বোখারা শব্দ উচ্চারণ করলে অবচেতনেই তাদের মুখ থেকে সমরকন্দ শব্দও বেরিয়ে আসে। ‘বোখারা-সমরকন্দ’ এই শব্দবন্ধ শুনলে আমাদের স্মৃতিপটে একটি ঐতিহাসিক কালের চিত্র ফুটে উঠে। সে চিত্রে থাকে বিশাল শামিয়ানা বা ছাদের নিচে হাদিসের পাঠদান, পাহাড়ের কন্দরে কন্দরে কিম্বা প্রতিষ্ঠিত কোনো খানখায় আধ্যত্মিকতার সবক প্রদানের দৃশ্য।

বিজ্ঞাপন

সমরকন্দ একটি ঐতিহাসিক এবং প্রাচীনতম শহর। ব্যবলনীয় কালপর্বের সময়ই এই শহরটির গোড়াপত্তন হয়েছিল বলে ভূতাত্ত্বিকদের মত পাওয়া যায়। সমরকন্দ ছিল বিখ্যাত সিল্করোডের প্রাণকেন্দ্র। ভৌগলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমরকন্দ শহর বিজয় করাকে বিখ্যাত বীরেরা নিজেদের শৌর্য-বীর্যের চূড়ান্ত হিসেবে মনে করত।

উমাইয়া খেলাফতকালে সমরকন্দ মুসলমানদের শাসনাধীনে আসে। ‘সমরকন্দ বিজেতা’ হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে কুতায়বা বিন মুসলিম রহ.-এর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। মুসলমানদের শাসনাধীন সমরকন্দ জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমিতে পরিণত হয়। দূর-দূরান্তের জ্ঞান সাধকেরা নিজেদের ইলম অন্বেষণের পিপাসা নিবারণ করতে সমরকন্দ সফর করত। সমরকন্দে অনেক মাদরাসা, মসজিদ, খানকা গড়ে উঠল। এখন মুসলমানদের জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক ক্রমধারার উদাহরণ দিতে গেলে প্রথমদিকেই সমরকন্দের নাম নেওয়া হয়।

রেজিস্তান স্কয়ার। এটি সমরকন্দে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনন্য স্থাপত্যশৈলির কারণে ইউনেস্কো এটিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের’ অন্তর্ভূক্ত করেছে। সমরকন্দে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার এত প্রসার ছিল যে, তৈমরীয় শাসকেরা পর্যন্ত সেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করত। তৈমরীয় শাসকদের নির্মিত তিনটি মাদরাসার সমন্বিত কমপ্লেক্সকে বলা হয় রেজিস্তান স্কয়ার। স্কয়ারের পশ্চিম দিকে প্রাচীন উলুগবাগ মাদরাসা, পূর্বদিকে শেরদোর মাদরাসা এবং উত্তরপার্শ্বে তিল্লাকারী মাদরাসা। তুলনামূলক উচুঁ পর্বতে নির্মিত মাদরাসাগুলোর চতুর্দিকের নীল রঙের সুদৃশ্য মিনারগুলো শহরের যে কোনো জায়গা থেকে পৃথকভাবে দৃষ্টিগোচর হয়।

রেজিস্তান স্কয়ার সমরকন্দের প্রাণকেন্দ এবং ঐতিহাসিকভাবে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। রেজিস্তান অর্থ বালুময় প্রান্তর। অতীতে যেকোনো রাষ্ট্রীয় ফরমান শোনে এবং উৎসব পালন করতে লোকেরা এখানে সমবেত হত।

১. উলুগবেগ মাদরাসা। এটি ১৪১৭ থেকে ২০ পর্যন্ত সময়কালে নির্মিত হয়। তৈমরীয় শাসক এবং প্রকৌশলী উলুগবেগ এর নির্মাতা। এখানে আগে তৈমুর লং নির্মিত একটি শপিং তোরণ ছিল। পরে বাদশাহ তৈমরের বংশধর উলুগবেগ এটি ভেঙ্গে এখানে মাদরাসা স্থাপন করেন। পনের শতকে নির্মিত উলুগবেগ মাদরাসার ভবন আজ অবধি অক্ষত টিকে আছে।

ভবনের প্রতিটি দেয়ালে নীল রঙয়ের টাইলস লাগানো। নিচে সাদা রংয়ের মোজাইক। পুরো দেয়াল জুড়ে আকর্ষণীয় বিন্যাসে কুরআনের উপদেশ সম্বলিত অনেক আয়াত। ভবনের চতুর্দিকে চারটি চিত্তাকর্ষক গম্ভুজ শহরের যেকোনে প্রান্ত থেকে দেখা যায়।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি এ মাদরাসায় বিজ্ঞান এবং সাধারণ জ্ঞানের পাঠদান হত। প্রতিষ্ঠাতা উলুগবেগ নিজে ছিলেন একজন স্বীকৃত বিজ্ঞানী।

২. শের দোর মাদরাসা। এটি রেজিস্তান স্কয়ারের পূর্বদিকে উলুগবেগ মাদরাসার ঠিক বিপরিত পার্শ্বে অবস্থিত। নির্মাণশৈলিতেও উলুগবেগ মাদরাসার বিন্যাস এখানে অনুসরণ করা হয়েছে। উলুগবেগ মাদরাসার দুইশত বছর পর খ্রীস্টীয় সতের শতকে এটি নির্মাণ করা হয়। বাদশাহ ইয়ালাংতুশ বাহাদুরের আদেশে নির্মাণ করা হয় এ মাদরাসা।

৩. তিল্লাকারী মাদরাসা। রেজিস্তান স্কয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা এটি। উজবেক ভাষায় তিল্লাকারী অর্থ দাঁড়ায় স্বর্ণের ছাঁট। তিল্লাকারী মাদরাসা ভবনের নির্মাণশৈলিতে স্বর্ণের ছাঁট ব্যবহার করা হয় মাদরাসার এ নামকরণ করা হয়। দেয়াল নীল রঙয়ের টাইলস সজ্জিত এবং স্বর্ণ মিশ্রিত কালিতে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত খচিত।

এটি শের দোর মাদরাসার ১০ বছর পরে বাদশাহ ইয়ালাংতুশের নির্দেশেই নির্মাণ করা হয়। শুরুর দিকে এটি ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরে এটিও স্বতন্ত্র একটি  মাদরাসায় রূপ নেয়। রেজিস্তান স্কয়ারের উত্তর দিকে এটির অবস্থান।

এখানে শিক্ষাদীক্ষার মানও সবচেয়ে উন্নত ছিল। তখন পুরো মধ্য এশিয়া থেকে ছাত্ররা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য উপস্থিত হত।এটি অত্যাধুনিক শিক্ষামানের কারণে তখন শিক্ষার্থীদের গভীর মনযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিল। এখান থেকে শিক্ষা সমাপ্তকারীদের বিশেষ সম্মান ছিল পুরো ককেশাস অঞ্চলে।

তিল্লাকারী মাদরাসাটি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মাঝে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলে চলমান শতাব্দীর শুরুর দিকে আবারও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে চীর ভাস্বর হয়ে একটি কালের নিদর্শন বহন করে চললেও তিল্লাকারী বা উলুগবেগ কিম্বা শেরদোর মাদরাসার আগের সেই জৌলুস এখন আর নেই। নেই ইলম চর্চার সেই রুহানিয়্যাতও।

এখন এগুলো কেবল বিশ্বে ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়া দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি ইমারত। যা দর্শনার্থীদের চোঁখকে তৃপ্ত করে কিন্তু তাদের আত্ম্যার খোরাগ জোগাতে পারে না।