দ্বীনদারী ও আমাদের পরিবারিক জীবন

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব।।

আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে দ্বীন জানা ও মানা সহজ। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ও সমাজ জীবনে সহী দ্বীনী তালীমের চর্চা করা এবং উত্তম পন্থায় দ্বীন পালন করার পরিবেশ এখানে আছে। এটা বাস্তবিক অর্থেই আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিয়ামত। এ নিয়ামতের যথাযথ শোকর আদায় করা সবার কর্তব্য। সেই সঙ্গে এই পরিবেশ তৈরির পেছনে যে সকল মনীষীদের সীমাহীন মেহনত ও ত্যাগ রয়েছে, তাদের প্রতিও শোকরের অনুভূতি লালন করা এবং তাদের জন্য প্রাণভরে দুআ করা উচিত। শোকর ও দুআর এই আমল বাহ্যত অন্যের জন্য মনে হলেও বাস্তবিক পক্ষে তাতে নিজের ফায়েদাই বেশি। একথা দ্বীনদার ব্যক্তিমাত্রই জানেন।

বিজ্ঞাপন

দ্বীন জানা ও মানার এই সুযোগ-পরিবেশ পাওয়ার পর আমাদের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত ছিল, একটু ভাবলেই বুঝে আসে। কিন্তু ব্যাপকভাবে অবহেলা আর উদাসীনতায় আমরা কী পরিণতির শিকার, সেটাও স্পষ্ট। নিশ্চয় একদিন আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়াতে হবে। তাঁর কাছে জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খু হিসাব আমাদের দিতে হবে। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন,

ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ

অতপর সেদিন তোমাদেরকে নিয়ামতরাজি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে (যে, তোমরা কী হক আদায় করেছ?) অর্থাৎ দুনিয়ার যেসব নিয়ামত তোমরা লাভ করেছিলে সে কারণে তোমরা আল্লাহ তাআলার কী শোকর আদায় করেছ এবং তাঁর কেমন আনুগত্য করেছ?-সূরা তাকাছুর (১০২) : ৮; তাফসীরে তাওযীহুল কোরআন (বাংলা), খ- ৩, পৃষ্ঠা : ৭৪৩

আমাদের সাধারণ ও দ্বীনী পরিবারগুলোর দিকে তাকালে কী দেখতে পাই? পরিবারের লোকদের মাঝে দ্বীন শেখা ও দ্বীন চর্চার ব্যবস্থা কতটুকু? পুরোপুরিভাবে দ্বীন মানার উদ্যোগ আয়োজনই বা কী পরিমাণ? বিশেষভাবে ঘরের মাহিলাদের বিষয়ে যদি আমরা চিন্তা করি!

খেয়াল করলে দেখা যায়, মৌলিকভাবে আমাদের ঘরের মহিলারা তিন ধরনের।

এক : সারাদিনের ব্যস্ততা কেবল রান্না-বান্না, ঘর গোছানো, বিছানা ও ঘর ঝাড়– দেওয়া মোছা, সবার খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে খেয়াল রাখা, কিছু সময় পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প-গুজব করা, আত্মীয় ঘনিষ্ঠদের নিমন্ত্রণ করে আড্ডা দেওয়া, সপ্তাহে দুয়েকদিন কেনাকাটা করতে বাইরে যাওয়া, মাঝেমধ্যে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, ব্যস। যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও পড়েনা তাদের রুটিনে এসবের বাইরে আর কী থাকে? উল্লেখ করার মতো কিছুই না।

দুই. রান্না-বান্না, ঘর গোছানো, বিছানা ও ঘর ঝাড়– দেওয়া মোছা, সবার খাওয়া দাওয়ার বিষয়টা খেয়াল রাখা ইত্যাদি কাজকর্মই প্রধান। তবে ফাঁকে ফাঁকে এবং নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত ফরয নামায আদায় করা। সুযোগে সময়ে কখনো কিছু নফল ও তাসবীহ তাহলীল আদায় করা। ঘরের লোকদের সঙ্গে কিছু সময় গল্প-গুজব করা। হঠাৎ কোথাও কোনো দ্বীনী আলোচনা শোনা বা দ্বীনী বই পুস্তক পড়া। এই যা। এরচেয়ে বেশি তেমন কিছু তাদের রুটিনে থাকে না।

তিন. সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফরয নামায আদায় করা। ইশরাক আওয়াবীন ও দৈনন্দিন নফল নামাযের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা। প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখা কিংবা প্রতি সপ্তাহের সোমবার বৃহস্পতিবার রোযা রাখা, বিভিন্ন নফল ইবাদত, ছয় তাসবীহ বারো তাসবীহ ও অন্যান্য যিকির তাসবীহ আদায় করা, সেইসঙ্গে রান্না-বান্না, ঘর গোছানো ও ঘর ঝাড়– দেওয়া, সবার খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে খেয়াল রাখা।

মৌলিকভাবে এই তিন ধরনের পরিবারই আছে আমাদের সমাজে। এরমাঝে কিছু কমবেশি ও কিছু কাজকর্মের পার্থক্য আছে কোনো কোনো পরিবারে।

এখন যদি আমরা প্রত্যেকে নিজেদের পরিবারের দিকে তাকাই, আমাদের পরিবার কোন প্রকারে পড়ে বুঝতে পারব। বুঝতে পারব, দ্বীনদারীই আমাদের পরিবারের প্রধান ব্যস্ততা, নাকি দুনিয়াবী বিষয়াশয়ের সাথে সাধ্যমতো দ্বীনদারী রক্ষা করা, নাকি নামেমাত্র মুসলমান থেকে দুনিয়াবী কাজকর্মকেই প্রধান বানিয়ে জীবন অতিক্রম করা। কোনটা আমাদের পরিবারে লক্ষ্য কিংবা বর্তমান অবস্থা?

অনেক মহিলারা বলেন এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করেন যে, রান্না-বান্না আর ঘর গোছানোর পর আসলেই কোনো সময় থাকে না। তারা যদি একবার একটু পরীক্ষা করে দেখেন, আশা করি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। একবার কোনো কাগজে লিখে কিংবা মনে মনেই একটা রুটিন ঠিক করে নিলে এবং কোন কাজে কতটুকু সময় প্রয়োজন হয়, খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন। তখন দেখা যাবে কী পরিমাণ সময় অনর্থ কাজে ব্যয় হয় এবং কত সময় অবহেলায় নষ্ট হয়। সেইসঙ্গে বুঝে আসবে, অন্যরা কোথায় পায় আড্ডা দেওয়ার সময়? কোথায় পায় টিভি কিংবা মোবাইলে ব্যয় করার সময়? আর যে সমস্ত পরিবার পূর্ণ দ্বীন পালন ও দ্বীন চর্চার পরও সাংসারিক কাজকর্ম আঞ্জাম দেয়, তারাই-বা কোথায় পায় অতিরিক্ত আমল ইবাদতের সময়? তখন সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে যে, আমাদের পরিবার কোন ধরনের হতে পারে অথবা বাস্তবে আমাদের কেমন হওয়া উচিত কিংবা কেমন হওয়া আমাদের স্বপ্ন।

মহিলাদের টুকরো টুকরো কাজ অনেক। কিন্তু এসবের মধ্যেও যে পরিমাণ সময় খরচ হওয়ার কথা, তারচে অনেক বেশি খরচ হয়ে থাকে। অপ্রয়োজনীয় কাজেও খরচ হয় প্রচুর সময়। অবশিষ্ট যা থাকে তা নষ্ট হয় অনর্থ অযথা কথাবার্তায়। অথচ ইচ্ছে করলেই সময়গুলোকে বাঁচিয়ে নিজেদের দ্বীনী ঈমানী উন্নতি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যয় করা যায়। তাতে সময় অপচয়  ও  অনর্থ কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার গোনাহ থেকে যেমন বাঁচা যায়, তেমনি দুনিয়া আখিরাতের বহুমুখী উন্নতি লাভ হয়। এরপর নিজের এবং পরিবারের সবার মাঝেই সে উন্নতির পবিত্র প্রভাব পড়ে। সুন্দর সুখময় হয় পরিবার ও সমাজ।