যে কারণে সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেছিলেন

মাওলানা সাঈদ হুসাইন ।।

কোন ভূখন্ড যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হলে তার উপর বিজয়ীদের নিরংকুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের প্রতিটি স্থাপনার উপর তাদের বৈধ কর্তৃত্ব থাকে। এক্ষেত্রে তারা মানবাধিকার রক্ষা করে নিজেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ স্বাধীন। এটি আন্তর্জাতিক সমরনীতিতে স্বীকৃত একটি বিষয়।

বিজ্ঞাপন

ইসলাম তার অনুসারীদেরকে নির্দেশ দেয়, বিজয়ের পর স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে ইনসাফের আচরণ করতে। বিজেতাগণ শরীয়তের বিধান অনুসারে স্থানীয় বাসিন্দাদের মানবিক ও নাগরিক সুবিধাসমূহ সরবরাহ করবে। স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ করে দিবে। এবং দেশে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করবে। মুসলিম বিজেতা-প্রধান কোন কল্যাণ বিবেচনায় যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলে চাইলে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনা বন্ধ করে দিতে পারেন অথবা অন্যকিছুতে রূপান্তর করতে পারেন। এতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। আর এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত যুদ্ধনীতিও বটে। ইতিহাসের পাতায় যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

আমরা জানি, মহান সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ কন্সট্যান্টিনোপলে আক্রমণ শুরুর পূর্বে বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিকট এ র্মমে পত্র প্রেরণ করেছিলেন যে, তিনি যেন অস্ত্র সমর্পন করে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হন। কিন্তু সম্রাট তাঁতে ভ্রুক্ষেপ করেনি। অবশেষে সুলতান ফাতিহ ২০-৫-৮৫৭হি/২৯-৫-১৪৫৩ঈ. তারিখে আক্রমণ শুরু করেন। এবং ইস্তাম্বুল জয় করেন। তো এই ভূমি সেদিন মুসলিম জাতি রক্ত আর শাহাদাতের বিনিময়ে অর্জন করেছিল। তাই সমগ্র ভূখণ্ডটি এবং তাতে বিদ্যমান সবগুলো র্ধমস্থান ও স্থাপনার উপর মুসলিমদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। দেশ ও জাতির সুবিধা বিবেচনায় সুলতান বা খলীফা এক্ষেত্রে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের পর সেদিন সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ রহ. কর্তৃক গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জাতীয় গীর্জা আয়া সোফিয়াকে ‘জামে মসজিদে’ রূপান্তরের ঘোষণা দেয়া হয়। প্রশ্ন হতে পারে, সুলতান মুহাম্মাদ ফাতিহ তৎকালীন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপলের অসংখ্য গীর্জার মধ্যে আয়া সোফিয়াকে কেন মসজিদের জন্য বেছে নিয়েছিলেন ? অন্যান্য গীর্জার মত আয়া সোফিয়াকে কেন গীর্জারূপে বহাল রাখলেন না ?

ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটা ছিল সুলতানের অত্যন্ত দূরদর্শী ও যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ- যা তিনি তদানীন্তন পরিবেশ-পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং ভবিষ্যত-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তটি প্রদান করেছিলেন। কন্সট্যান্টিনোপল অধিকারের পর সেখানে অসংখ্য গীর্জা ছিল। কিন্তু সুলতান তার মধ্য হতে মাত্র ৪টি বা (মতান্তরে) ১৭টি গীর্জাকে মুসলমানদের নামাজের জন্য মসজিদে রূপান্তর করেন। যার মধ্যে ‘আয়া সোফিয়া’ অন্যতম। ইতিহাস অধ্যয়নকারীগণ মনে করেন, এক্ষেত্রে দুটি কারণ উল্লখেযোগ্য:

এক. রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ 

ঐসময় বাইজাইন্টাইন ছিল অন্যতম পরাশক্তির দেশ। যার রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপল আর প্রাণকেন্দ্র আয়া সোফিয়া। এই আয়া সোফিয়া একদিকে খৃস্টান বিশ্বের প্রাচীন ও বৃহত্তম ধর্মশালা। অপরদিকে ক্রুসেডারদের মূল ঘাঁটি। ধর্মের পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যক্রমও পরিচালিত হত এখানে। সমগ্র খৃস্টজগতের আধ্যাত্মিক সুধা নিবারণ করত এই অর্থোডক্স চার্চ। একইসাথে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ক্রুসেডের নীলনকশাও প্রস্তুত হত এখান থেকে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই অর্থোডক্স ও ক্যাথলিকদের মাঝে এই প্রাচীন গীর্জার দখলদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছিল। ফলে অন্যান্য যে কোন স্থানের তুলনায় আয়া সোফিয়া ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি নিছক কোন গীর্জা ছিল না, বরং খৃস্টজগতের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ছিল। আর এসব ক্ষেত্রে ধর্মপালনের সুযোগে ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক উস্কানি সৃষ্টির প্রবল আশংকা থাকে। ইতিহাস সচেতনরা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবেন।

ফলে সুলতানের জন্য আবশ্যক ছিল এক্ষেত্রে স্পেন-আন্দালুসের মত ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। তিনি সে ভুল করেন নি। অত্যন্ত কুশলতার সাথে তিনি আয়া সোফিয়ার রাজনতৈকি অবস্থানের বিলোপ সাধন করেন। খ্রিস্টানদের অন্যায় সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে তিনি গীর্জার পাদ্রী-পণ্ডিতদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। তবে মূল্যবান স্থাপনাটিকে একেবারে ধ্বংস না করে সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদে রূপান্তর করেন। এতে শুধু একটি গীর্জাকেই মসজিদে রূপান্তর করা হয়নি, বরং খৃস্টজগতের ক্রুসেডারদের বিশাল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ঘাঁটিকে সমূলে ধ্বংস করা হয়েছে।

দুই. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

খৃস্টজগতের ধর্মীয় আদি বিশ্বাস ছিল, এই গীর্জা কখনোই তাদের হাতছাড়া হবে না। যখন তুর্কিরা এখানে ঢুকতে চেষ্টা করবে তখন তাদের উপর বিপদ আপতিত হবে। আসমান থেকে তরবারী হাতে একজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হবে। তিনি অস্ত্র ও সাম্রাজ্য এমন এক দরিদ্র ব্যক্তির নিকট অর্পন করবে, যে ঐ খুুঁটির নিকট বসা থাকবে। সে তুর্কিদের পিছু ধাওয়া করবে। আর তুর্কি জাতি পলায়ন করবে। এই সীমানায় থাকতে পারবে না। এটা ছিল মুসলিম জাতির প্রতি খৃস্টানদের তাচ্ছিল্যবোধ ও নিজেদের অলীক বিশ্বাস।

এমতাবস্থায় তাওহীদের বিশ্বাসী সুলতানের অবশ্য কর্তব্য ছিল তাদের ঐ কুসংস্কার মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া। হাজার বছরের মিথ্যার শিকল ভেঙ্গে তাওহীদ বাণী সুপ্রতিষ্ঠিত করা। এই ধর্মীয় কারণেও গীর্জার অপসারণ অনিবার্য ছিল।

সর্বোপরি যেহেতু এই অঞ্চল মুসলমানরা যুদ্ধের মাধ্যমে অধিকার করেছিলেন তাই যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ ফাতিহ পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। সেখানে বিদ্যমান সকল ধর্মশালার বিলুপ্তি বা মসজিদে রূপান্তরের অধিকার তাঁর ছিল। এসব কারণে সুলতান অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তার প্রাজ্ঞতা ও কুশলতার ফলে আয়া সোফিয়া গীর্জা আয়া সোফিয়া জামে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। বস্তুত ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে এটা ছিল তরুণ উছমানী সুলতানের যুগান্তকারী ও দূরদর্শী একটি পদক্ষেপ।

৮৫৭হি/১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে উছমানী খলীফা মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ আয়া সোফিয়া গীর্জাকে বৈধভাবেই মসজিদে রূপান্তর করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ৪৮২ বছর এটা মসজিদরূপেই বিদ্যমান থাকে। ইসলামে মসজিদ বিক্রি, বন্ধ বা বিলুপ্তির কোন সুযোগ নেই। যা খৃস্টবাদে রয়েছে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। যেখানে নির্মিত হবে কিয়ামত পর্যন্ত সেটা মসজিদই থাকবে। কারো তাতে হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ নেই।

কিন্তু ইসলাম ও খেলাফতের দুশমন সেক্যুলার কামাল পাশা পাশ্চাত্যের ইশারায় ১৯৩৪ সালে আয়া সোফিয়া জামে মসজিদকে অন্যায়ভাবে জাদুঘর ঘোষণা করে। সন্দেহ নেই যে, তার এই ঘৃন্য রায় তার কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিচারেও ছিল অগ্রহণযোগ্য।

সেই থেকে দীর্ঘ ৮৫ বছর আয়া সোফিয়া জাদুঘর হিসাবেই রয়ে যায়। আয়া সোফিয়ার মিনারে আর ধ্বনিত হয় না আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ…..। আয়া সোফিয়া আর প্রাণবন্ত হয় না মুসল্লিদের নামাজ, সেজদা ও আল্লাহওয়ালাদের কান্নায় ! এ প্রসঙ্গেই যেন কবি বলেছেন-

پوشیدہ تری خاک میں سجدوں کے نشاں ہیں

خاموش اذانیں ہیں تیری باد سحر میں

তোমার মাটির আত্নায় লুকিয়ে আছে সেজদার নিশান/
তোমার ভোরের বাতাসে মিশে আছে নীরব আযান।

ইতিপূর্বে যে বা যারাই তুরস্কের রাজক্ষমতায় এসেছিল তাদের সবার উপর অপরিহার্য ছিল আয়া সোফিয়াকে তার আসল প্রাণ ও আপন মর্যাদায় ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু আয়া সোফিয়ার কান্না ও আর্তনাদে কেউই কর্ণপাত করেনি।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে গত ২০-১১-১৪৪১হি./১০-৭-২০২০ তারিখে তুর্কি আদালত ১৯৩৪ সালে কামাল পাশার রায়কে অবৈধ আখ্যা দেয়। মিউজিয়াম বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করে। এতে আয়া সোফিয়া তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পায়। বস্তুত এটা একটি বাস্তবসম্মত, ন্যায়নিষ্ঠ ও যথার্থ রায়। আদালতের এই রায়ের যৌক্তিকতা ও যথার্থতা নিয়ে দ্বিমত পোষণের কোন অবকাশ নেই।

বেশ কিছুদিন ধরেই গ্রীস, ইউরোপ, রাশিয়া ও খৃস্টান দেশগুলো তুরুস্ককে এ বিষয়ে কড়া সতর্ক করে আসছিলো। কিন্তু তাদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে তুর্কি আদালত এ রায় প্রদান করে। এরপর ঘন্টাখানেকের মধ্যে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আয়া সোফিয়া পুনরায় মসজিদে প্রত্যাবর্তিত হয়। মুসলিম উম্মাহ দীর্ঘদিন পর আবার ফিরে পায় আয়া সোফিয়াকে। একদিন যা তারা লাভ করেছিল অসংখ্য শহীদানের রক্তের বিনিময়ে।

দীর্ঘ ৮৫ বছর পর আয়া সোফিয়ার মিনার থেকে আবার ভেসে উঠে আযানের ধ্বনি। আল্লাহু আকবার! সেই আযান ছুয়ে যায় বিশ্বের ধর্মপ্রাণ সকল মানুষের হৃদয় ও আত্নাকে । আন্দোলিত করে সবার মন। তুর্কিরা আযানের সুরে সুরে আনন্দে হারিয়ে যায় অতীতের গৌরবময় খেলাফতের সেই যুগে। উসমানী খিলাফতের পতাকা নিয়ে ছুটে আসে আয়া সোফিয়ার প্রাঙ্গনে। সমস্বরে তোলে তাকবীর ধ্বনি- আল্লাহু আকবার!

বস্তুত এটা শুধু তুর্কি জাতিরই নয়, এটা গোটা বিশ্ব মুসলিমের আনন্দ। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তুরুস্কের জনগণের মধ্য দিয়ে। তুর্কি আদালতের এমন যুগান্তকারী রায়, প্রেসিডেন্ট এরদোগানের এমন সাহসী পদক্ষেপ এবং ইসলামপ্রিয় তুর্কি জাতির এই আনন্দ ও আবেগ বিশ্ববাসীকে নতুন এক বার্তা দিয়ে গেল। হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যেদিন আলআকসাও মুক্ত হবে ইহুদিদের কবল থেকে। বাবরি মসজিদও মুক্ত হবে মুশরিকদের জুলুম থেকে ।

বিজ্ঞাপন