বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিখ্যাত দুই মনীষীর কলমে আয়া সোফিয়ার অশ্রুভেজা স্মৃতি

ইসলাম টাইমস ডেস্ক:  এক সময়ের ইসলামী খেলাফতের  প্রাণকেন্দ্র তুরস্কে ইসলামী সভ্যতার  নিদর্শনগুলো যে কোনো চেতনাশীল মুসলমানকেই নাড়া দিবে।  গতকাল পর্যন্ত  প্রায় ৮৬ বছর ধরে বেদখল হওয়া মসজিদ আয়া সোফিয়া ইসলামী সভ্যতার অন্যতম একটি নিদর্শন হিসাবে অনেকের চোখেই অশ্রু ঝরাত। মসজিদকে জাদুঘর হিসেবে দেখার কষ্টকর অনুভূতির কথা এসেছে বিভিন্ন লেখকের কলমে। ২০১০ সালে ইস্তাম্বুল সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুফাক্কির আলেম মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ। তিনি তার সফরনামা ‘তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে’ ‍স্মৃতিচারণ করেছেন আয়া সোফিয়ার। এর আগে পাকিস্তানের মুফতি তাকি উসমানিও আয়া সোফিয়ার স্মৃতি চারণ করেছেন তার সফরনামা ‘মুহাম্মদ আল ফাতিহের শহরে’-এ।

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ লিখেছেন, ’অমুসলিম পর্যটকদের জন্য, বিশেষ করে ইউরোপের খৃস্টান পর্যটকদের জন্য ইস্তাম্বুলে সবচে’ আকর্ষণীয় বিষয় হলো আয়াছুফিয়া পরিদর্শন। এখনো এখানে বহু পর্যটককে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায়। অনেক পর্যটক তাদের ভ্রমণকাহিনীতে আয়াছুফিয়ার কথা এমন আবেগ-উন্মাদনার সঙ্গে লিখেছেন যে, বোঝা যায়, ইস্তাম্বুল খোয়ানোর বেদনা এখনো তারা ভুলতে পারেনি; এখনো তাদের অন্তরে ধিকি ধিকি জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন, জনৈক পর্যটক লিখেছেন, আমাকে যদি একশ টুকরো করে বসফরাসের পানিতে ফেলে দেয়া হয়, আর বিনিময়ে আয়াছুফিয়া ফিরিয়ে দেয়া হয়, সানন্দে আমি প্রস্তুত আছি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও লেখেন, ’আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল পাশা সম্ভবত খৃস্টানজগতের সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আয়াছুফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করেছিলেন। কিন্তু এই নির্বোধ লোকটি বুঝতে পারেনি, ধর্মান্ধ ক্রশেডারদের মুসলিমবিদ্বেষ এত সহজে দূর হওয়ার নয়। কতকিছুই তো তিনি করলেন, কিন্তু ইউরোপ এখনো তুরস্ককে আপন ঘরানার বলেই মানতে রাজি নয়।’

আরো পড়ুন: ৮৬ বছর পর আয়া সোফিয়ায় আজান শুনতে পেয়ে খুশিতে মেতে উঠে তুর্কিরা

মুফতি তাকী উসমানী  লিখেছেন, ‘মুস্তফা কামাল পাশার সময় থেকেই এখানে এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও নামায পড়া নিষিদ্ধ ছিলো, তবে ধীরে ধীরে এই কড়াকড়ি অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে। আমরা আছর নামায এখানেই আদায় করেছি, কেউ বাধা দেয়নি। কিন্তু এটা অবশ্যই এক মর্মান্তিক ট্রাজেডি যে, যে পবিত্র ভূমিতে শত শত বছর আল্লাহর লাখ লাখ বান্দা সিজদা করেছে সেখানে এখন হাজার হাজার পর্যটক  (জুতা পায়ে) ঘুরে বেড়ায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।’

তিনি আরো লেখেন, আয়া সোফিয়া হচ্ছে কুসতুনতুনিয়ায় মুসলিম বিজয়ের প্রতীক, কিন্তু আমরা ইস্তাম্বুলবিজয়ী সুলতান মুহম্মদ আলফাতিহের অছিয়তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছি, যাতে তিনি বলেছেন, আয়া সোফিয়াকে মসজিদ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা গুরুতর অপরাধ হবে।

আয়া সোফিয়ার ভেতর জুতা পরা অবস্থায় চলাচল করতে দেখে দু:খ প্রকাশ করে মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ লেখেন, অমুসলিম পর্যটকদের বিষয়ে আর কী দুঃখ প্রকাশ করবো, আর সাধারণ মুসলিম পর্যটকদের সম্পর্কেই বা কী বলবো, সম্মেলনে আগত মেহমানদের অনেককেই নির্দ্বিধায় জুতা পায়ে ভিতরে প্রবেশ করে দিবিব ঘুরে বেড়ালেন দেখলাম। কিছু কিছু মেহমান অবশ্য সচেতন ছিলেন, এমনকি কারো কারো চোখ অশ্রুসিক্ত হতেও দেখেছি। একজন আরব মেহমান উচ্চ স্বরে অত্যন্ত দরদের সঙ্গে এই দু‘আ করছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তোমার বান্দারা তোমার ঘরের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, হে আল্লাহ, তুমি নিজে তোমার ঘরের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করো।’

আয়া সোফিয়া আবার নামাজের জন্য উম্মুক্ত হবে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ লেখেন, ’তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তৈয়ব এরদোগান বাইজান্টাইন খৃস্টান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের ৫৬১তম বার্ষিকী উদযাপনকালে বলেছেন, এটি ছিলো দরজা ও হৃদয়ের শেকল ভাঙ্গার বিজয়। পর্যবেক্ষক মহল তার এ বক্তব্যকে আয়া সোফিয়া সম্পর্কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন।’

’আমরাও মনে করি, ইনশাআল্লাহ সেদিন খুব বেশী দূরে নয় যখন আয়া সোফিয়া মসজিদের মেহরাব শেকল মুক্ত হবে এবং আবার তা আল্লাহর ঘর মসজিদের রূপ ফিরে পাবে।’

গতকাল তার এবং লক্ষকোটি মুসলমানের সেই প্রত্যাশাই বাস্তব হল।