এবার হজ্ব ‘নিষিদ্ধ’ না করে বিকল্প যা করতে পারত সৌদি আরব

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

ইসলামের অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ হলো হজ্ব। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির এক পর্যায়ে হজ্ব পালনের আয়োজন নিয়ে কথা উঠলো। প্রথমদিকে এ বিষয়ে কোনো খবর বা খবরের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল না। হজ্বযাত্রীরা দেশে দেশে অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের দেশের ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, হজ্বের প্রস্তুতি নিতে থাকুন। সৌদি সরকার অনুমতি দিলেই আমরা সেখানে যাবো।’ এরই মধ্যে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ইন্তেকাল করলেন। হজ্ব পালনে কোনো রকম প্রস্তুতির খবরও পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাৎ সৌদি সরকার ঘোষণা করলো, হজ্বের সময় কোনো দেশ থেকেই হাজ্বী সাহেব সৌদি আরবে যাবেন না। শুধু সৌদি আরবে বসবাসরত অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক (তাদের ভাষায় عدد قليل جدا) লোক এবার হ্জ্ব করতে পারবেন। গণমাধ্যমে সেটাকে বলা হলো ‘প্রতীকী হজ্ব’। প্রস্তুতি নেওয়া অপেক্ষমান হজ্বযাত্রীদের মন ভেঙ্গে গেল। মনে আঘাত লাগল। আর এসব কিছু হলো সৌদি সরকারের একক সিদ্ধান্তে।

বিজ্ঞাপন

হজ্বের দিনগুলোতে হাজ্বী সাহেবদের মনের কষ্ট আরো বেড়ে যাবে। হজ্ব তো ইসলামের অন্যতম রোকন। এটা মুসলমানদের অধিকার। যিনি যে দেশেই থাকুন না কেন। হজ্বের জায়গা এবং হারামাইন এলাকা সৌদি শাসকগণ তাদের মানচিত্রে নিয়ে গেছেন বলে এ স্থানগুলোতে বিশ্বের সাধারণ মুসলমানদের যাতায়াত আটকে দেওয়ার অধিকার তাদের নেই। এটা একটা প্রধান আপত্তির জায়গা। তারা তো মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করে এ ব্যাপারে মতামত নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে সবাইকে অপেক্ষায় রেখে হঠাৎ হজ্বে অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল করে দিলেন একক সিদ্ধান্তে। ঘোষণা করলেন সামান্য সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণে ‘প্রতীকী হজ্ব’ পালন হবে। বিশ্বের মুসলমানদের হজ্বে শরীক হতে না দেওয়ার এই একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তাদের নেই; না শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে, না নৈতিক বিবেচনায়।

মক্কা-মদীনা হিজাযে মুকাদ্দাসের এলাকা। এই অঞ্চল আসলে ইসলামী খেলাফত ছাড়া অন্য কোনো একক রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণাধীন থাকতে পারে না। বিশ্বব্যাপী ইসলামী খেলাফত থাকলে তার অধীনে থাকতো হারামাইন। পৃথিবীতে এখন বহু স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র। যেসব রাষ্ট্রে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ অবস্থায় এই পবিত্র ভূমির উপর একটি রাষ্ট্রের এমন একচ্ছত্র অধিকার ও কর্তৃত্ব থাকা যে, মনগড়াভাবে যাকে ইচ্ছা তাকে সেখানে হাজিরে বাধা দিতে পারবে। এটা চলতে পারবে না। হজ্বে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া-না দেওয়ার ব্যাপারে তাদের এমন স্বেচ্ছাচারমূলক আচরণ চলতে থাকলে অধিকারের এই গোড়ার কথায় যেতে চাইবেন বিশ্ব মুসলিম সমাজ। আগেও এমন কথা উঠেছে। এজাতীয় পরিস্থিতি বারবার ঘটালে এবং বিশ।ব মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতেই থাকলে ধীরেধীরে হারামাইন শরীফাইনকে সৌদিআরবের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার দাবি বাড়তে থাকবে।

হজ্ব: তারা যা করতে পারতেন

প্রশ্ন উঠেছে, কোভিট-১৯ পরিস্থিতিতে বিশ্বের সব রাষ্ট্র থেকে মুসলমানদের হজ্বে যেতে নিষেধ করার বিকল্প কোনো উপায় নিয়ে কি ভাবা যেত না? সৌদি সরকার কি বিশেষ উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে ভেবে দেখতে পারত না? যদিও বর্তমানে এশিয়ার কয়েকটি রাষ্ট্রে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির আক্রান্তের হারও বাড়তির দিকে, তবুও একথা বিশ্লেষকরা বলছেন, গণমাধ্যমে আসছে যে, এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরের সমস্যাগুলোর মাত্রা দেশেদেশে কমে আসছে। আগে যতটা ক্ষতি করত, এখন সে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সৌদি সরকার এবার হজ্বের ক্ষেত্রে বাছাইকরণ পদ্ধতিতে হাজ্বী সাহেবদের যেতে দিতে পারতেন।প্রত্যেক দেশের হজ্বযাত্রীর সংখ্যা বা হার কিছু কমিয়ে দিতে পারতেন।এমনকি অর্ধেক করে দিতে পারতেন প্রয়োজনে। সেক্ষেত্রে যারা প্রথমবার যাচ্ছেন তাদের অগ্রাধিকার দেয়া যেত।

প্রত্যেক দেশের সরকার এবং প্রয়োজন হলে সৌদি সরকার এসব ক্ষেত্রে বাছাইকরণে ভূমিকা রাখতে পারতেন। হজ্বযাত্রীর নিজ দেশে এবং সৌদি আরবে যাওয়ার পর সে দেশেও কোভিড-১৯ ন্যাগেটিভ নিশ্চিত হয়ে নিতে পারতেন। সৌদি আরবে পৌঁছার পর আল্লাহ না করুন, কেউ কোভিড পজিটিভ হলে তাকে তার হোটেলে কোয়ারেন্টিনেও রেখে দেওয়া যেত। এসব ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়ে সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য হজ্বপালনের সুযোগ দেওয়া যেত। সৌদি সরকারের জন্য এজাতীয় ব্যবস্থাপনা তেমন কোনো দুরূহ ব্যাপারই ছিল না; কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, হারাম বন্ধ এবং হ্জ্ব বন্ধ করে দেওয়ার বিকল্প কোনো ভাবনা মাথাতেই নিতে চাননি তারা। তারা দাবি করেছেন, তারা হারামাইনকে ‘ভাইরাসমুক্ত’ রাখতে চান এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে চান। হজ্বে গমনকারী মুসলমানদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধান ভাবনা তো তাদের নিজেদের। অনেকেই মনে করেন, তারা এসব কঠোর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সৌদিআরবের আমীরদের, রাজা-বাদশাহদের জীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই করতে চান।

‘ভাইরাসমুক্ত’ রাখা আর জীবনের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে সরাসরি বাইরের দেশ থেকে হজ্বযাত্রীর যাওয়াকে বন্ধ করে দেওয়া- এর কোনো শরঈ বা নৈতিক অধিকার তাদের আছে- একথা বলা মুশকিল।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিশ্ব মুসলিমের হজ্ব পালনের ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখতে সৌদি সরকার কী করতে পারতেন, এ প্রশ্ন অনেকে করতে চান, অনেকে জানতে চান। আমি অপর একটি গণমাধ্যমে এ প্রশ্নটি নিয়ে কথা বলেছি। সৌদি আরবের তিনটি বিমানবন্দর দিয়ে হজ্ব ও ওমরাকারীরা সাধারণত প্রবেশ করে থাকেন। জেদ্দা, মদীনা, ইয়াম্বু। ধরে নিলাম, আন্তর্জাতিক বড় টার্মিনাল এবং সৌদিদের বড় বাণিজ্যনগরী হওয়ায় জেদ্দাকে এ খাত থেকে বাদ রাখা হলো। হাজ্বী সংখ্যা সীমিত রাখলে মদীনা ও ইয়াম্বু এ দুটি বিমানবন্দর দিয়ে হ্জ্বযাত্রীদের ঢুকতে দেওয়া যেত এবং এরপর মক্কা ও মদীনা এ দুটি শহরেই হজ্বযাত্রী ও ওমরাকারীদের বিচরণ সীমাবদ্ধ রাখা যায়। জেদ্দায় তাদের যেতে না দিলেও কোনো সমস্যা নেই। এতে হজ্ব, যিয়ারাহ সব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়ে যেতে পারত। এবং বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্নধাপে তাদের পরীক্ষা চলতে পারত। কিন্তু এজাতীয় উদ্যোগ তারা নেননি। একক সিদ্ধান্তে হজ্ব ও ওমরা বাতিল করেছেন। যদি ভবিষ্যতেও স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণভাবে যখন যাকে মনে চাইবে, হজ্ব-ওমরার অনুমতি দেবে এবং যাকে চাইবে না, দেবে না- এমন আচরণ তারা বহাল রাখেন- তাহলে হারামাইনের ওপর তাদের অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং দাবি বাড়তে থাকবে বৈকি!

সৌদি আরবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যও হতাশাজনক। দুই মসজিদে হারামের প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যান বড়ই আশ্চর্যজনক একটি কথা বলেছেন। করোনা পরিসিস্থিতিতে অনেকদিন বন্ধ থাকার পর দুই মসজিদ যখন খুলে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো, তিনি বললেন, মসজিদ খুলে দেওয়ার জন্য শুকরিয়া। তবে নামায হবে মসজিদের স্টাফদের নিয়ে। বাইরের মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করতে পারবে না। মসজিদে হারামের প্রেসিডেন্সির এই চেয়ারম্যান সাহেব বড় আলেম হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু তার এই অভিব্যক্তি মারাত্মক হতাশাজনক ও আশ্চর‌্যজনক। তার এই কথার মানে হলো, সৌদি আরবের বাসিন্দা- যারা হারামের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, মসজিদে হারামে ঢুকতে পারবেন না।  কেন পারবেন না? তার ব্যাখ্যাও তিনি বলে দিলেন, যেন হারামাইনকে ‘ভাইরাসমুক্ত’ রাখা যায়।

তাদের কথায়-অভিব্যক্তি থেকে এমন মনে হয় যে, হারামাইন যেন এমন জায়গা যেখানে ভাইরাসের স্তুপ জমে থাকে! এখানেই প্রশ্ন জাগে যে, তাদের এসব অতি কঠোর উদ্যোগ কি হারামাইনকে ‘ভাইরাসমুক্ত’ রাখার জন্য, নাকি তাদের নেতা ও আমীরদের থেকে ভাইরাসকে দূরে রাখার জন্য। তাদের নেতাদের মৃত্যুভয় প্রকট হয়ে উঠেছে। মৃত্যু থেকে বাঁচতে তারা হারামাইন বন্ধ করে রাখতে কুন্ঠিত হচ্ছে না। আল্লাহপ্রেমিক বান্দাদের বাধা দিচ্ছে। মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে।  মানুষ তাদের পক্ষ থেকে এজাতীয় বক্তব্য আশা করে না। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য পীড়াদায়ক এমন বক্তব্য ও আচরণ অব্যাহত থাকলে মানুষের মুখ খুলবে। এবং হারামাইনের সঙ্গে বিশেষত মুসলমানদের অধিকার ও সম্পর্কের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হবে।

আরো পড়ুন: হজ্ব ‘বন্ধ’: একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে কি সৌদি আরবের

অনেকেই মনে করেন, সৌদি আরবের রাজ্যও সৌদিদের কাছেই থাকুক। কিন্তু মক্কা-মদীনা এই দুটি পবিত্র ভূমিকে হজ্ব-ওমরা ও যিয়ারতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক। সৌদি শাসকদের পরিবর্তে খোদ জাযীরাতুল আরব কোনো ইসলামী খেলাফতের অধীনে এলে তখন অবশ্য ভিন্ন বিষয়। চিরকাল তো এই অবস্থা থাকবে না। ইনশাআল্লাহ একদিন মুসলমানদের পবিত্র ভূমিগুলো কোনো ইসলামী খেলাফতের আওতায় আসবে। তখন সেই সরকারের সিদ্ধান্ত হবে মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতির অনুকূল। ইবাদত-আমলের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। আর যতদিন সেই পরিস্থিতি না হবে, সম্মানিত দুই শহরের ক্ষেত্রে সৌদি সরকার উদ্যোগী ও অংশগ্রহণমূলক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে পারে।

হজ্ব-ওমরার জন্য বিশেষ অঞ্চল

মক্কা-মদীনা দুটি শহরের দূরত্ব ৪৫০ কিলোমিটার। উত্তরে-দক্ষিণে এ পুরো অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা মরুভূমি ও খালি। এ দুটি শহরসহ এর মাঝখানে যোগাযোগের জন্য পুরো জায়গাকে সৌদি সরকার হজ্ব ও ওমরাকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে পারে। হজ্ব-ওমরার একাধিক বিমানবন্দর ওই এলাকায় নির্মাণ করা যায়। হজ্ব ও ওমরাকারীদের চলাচল, থাকা, বিচরণ ও যিয়ারাহর জন্য ওই অঞ্চলটুকু বিশেষ ব্যবস্থাধীন রাখা যায়। ওই এলাকায় সৌদি নাগরিকরা চাইলে বসবাস করবেন, কিন্তু হজ্ব-ওমরাকারীদের ওই দুই শহর ও মাঝের নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও যেতে দেওয়া হবে না। এতে কোনো সমস্যা হবে না। সৌদি আরবের অন্যান্য অঞ্চলের সব রকম নিরাপত্তা অটুট থাকবে। অপরদিকে হজ্ব ও ওমরাকারীরাও তাদের ইবাদত-আমল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন। এবং কোনো জটিল মুহূর্তে হজ্ব-ওমরা করতে পারা-না পারার বিষয়ে কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে এবং ওই নির্দিষ্ট এলাকায় বহির্বিশ্ব থেকে আগত মুসলমানদের প্রবেশ করতে দেওয়া- না দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে সেটা এককভাবে সৌদিআরব নিবে না, বরং বিশ্বব্যাপী নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরাম ও মুসলমানদের যথোপযুক্ত প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উপরোক্ত প্রস্তাবিত নির্দিষ্ট পুরো এই এলাকাটিতে যদি বিশ্ব মুসলিমের সঙ্গে মশওয়ারার ভিত্তিতে হজ্ব-ওমরার কার‌্যক্রম পরিচালিত হয়, এককভাবে স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়- তাহলে সেটাই হবে ভালো, সুন্দর এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। মুসলিম উম্মাহ হজ্ব-ওমরা ও যিয়ারাহর ক্ষেত্রে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। হঠাৎ একক সিদ্ধান্তে হজ্ব-ওমরা বন্ধ হওয়ার মতো কষ্টদায়ক পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পারবে।

পক্ষান্তরে ব্যবস্থাপনা ও কর্মপদ্ধতি এমন না হয়ে যদি সৌদি সরকারের একক সিদ্ধান্তের স্বেচ্ছাচারিতা সেখানে প্রকট হয়ে উঠে, তাহলে ধীরেধীরে হারামাইন শরীফাঈন থেকে তাদের একক কর্তৃত্ব মুক্ত করার দাবি উঠবে। কারণ, একটা ভূখণ্ড দখল বা আশপাশের একটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার কর্তৃত্ব থাকার কারণে হারামাইন শরীফাইনও ওই ভূখণ্ডের ভেতরে থাকায় তাদের একক কর্তৃত্বে থাকতে হবে- এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।

হারামাইন বিশ্ব মুসলিমের মর্যাদাপূর্ণ সম্পদ। মুসলমানদের কোনো খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে হারামাইন তাদের ব্যবস্থাপনার আওতায় যেতে পারে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকা বা ভূখণ্ডকে নিয়ন্ত্রণকারী কোনো রাজা-বাদশাহর আওতায় থাকতে বাধ্য নয়।এখানে বলে রাখা ভালো যে, এটি একটি প্রস্তাবনা। এ ধরনের আরো চিন্তাও হতে পারে। এবং যথোপযুক্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বিত চিন্তার মাধ্যমে উপরোক্ত উদ্দেশ্যগুলো হাসিল হয় এমন যে কোন চিন্তাই করা যেতে পারে।

রাজা-বাদশাহরা তাদের মনমতো হারামাইনের ব্যবস্থাপনা আঞ্জাম দেবেন। ইচ্ছে হলে মানুষকে প্রবেশ করতে দেবেন, ইচ্ছে হলে আটকে দেবেন- শরীয়তের দৃষ্টিতে ও নৈতিকভাবে এই সুযোগ তাদের নেই।

তাই  বারবার আমরা বলতে চাই, হারামাইন শরীফাইনের ব্যবস্থাপনায় সৌদি সরকারের উচিত স্বেচ্ছাচারিতামূলক একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং সতর্ক হওয়া। তাদের কোনো পদক্ষেপে যেন বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে আঘাত না লাগে- এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ সতর্কতা ও সচেতনতা বজায় রাখতে হবে।

দরবারি কথা নয়, প্রকৃত জনমত শুনুন

সৌদি শাসকরা যদি ‘খাদেমুল হারামাইন আশশরীফাইন’ এই উপাধি ও মর্যাদা বহন করে যেতে চান তাহলে দ্বীনী বিষয়ে তাদের ঐতিহ্যগত পথে ফেরত যেতে হবে। অতীতে যেমন শরীয়া অনুসরণ এবং গুনাহ-খাতা ও প্রকাশ্য পাপাচারের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়নি, সে অবস্থানে তাদের ফিরে যেতে হবে। তবেই ‘খাদেমুল হারামাইন’ উপাধিটি তাদের জন্য স্বার্থক হবে। একই সঙ্গে হজ্ব-ওমরার বিষয়ে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি সামনে এলে ভবিষ্যতে মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যেনতেনভাবে কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

স্বেচ্ছাচারের পক্ষে অনেক সময় অনুগত লোকজনের সমর্থন পাওয়া যায়। রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক দেশে কিছু লোককে অনুগত বানিয়ে নেওয়া যায় অথবা কিছু লোকের কাছ থেকে শাসকদের মন-মর্জিমতো ‘ফতোয়া’ আদায় করেও নেওয়া যায়। কিন্তু এতে সঠিক মতামত ও জনমতের প্রতিফলন ঘটে না। দেশে দেশেই বিদ্যমান দরবারী শায়খ, দরবারী ‘ফতোয়া’। অনেক সময় সরকারের মনোভাব আন্দাজ করে দরবারী লোকেরা অগ্রিম ফতোয়া কিংবা অগ্রিম সাফাই বক্তব্য প্রস্তুত করে রাখে। কিন্তু তাতে সচেতন জনমতকে প্রভাবিত করা যায় না।

আরো পড়ুন: হজ মুমিনের স্বপ্ন, মুমিনের ভালোবাসা

মুসলিম উম্মাহর বক্তব্য, জনমত ও দেয়ালের লিখন অনুধাবন করার জন্য মুসলিম শাসক ও রাজা-বাদশাহদের আমরা অনুরোধ করি। যদি তারা তাদের হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচার বজায় রেখেই চলেন, তাহলে দিনদিন মানুষের রাগ বাড়বে। প্রতিবাদী দাবি বাড়বে। পরিস্থিতি সে পথে এগিয়ে গেলে পরিণতি কী হবে, তারা এখন হয়ত অনুভবও করতে পারবেন না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞায় বিভিন্ন বিভিন্ন দেশ থেকে যারা এবার ফরয হজ্ব করতে যেতে পারেননি, তাদের এই অপারগতা ‘ইহসার’ বা বাধাপ্রাপ্তির হুকুমে পড়বে। এ সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনা রয়েছে এবং ফিকহের কিতাবে সবিস্তার আলোচনা রয়েছে। ফরয হজ্ব আদায়ে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এবার হজ্ব পালন করতে না পারার গুনাহগার হবেন না। তারা ভবিষ্যত সুযোগে হজ্ব করার চেষ্টা করবেন, হজ্ব করবেন।

আলোচনার শেষে আমরা দুআ করি, হারামাইন শরীফাইনের ব্যবস্থাপনা আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের হাতে দিন, যারা মুত্তাকী। যারা নেককার, সদাচারী এবং যারা অন্য কাউকে খুশি করার জন্য নয়; শুধু আল্লাহ তাআলাকে রাজি-খুশি করার জন্য কাজ করবেন। অথবা এখন যারা হারামাইন শরীফাইনের দায়িত্বে আছেন, আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে যোগ্যতা দান করুন। তাদেরকে নেককার বানিয়ে দিন। এই আমানতের যিম্মাদারি বহন করার শক্তি দিন। হারামাইন শরীফাইনকে আল্লাহ তাআলা হেফাযত করুন।

– ১৩ যিলকদ ১৪৪১ হি.

আরো পড়ুন: যুগে যুগে দুর্যোগে হজ্ব বন্ধ থাকার ইতিহাস

বিজ্ঞাপন