উপনিবেশিত ভূমিতে নিপীড়ন: পশ্চিমা সভ্যতার ক্ষতস্থান

আরজু আহমাদ ।।

নীচের ছবিটা জুলাইখা আল শায়িব নামে এক মুসলিম আলজেরিয়ান তরুণীর। ১৯৫৭ সালে ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের সেনারা একটা মিলিটারি ভ্যানের সঙ্গে তাঁকে বেঁধে রেখেছে, সে অবস্থায় তোলা।

বিজ্ঞাপন

এর কিছু পরেই তাঁকে এভাবে বেঁধেই পুরো দশদিন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরানো হয় এবং লাউড স্পিকারে ফ্রান্স সরকারের তরফে জানান দেওয়া হয়-

যদি কোনও আলজেরিয়ান ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টা করে কিম্বা সাহায্য করে তবে এর ফল হবে এমনই। এমনকি সে নারী হলেও বিন্দুমাত্র অনুকম্পা প্রদর্শন করা হবে না।

এর ঠিক দশদিন পর, তাঁকে ২৫ অক্টোবর একটা সামরিক হেলিকপ্টার থেকে ফেলে হত্যা করে ফরাসি সেনাবাহিনী। পরবর্তীতে, ১৯৮৪ সালে তাঁর কবরের সন্ধান মেলে।

এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ফরাসি শাসনাধীন ফ্রান্সের প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ ছিল এই জুলুম, এই হত্যাযজ্ঞ। আমিন আল মুতাওয়াসসিতি তাঁর পরিবারের নিকটজনদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন।

তাঁরই এক আত্মীয়, কার্ফিউ চলাকালে নিজের সন্তানকে খেলার মাঠ থেকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। ফিরতে ফিরতে কার্ফিউ শুরুর সময় হয়ে যায়। পথে তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ফরাসি সেনারা। কার্ফিউ ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে তাঁর সন্তানসহ মাটিচাপা দেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলো কিন্তু খুব বেশিদিন আগের নয়। মাত্র ৬০ বছরের কিছু বেশি কাল আগের। সময়ের হিসেবে ইতিহাস হয়ে পড়ার মত দূরত্বেরও নয়। সে সময়কার বহু মানুষ এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছেন।

সারা দুনিয়ায় যে পশ্চিমা দুনিয়া আমাদের তথাকথিত সভ্যতার শিক্ষা দেয়- সে শিক্ষার জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে এই ঘটনাগুলো।

১৮৩০ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক বছরে ফ্রান্স গোটা আলজেরিয়া দখল করে নেয়। এরপরই মুসলমানদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ জুলুম চলে। নগরের পর নগরে গণহত্যা চালানো হয়।

আরবি শিক্ষা এবং ‘ইসলামিক লেসন’ অর্থাৎ ইসলাম শিক্ষা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। বহু মসজিদকে গীর্জায় বদলে ফেলা হয়।

১৬১২ সালে উসমানি খেলাফতকালে নির্মিত আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক জামে মসজিদ জামা কাংশোয়াহ (جامع كتشاوة) ছিল সবচে’ বড়ো মসজিদ। ১৮৪৫ সালে এ মসজিদটি গীর্জায় বদলে ফেলে ফ্রন্স সরকার। Cathedral of St Philippe নাম দেওয়া হয়।

উমাইয়া খেলাফতের একেবারে শুরুতেই আলজিরিয়া ইসলামী খেলাফতের সীমাভূক্ত হয়েছিল। ইসলামের গোঁড়ার দিকেই। প্রখ্যাত বীর সেনাপতি সাহাবি উক্ববা বিন নাফি রা. আলজেরিয়ার বিজয় সূচনা করেন।

এরপর আবু আল-মুনজির দিনার রহ. সমগ্র আলজেরিয়ায় ইসলামকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বর্তমানেও আলজেরিয়ায় প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলমানের বাস।

১৯৫৪ সালের অক্টোবর ছিল পরাধীন আলজেরিয়ার উত্তপ্ত মাস। নভেম্বরেই শুরু হয় আলজেরিয়ান বিপ্লব। পনেরো লাখ মুক্তিযোদ্ধার রক্তস্রোতে ভেসে ১৩২ বছরের পরাধীনতার সমাপ্তি ঘটে।

স্বাধীন হয় আলজেরিয়া। ১৯৬২ সালের ৫ জুলাই আত্মপ্রকাশ ঘটে স্বাধীন আলজেরিয়ার। যেই কাংশোয়া জামে মসজিদকে করে রাখা হয়েছিল গীর্জা সেটায় ১১৭ বছর পর হয় পুনরায় হয় জুমার নামাজ।

এই এ বছরও আলজেরিয়ার সদ্যগত স্বাধীনতা দিবসকে উপলক্ষ করে ফ্রান্স দুই ডজন আলজেরীয় মুক্তিকামীদের মাথার খুলি ফেরত পাঠিয়েছে।

এইরকম বহু মুক্তিকামী মুসলমানদের হত্যার পর তাদের খুলি আজও সুসভ্য ফ্রান্সের যাদুঘরগুলোতে সংগ্রহে রাখা আছে।

আলজেরিয়ায় ‘সভ্য’ ‘গণতান্ত্রিক’ ‘সেক্যুলার রাষ্ট্র’ ফ্রান্স তার আধুনিক কালের ইতিহাসে যা করেছে তা কি করে এই পশ্চিমের মনস্তাত্ত্বিক গোলামিতে আবদ্ধ প্রজন্ম বিচার করবেন তা আমার জানা নেই!

আজ যে ফ্রান্স সে ফ্রান্সের নাগরিকদের মাত্র এক পুরুষ আগের প্রজন্মই ছিল তারা। আজও ফ্রান্সের এই জুলুমবাজি মালির মাটিতে বিদ্যমান।

পাশ্চাত্য, ইউরোপের প্রতি আমাদের যে শির ঝুঁকে গেছে- যে দুনিয়ার চাকচিক্য আমাদের নজর কেড়েছে তাতে এই জুলুম এই ইতিহাস আমাদের হৃদয়ে কখনো প্রবেশ করবে না, কখনো দাগ কাটবে না।

আফসোস, আমরা নিজেদের জন্য কেবল এই দুনিয়াকে বেছে নিয়েই সন্তুষ্ট আছি। অথচ আমাদের অবস্থা তো কোরআন আমাদের জানাচ্ছে,

لَوْ نَشَاءُ أَصَبْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَنَطْبَعُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لا يَسْمَعُونَ

আমি চাইলে তাদেরকেও তাদের গুনাহের কারণে মুসিবতে আক্রান্ত করতে পারি। এবং (যারা উপেক্ষা করে এবং নিজেরা হঠকারী মনোভাবের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করে না) আমি তাদের অন্তরে মোহর করে দেই, ফলে তারা কোনও কিছুই শুনতে পায় না। (আ‘রাফ ১০০)

ক্বাবার রবের শপথ, এই মোহর পড়ে যাওয়া অন্তরের জন্যই আজ আমাদের এই দূর্ভোগ। এই ইতিহাস, এই সত্য আজ আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে না!

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।

বিজ্ঞাপন