কুরআনের শহর দারফুরের প্রধান ‘কুনী’ বাশারাত মাসিরী রহ: জীবনের এক ঝলক

তারিক মুজিব ।।

ছবির এই বৃদ্ধ শায়খ সুদানের কুরআনের শহর খ্যাত দারফুরের বাসিন্দা। সুদানে তিনি প্রধান কুনী হিসেবে পরিচিত। নিজ হাতে একশোটিরও বেশি কুরআনের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন। একশত বছর হায়াত পেয়েছিলেন। কিছুদিন হলো তার ইন্তেকাল হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সুদানের এই প্রধান কুনীর নাম বাশারাত মুসতফা মাসিরী। তাকওয়া, খোদাভীতি এবং অন্যসব চারিত্রিক উত্তম গুণাবলীর জন্য দেশজুড়ে তাঁর আলাদা খ্যাতি ছিল। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কুরআনের খেদমত করেছেন। তাঁর হাতে ৭০ জনেরও বেশি লোক কুনী উপাধী লাভ করেছেন। তার কাছে কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করেছেন অগণিত লোক।

কুনী। সুদানের একটি বিশেষ উপাধী। দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক উপাধীগুলোর একটি। পুরো কুরাআন মাজীদ গ্রহণযোগ্য সবগুলো রেওয়ায়েতে ( কিরাতে) মুখস্ত করে কুরআনের কোন শব্দ কোথায় কতবার কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা আত্মস্ত করার পর একজন ব্যক্তিকে কুনী উপাধী প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি কুনী হতে হলে একজন ব্যক্তিকে নিজ হাতে কুরআনের নির্ভুল মুখস্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হয়।

এই কঠিন পর্যায় অতিক্রম করতে পারলে একজন ব্যক্তিকে দেশের প্রধান কুনী বিশেষ এক ধরনের পোষাক এবং পাগড়ি পরিয়ে দেয় এবং তাকে কুনী উপাধী প্রদান করে দরসের অনুমতি দেয়।

দারফুর। প্রাচীন এই নগরীটি সুদানে কুরআনের শহর হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবেই এই শহরে কুরআনের হাফেজদের বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়। খ্রিস্টীয় ষোল শতকের এক জরিপ অনুযায়ী তখন দারফুরের সকল বাসিন্দা ইসলামে দীক্ষিত হয়। তখন থেকেই বিশেষ পদ্ধতিতে কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করে কুনী উপাধী লাভের প্রচলন শুরু হয়।

জানা যায়, দারফুরের সুলতানদের পরিবারের ছেলেমেয়েরাও কুনী উপাধী গ্রহণের প্রতিযোগিতায় শরিক হতো। দারফুর সুলতান আলী দিনারের কুনী উপাধীধারী হওয়ার কথাও জানা যায়।

কুরআনের শহর হিসেবে মুসলিম বিশ্বে দারফুর শহরের বিশেষ কদর ছিল। সুদান ছাড়া অন্য দেশ থেকেও দারফুরে এসে কুরআনের তালিম গ্রহণের ঘটনা এখনও বিরল নয়।

সদ্য প্রয়াত সুদানের প্রধান কুনী বাশারাত মাসিরী রহ. কয়েক বছর আগে অসুস্থ হওয়া পর্যন্ত নিজ হাতে কুরআনের পাণ্ডুলিপি লেখা জারি রাখেন। নব্বই বছর বয়স অতিক্রান্ত হলেও তিনি বন্ধ করেননি এ লেখা। তার কাছে পঞ্চাশটিরও বেশি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। অনেকে চড়া মূল্য দিয়ে এই পাণ্ডুলিপিগুলো কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও শায়খ মাসিরী একটি পাণ্ডুলিপিই কারো কাছে বিক্রি করেননি। তিনি বরং বিশেষ কাছের লোকদেরকে পাণ্ডলিপিগুলো হাদিয়া দিতেন।

বর্তমান এই উন্নত সময়ে হাতে কুরআন লেখা প্রসঙ্গে একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছেলেন, কুরআনের পাণ্ডলিপি তৈরি করে যে পবিত্রতা অনুভব হয় তাই আমাকে বারবার নিজ হাতে কুরআন লিখতে উৎসাহিত করে। এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়।

শায়খ মাসিরী রহ. ছিলেন সাদামাটা সরল প্রকৃতির। তিনি কম কথা বলতেন। দিনের অধিকাংশ সময় তাঁর কুরআন তিলাওয়াত করেই কাটতো। তাঁর এই নির্মল জীবনের ছোঁয়া পেতে সুদানের বড় বড় ব্যবসায়ীরা মাঝেমাঝে তার দরবারে হাযির হতেন।

শায়খ বাশারাত মাসিরী রহ. নিজে নাইজেরিতে প্রথম কুরআন হিফজ করেন এবং উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে সুদানের দারফুরে গিয়ে বিশেষ পদ্ধতি সম্পন্ন করার মাধ্যমে কুনী উপাধী লাভ করেন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দারফুরে কুরআনের এই খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন