শিশুদের নাম নির্বাচন বিষয়ে একটি গ্রামীণ গল্প, কয়েকটি কথা

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব।।

বেশ কয়েক বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়েছিলাম, তাবলীগের সফরে। আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় সফর। মানুষের ভাষা যে কতো মিঠা হতে পারে—এ সফরেই জেনেছি। দেখেছি মানুষের সরলতা। যেন শান্ত নদীর নীরব স্রােত। এমনই একটি সরল ঘরের ছেলের সাথে পরিচয় হলো। তার নাম ‘আল্লাহুস সামাদ’। শুনে তো আমরা হতভম্ব। একি কথা! কে রেখেছে এই নাম?

বিজ্ঞাপন

বাবা মৎসজীবী। পদ্মার জেলে। ডিঙ্গি নৌকার বৈঠা বেয়ে বেয়ে জীবন নদীর কূলে এসে থেমেছেন। মক্তবে কায়দা কুরআন পড়া হয়েছে শৈশবে। এরপর থেকেই মাছ ধরা। কুরআন মজীদে পেয়েছেন তিনি এই নাম। সেখান থেকে বড় ভালোবেসে নামটি রেখেছেন ছেলের জন্যে। কে জানে কী আবেগে সেই বৃদ্ধ মাঝি ছেলেকে নাম ধরে ডাকেন!

ছেলেও এখন ডিঙ্গি বায়। সারারাত মাছ ধরে সকালে উঠে বাজারে। তাজা মাছের লাফের দৃশ্য আর দুটি পয়সা—এখানেই জীবনের সব গল্প।

ছেলেটির সঙ্গে আমি দীর্ঘক্ষণ কথা বললাম। ভালো লাগলো। নদীর মতোই আবেগ প্রবণ। কথা বলে যাচ্ছে তো আর থামা নেই। স্রােতের গতি নিয়ে জীবনের গল্প শোনাচ্ছে আমাকে। সুরেলা ভাষা। পরিষ্কার বাক্য। বিশুদ্ধ উচ্চারণ। সম্ভব হলে তার একটি নমুনা এখানে তুলে ধরতাম। কিন্তু সুরভঙ্গি তুলে ধরা তো সহজ নয়।

কয়েক দফা আলোচনার পর একদিন তাকে বলা হলো, আল্লাহর কোনো কোনো নাম সোজাসুজি বান্দার জন্য রাখা যায় না। রাখতে চাইলে সে নামের শুরুতে ‘আবদু’ যোগ করে নিতে হয়। যেমন, রহমান, রাহীম, আলীম ইত্যাদি আল্লাহ তাআলার নাম। এ নামগুলো বান্দার জন্য হবে, আবদুর রহমান। আবদুর রহীম। আবদুল আলীম।

এবার সে তার নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করলো। আমি বললাম, পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। শুধু ‘আবদু’ যোগ করে নাও। আবদুল্লাহ বা আবদুস সামাদ। তার পছন্দ আবদুস সামাদ। বললো, ‘আগের মতোই তো থাকছে। ‘আল্লাহুস সামাদ’ এর জায়গায় ‘আবদুস সামাদ’!!

মাদরাসা জীবনের শুরুর দিকে আমাদের সাথে একজন পড়তো, নাম মোহন। অথবা মহান। বেচারা ছোটো মানুষ। নাম বিষয়ে কীইবা জানে ? তাই অভিভাকদের সাথে পরামর্শ করে তার নতুন নাম রাখা হলো ‘নাজমুল ইসলাম’। এই নামেই সে আমাদের সাথে পড়াশোনা করলো কয়েক বছর। পরে কীভাবে যেন স্কুলে চলে গেলো। এবং সেখানেই চালিয়ে গেলো বাকী পড়াশোনা। গত কিছুদিন আগে তার এক আত্নীয়ের সাথে দেখা। তার কাছে আমি আমার ছেলেবেলার সাথী নাজমুলের খোঁজ খবর জানতে চাইলাম। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই নাজমুল নামের কাউকে চিনতে পারলেন না। আমি নানাভাবে চেনাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। অবশেষে এক পর্যায়ে বললেন, ‘ও! আপনি বোধহয় মোহনের কথা জিজ্ঞেস করছেন?!’

আমি নাজমুলের এই নামটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সেজন্যে এবার আমাকে চেনাতে হলো নতুন করে এবং দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে।

এই ঘটনায় কেনো যেন খুব কষ্ট পেলাম। বিবেকের সামনে একটি প্রশ্ন বারবার শুধু প্রতিধ্বনিত হলো- মুসলমান ঘরের সন্তান, মোহন নামটা জিইয়ে না রাখলে হতো না??

হাদীস শরীফে এসেছে। হযরত নবী করীম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচে‘ পছন্দনীয় নাম হলো আবদুল্লাহ এবং আবদুর রাহমান।-সহীহ মুসলিম (২১৩২)

অন্য একটি হাদীসে আছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচে’ অপছন্দনীয় নাম হলো ‘মালিকুল আমলাক’। অর্থ, রাজাধিরাজ বা শাহানশাহ।- সহীহ বুখারী (৬২০৬)

সহীহ বুখারী সহীহ ইবনে হিব্বান এবং মুসনাদে আহমদ সহ হাদীসের অন্য অনেক কিতাবেই একটি বর্ণনা এসেছে যে, হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যাব রহ. তাঁর বাবার সূত্রে, বাবা তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, একদিন তিনি (অর্থাৎ সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যাবের দাদা) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলে নবীজী তাঁকে নাম জিজ্ঞাসা করেন।

তিনি বলেন, আমার নাম ‘হাযন’। [যার বাংলা অর্থ হলো, অসমান শক্তভূমি। অথবা আচরণের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া। রূঢ় হওয়া। নিষ্ঠুর হওয়া- ব্যাখ্যা দেখুন, ফাতহুল বারী ১০/৫৯০]

জবাব শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বরং ‘সাহল’। [অর্থ, সমতল। সহজ। সরল। নরম। কোমল]

হাযন বললেন, আমি আমার বাবার রাখা নাম পরিবর্তন করতে চাচ্ছিনা।

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যাব রহ. ঘটনাটি বর্ণনা করার পর বলেন, ‘এরপর আর কখনো আমাদের (বংশের লোকদের) রূঢ়তা কঠোরতা দূর হয়নি।’-সহীহ বুখারী,  (৬১৯০ ও ৬১৯৩ ); সহীহ ইবনে হিব্বান (৫৮২২); মুসনাদে আহমাদ (২৩৬৭৩)

আমরাও দেখি, ব্যক্তির মাঝে তার নামের প্রভাব সামান্য হলেও থাকে।

ড. কাজী দীন মুহাম্মদ সাহেবের ব্যাপারে বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছি, তিনি বলতেন, ‘টেম্পু’ ‘মন্টু’ জাতীয় নামের মানুষের আপ্যায়ন কখনোই গ্রহণ করবেনা। যদি কর তাহলে তাদের ঘরে অন্তত সম্মান আশা করবেনা।

এই মনীষীর আরেকটা কথা প্রায়ই খুব মনে পড়ে। তিনি বলতেন, বানান ভুল লেখা কোনো হোটেলে বা গাড়িতে উঠলে যতক্ষণ আমি সেখানে থাকি আমার মাথা ব্যথা করতে থাকে।

একজন সম্ভ্রান্ত বা অভিজাত রুচির মানুষের কাছে এজাতীয় বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার দাবী রাখে।

কোনো কারণে কারও ভালো নাম না রাখা হয়ে থাকলে যে কোনো সময় তার নাম পরিবর্তন করে নেওয়া যেতে পারে।

আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর এক মেয়ের নাম ছিলো ‘আসিয়া’। যার শাব্দিক অর্থ, অবাধ্য। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার এই নাম পরিবর্তন করে রাখলেন ‘জামীলা’।-সহীহ মুসলিম (২১৩৯)

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একবার এক কাফেলা এলো। তাদের একজনের নাম ছিলো ‘আসরাম’। অর্থ, অধিক কর্তনকারী। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন- তোমার নাম কী ? তিনি  বললেন, আমি আসরাম। নবীজী বললেন- তুমি বরং ‘যুরআহ’। (শাব্দিক অর্থ, উৎপন্নকারী। বীজ বপনকারী।)- সহীহ ইবনে হিব্বান (৫৮১৯ ও ৫৮২০), আবু দাউদ (৪৯৫৪)।

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, জাহিলী যুগে আমার নাম ছিলো ‘আবদু আমর’ [আমরের গোলাম]। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নাম রেখেছেন, আবদুর রহমান [পরম দয়ালু আল্লাহর গোলাম]।-মুসতাদরাকে হাকেম (৭৭৩১)।

এক সাহাবীর নাম ছিলো ‘শিহাব’। (অর্থ, উল্কা, অগ্নিশিখা।) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নাম রাখলেন ‘হিশাম’। (অর্থ, বদান্য, উদার।)-মুসতাদরাকে হাকেম (৭৭৩৩)।

আরেক সাহাবীর নাম ছিলো ‘আল আস’। অর্থ, অবাধ্য। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সেই নাম বদল করে রাখলেন ‘মুতী’। (অর্থ, অনুগত।)-সহীহ মুসলিম (১৭৮২)।

এভাবে আরো অনেক সাহাবীর নাম নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদলে দিয়েছেন। বদলে দিয়েছেন কিছু জায়গার নাম এবং বস্তুর নামও। এর কারণ হিসাবে তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসে বক্তব্য এসেছে এমন- উম্মুল মুমিনীন আম্মাজান হযরত আয়েশা র. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মন্দ এবং অশুভ অর্থের নামকে বদলে দিতেন।-সুনানে তিরমিযী (২৮৩৯)।

কেউ কেউ বলেন, নাম হলো একটা দুআর মতো। কাউকে যদি সবসময় ‘ওলীউল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর ওলী বলে ডাকা হয় তাহলে হতে পারে কখনো কোনো বুযুর্গের মুখে এই নামের ডাক আল্লাহ তায়ালা কবুল করে নিবেন। অথবা যখন সবাই কাউকে আল্লাহর ওলী, আল্লাহর ওলী বলে ডাকতে থাকবে, তখন কোনো দুআ কবুলের মুহূর্তে যে কারো মুখেই এই ডাক-দুআ কবুল হয়ে যেতে পারে। এসব ছাড়াও মেহেরবান আল্লাহ যেকোনো মুহূর্তে যে কারো ডাককে কবুল করে নিতেই পারেন। এমনিভাবে অন্য কোনো ভালো অর্থবোধক নামও যে কারো জন্যে যে কোনো সময় কবুল হয়ে যেতে পারে। তখন কেবল নামের উসিলায় কতো সহজে সৌভাগ্য লাভ!

এজন্যে সন্তানদের ভালো নাম রাখা চাই। সুন্দর ও কল্যাণের অর্থবহ নাম।

বিজ্ঞাপন