ব্রিটিশ ভারতে মালাবার বিদ্রোহ: হিন্দুত্ববাদীরা মুছে দিতে চায় যে ইতিহাস

ওলিউর রহমান ।।

১৮৫৭ সালে ভয়ঙ্করভাবে সিপাহি বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে ইংরেজরা পূর্ণরূপে ভারতের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত ক্ষমতা গ্রহণের পর ইংরেজ সরকার ভারতজুড়ে যে দমন নীতি চালায় তাতে নতুন করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোথাও বিদ্রোহের সামান্য সূত্র পেলেই কঠোরভাবে তা দমন করা হতো।

বিজ্ঞাপন

তবে ইংরেজ সরকারের সকল দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে ৫ টি সশ্রস্ত্র বিদ্রোহ পরিচালনা করে মালাবারের মোপলা মুসলমানরা। এবং মালাবার বিদ্রোহের নেতা হাজী কুঞ্জাহামেদের নেতৃত্বে ছ’মাস স্থায়িত্বকাল স্বাধীন মুসলিম সরকার গঠিত হয়েছিল।

ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা শুরু থেকেই ‘মালাবার বিদ্রোহ’ এবং হাজী কুঞ্জাহামেদের প্রতি ছিল বিদ্বেষভাবাপন্ন। উপনিবেশ শাসনের বিরুদ্ধে মোপলা মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা ‘সাম্প্রদায়িক আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছিল। এমনকি ১৯২১ সালে যখন ভয়ঙ্করতম উপায়ে মালাবারের স্বাধীন মুসলিম সরকারকে উৎখাত করা হয় ভারতের কেন্দ্রীয় হিন্দু নেতারা তখন নিরব ভূমিকা পালন করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া মাওলানা মুহাম্মদ আলী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে আস্থা হারান।

নতুন করে ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে মালাবার বিদ্রোহের শতবর্ষ উপলক্ষে ভারতে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনাকে কেন্দ্র করে। হিন্দুত্ববাদী নেতারা কুঞ্জাহামেদকে লুটেরা এবং বিদ্রোহকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা দিয়ে আসছে। নির্মাতা অবশ্য সকল তিরস্কার এবং ভর্ৎসনা উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশে নিজেকে বদ্ধপরিকর বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

চলচ্চিত্র নির্মাণ কখনো প্রশংসার কাজ নয়। তবে মিথ্যে অজুহাতে, অন্যায়ভাবে ইতিহাসের সত্য পাঠকে রুখে দিতে চাওয়া নিঃসন্দেহে অতীব নিন্দনীয়।

হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, কুঞ্জাহামেদ মালাবারের স্থানীয় হিন্দুদেরকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করেন। হিন্দুদের নির্যাতন করেন। তিনি ছিলেন লুটেরা। অথচ ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা।

ইতিহাসের অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাক বলছেন, কে এন পানিক্কর থেকে শুরু করে বহু ইতিহাসবিদ মালাবার বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোনও বইতেই ওই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলা হয়নি। ইতিহাস বলছে ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ বরং তার দলের সেই সব সদস্যদের কঠোর শাস্তি দিতেন, যারা লুটপাট চালাতো বা জোর করে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত।

অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাকের মতে “আসলে ব্রিটিশ আর জমিদার শ্রেণী তার বাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছিল, সেজন্যই তারা বিদ্রোহ হিসাবে না দেখিয়ে ১৯২১ এর ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলার চেষ্টা করেছে। আর এই প্রচেষ্টা এখন নয়, ওই সময় থেকেই চলে আসছে।

ভারতের ইতিহাস গবেষক গোলাম আহমদ মোর্তজার মতে মূল ঘটনা হল-

“ব্রিটিশ সরকার সহজে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মোপালা বিদ্রোহকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে চেষ্টা করে। প্রচার করা হয় যে, মালাবারের কুঞ্জাহামেদ হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছে। ফলে স্থানীয় হিন্দুরা মোপালা মুসলমানদের বিদ্রোহে অসহযোগিতা করে। বরং হিন্দুরা বিপ্লবী মুসলমানদের শত্রু মনে করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

মালাবার বিদ্রোহে বন্দি মুসলমান। ছবি, গেটি ইমেজ

“অপরদিকে ইংরেজরা মালাবারে হাজার হাজার সৈন্য নানা ধরনের ট্যাঙ্ক, কামান, বোমা কতকগু্লো গানবোট এবং রণতরী নিয়ে আসে। “যুদ্ধ চলল এক মাস। তারপর একদিন ইরেজরা আকাশ হতে বোমা বর্ষণ রণতরী হতে শেল বর্ষণ, ট্যাঙ্ক ও কামান হতে গোলা বর্ষণ করে মোপলাদের ঘরবাড়ি, দোকান-পাট ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। যুদ্ধ শেষে মোপলা বাহিনীর দশ হাজার নারী-পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়। আর জীবন্ত যাদের পাওয়া যায় তাদের বন্দী করে বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বিচারের পূর্বেই অনেক পুরুষ ও শিশুকে হত্যা এবং নারীদের উপর লজ্জাকর পাপাচার করা হয়। বাকী বেঁচে থাকা আসামীদের বিচার-ফল এমন দাঁড়ায়-এক হাজার জনের ফাঁসি দু হাজার লোকের দ্বীপান্তর অর্থাৎ, আন্দামানে শ্রমসহ নির্বাসন আর আট হাজার লোকের পাঁচ হতে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

ভারতে কুঞ্জাহামেদ চরিত্র নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বর্তমান সমালোচনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাক বলেন, ”আগামী বছর তো বিদ্রোহের শতবর্ষ, তাই কুঞ্জাহামেদকে নিয়ে চলচ্চিত্রটি যদি নাও হতো, তাহলেও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো রাজনীতির মাঠ গরম করার জন্য এই বিতর্ক তুলতোই। যেভাবে টিপু সুলতানকে নিয়ে বিতর্ক করেছিল, একই ভাবে ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ নিয়ে বিতর্ক তুলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তারা করতোই। হিন্দুত্ববাদীদের এটা সাধারণ চরিত্র।

আদতে ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মুসলিম শাসক এবং বীরদের নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা এবং তাদের কুৎসা রটানো হিন্দুত্ববাদীদের ধারাবাহিক প্রজেক্টের অংশ। এর আগে বাদশা আলমগীর থেকে শুরু করে সুলতান মাহমুদ- মুসলমানদের সকল কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়েই হিন্দুত্ববাদীরা ঘৃণ্য চক্রান্তে মেতেছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস বিস্মৃত রাখা এবং মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টির কাজটি তারা সূক্ষ্মভাবে সস্পন্ন করতে সচেষ্ট থাকে।

তথ্যসূত্র: চেপে রাখা ইতিহাস, বিবিসি বাংলা, উইকিপিডিয়া।