কুতুব মিনার ইসলামী স্থাপত্যশিল্প ও মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক

মুহাম্মাদ সাঈদ হুসাইন।।

পৃথিবীতে বিদ্যমান মিনার সমূহের মাঝে সম্ভবত কুতুব মিনারই বহুল আলোচিত এবং শৈল্পিক দিক থেকে সবচে’ সুন্দর। ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত এ ইসলামী স্থাপত্যটি হিন্দু ভারতের বুকে মুসলিম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কালের সমস্ত ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। যুগ-যুগান্তর ধরে হিন্দুস্তানের বুকে আমাদের ন্যায়নিষ্ঠ ইসলামী শাসন ও মুসলিম ঐতিহ্যকে ধারণ করে মাথা উচু করে আছে। এই কুতুব মিনার আজও স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের সোনালী অতীতকে, আমাদের………!

বিজ্ঞাপন

প্রথম যখন মিনারটি নির্মিত হয় তখন এটার উচ্চতা ছিলো ২২৪ ফুট (৬৮.২৭মি.)। পরবরর্তীতে সংস্কার কার্যের সময় উপরে আরো সংযোজিত হয়। নিচে মিনারের ব্যাস ৪৭ ফুট৩ ইঞ্চি (১৪.৩৮মি.)। ক্রমে সরু হয়ে শীর্ষদেশে এটার ব্যাস হয়েছে ৯ ফুট (২.৭৪মি.)।

প্রথমে মিনারটি চারতলা বিশিষ্ট ছিলো। প্রতি তলার বিভক্তিকরণ রেখার নির্দেশক হিসাবে স্তালাকটাইত ঠেক্নাযুক্ত বৃত্তাকার ঝুলন্ত বারান্দা ব্যবহার করা হয়েছে। ফিরোজ শাহ্ তুঘলকের সংস্কারের সময় মূল চতুর্থ তলার স্থলে আরো একটি তলা নির্মিত হয়। ফলে বর্তমানে কুতুব মিনার পাঁচ তলা বিশিষ্ট।

প্রথম তলার উচ্চতা ৯৪ ফুট (২৮.৬৫মি.); দ্বিতীয় তলার উচ্চতা ৫০ ফুট ৮.৫০ ইঞ্চি (১৫.৪৪মি.); তৃতীয় তলার উচ্চতা ৪০ ফুট (১২.১৯মি.); চতুর্থ তলার উচ্চতা ২৫ ফুট ৪ ইঞ্চি (৭.৭২মি.) এবং পঞ্চম তলার উচ্চতা ২২ ফুট (৬.৭০মি.)। এই মিনারের ভূমি ২৪ বাহু বিশিষ্ট একটি বহুভুজ। প্রতি বাহুর দৈর্ঘ ৬ ফুট ১.৫০ ইঞ্চি (১.৮৫মি.); ভূমির উচ্চতা ২ ফুট (০.৬০ মিটার) ।

ভূমি নক্শা ও গঠন :

কুতুব মিনার বৃত্তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। প্রথম তলার বহির্গাত্রে ২৪টি কৌণিক এবং গোলায়িত খাত রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমিকভাবে সন্নিবেশিত। দ্বিতীয় তলার বহির্গাত্র গোলায়িত এবং তৃতীয় তলার বহির্গাত্র কৌণিক খাত সম্বলিত, চতুর্থ তলার বহির্গাত্র সমতল, তবে পঞ্চম তলা আংশিকভাবে গোলায়িত খাত দ্বারা আবৃত।

এই মিনার নির্মাণে প্রধানত তিন প্রকারের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ধূসর বেলে পাথর, সাদা মার্বেল পাথর এবং লাল বেলে পাথর। দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত মিনারটি নির্মাণ কার্যে ব্যবহৃত হয়েছে ধূসর বেলে পাথর;

তৃতীয় তলায় ব্যবহৃত হয়েছে গাঢ় লাল পাথর; চতুর্থ এবং পঞ্চম তলার অভ্যন্তর ভাগ লাল বেলে পাথরে এবং বহির্গাত্র সাদা মার্বেল ও ধূসর বেলে পাথরের আংশিক মিশ্রণে নির্মিত।

অনলাইনে কাটলে পর্যটকেরা কুতুব ...

এই মিনারের অভ্যন্তরভাগে ৩৭৯ ধাপ বিশিষ্ট একটি প্যাঁচানো সিঁড়ি সোপান মিনারের পঞ্চম তলা পর্যন্ত চলে গেছে। প্রথম তলার উত্তর দিকে মিনারে প্রবেশের জন্য একটি দ্বার পথ রয়েছে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে উপরে যাওয়ার প্যাঁচানো সিঁড়ি সোপান। পঞ্চম তলায় কয়েকটি জানালা সংযুক্ত হয়েছে। উপরে ক্ষুদ্র গম্বুজাকৃতি ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল।

কুতুব মিনারের একটি শৈল্পিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য হল- এটার প্রতিটি তলা বিভক্তকারী বহির্গত বৃত্তাকার ঝুলন্ত বারান্দা এবং সেগুলোর নিকটস্থ ঠেক্না ব্যবস্থা। ঝুলন্ত বারান্দার এই ঠেক্না ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য স্তালাকটাইত ঠেক্না পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

এই পদ্ধতি অনুযায়ী একগুচ্ছ ক্ষুদ্র খিলান ও অবতল গাত্রের মধ্যবর্তী স্থানে ঠেক্না সংযুক্ত করে জ্যামিতিক স্তালাকটাইতের ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে দূর থেকে দেখলে এগুলো মৌচাকের মত মনে হয়। স্তালাকটাইতের সাথে পূর্ণ সাদৃশ্যতা বিধানের জন্য ক্ষুদ্র খিলানের অভ্যন্তরসহ অবতল গাত্রসমূহকে খোদাই করে এগুলোতে মৌচাকের আদল সৃষ্টি প্রয়াস চালানো হয়েছে।

অঙ্গসংঠন ও অলঙ্করণের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হবে, এই মিনারের স্তালাকটাইত ঠেক্নাযুক্ত বৃত্তাকার ঝুলন্ত বারান্দাগুলি মুসলিম শিল্প নৈপুণ্যের এক অপূর্ব নিদর্শন।

অলঙ্করণ :

লোহিত ও ধূসর বেলে পাথর এবং সাদা মার্বেল পাথরের সমন্বয় কুতুব মিনারকে এক অপূর্ব আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। মিনারের বহির্গাত্রে কৌণিক ও গোলায়িত খাতের ব্যবহার এর সার্বিক গাত্রালঙ্কারের ক্ষেত্রে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।

মনোমুগ্ধকর স্তলাকটাইত ঠেক্নাগুলিও কুতুব মিনারের আঙ্গিক সৌন্দর্য্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। তবে কুতুব মিনারের গাত্রালঙ্কারের সবচে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মিনারের বহির্গাত্রের লিপিকলার অলঙ্করণ। লিপি অলঙ্করণের পাঁড় বা পট্টিগুলো ‘জ্যামিতিক সিরিজে’ বিন্যস্ত করা হয়েছে।

তুঘ্রা পদ্ধতির সুস্পষ্ট আরবী অক্ষরের সৃষ্ট লিপি অলঙ্করণের সাথে লতাপাতা ও ফুলের নকশার এক চমৎকার সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। লিপি অলঙ্করণের পাঁড় বা পট্টির সীমা নির্দেশের জন্য দুই, তিন বা চারটি স্ফীত রেখার সমন্বয়ে সীমারেখা নির্দেশিত হয়েছে।

এগুলোর সাথে আরব্য পাঁড় নক্শার সংযোজন গাত্রালঙ্কারের শৈল্পিক মূল্যকে অনেকাংশে বৃদ্ধি করেছে। সর্বপোরি খোদিত লতাগুল্মো ও কুরআনের আয়াতের সংমিশ্রণে লিপিকলা এবং জ্যামিতিক নক্শা পরিবেষ্টিত কুতুব মিনার ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের এক নান্দনিক নিদর্শণ।

নির্মাণ তারিখ :

সমসাময়িক ইতিহাসগ্রন্থ ও সংশ্লিষ্ট কিতাবাদীর আলোকে কুতুব মিনারের সঠিক নির্মাণ তারিখ নির্ণয় করাটা একটু মুশকিল। তবে কুতুব মিনার থেকে যে সমস্ত শিলালিপি আবিস্কৃত হয়েছে তা থেকে মিনার নির্মাণের যে তারিখ নির্ণিত হয় তা হলো, ৫৯৬ হিজরী -এই বছরটির উল্লেখ শিলালিপিতে ৩বার পাওয়া গেছে। যা থেকে অনুমান করা হয় এই মিনারটি ৫৯৬ হি./১১৯৯খৃ. -তে কুতুব উদ্দিন আইবেকের আমলে নির্মাণ কার্য শুরু হয়।

আরো জানা যায়, কুতুব উদ্দিন আইবেক মিনারটির প্রথম তলা নির্মাণ করেন। পরে তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী শামছুদ্দিন ইলতুৎমিশ ৬২৭হি./১২২৯খৃ. -তে আরো তিনটি তালা নির্মাণের মধ্য দিয়ে এর নির্মাণ কার্য সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বজ্রপাতে মিনারটি ক্ষতিগ্রন্থ হলে ফিরোজ শাহ্ তুঘলক ৭৬৯হি./১৩৬৮খৃ. -তে পঞ্চম তলা সংযুক্ত করেন। জানা যায়, বজ্রপাতের দরুন মিনারটি দুইবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নির্মাণ উদ্দেশ্য :

কুতুব মিনার কেন নির্মাণ করা হয়েছিলো ? -এ প্রশ্নের উত্তরে একেক জন একেক রকম লিখেছেন।

১৮৬২ খৃস্টাব্দে ইংরেজ গবেষক কানিংহাম এই মর্মে মন্তব্য করেছিলেন, এই মিনার নির্মাণের মাধ্যমে বিজিত জনগণকে বিজয়ীদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন করা এবং ‘কুওয়াতুল ইসলাম’ মসজিদের (যা কুতুব মিনারের পাশেই অবস্থিত, তবে মসজিদ ও মিনার আলাদা দুটি স্থাপত্য) ‘মাযিনা’ হিসাবে ব্যবহার করা -এই দুই উদ্দেশ্যে কুতুব মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

আরেক ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ফারগুসনের মতে- কুতুব মিনার একটি জয়স্তম্ভ। বলাইবাহুল্য, ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইজনের কারোর কথাই ইতিহাসবিদ ও শাস্ত্রজ্ঞদের নিকট গ্রহণযোগ্য না।

মিনারটি হিন্দু ভারতে মুসলিম জাতির বিজয়ের অব্যবহিত পরেই নির্মিত হয়েছিলো। এজন্য অনেকে বলেন, তৎকালিন বাদশা এটা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়স্বরূপ নির্মাণ করেছিলেন। সাথে এর এ উদ্দেশ্যও হতে পারে যে, ভারতের হিন্দুবাসীকে মুসলিম বিজয়ীদের শক্তি ও দাপট সম্পর্কে অবহিত করা।

তবে ইতিহাসে পাওয়া যায়, অতীতে কখনো এই মিনারের প্রথম তলা আযান দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতো। মোটকথা এই মিনার কীর্তিস্তম্ভ ও কৃতজ্ঞতাসৌধ।

মিনারের নামকরণ :

মিনারটি ‘কুতুব মিনার’ নামে সুপরিচিত হলেও সমসাময়িক ইতিহাস ও শিলালিপিতে এই নামের প্রামান্যতা বা কোন সমর্থন খুঁজে পাওয়া যায় না। সমসাময়িক ঐতিহাসিক হাসান নিজামী (তাজুল মাসীর) ও মিনহাজ (তাবাকাত-ই-নাসিরী) এ প্রসঙ্গে কিছুই উল্লেখ করেন নি। এমনকি আল্লামা ইবনে বতূতাও ‘কুতুব মিনার’ নামে অভিহিত করেন নি।

সর্বপ্রথম কুতুব মিনার সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায় আমীর খসরুর বর্ণনায়; তিনি এটাকে ‘জামে মসজিদের মিনার’ নামে উল্লেখ করেছেন। ফিরেজ শাহ্ তুগলক এটাকে ‘সুলতান মুঈজউদ্দিন সামের মিনার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রথম মুগল সম্রাট বাবর ১৫২৬ খৃস্টাব্দের ২৪শে এপ্রিলের রাত কিলা-ই-রাই পিথোরার দুর্গে যাপন করেছিলেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে এটাকে ‘আলাউদ্দিন খলজীর মিনার’ নামে লিখেছেন।

তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো- কোন ঐতিহাসিক সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও ও বৃটিশ আমলের কতিপয় প্রাচ্যবিদ, ইতিহাসবিদ ও প্রত্মতত্ত্ব (কানিংহাম, র‌্যাভারটি, উলসলীহেগ, আর এন মুন্সী প্রমুখ) এই মত পোষণ করেন যে, কুতুব উদ্দিন আইবেক বাগদাদের উস্ নিবাসী সূফী সাধক কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কা‘কীর (মৃ.৬৩৩ হি./১২৩৫ খৃ.) নামানুসারে এই মিনারকে ‘কুতুব মিনার’ নামকরণ করেন।

পরবর্তীতে পর্যটক-গাইড, লেখক-সাহিত্যিক এই নামেই মিনারকে অভিহিত করতে থাকে। আর বৃটিশরা যেহেতু ২০০ বছর ভারত-বর্ষ শাষন করেছে, (আর এ দেশবাসী ‘বৃটিশ-গোলামী’ ছাড়তে নারাজ) ফলে কোন প্রকারের ঐতিহাসিক সমর্থন ও ইলমী ভিত্তি না থাকা বিত্তে¡ও এই নামটিই বহুল প্রচলিত ও প্রচারিত হয়ে গেছে।

(বিস্তারিত তথ্যসূত্র : রিহলাতু ইবনে বতূতা/ আছারুস-সানাদীদ :স্যার সৈয়দ আহমদ খান (দিল্লী ১৯৬৫ পৃ-৫৪) /ইসলামী বিশ্বকোষ ৮:৩২৩/ দি হিস্ট্রি অব দি কুতুব মিনার : আর.এন.মুন্সী, (মুম্বাই ১৯১১ পৃ-৮৪)/ ফুতুহাতে ফিরোজশাহী : ৩৮৩/ খাযায়েনুল ফুতুহ : ৬৯-৭০/ বাবুরনামা ২:৪৭৫/হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান ইস্টার্ন আরকিটেক্চার : জেমস, ফারগুসন, পৃÑ৫০৫/সুলতানী আমলে মুসলিম স্থাপত্যের বিকাশ : ৫৮/আল-কিরাতুর রাশিদাহ্ …..)

বিজ্ঞাপন