নবীন আলেমদের পাশ্চাত্যের উপর কাজ করা উচিত

মাওলানা যাহেদ রাশেদী।।

মুসলিম শরীফে কেয়ামতের আলামত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ’’والروم اکثر الناس‘‘ রোমের লোকদের মধ্যে আধিক্য হবে। এখানে রোমের লোকদের দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় পশ্চিমা জাতিবর্গ এবং আধিক্য দ্বারা উদ্দেশ্য পশ্চিমা দেশসমূহের প্রাবল্য এবং একচেটিয়া ক্ষমতা, তাহলে এটা আমরা এখন শুধু দেখছি না, বরং ভুগছি। তাদের সামনে দুনিয়ার প্রায় সব দেশ ও জাতি নতজানু। আমরাও তাদের গোলামীর শিকার। পাশ্চাত্যের সামনে পরাজিত হওয়ার কারণ, প্রতিকার খুঁজে বের করা এখন আমাদের জাতীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কাজ করার এখন আমাদের না সময় আছে, না প্রয়োজনীয়তার কোনো অনুভূতি আছে।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমা বিষয়ে কাজ করার পৃথক তিনটি ক্ষেত্র আছে-

১. পশ্চিমা বিশ্ব নিয়ে কাজ করা

২. পশ্চিমা বিশ্বে গিয়ে কাজ করা

৩. পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থে কাজ করা। এই তৃতীয় ক্ষেত্রটিতে কাজের লোকের অভাব নেই। কিন্তু প্রথম দুই ক্ষেত্রে আমাদের মনোযোগ নেই। এই বিষয়েই আমি দুয়েকটি কথা আরজ করি

১. পশ্চিমা বিষয়ে কাজ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথিবীতে বিশেষত ইসলামী বিশ্বে পশ্চিমাদের সব ধরণের প্রভাবের বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ করা। নিরপেক্ষভাবে অবস্থা বিশ্লেষণ করে এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে যে আমাদের ত্রুটি কোথায় কোথায়। কোন কোন কারণে তারা আমাদের ‍উপর প্রভাব বিস্তার করে আছে। একথা একবারে বাস্তব যে কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ থেকে সামাজিক পর্যায়ে আমাদের সরে যাওয়া পতনের সবচেয়ে বড় কারণ কিন্তু এতটুকু বলে দেওয়া যথেষ্ট নয়। বরং আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার। বরং কুরআন যেভাবে উহুদ যুদ্ধের সাময়িক পতনের পর পতনের কারণ প্রতিকার চিহ্নিত করে দিয়েছে এখনো সেভাবে কারণগুলো বের করা দরকার।

২. প্রথম দুটি ক্ষেত্র প্রস্তুত না থাকায় পশ্চিমা সভ্যতা নিয়ে যে কোনো কাজ আমাদের দেশে তৃতীয় প্রকারের গণ্য করা হয়। আমি এর দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি, যেভাবে কিছু লোক কালার ব্লাইন্ড অর্থাৎ বর্ণকানা হয়। তারা বিভিন্ন রঙ্গের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। রং বলতে তারা সাদা আর কাল বুঝে। তদ্রুপ সাদা-কালো রঙ্গের পার্থক্য করতে না পারা লোকেরা পশ্চিমা বিশ্ব নিয়ে করা যে কোনো কাজকে এক দৃষ্টিতে দেখেন এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে অক্ষম মনে করতে হবে।

কয়েক বছর আগে আমরা লন্ডনে ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফোরাম নামে কাজ শুরু করেছি।  সেখানে ‘ওয়েস্ট ওয়াচ নামে একটি বিভাগের প্রস্তাব এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দিয়েছিলাম যে, যেভাবে পশ্চিমারা ‘ইসতিশরাকে’র নামে প্রাচ্য ও ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের উপর বিশেষজ্ঞতা অর্জন করে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইলমী ও ফিকরী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের পথ আবিস্কার করেছে এবং এ পথে অনেক দূর এগিয়েছে, ঠিক সেভাবে আমাদেরও ‘ইসতিগরাব’ তথা পাশ্চাত্য নিয়ে একটা মেহনত হওয়া উচিত, যাতে পাশ্চাত্যের জাতিসমূহের প্রভাব বিস্তার করা, এবং মুসলিম জাতির পিছিয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ বের করার পাশাপাশি পশ্চাত্যের চিন্তা, দর্শন, সমাজ ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে ইসলামকে বিজয়ী করার বিভিন্ন উপায় সামনে আনা হবে। আমরা এ উদ্দেশ্যে লন্ডনে বিভিন্ন বৈঠক করেছি। বিভিন্ন জ্ঞানীদের সাথে মতবিনিময় করেছি কিন্তু পরিবেশ না থাকার কারণে এটা বেশী দূর আগায়নি।

৩. দ্বিতীয় প্রকার ছিল পশ্চিমা বিশ্বে অবস্থান করে কাজ করা। যেমন কিছু আহলে ইলম ও চিন্তাবিদ পশ্চিমে বসে এর সভ্যতা সংস্কৃতিতে প্রভাবিত না হয়ে এর চিন্তাগত ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন হামলার জবাব দিয়েছেন এবং পশ্চিমা বিভিন্ন সমাজের সামনে ইসলামের উপকারিতা এবং প্রয়োজনিয়তা তুলে ধরেছেন। গত শতাব্দিতে বিভিন্ন দেশের  ডজন খানেক আহলে ইলম পাশ্চাত্যে কাজ করেছেন। যাদের মধ্যে ড. হামীদুল্লাহকে আইডল হিসাবে পেশ করা যেতে পারে। আর তার সেই কাজগুলোকে এ ময়দানে কাজের ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে, যা তিনি হারাদাাবাদ থেকে প্যারিসে হিজরত করার পর কয়েক দশক ব্যাপী করেছিলেন। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আমি নবীন আলেমদের নিকট আরজ করব, আপনারা পাশ্চাত্যের স্বার্থে কাজ করার নমুনা তো সর্বত্র পেয়ে যাবেন। কিন্তু আপনাদের উচিত, পাশ্চাত্যের স্বার্থে নয়, পাশ্চাত্যের উপর কাজ করা এবং এর জন্যে উপায় খুজে বের করা। আর এর জন্য আপনারা মনোযোগের সাথে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ., ড. হামীদুল্লাহকে অধ্যয়ন করুন। এতে আপনাদের সাহস বাড়বে দিকনির্দেশনাও পাবেন। এবং কাজের রাস্তাও পরিস্কার হবে।

রোজনামায়ে ইসলাম,১০জুন,২০২০

অনুবাদ: এনাম হাসান জুনাইদ।

বিজ্ঞাপন