সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও স্বাস্থ্যখাতে আরো নজর দিন

[২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন দেশের অর্থনৈতিক ফিকহের প্রাজ্ঞ উস্তায, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। ধারাবাহিকভাবে সে আলোচনা ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। এটি পঞ্চম ও শেষ আলোচনা।]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ।।

বিজ্ঞাপন

বাজেট নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণে গেলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক-দুই আঙ্গিকের অনেক কথা সামনে চলে আসে। আলোচনা আর বাড়াতে চাই না। প্রয়োজনীয় দু’-একটি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে এ আলোচনা শেষ করতে চাই।

বাজেটে বরাদ্দের একটি খাত হলো, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ। এটা বাজেটের একটা নিয়মতান্ত্রিক খাত। এ খাতটির প্রতি যেভাবে যতটুকু মনোযোগ দেওয়া উচিত, আমাদের বাজেট প্রস্তাবনায় যথাযথভাবে সেটা পরিলক্ষিত হয় না। এবারের বাজেটে এ খাতে গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এটা ভালো দিক কিন্তু এই বর্ধিত বরাদ্দ এ খাতের জন্য যথেষ্ট কিনা সেটাও বিবেচনাযোগ্য ব্যাপার। এবার করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর কর্ম বঞ্চিত দিনমজুর ও অসহায় সাধারণ মানুষের মাঝে প্রথমেই নানা দিক থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে সরকারি উদ্যোগে সাহায্য-সহযোগিতা বিতরণের সংবাদ আমরা পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নানারকম দুর্নীতি, চাল চুরির ঘটনা সামনে এলেও, আমরা সরকারি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এক সময়ে জাতীয় উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হতো না, এখন সরকার নিচ্ছে। আগে এজাতীয় সহযোগিতার আওতা কম ছিল, এখন এর আওতা বাড়ছে। এটাকেও আমরা ভালোই বলবো। তবে এরপরও কথা থেকে যায়।

নাগরিকদের প্রতি এজাতীয় সহযোগিতামূলক কিংবা সামাজিক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের পরিধিটা কতটুকু, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অভাবী, অনাথ, অসহায় সকল নাগরিক এই সহযোগিতামূলক পদক্ষেপের আওতায় পড়ছেন, নাকি অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ সুবিধাটা পাচ্ছেন। আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, যারা সরকারি উদ্যোগের এজাতীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন তারা কি প্রকৃত হকদার, নাকি প্রকৃত হকদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন আর নানা রকম পরিচিতি ও সম্পর্ক থাকায় কিছু সচ্ছল মানুষেরাও এর সুবিধাগুলো হাতিয়ে নিচ্ছেন। করোনা সংকটকালে সরকারি সহযোগিতা বিতরণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে এমন বেশ কিছু অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে।

আমরা ইসলামের বিধি-বিধান এবং এর সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। অসহায় দরিদ্র নাগরিকদের ভরণপোষণ বাসস্থান ও জীবন নির্বাহের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি হলো, অসহায়দের কোনো অংশের নয়, বরং রাষ্ট্রের উচিত শতভাগ অসহায় মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করা। প্রথম যুগ থেকে ইসলামী রাষ্ট্র গুলোর দিকে তাকালে এ নীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সা.-এরশাদ হলো: من ترك مالا فلورثته و من ترك كلا او ضياعا فالى أو (قال) فعلي (মৃত্যুকালে কেউ যদি কোনো সম্পদ রেখে যায় তাহলে সেটা তার উত্তরাধিকারীরা পাবে, আর কেউ যদি কোনো বোঝা অথবা দায় রেখে যায়, তাহলে তার দায়িত্ব আমার ওপর।)

এর মানে হচ্ছে, অভাবগ্রস্ত মানুষের বিপন্নতার দায় ও বোঝা রাষ্ট্র বহন করবে। সমাজে বসবাসরত দরিদ্র তালাকপ্রাপ্তা, বিধবা নারী, গরিব এতিম, সম্পদহীন মানুষ, কর্মক্ষমতা-শূন্য ও আয়-রোজগারহীন মানুষের ভরণপোষণ, বাসস্থান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ রাষ্ট্র সরবরাহ করবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এবং এ শ্রেণীর প্রতিটি মানুষকেই এ সেবা পৌঁছাতে হবে।

আরো পড়ুন: বিশাল ঘাটতি বাজেট থেকে বাড়ছে ঋণ ও সুদের বোঝা

আমরা তো এখন শুনতে পাই, আমরা এখন আর গরিব রাষ্ট্র নই, ধনী হয়ে গেছি। গড় আয় অনেক বেশি। এ অবস্থায় আমাদের মতো রাষ্ট্রের উচিত সামাজিক নিরাপত্তার আওতা পরিপূর্ণ করে তোলা। একজন অভাবী নাগরিকও যেন অসহায় অবস্থায় না থাকে সে ব্যবস্থাপনা বার্ষিক বাজেট বা রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে থাকা উচিত। কিন্তু এ জায়গাটায় আমরা একটি ফাঁকা দৃশ্য দেখি। একদিকে মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ের কথা খুব বড় করে বলা হয়। অপরদিকে দরিদ্র শ্রেণী অসহায় অবস্থায় দিন পার করতে বাধ্য হয়। কোনো কল্যাণ রাষ্ট্রের চিত্র এমন হতে পারে না।

কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, অসহায় দরিদ্র নাগরিকদের পৃষ্ঠপোষকতার শতভাগ দায়িত্ব নেওয়া। সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ খাতটি সেখানে আংশিক ও বাছাইকৃত হতে পারবে না। ইসলাম এ শিক্ষাই দেয় যে, প্রয়োজন সম্পন্ন প্রতি জন মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতা পাবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে অপচয় কমিয়ে মিত ব্যয়িতার চর্চা করা গেলে এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ খুব সহজ ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজের উপলক্ষে অপচয়ের পেছনে শত শত কোটি টাকা খরচ হয় বলে শোনা যায়। বিদেশ সফর এজাতীয় অপচয়ের একটি বড় উদাহরণ। প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখা যায়, কোন দেশ থেকে একটি মানচিত্র আনার প্রয়োজনে একদল প্রতিনিধি সেখানে চলে যাচ্ছে। দেশে একটি খামার প্রতিষ্ঠা করার নমুনা দেখার জন্য বিদেশের কোনো খামার দেখতে চলে যাচ্ছে বড় আরেকটি প্রতিনিধিদল। সদলবলে ছোটখাটো উপলক্ষে বিদেশ সফরসহ সরকারি বিভিন্ন খাতে নানারকম অপচয়ের যেসব ঘটনা সামনে আসে এগুলো বন্ধ হলে জনকল্যাণের তহবিল বা বরাদ্দ আরো বড় করা যেতে পারে।

আরো পড়ুন: ঘাটতি বাজেটের খেসারত কোথায় কীভাবে দিতে হচ্ছে!

অপচয় ও বিলাসিতা বন্ধ করে নাগরিক বান্ধব খরচের খাতকে উৎসাহিত করা দরকার। কথায় বলে: ‘কোম্পানি কা মাল দরিয়া মে ডাল’। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে আমরা প্রবচনটির প্রয়োগ দেখি। এ জাতীয় ধ্বংসাত্মক অপচয় বন্ধ করে মিতব্যয়িতার চর্চা বাড়ালে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ কমে যেত এবং জনকল্যাণে বেশি ব্যয় করা যেত। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। অপ্রয়োজনীয় খাতে বছর বছর প্রাক্কলন বাড়ছে, ঘাটতি বাড়ছে, রাষ্ট্রের নাভিশ্বাস ছুটছে।

নৈতিক উন্নয়ন খাত রাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সব পর্যায়ের জনগণকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্দীপ্ত করতে পারলে রাষ্ট্রেরই কল্যাণ। কিন্তু বাজেট বরাদ্দের সময় এ খাতের বিশেষ বিকাশ ও প্রাধান্য দেখা যায় না। এক সময় দেশের বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মীদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হতো। যাদের মাধ্যমে তারা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের শিক্ষাও পেত। শিক্ষার বিস্তার এবং এ শিক্ষার মধ্য দিয়ে নৈতিকতার উন্নয়ন রাষ্ট্রের পুরো ব্যবস্থাপনার মধ্যেই দরকার। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত, শিশু-কিশোর থেকে পৌড় পর্যন্ত সব স্তরে নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে রাষ্ট্রের অনেক বাজে খরচ এমনিতেই কমে যাবে। কমে যাবে দুর্নীতি এবং উন্নয়ন বাজেটের ব্যয়। কমে যাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের খরচ পর্যন্ত। নাগরিকদের মাঝে নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটলে সব রকম অপরাধ যেমন কমে যাবে, সেই সব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত খরচের পাল্লাও কমে যাবে। বাজেট প্রস্তাব এবং পাশের সময় তাই নৈতিক খাতের উন্নয়নের বিষয়টির দিকে রাষ্ট্রের কর্ণধারদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

আরো পড়ুন: প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের অমীমাংসিত অঙ্ক

করোনার সময় স্বাস্থ্যখাতের হাহাকারের চিত্রটি সামনে এসেছে। এতদিন তো এই খাতের দুর্বলতা স্বীকারই করতে চাইতো না অনেকে। এখন উপর-নিচের সবাই এর ভুক্তভোগী। এবছর অবশ্য এ খাতে বরাদ্দ কিছুটা বেশি ধরা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতার বিচারে এটাও যে অপ্রতুল এটা পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এ পরিস্থিতি একদিনে হয়নি, এক সরকারের কাজ নয় এটা। ধারাবাহিক অবহেলার ফল এখন জাতি ভোগ করছে। এজন্য নাগরিকদের দাবি, এ খাতের প্রতি ব্যাপক মনোযোগ দেওয়া উচিত। দৃশ্যমান ও উন্নয়নমুখী পরিবর্তন স্বাস্থ্যখাতে দরকার। ছোট-বড় বহু কার্যকর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, জায়গায় জায়গায় বিপুলসংখ্যক ডাক্তার নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্য খাতের এ অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় শিকার দেশের গরীব নাগরিকরা। অথচ এ গরিব নাগরিকদের পকেটেই বাজেটের বরাদ্দের বড় অংকটা দাঁড় করানো হয়। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর থেকে এবার আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। সবাই জানে, ভ্যাটের আওতায় রয়েছেন একজন ভিখারি থেকে নিয়ে শিল্পপতি পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিক। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার এক অভিশপ্ত চক্কর যে গরীবের টাকায় গড়ে ওঠা সৌধে গরিবের জায়গা থাকে না। গরিবের দেওয়া ‘করে’ নির্মিত ব্যবস্থায় গরিবই থাকে সবচেয়ে বেশি অসহায়। স্বাস্থ্য খাতে ব্যবসা প্রবণতা, অবহেলা, অব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের কষ্ট এখন অনেক। কয়দিন আগে উচ্চ আদালত থেকে চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিতে হয়েছে, পরে আবার সে নির্দেশনার বিরুদ্ধে আপিলও করা হয়েছে। এ থেকেও বোঝা যায়, সরকারি-বেসরকারি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের পাশাপাশি সর্বোচ্চ মনোযোগের ব্যবস্থাও করা দরকার।

আরো পড়ুন: জনপ্রশাসন খাতের বর্ধিত ব্যয় এবং ঘুষ ও উপঢৌকন প্রসঙ্গ

বাজেট নিয়ে মনের তাগিদ এবং সংশ্লিষ্ট স্বজনদের অনুরোধে কথা বলার সময় অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করে। অনেক সময় আবার মনে হয়, এসবই অরণ্যে রোদন। তবুও কিছু কথা পেশ করলাম, নীতিনির্ধারণে যারা রয়েছেন, নীতি নির্ধারণের সঙ্গে যারা রয়েছেন কেউ যদি দরকারি ও ভালো কিছু করতে একটু উদ্যোগী হন!

(ধারাবাহিক বাজেট বিশ্লেষণমূলক আলোচনা এখানে শেষ হলো)

বিজ্ঞাপন