জনপ্রশাসন খাতের বর্ধিত ব্যয় এবং ঘুষ ও উপঢৌকন প্রসঙ্গ

[২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন দেশের অর্থনৈতিক ফিকহের প্রাজ্ঞ উস্তায, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। ধারাবাহিকভাবে সে আলোচনা ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। এটি চতুর্থ আলোচনা।]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ।।

বিজ্ঞাপন

২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটে যথারীতি প্রধান ও এক নাম্বার বরাদ্দের খাতটি হলো, জনপ্রশাসন। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের খাত। এবার মোট বাজেটের ১৮.০৭ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি একটি বিশাল বরাদ্দ। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কারণে এ খাতের বরাদ্দ প্রতি বছর বাড়ছে। অনেকে এ খাতের বিশাল বরাদ্দ নিয়ে আপত্তি করতে চান না বিশেষ একটি আশাবাদের কারণে। তারা মনে করেন, বেতন-ভাতা বাড়লে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবৈধ পথে আয়-রোজগার বন্ধ করে দেবে। ঘুষ ছাড়াই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জনগণ সেবা পাবে। উন্নয়নমূলক কাজেও ঘুষ ও উৎকোচের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হবে না। কিন্তু এ আশাবাদের কোনো বাস্তব চিত্র দেখতে পাওয়া যায় না।

দু’বছর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। এরপর থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা কাজকর্মে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ কতটা কমেছে? দুর্নীতির মাত্রা আদৌ কি নিচের দিকে গিয়েছে? অফিস-আদালতে মানুষ কোনো কাজের জন্য গেলে ঘুষ ছাড়া নির্বিঘ্নে কতটুকু কাজ করতে পারে? কত জায়গায় পারে? বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য, জমি রেজিস্ট্রি জমির খাজনা পরিশোধ- কোন জায়গায় ক’জন ব্যক্তি ঘুষ ছাড়া তার কাজটি সম্পন্ন করে আসতে পারেন? প্রায় সবাই জানে, জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে বাড়তি ১ পার্সেন্ট, দেড় পার্সেন্ট টাকা কোথায় কাকে দিতে হয়। এ পরিস্থিতি প্রায় সব সেক্টরে, সব ক্ষেত্রে, সব খাতে। ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে লাফিয়ে লাফিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে লাভটা কী হয়? বেতন বাড়ালে ঘুষ কমবে, যারা এমন আশাবাদ লালন করেছিলেন, তাদের সে আশাবাদ সামান্য পরিমাণেও পূরণ হচ্ছে বলে মনে হয় না। অথচ বরাদ্দকৃত বাজেটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ খাতে ব্যয় করা হচ্ছে! বিশাল ঘাটতি বাজেটের চাপ মাথার উপর নেওয়ার পেছনে এই খাতেরও বড় একটি ভূমিকা আছে।

আওেরা পড়ুন: বিশাল ঘাটতি বাজেট থেকে বাড়ছে ঋণ ও সুদের বোঝা

অবশ্য আমরা একথা খুশি ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই বলবো যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এমন অনেকেই রয়েছেন যারা সৎ। অসৎ পথে তারা কোনোভাবেই পা বাড়ান না। আমরা তাদেরকে মোবারকবাদ জানাই। আল্লাহ তাআলা তাদের সততার পুরস্কার দেবেন। কিন্তু জনপ্রশাসনে এমন সৎ লোকের সংখ্যা কত? কত শতাংশ লোক সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করেন? হার হিসেব করলে তারা সংখ্যালঘুই হবেন। জনপ্রশাসনে সৎ লোক যে সংখ্যালঘু, এটা বোঝার জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ- দলিলের প্রয়োজন নেই। যে কেউ যেকোনো সরকারি অফিসে কোনো কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলেই সেটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করবেন। মুষ্টিমেয় কিছু সৎ মানুষের জন্য পুরো সেক্টরের বেতন বাড়িয়ে নাগরিকদের ওপর বাড়তি করের চাপ এবং দেশের ঋণের বোঝা বাড়ানোর কী মানে আছে? দরকার মনে করলে সৎ লোকদের অন্যভাবে পুরস্কৃত করুন। আর অসৎ লোকদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। ঢালাওভাবে অসততা চলতে দিয়ে এবং সবার বেতন বাড়িয়ে দিয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ নেওয়ার কোনো মানে আছে বলে মনে হয় না।

ইসলামের বিধান ও ইতিহাসে দেখা যায়, সরকারি কাজে নিযুক্ত মানুষদের সততার বিষয়ে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। হাদিসের কিতাবগুলো দেখলে এর উজ্জ্বল নজির পাওয়া যায়। অসততার সুযোগ তো দূরের কথা, সামান্যতম সন্দেহজনক কিছু হলেও সেখানে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে দেওয়া সাধারণ মানুষের হাদিয়া বা উপঢৌকনকেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। অথচ আমাদের সমাজে উঁচু পদের সরকারি কর্মকর্তা ও ও সরকারের মন্ত্রীদের হাতে দামি দামি জিনিসপত্র উপঢৌকন হিসেবে আসার কথা শোনা যায়। এসব দামি জিনিসপত্র নিয়ে জনসমক্ষে কেউ কোনো প্রশ্ন করলে উচ্চপদের কর্তা কিংবা মন্ত্রী মহোদয় উত্তর দেন, এটা আমার উপার্জন নয়, মানুষের দেওয়া উপহার। সরকারি চেয়ারে বসে জনগণের কাছ থেকে পাওয়া এসব উপহার চেয়ারের বাইরে থাকলে তারা পান না কেন? এ থেকে বোঝা যায়, সরকারি কাজে উঁচু পদে বসে থাকা ব্যক্তিদেরকে দেওয়া এসব উপহার আসলে কতটা ‘উপহার’ এবং কতটা কাজ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য ‘উৎকোচ’।

আরো পড়ুন: ঘাটতি বাজেটের খেসারত কোথায় কীভাবে দিতে হচ্ছে!

অথচ ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস দেখুন। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন সম্মানিত বদরী সাহাবী রাষ্ট্রীয় ফান্ডের জন্য  উশর/সাদাকাতের অর্থ উত্তোলনের করতে গেলেন। একজন বদরী সাহাবীকে স্থানীয় মানুষ নিজেদের মধ্যে পেয়ে আনন্দিত হলো এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রদত্ত অর্থের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তাকে কিছু উপহার দিল। এটা তাঁর জন্য খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মদিনায় ফিরে যখন তিনি একটি অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিলেন এবং আরেকটি অংশের ব্যাপারে বললেন যে এটি তার জন্য মানুষের দেওয়া উপহার, তখন সে উপহারের সম্পদ উপহার হিসেবে গণ্য করা হলো না। বরং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন যে, পুরো সম্পদই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাবে। এর কোন অংশ হাদিয়া/ উপঢৌকন হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকি আল্লাহর রাসূল ( সা.) বললেন, ‘তুমি যদি ঘরে বসে থাকতে তাহলে কি এই উপহার পেতে!’

আরো পড়ুন: প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের অমীমাংসিত অঙ্ক

আমাদের সমাজে বর্তমানে এর উল্টো চিত্র বিদ্যমান। আমি কোনো এক সরকারের কথা বলছি না। সব আমলেই উপহার, উপঢৌকন আর উৎকোচ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের উঁচু পদে বসে যারা ‘উপঢৌকন’ গ্রহণ করে, তাদেরকে বাঁধা দিতে উদ্যোগী হই না। ফলে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ঘুষ-উৎকোচের বাজার থাকে জমজমাট। এজন্যই আমরা বলে থাকি, রাষ্ট্রের বোঝা বাড়িয়ে বেতন বৃদ্ধি করা এবং এর সঙ্গে ঘুষ- উৎকোচের দরজা খুলে রাখলে কোনো ফায়দা তো নেই- ই, উল্টো দ্বিগুণ ক্ষতি। বেতন বাড়ানো হলো, দুর্নীতি কমলো না, রাষ্ট্র বা জনগণের কী উপকার হলো! অথচ দায়িত্বশীলদের মধ্যে এ নিয়ে যেন কোনো ভাবনাই নেই। সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা রক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপ আমরা প্রত্যাশা করি। বেতন বৃদ্ধি কিংবা বর্ধিত বেতনের দাবি পূরণ করতে গিয়ে ঋণ করে বাজেটের আকার বড় করার পর সততা রক্ষার এই কঠোরতা আরো বেশি প্রত্যাশিত এবং আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

(চলমান, ইনশাআল্লাহ)

বিজ্ঞাপন