হতাশা ও আত্মহত্যা নয়, প্রিয়জনদের ভিড়ে প্রাণ খুলে হাসুন

রায়হান মুহাম্মদ।।

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করেই যেন আবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক অস্থিরতা, অমানবিকতা, ভালবাসায় ভরপুর গল্পগুলো। এদিকে এই মহামারি থেকে রক্ষা পেতে লকডাউন পরিস্থিতির  কারণে একাকীত্ব, হতাশা ও দুশ্চিন্তার কারণে আত্মহত্যার বিষয়টিও বর্তমানে আলোচনায় আসছে করোনার ক্ষতিকর দিকগুলোর মধ্য থেকে।

বিজ্ঞাপন

লকডাউন পরিস্থিতির  কারণে একাকীত্ব, হতাশা ও দুশ্চিন্তার কারণে আত্মহত্যায় মৃত্যুর ব্যাপারটি করোনার ক্ষতিকর দিক হিসেবে উপস্থাপিত হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। এছাড়া প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষ মারা যান এই আত্মহত্যায়। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ নানা মানসিক চাপ থেকে আত্মহত্যা করে থাকে। দেশে প্রতিদিন ত্রিশজন মানুষ আত্মহত্যা করেন বলে জানা গেছে। ২০১৭ সালে এক বছরে বাংলাদেশে ১১০০ মানুষ আত্মহত্যা করেছে।

তাই শুধু করোনা পরিস্থিতির কারণে দুশ্চিতা ও হতাশা মানুষের মাঝে আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে বর্তমানে যা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয় বলতে চাইছেন, মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার ইফতা বিভাগের শিক্ষক মাওলানা আনোয়ার হুসাইন। আত্মহত্যায় মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়া মানুষদের ৭০ ভাগই মনোরোগের কারণে এপথ অবলম্বন করেন বলে যে গবেষণা আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয় তার সাথে অনেকটা মিল পাওয়া গেল মাওলানা আনোয়ার হুসাইনের কথার। তিনি বলছেন, আত্মহত্যায় মৃতুর ক্ষেত্রে সবার কারণ এক হয় না, তবে এই মুত্যুর পেছনে হতাশা আসল কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

নিজে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, এমন ভাবনা থেকে ভাইরাসটি থেকে সন্তানদের রক্ষায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের অন্ধপ্রদেশে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বালা কৃষ্ণ নামে ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। করোনা সংক্রমিত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে তাতে নিজেই আক্রান্ত হন ইতালির ৩৪ বছর বয়সী এক নার্স। সংক্রমণ থেকে নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে ড্যানিয়েল তেরেজ্জি নামে ঐ নার্স আত্মহত্যা করেন গত ২৬ মার্চ।

চারদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন বাংলাদেশের মাগুরা জেলার আসলাম হোসেন নামে এক কৃষক। প্রতিবেশীরা ‘করোনা রোগী’ বলে রসিকতা করায় আতঙ্কিত হয়ে গেলে ২৪ মার্চ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতে এই মৃত্যুগুলোর সাথে করোনার বিষয়টি উঠে এলেও দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে মুলত এই মানুষগুলো আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আরেকটি কঠিন ব্যাপার হল, একজন মানুষের আত্মহত্যার কারণে তার পরিবার, বন্ধু , আত্মীয়-স্বজন, মিলিয়ে প্রায় ১৫০ জন মানুষ এতে ভোগেন। বিভিন্ন সংস্থা, টিভি, পত্রিকাও এর মধ্যে জড়িত থাকে। তাই করো মাঝে এধরণের আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা দিলে সে বিশেষজ্ঞ আলেমদের শরণাপন্ন হতে পারে, এছাড়া পরামর্শ নিতে পারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের বলছিলেন, মাওলানা আনোয়ার হোসাইন।

এছাড়া মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার ইফতা বিভাগের শিক্ষক মাওলানা আনোয়ার হুসাইন বলছেন, আত্মহত্যা কবিরা গুণাহের মধ্যে অন্যতম। অভিশপ্ত শয়তান মানুষকে সব সময় গুণাহের দিকে প্ররোচিত করে, বিশেষত মানুষের একাকিত্বের সময় শয়তান মানুষকে গুণাহে লিপ্ত করতে তার সব ধরণের কৌশল প্রয়োগ করে থাকে, আর আত্মহত্যার মতো কবিরা গুণাহের বিষয়টি মানুষ সবার অগোচোরে গোপনে করে থাকে, তাই মাওলানা আনোয়ার হুসাইন বলছেন. করো মাঝে এ প্রবণতা দেখা দিলে তার একাকীত্ব ছেড়ে মানুষের ভিড়ে আসার চেষ্টা করা উচিত। একান্ত আপনজনদের সাথে নিজের সমস্যা, দুঃখ, কষ্ট শেয়ার করা এ থেকে পরিত্রাণ অন্যতম মাধ্যম হতে পারে তার মতে।

তওবা বনী আদমের পাপ থেকে মুক্তির পথ। তবে তওবা করা সম্ভব হয় মানুষ বেঁচে থাকলে, কিন্তু আত্মহত্যা এমন পাপ যার পরে তওবার আর কোন সুযোগ থাকে না। এছাড়া এপাপের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে ও ঘৃণা জানাতে সমাজের বরেণ্য আলেমদের আত্মহত্যাকারীদের জানাজা না পড়ানোর বিধান দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পরেও শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দোনীয় বিবেচিত হয় এমন আত্মঘাতী পথ থেকে বাঁচতে কঠোর সর্তকতা অলম্বনের বিকল্প নেই বলছিলেন মাওলানা আনোয়ার হুসাইন।এছাড়া এমন মৃত্যু থেকে বাঁচতে সকাল সন্ধ্যার মাসনূন দোয়াগুলো আমাদের সহায়তা করতে পারে বলে মত দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে লকডাউনের সময় হতাশা থেকে অনেকে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে কথা উঠছে, তবে আত্মহত্যা হতাশা থেকে মুক্তির সমাধান নয়, তাই এই সময় হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হতে নিজেকে সময় দিন, পরিবারের সাথে সময় কাটান, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন নিজের কথা,বিশেষত একাকীত্ব ছেড়ে প্রিয়জনদের ভিড়ে প্রাণ খুলে হাসার চেষ্টা করুন বলছেন বিষেশজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন