পলাশীর খলনায়ক ক্লাইভের মূর্তি গুড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে খোদ বৃটেনেই

সৈয়দ আবদাল আহমদ ।।

ক্লাইভের মূর্তি গুড়িয়ে দাও – খোদ বৃটেনেই এ দাবি উঠেছে। দাস ব্যবসায়ী কলস্টোনের মূর্তি ভেঙে ব্রিস্টল নদীতে ফেলে দেবার পর শত শত বৃটেনবাসী আবেদনে রবার্ট ক্লাইভকেও চিরতরে মুছে ফেলার দাবি তুলেছেন। বলেছেন ক্লাইভ অত্যাচারের প্রতীক। ঔপনিবেশবাদের প্রতীক। ঐতিহাসিক ব্যক্তি হওয়া মানেই তিনি ভালো লোক নন। ক্লাইভ ইতিহাসের খলনায়ক। তার ইতিহাস খুন আর লুটের । তাই স্রেশবারিতে এ মূর্তি থাকতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

দেখুন, প্রকৃতির কী অপূর্ব প্রতিশোধ! আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের কাছে ঘৃণিত এক লোকের নাম লর্ড ক্লাইভ। তার কারনেই উপমহাদেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এ লোকটিই এখানে ইংরেজ শাসনের সূচনা করেন। এরপর বৃটিশরা প্রায় দুশ বছর এখানে রাজত্ব করে। উপমহাদেশের স্বাধীনচেতা জনগনকে গোলাম করে রাখে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের কথা আমরা কেউ ভুলিনি। এই ক্লাইভই নবাব সিরাজুদ্দৌলার দরবারের কুখ্যাত জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ আর মীরজাফরের সাথে ষড়যন্ত্র করে পলাশীর করুন পরিণতি ঘটান। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ক্ষমতা দখল করে। যার পরিণতিতে ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পরযন্ত ১৯০ বছরের বৃটিশ দখলদারিত্ব আমাদের সইতে হয়।

পলাশী বিপর্যয় ঘটিয়েই এই ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ কোষাগারের সমুদয় ধন সম্পদ লুট করেন। এক সময়ের একজন সামান্য কেরানী রাতারাতি বনে যান বড়লোকে। এই লোকটি তথা বৃটিশ দখলদারিত্বের কারনেই এক সময়ের ঐশ্বর্যের বাংলায় নেমে আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ১৭৭৬ সালের এই দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ লোকের করুন মৃত্য হয়। সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনের সেই বিখ্যাত কোহিনূর হীরা চুরি করে নিয়ে যায় বৃটিশরা।

এই ক্লাইভ বৃটিশরাজকে তুষ্ট করার জন্য লুটতরাজ, খুন, হত্যা হেন কোনো অপরাধ নেই যা করেননি। শঠতা, ধূর্ততা,কূট কৌশল,ঘুষ দূর্নীতি, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ডিভাইড এন্ড রুল নীতির ভিত্তিতে শাসন ভারতবর্ষে এসবও প্রচলন ঘটিয়ে গেছেন এই বদমাশ লোকটা। আর ঘটাবেন না-ই বা কেন?

ছেলেবেলা থেকেই ক্লাইভ ছিল দুষ্ট প্রকৃতির। তার জীবনী লেখক ম্যালকম লিখেছেন ছোটবেলাতেই ক্লাইভ ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল। রেবেকা ক্লাইভের ১৩ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ক্লাইভ। শিশু কালে খালার কাছে থাকতো। তার খালুর বর্ণনায় পাওয়া যায় ম্যানচেস্টারে মারামারি করেই দিন কাটাতো। নিজে তো বখাটে,পাড়ার বখাটেদের নিয়ে মাস্তান গ্যাং গড়ে তুলেছিল। এলাকার দোকানগুলোতে চাঁদাবাজি করতো। চাঁদা না দিলে দোকানিদের বারোটা বাজিয়ে ছাড়তো। যে স্কুলেই পড়ুক না কেন গন্ডগোল করা চাই -ই। অনেক স্কুল থেকেই তাকে বহিস্কৃত হতে হয়েছে। লেখাপড়ায়ও কখনো ভালো করতে পারেনি। এমন বখাটে ছেলেকে বাবা অনেক দেনদরবার করে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীতে একটি কেরানির চাকরি যোগাড় করে দেন। চলে আসেন ভারতের মাদ্রাজে। আর সেখান থেকেই তার উত্থান।

নানা ফন্দিফিকিরে অবশেষে বাংলা দখল করে, বাংলার শেষ নবাবকে পরাস্ত করে গভর্নর! অথচ নিজ দেশে কিছুই করতে পারেনি ক্লাইভ। এ উপমহাদেশ তছনছ করে শেষ জীবনে ইংল্যান্ডে চলে যান তিনি। কিন্তু আরামে থাকা হলো না। বৃটিশ পার্লামেন্ট তার বিরুদ্ধে লুটপাট দুর্নীতির জন্য তদন্ত বসায়। ফলে একরাশ হতাশায় নিজের বাড়িতে নিজেই নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। কোনো এক গির্জার চত্বরে তাকে কবর দেয়া হয় কিন্তু এমনই ঘৃণিত লোক তিনি তার কবরের কোনো হদিস রাখা হয়নি।

আমেরিকায় জর্জ ফ্লোয়েড বর্ণবাদী হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার পর দেশে দেশে বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। খারাপ ও ঘৃণিত লোকদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। স্রেশবেরিতে তার মূর্তিও সরিয়ে ফেলার দাবি উঠেছে। খুবই যুক্তিসংগত দাবি।

Oxford University তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছিল। ওই ডিগ্রিও কেড়ে নেয়ার দাবি তোলা হোক।

লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব।

সামাজিক মাধ্যম থেকে নেওয়া।

বিজ্ঞাপন