তাদরীসের খেদমতে নবাগত বন্ধুদের প্রতি কিছু নসিহত

মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম ।।

প্রথমেই  তোমার প্রতি আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। দ্বীনী খেদমতের এ মহান অঙ্গনে তোমাকে জানাই আহলান্ ওয়া সাহলান্ ওয়া মারহাবান্। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের পর কর্মজীবনের জন্য তুমি অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক কাজ বেছে নিয়েছ। তোমার এ বাছাইকরণ মুবারক হোক।

তাদরীসী খেদমত তথা তা‘লীম ও তারবিয়তের মেহনত যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর দ্বারা উদ্দেশ্য দ্বীনী আলেম তৈরি করা। অর্থাৎ এমন ব্যক্তি গঠন, যে কুরআন-সুন্নাহর ইলম আত্মস্থ করবে, এর হেফাজত করবে, ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করবে এবং এর প্রচার-প্রসারে ভূমিকা রাখবে। এর জন্য সে সাহাবায়ে কিরাম, তাবি‘ঈন, আইম্মা-মুজতাহিদীন ও আসলাফ আকাবিরের উলূম অনুসন্ধান করবে এবং তাদের রুচি-অভিরুচি ও বোধ-ভাবনার সাথে পরিচিত হবে। অতপর সেই আলোকে ইলমে ওয়াহ্য়ির রূপ-রসে আপনাকে ভূষিত ও সিঞ্চিত করবে। তখন তার অবস্থান হবে আল্লাহ ও বান্দার মাঝখানে। এই অর্থে যে, আল্লাহর রিযা ও মরযী এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও সন্তুষ্টিলাভের উপায় জানা-বোঝার জন্য মানুষ তাদের শরণাপন্ন হবে।

বিজ্ঞাপন

বোঝাই যাচ্ছে খুব সহজ কাজ নয় এটি। এর প্রাথমিক প্রস্তুতিস্বরূপ তালিবুল ইলমকে একটি নেসাব সমাপ্ত করতে হয়। আমাদের কওমী মাদরাসাসমূহে ‘দরসে নেযামী’ নামে পরিচিত নেসাবের মাধ্যমে আসাতিযায়ে কিরাম এরকম ‘উলামা গড়ার মেহনত করে থাকেন।

বলাবাহুল্য এ নেসাব তৈরি হয়েছে অনেকগুলো ফান্ন (শাস্ত্র)-এর সমন্বয়ে। ‘ইলমের কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছার জন্য এসব ফান্নের প্রত্যেকটিতেই দখল থাকা জরুরি। সেই দখল যাতে এসে যায় সে লক্ষ্যে প্রতিটি ফন্নের একাধিক কিতাব পর্যায়ক্রমে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে‘ একজন উস্তায যে ফান্নের যে কিতাবেরই দরস দান করেন, তিনি মূলত উপরিউক্ত ব্যক্তিগঠনের মেহনত করেন এবং সুযোগ্য আলেম ও নায়েবে রাসূল তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। এই ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে নাহ্ব-সরফের দরসদাতা এবং হাদীস ও উসূলে হাদীসের দরসদাতার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। যিনি রাওযাতুল আদাবের দরস দেন তিনি তো ওই লক্ষ্যেই তা দিয়ে থাকেন, যে লক্ষ্যে একজন মুদাররিস বায়যাবী বোঝানোর সাধনায় মশগুল থাকেন। সুতরাং যিনি বুখারী শরীফের দরস দান করেন, ‘হিদায়াতুন্-নাহবের’ দরসদাতা তারচে’ কিছু ক্ষুদ্র কাজ করেন বলে ভাবার অবকাশ আছে কি? এবং এই ধারণারও কোনও সুযোগ আছে কি যে, তার ছওয়াব তিরমিযী শরীফের মুদাররিস অপেক্ষা কিছু কম হবে? না এরকম ভাবনার বিলকুল সুযোগ নেই। নেসাবভুক্ত যে কোনও কিতাবের দরসদাতা অতি মহতি এক কর্মধারার মহান কর্মী। কাজেই নিজ কাজের মূল্যবোধ তারসহ এই সিলসিলার সাথে যুক্ত প্রত্যেকেরই অন্তরে লালন করা উচিত।

এটা লালন করা উচিত সেই গণিত বা ইংরেজির শিক্ষকেরও, যিনি দ্বীনী মাদরাসায় এসব বিষয়ের পাঠদান করে থাকেন। কারণ এসব বিষয়ের পাঠদান দ্বারা তো তার উদ্দেশ্য এমন কোনও ব্যক্তিগঠন করা নয়, যে কর্মজীবনে অবতীর্ণ হয়ে অর্থ-বিত্তের পেছনে দৌড়-ঝাঁপ করবে। তারও তো উদ্দেশ্য একজন সুযোগ্য আলেম তৈরিতে ভূমিকা রাখা, যে আলেম তার কর্মজীবনে নায়েবে রাসূল হিসেবে তার করণীয় কর্মে আত্মনিবেদিত থাকবে। সুতরাং তিনি কী পড়াচ্ছেন সেটা দেখার বিষয় নয়; কেন পড়াচ্ছেন সেটাই বিবেচ্য। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মহৎ হওয়ার কারণে যে বিষয়েরই পাঠ তিনি দান করুন না কেন, সেই মেহনতও অতি মহৎ বলেই বিবেচিত হবে। কাজেই ইংরেজি বা অংকের বই পড়িয়েও তিনি সেই ছাওয়াবের আশাবাদী আবশ্যই হতে পারেন, যার আশা কোনও উস্তায তাফ্সীর বা হাদীসের কিতাব পড়িয়ে করে থাকেন।

এইসব সকলের জানা কথা। এই জানা কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করছি আমাদের হযরত প্রফেসর হামীদুর রহমান ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম থেকে ‘জানা কথা স্মরণ করিয়ে দাও’-এর শিক্ষা নিয়ে। তিনি কুরআন মাজীদের আয়াত

وَّ ذَكِّرْ فَاِنَّ الذِّكْرٰی تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِیْنَ -এর উল্লেখপূর্বক বলে থাকেন যে, জানা কথাই বারবার বলতে থাক। বারবার স্মরণ করিয়ে দাও। তাতে মুমিনের উপকার হবে।

তো তা‘লীম ও তারবিয়াতের খেদমতে নবাগতদের লক্ষ্য করে এই জানা কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য তাদের অন্তরে আপন কাজের মূল্যবোধ জাগ্রত করা, যাতে বিশেষ কোনও শাস্ত্র ও বিশেষ কোনও কিতাবের প্রতি এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের নজর না যায় যে, ওই শাস্ত্র বা ওই কিতাবের দরস দান করতে পারলে মুদাররিস হিসেবে তার প্রতিষ্ঠালাভ হবে, প্রতিষ্ঠানে তার ‘মাকাম’ তৈরি হবে এবং ‘উলামা সমাজে তার ইজ্জত হবে।

না ভায়া! এ দৃষ্টিকোণ পরিহারযোগ্য। এসব ইজ্জত-মাকামের ধার তো আমাদের ধারার কথা নয়। আমার ছোট মুখে মানায় না জেনেও বলছি‘ এটাও একরকম হুব্বে জাহ্, যা পুতিগন্ধময় দুনিয়ারই একটা  দিক। আমরা তো এর থেকে পবিত্র হতে ও পবিত্র থাকতেই চাই।

আমাদের কথা হবে এই যে, আমরা নেসাবভুক্ত যে কোনও কিতাবের জন্যই প্রস্তুত থাকব, কিন্তু কোনওটি পাওয়ার জন্য লালায়ীত হব না। আমাদের হিম্মত থাকবে পাহাড়ের উচ্চতায়, কিন্তু সংগে নিজ ক্ষুদ্রতার বোধও থাকবে সদাজাগ্রত। সেই বোধের কারণে যে কোনও কিতাবের ব্যাপারেই ভাবব‘ আমি এর উপযুক্ত নই। যে কোনও কিতাবের পাঠদানই অনেক বড় যিম্মাদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ আমানত। আমার মত অযোগ্যের কাঁধে এটি পড়লে খেয়ানতের ভয় আছে। হয়ত আমার দ্বারা এর হক আদায় হবে না। ফলে আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এই বিনয় ও ভীতি বাঞ্ছনীয় যে কোনও কিতাবেরই ব্যাপারে। একদম ইবতিদায়ী থেকে শেষ পর্যন্ত। তারপরও যদি কর্র্তৃপক্ষ আমার কাঁধে কোনও গুরুভার ন্যস্ত করে, তখন আমি হিম্মতের পরিচয় দেব এবং আল্লাহর দিকে রুজু করব।

প্রিয় হে! তুমি যখন এই পবিত্র অংগনে যোগদান করেছ, তখন স্বীকার করতেই হবে এক পর্যায়ের প্রস্তুতি তোমার আছেই। সুতরাং যে কিতাবই তোমার দায়িত্বে আসুক ঘাবড়ানোর কোনও কারণ নেই। ওই প্রস্তুতির বুনিয়াদে যদি তোমার পরবর্তী শ্রম স্থাপিত করতে পার এবং হিম্মতের সাথে আল্লাহর উপর ভরসা করে চলতে থাক, তবে ইনশাআল্লাহ তোমার সচলতা অব্যাহত থাকবেই। কিন্তু সাবধান! কোনও কিতাবই চেয়ে নিতে যেয়ো না। চেয়ে নেওয়া তো নয়ই; বরং লালায়ীত থাকাও সমীচীন নয়। কেননা তা মেহনতের বরকত ও কল্যাণ নষ্ট করে এবং নিজ ব্যক্তিগঠন ব্যাহত করে। তা করে এজন্য যে, এরূপ ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য থাকে না। আর আল্লাহর সাহায্যবিহীন মেহনত সুফলদায়ী হয় কী করে?

মনে এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয় যে, আমাকে উপযুক্ত কিতাব দেওয়া হল না; এটা আমার প্রতি অন্যায় আচরণ। এটা ভিন্ন কথা যে, কর্তৃপক্ষ প্রত্যেককে তার যথোপযুক্ত মর্যাদা দেবে। أَنْزِلُوا النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ (প্রত্যেককে তার আপন জায়গাটিতে স্থান দাও) তো দ্বীনেরই শিক্ষা। সে অনুযায়ী কোন উসতায কোন কিতাবের উপযুক্ত, কার দ্বারা তলাবার কেমন ফায়দা হবে বা কার দ্বারা তারা কোন্ বিষয়ে বেশি উপকৃত হতে পারে, কর্তৃপক্ষের তা অবশ্যই বিবেচনায় রাখা উচিত। সেইসংগে এটাও তাদের কর্তব্য যে, প্রত্যেক উসতাযকে তার সম্ভাবনা অনুযায়ী তারা এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং তাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলবে। বস্তুত উপযুক্ততা বা যোগ্যতার প্রশ্ন কর্তৃপক্ষের নিজের ভেতরও থাকে বৈকি! গুণগ্রহিতা এবং প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারা কর্তৃপক্ষের উপযুক্ততার পরিচয় বহন করে। কিন্তু সর্বাবস্থায়ই এটা কর্তৃপক্ষেরই ব্যাপার। এতে ত্রুটি করলে সেজন্য তারা দায়ী থাকবে। তাদের দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে তাদের নিজেদেরই আল্লাহর দরাবারে জবাবদিহি করতে হবে। আমাকে সে সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করা হবে না। আমাকে তো জিজ্ঞেস করা হবে আমার দায়িত্ব সম্পর্কে। কাজেই আমাকে উপযুক্ত কিতাব দেওয়া হল না‘ এই ভাবনা না ভেবে, যা দেওয়া হয়েছে, আমি তার কতটুকু যোগ্য এবং আমার দ্বারা এ দায়িত্ব সুচারুরূপে কীভাবে আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব সেই চিন্তা করাই শ্রেয়।

নিশ্চিত করেই বলা যায় এই চিন্তার সাথে কাজ করতে থাকলে একদিন না একদিন যার দ্বারা মাকাম নির্মিত হয় বলে আমি ধরে রেখেছি সেসব কিতাবও আমার দায়িত্বে চলে আসবে। সেই আসাটা হবে মর্যাদার সাথে। কারণ যোগ্যকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। ব্যক্তি যখন আপন দায়িত্ব পালনে আন্তরিক থাকে, তখন পর্যায়ক্রমে তার যোগ্যতার উৎকর্ষসাধন হতে থাকে এবং একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একজন সুযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সে সকলের স্বীকৃত ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। তখন কথিত বড় কিতাব ও বড় পদ তুমি নিতে চাবে না, কিন্তু বড় কিতাব আপনিই তোমার ‘সারেতাজ’ হবে এবং বড় পদ তোমার পদচুম্বন করবে।

নাই বা পেলে বড় পদ কিংবা সারা জীবনেও কথিত বড় কোন কিতাব তোমার নাই বা পড়ানো হল। তাতে কি তোমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা কি বড় পদ ও বড় কিতাব পড়ানো না পড়ানোর মধ্যে নিহিত। যার জীবনের যতটুকু সময় আল্লাহর কাজে নিবেদিত হবে এবং যার যতটুকু শ্রম আখিরাতের সঞ্চায়র্জনে নিয়োজিত থাকবে তার জীবন ততটুকু সফল। সেই সফলতা জীবনভর ইবতিদায়ী মুদাররিস হিসেবে কর্মরত থেকেও অর্জিত হতে পারে আবার মানবজীবন ব্যর্থও হয়ে যেতে পারে সারাজীবন হাদীস-ফিকহের পাঠদানে ব্যাপৃত থেকেও। ভুলে যাওয়া উচিত নয় এ হাদীস‘

إن الله ليؤيِّدُ هذا الدِّينَ بالرّجُلِ الفاجرِ

‘আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনের কাজ পাপীষ্ঠকে দিয়েও নিয়ে থাকেন।’ এটা আল্লাহর ‘শানে ইস্তিগ্না’-এর ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা ওই পরিণতি থেকে আমাদের রক্ষা করুন।

তো সময় ও শ্রমের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না সেটাই মূল বিবেচ্য। বিশেষ কিতাবের দরসদানকে মনযিলে মকসূদ বানালেই যে সময় ও শ্রমের যথোচিৎ ব্যবহার হবে এ ধারণা ভুল। বরং এরূপ ধারণা চিন্তার সংকীর্ণতা প্রমাণ করে। ব্যক্তিগঠনের এ অংগনে দরস তো একটা উপলক্ষ্য মাত্র। এর ভেতর দিয়ে উসতায-শাগরিদের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং সেই সম্পর্কের মাধ্যমে শাগরিদের মানস গঠনে উস্তায যে ভূমিকা রাখেন সেটাই আসল জিনিস। যে উস্তায ওই কাজ যতখানি করতে পারবেন তিনিই ততটা কীর্তিবান। ওই ভূমিকা রাখার জন্যও নিজস্ব প্রস্তুতির দরকার আছে। সেদিকে নজর না দিয়ে কেবল কথিত বড় কিতাবের ধান্দায় থাকা আমাদের এ অংগনের পক্ষে কিছু মানানসই নয়। আমাদের আকাবির ও আসলাফের মধ্যে মানুষ গড়ার এমন অনেক কীর্তিবান কারিগরের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা জীবনে কখনও কথিত বড় বড় কিতাবের দরস দেননি। চোখ খুলে তাকালে সে রকম পরশপাথর ‘ব্যক্তিত্বের আকাল’-এর এ যুগেও কি দেখতে পাওয়া যায় না?

বলা যেতে পারে এটা বিশেষ যোগ্যতার ব্যাপার। সে রকম যোগ্যতা তো সকলের হয় না। কিন্তু ভায়া, আমি বলব চেষ্টা ও সাধনা থাকলে কিঞ্চিতও কি হতে পারে না। সার পদার্থ কিছুটাও যদি অর্জন সম্ভব হয়, তবে সেই খানিকটা উপেক্ষা করে কেবল খোলস নিয়ে তৃপ্ত থাকব কেন?

তারপরও কথা থেকে যায়। মানস গঠনের ওই সূক্ষ্মতার দিকে না-ই গেলাম। বাহ্য কাঠামো নির্মাণের জন্য যেই নেসাব পড়ানো হয়ে থাকে এর কোনও অংশই তো অবজ্ঞেয় নয়। পূর্বেই বলা হয়েছে, অভিন্ন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কারণে তার ‘আলিফ’ থেকে ‘ইয়া’ পর্যন্ত সবটাই সমান মূল্যবান। তার বিশেষ কোনওটাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর দ্বারা অন্যগুলোর অবমূল্যায়ন হয় বৈ কি! তাই বলব, বড় কিতাব ও ছোট কিতাবের তমীয দ্বারা দৃষ্টির তমীযবোধ ক্ষুণ্ন করে ফেল না; বরং যিম্মায় যখন যে কিতাব ও যে দায়িত্ব আসে তাকে গনীমত মনে করো। ইনশাআল্লাহ সা‘আদাত তোমার ললাট চুম্বন করবে।

যুক্তি দাঁড়াতে পারে, মুতালাআরও তো একটা ব্যাপার আছে। যত বেশি মি‘য়ারী বা উপরের কিতাব পড়ানোর দায়িত্ব আসবে, তত বেশি পড়াশুনা করা হবে। ফলে ‘ইলমী তরক্কী’ হবে। কথাটা একদম ফেলনা নয়। কিন্তু সেইসংগে বিষয়টা খুব প্রশংসনীয়ও নয়।

কিতাব পড়ানোর চাপে মুতালাআ হয় বটে, কিন্তু একজন ‘আলেমের দৃষ্টি কি এই মুতালাআর গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারে, না তা থাকা উচিত। যুগ যে ‘আলেমকে চায় এবং নায়েবে রাসূল হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য একজন আলেমের যেমন হওয়া দরকার, তা কি এই সীমিত পাঠাভ্যাস দ্বারা পূরণ হওয়া সম্ভব। তাছাড়া কৌতূহলের তো একটা ব্যাপার আছে। কৌতূহল বা অজানাকে জানার উৎসাহ একজন আলেমের মজ্জাগত গুণ হওয়ার কথা। সেই গুণের অধিকারী ব্যক্তি তো এটা ভাবতেই পারে না যে, তার পড়াশুনা কেবল দরসের চাপ থাকলেই হবে, অন্যথায় নয়। ইলম ও হিকমত মুমিনমাত্রেরই হারানো সম্পদ। সে সতত খুঁজে বেড়াবে কোথায় কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায়। আর আলেম, যে কি না ব্যক্তিগঠনের কারিগরও, সে তো এর সন্ধানে থাকবে পাগলপারা। চাপ থাকলে মুতালাআ হবে, নয়ত নয়‘ এ জাতীয় ধারণা তার পক্ষে মানহানিকর। তার পাঠাভ্যাস হবে স্বতঃস্ফূর্ত। মুতালাআর সাথে তার সম্পর্ক হবে ‘তুমি আছ, আমি আছি’-এর মত। তার যিম্মায় কোন কিতাব আছে সেটা কোনও বিষয় নয়। কি কি তার পড়া হয়নি, কোন কোন বিষয় এখনও পর্যন্ত তার আয়ত্তে আসেনি, সেই দিক সে নজর দেবে আর একের পর এক ইলমের গ্রন্থিমোচন করতে থাকবে। এ তার এক যতিহীন অভিযাত্রা, যার শেষ মানযিল বলতে কিছু নেই।

হাঁ নবীন বন্ধু, তুমি এভাবেই চলতে থাক। ‘বিশেষ’ কিছুতে তুমি আটকা পড়ে যেও না। তোমার দৃষ্টি ও চিন্তাকেও গণ্ডিবদ্ধ করে ফেল না। তোমার তাদরীসী খেদমত অতি বড় মহিমার ধারক। সেই মহিমাকে কোনও ক্ষুদ্রতা দ্বারা ক্ষুণ্ন হতে দিয়ো না। ইনশাআল্লাহ দ্বীন দুনিয়ায় তুমি সকলের মধ্যমনি হয়ে থাকবে। যা কখনও তোমার তাদরীসভুক্ত হয়নি, সে বিষয়েও তুমি অন্যের রুজুস্থল হয়ে যাবে। আল্লাহ তোমার সহায় হোন, তিনিই তাওফীকদাতা।

বিজ্ঞাপন