নাজমুল হুদা ।।
আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ। যে ঘরের প্রতি রয়েছে একজন মুমীনের সহজাত টান। যার পরশে এসে নিজেকে বড় শুভ্র-পবিত্র ও নিষ্পাপ মনে করেন একজন মুমীন। ঈমানের বলে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে মানবের পথচারণা ও সমাগম যুগ যুগ ধরে বহমান ঈমানস্নিগ্ধ এ আঙিনায়। কখনো একাকী, কখনোবা কাফেলা বেঁধে এই পথ-পরিক্রমায় আল্লাহ প্রেমিকের আগমণ হয় শুভ্র পোষাকে, স্বচ্ছমনে। ঈমানের এ আভায় এসে একজন মুমীন নিজেকে সত্যপন্থী হিসেবে আবির্ভূত করবেন। নূরাণী পরিবেশে এসে একজন নিজেকে আলোকিত করবেন, থাকে এসব সুপ্ত বাসনা ও কামনা।
অন্যদের মতো জীবনে প্রথম পাওয়া রমজান আমার জন্য ছিলো ভিন্নরকম অনুভব-অনুভূতি এবং অন্যরকম তৃপ্তি ও প্রাপ্তি। ইলম অন্বেষণে পবিত্র এই শহরটিতে এসে এ নিয়ে মোট পাঁচ পাঁচটি রমজান পাবার সৌভাগ্য হলো। বিগত সময়ে সেমিস্টার পরীক্ষা শেষে বাৎসরিক গ্রীষ্মের ছুটিটা রোজা দিয়েই শুরু হতো। পরীক্ষা পরবর্তী লম্বা বন্ধে রমজানের বড় একটি সময় হাতে রেখে দেশে যাবার টিকিট নিতাম। কিন্তু এবারের রমজানের রূপ-চিত্র পুরোই দুঃখ ও বেদনার। সুখানন্দের সেই স্মৃতিগুলো আজ এই সময়ে ভেতরে ক্ষণে ক্ষণে যাতনা সৃষ্টি করছে।
হারামের সুবাতাস। আলী তানতাবী রহ. যাকে বলেছেন ‘নাফাহাতুল হারাম’। রমজানের সে মধুর দিনগুলোর কথা স্মৃতিচারণে যেমন আনন্দ থাকে আবার সেসবের শূন্যতা ও অনুপস্থিতি আজ ভেতরে বড্ড পীড়া দেয়। বাইতুল্লাহর চৌহদ্দির সেই ইফতার-তারাবীহ এবং এসবে নিজেদের উপস্থিতিকে নিজেদের জন্য বড় পাওয়া যে কেউ-ই মনে করেন। কিন্তু হায়! এসবের বিচ্ছেদ বেদনায় দগ্ধ আজ সবার হৃদয়। যেখানে রহমতের ঝর্ণা বয়, আসমানী করুণার শিশির ঝরে। রমজানের সময়টায় কী যে অপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা হয়! প্রত্যক্ষদর্শী মাত্রই জানেন। কালো গিলাফের দিকে চেয়ে চোখ জুড়ানো, যমযম চুমুকে ভেতরটা শীতল না করার যাতনা এই ঘরের প্রেমিক ও প্রতিবেশী উভয়েই বয়ে বেড়ান।
আরো পড়ুন: প্রিয়তমের প্রেম-নগরী মক্কা
রোজাদারের জন্য ইফতারের একটি আনন্দতো আল্লাহ তাআ’লা তাঁর বান্দাহকে দুনিয়াতেই দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর পবিত্র ঘরের ছায়ায় বসে, কত শত নেককারদের সাথে উপবিষ্ট হয়ে কালো গিলাফে আবৃত কাবা ঘরকে দেখে সেই অন্যরকম ইফতার গ্রহণ সত্যিই ভেতরটায় ভিন্ন এক পুলক তৈরি করে। বিশেষ করে ইফতারের আগে বাইতুল্লাহর স্বচ্ছ আকাশ থেকে ঝিরঝির করে ঝরে অন্যরকম এক আশ্বাস ও সান্ত্বনা। হজরত আয়েশা রাজি. এর ভাষায় মক্কার আকাশ সত্যিই যেন খুব নিকটে লাগে। ইফতারের আগে দরবারে এলাহীতে দু হাত পেতে দেবার দৃশ্য কতো যে মধুর ও তৃপ্তির এবং দয়াবানের কতো নিকটে যাবার মাধ্যম। এ বছর যা হারিয়েই গেল। নিজের ঘরের হরেক রকমের ইফতার ফেলে আল্লাহর ঘরের পবিত্র ছায়ায় বসে ইফতারের সুখ উপভোগ একদিকে যেমন ত্যাগের পরিচয় দেয়, অপরদিকে প্রত্যহ আল্লাহর ঘরের মেহমান হবার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আসরের পর হতে ইফতার প্রস্তুতি শুরু হয়। বিছানো দস্তরখানে খেজুর আর যমযমের চেয়ে আরো উত্তম উপকরণ কীইবা থাকতে পারে! সেই গুনগুন শব্দের তেলাওয়াত, তাওয়াফেই ইফতার গ্রহণ, যমযম পানের সেই দৃশ্য কাকেই-বা পুলকিত না করে। নানা আমলে নিজেকে রঙিন করে তুলতে আগতদের আগ্রহের কোন কমতি থাকে না। বিশেষ করে বাইতুল্লাহর সর্বোচ্চ আমল তাওয়াফে প্রচুর ভিড় থাকে।
আরো পড়ুন: রমযানের শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটানো উচিত
আসরের পর সে দৃশ্যটা একদম পাল্টে যায়। রোজামুখে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণের সেই স্বাদ উপভোগ্যরাই লাভ করে। বিন্যস্ত ও গোছালো এই আয়োজন সারতে পরিসেবায় নিয়োজিতদের থাকতে হয় বাড়তি সতর্কতায়। সেই সময় সবার মাঝে যেন আত্মত্যাগ ও বিসর্জনের এক অপূর্ব সম্মিলনের চিত্র ফুটে ওঠে। বিতরণ করতে পেরে সবার চোখেমুখে থাকে অপার্থিব খুশির ঝিলিক। সবাই যেন হৃদয়জাত ভালোবাসা বিতরণ করছে। বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই যেন হৃদয়ে প্রশান্তির শুভ্রতা ছড়িয়ে পড়ে। দিন যতো যেত, ততোই আল্লাহমুখী বান্দাদের ভিড় বৃদ্ধি পেতো। তারাবীহতে জায়গা মেলা কষ্টকর হতো। মাঝে মাঝে ইফতার নিজেদের ছাত্রাবাসে সেরে তারাবীহতে অংশগ্রহণ করতে রওয়ানা হতাম বাইতুল্লায়। বৃহৎ এ জামাতে অংশগ্রহণ ও হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ইমামের সুললিত কন্ঠ ও হৃদয়গ্রাহী তেলাওয়াত শ্রবণে মুসল্লীদের উপচেপড়া ভিড়ের সে আয়োজন এবার শূন্যতায় ভরা।ইহরাম বেঁধে ইফতার ও তারাবীহ সম্পাদন, এখানে ওখানে খেজুর বিতরণ, যমযম তুলে দেবার সেই সুখকর দৃশ্য এ বছর স্মৃতির ডায়রীতে আটকে গেল।
আরো পড়ুন: হযরতপুরে প্রশান্তিময় ইতেকাফের দিন-রাত
বিতরের নামাজে পাঠ্য কুনুতের বৈচিত্রময় দোয়া এবং ২৯ এর রাতে কোরআন খতমে শরীক হওয়া ও শাইখ সুদাইসের সে হৃদয়গ্রাহী দোয়াতে মুসল্লীদের বাঁধভাঙা জোয়ার বইবে না। কান্না ও অশ্রুর কোন দৃশ্য এবার দেখা যাবে না। মানুষের ভাবনার বাইরে, কল্পনার আড়ালে কতো কিছু হতে পারে, কতো ঘটনা জন্মাতে পারে; তার একটা আশ্চর্য নজির বর্তমান করোনাময় পৃথিবী দেখিয়ে দিলো। কাবা বাইতুল্লাহর আকস্মিক এই চিত্ররূপে প্রতিটি মুমীনের হৃদয় মর্মাহত। দোয়া করি, এই শূন্যতার অবসান ঘটে দ্রুত যেন ফিরে পায় চিরচেনা রূপ।
লেখক : শিক্ষার্থী, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মোকাররমা
















