রমযান তো চলে গেলো, কী রয়ে গেলো তবে!

ড. আহমদ হাসান যাইয়াত ।।

মহিমান্বিত মাস রমযানের আর কিছু সময় বাকী। রমযান বরকতের মাস। যেটুকু সময় এখনও রয়ে গেছে পরিপূর্ণভাবে তার কদর তরা উচিৎ।

বিজ্ঞাপন

পরকথা হলো-

প্রকৃতির বসন্ত যেমন ফুরিয়ে যায়, অন্তরের বসন্তও ( রমযান) তেমনি ফুরিয়ে গেছে। বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে যেমন উর্বরতা এবং সজিবতা দেখা দেয়, মানুষ আনন্দ ভ্রমণে বের হয়, তেমনি রমযানের আগমনেও মানুষের অন্তর প্রশান্ত এবং উৎফুল্ল হয়ে উঠে। তাই রমযান মাস মুমিনের অন্তরের বসন্তকাল। রমযানে মু’মিনেরা তাকওয়ার সরোবরে অবগাহন করে। ফলে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ এবং কালিমামুক্ত হয়ে যায়।

রোযা পালনে যদিও বাহ্যিক কষ্ট নিহিত। কিন্তু প্রকৃত অর্থে অধিকাংশ মুমিনের জীবনে রমযানের প্রতিটা দিনই ঈদের মতো। যে সময়ে তারা খানা পিনা, জৈবিক চাহিদা পূরণ, যাবতীয় অহেতুক কাজ এবং অনাচার থেকে বিরত থেকে আল্লাহর হুকুম পালনের স্বাদ আস্বাদন করে। অতপর রমযান যখন শেষ হয়ে যায়, তারা যেন সবুজ উপাত্যকা থেকে লু হাওয়ার মরুতে নিপতিত হয়। যে শান্তি এবং নিরাপত্তা, হেদায়েত এবং আলো রমযানে মুমিনরা লাভ করেছিল তা যেন সহসাই হারিয়ে ফেলে।

 

এজন্য রমযানের পরিসমাপ্তিতে স্তরভেদে মুমিনদের নানারকম অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।

আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত যারা এবং যাদের অন্তরে গোনাহের আঁচ লাগেনি, রমযানের বিদায়ে তাদের চেহারায় চিন্তার চাপ দেখা যায়। হায়, বরকতের সময় যে ফুরিয়ে গেলো। কল্যাণের বৃষ্টি যে থেমে গেলো। বসন্তের পর যমিনে যেমন অনুর্বরতা দেখা দেয়, আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত এসব বান্দারা তেমনি অনুর্বরতার আশঙ্কায় চিন্তিত থাকে। অতপর যখন আবার রমযান আসে, ঘরে ঘরে মানুষ রোযা রাখে, মসজিদ মুসল্লিতে ভরে যায় তাদের সকল দুশ্চিন্তা কেটে যায়। আবারও প্রফুল্ল হয়ে উঠে নৈকট্যপ্রাপ্ত আল্লাহর এসব বান্দাদের অন্তর।

আরো পড়ুন: হযরতপুরে প্রশান্তিময় ইতেকাফের দিন-রাত

অলস এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী আরেক শ্রেণি আছে-রমযানকে যারা বন্দিকালীন সময় মনে করে। রমযানের বিদায়ে তারা জেলমুক্তির আনন্দে মেতে ওঠে। এসব দুর্বলপ্রাণ নির্বোধদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কী জানানো যেতে পারে! এরা রমযান মাস পাওয়ার উপযুক্ত নয়। এদের নিয়ে কথা বলাও অনর্থক।

রমযানের বিদায়ে যারা কষ্ট অনুভব করেন, নিষ্ঠার সাথে যারা বারবার রমযানের প্রত্যাবর্তন কামনা করেন, তাদের বলা যায়, রমযানে রোযার কঠিন বিধান পালনের পর আপনারা কি অন্তরের পবিত্রতা এবং প্রফুল্লতা আন্দায করতে পারছেন? আপনারা কি এটা বুঝতে পারছেন যে, আল্লাহর সাথে আপনাদের একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈয়ার হয়েছে? যদি হ্যাঁ বাচক উত্তর আসে তাহলে আমি বলব, তবে আবার চিন্তা কিসের? রমযানের বিদায়ে কেনইবা আফসোস আপনাদের? বছরের প্রতিটি মাসকেই তো আপনারা রমযান মনে করতে পারেন।

রমযানে রোযা রাখার মাধ্যমে যেমন, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়, অনাচার, পাপাচার, ধোঁকা, হারাম উপার্জন থেকে যেমন সতর্কতার সাথে বিরত থাকা হয়-রমযান পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী আমল করতে কিসের বাঁধা? একমাসের অনুশীলন কাজে লাগিয়ে সারা বছর সে মোতাবেক চলার যোগ্যতা অর্জনের নিমিত্তেই তো রমযানের এই বিশেষ মাহাত্ম ও তাৎপর্য।

আরো পড়ুন: বাইতুল্লাহর স্নিগ্ধ ছায়ায় কাটানো রমজান-স্মৃতি

এই যেমন ধরুন, মদে মাতাল ব্যক্তি। রমযানের ত্রিশ দিন সে মদ থেকে দূরে থাকে। ফলে তার অন্তর পবিত্র হয়ে উঠে এবং দেহ সুস্থ থাকে। পকেটের টাকাও বেঁচে যায়। তাহলে সে কেন সারা বছর এই আমল জারি রাখতে পারবে না? অথচ সে বুঝতে পারে যে, এতেই তার দৈহিক শান্তি এবং আত্মিক মুক্তি। মদপান ছেড়ে দেওয়াতে তার উপকারই উপকার।

আরও ধরুন, ধুমপায়ী ব্যক্তি। রমযানে দিনের বেলা সে ধুমপান থেকে বিরত থাকে। সর্বদিক থেকেই এতে তার লাভ বৈ ক্ষতি নেই কোনো। উপরন্তু এতে তার শরীর স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। তাহলে সে তো সারাবছরের জন্য এই নেশা ছেড়ে দিলেই পারে!

ব্যবসায়ী। যে রমযান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যে ছাড় দেয়। ওজনে কমবেশ করে না। আল্লাহর ভয়ে এবং সন্তুষ্টি লাভের আশায় রমযানে সে ক্রেতাদের সে ঠকায় না, পণ্য গোদামজাত করে না, গরিব অসহায়দের বেশি বেশি দান করে- তাহলে কেন সে সারাবছর এমন আমল জারি রাখতে পারে না! এতে তো তার ব্যবসায় লাভও হবে, বরকতও দেখা দিবে।

চাকুরে বা পেশাজীবী। রমযানে যে সময় বের করে করে ইবাদত, তিলাওয়াত করে, কিংবা বিত্তশালী ব্যক্তি রমযানে কিছু সময় অভূক্ত থাকার দরুন যে গরিবের কষ্ট বুঝতে পারে, ফলে রমযানে সে তার দানের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়- প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে আমলগুলো জারি রাখলেই তো সারা বছরই রমযানময় পরিবেশ বিরাজ করে। তাহলে আর রমযানের বিদায়ে আফসোস করারও প্রয়োজন পড়ে না।

আসলে সারা বছরই রমযান। অনুশীলনটাকে ধাতস্ত করার জন্য একটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির বসন্তকালে আনন্দভ্রমণ করে যেমন সারাবছর পূর্ণ উদ্যমতার সাথে কাজ করার শক্তি অর্জন করা হয়, রমযানেও তেমনি সারাবছর সৎপথে চলার জন্য রূহ এবং অন্তরের খাদ্য সঞ্চয় করা হয়।

রমযানময় পরিবেশ যখন সারাবছর বিরাজ করবে, তখন শাওয়ালে একমাসের রোযার বিধানের সমাপ্তিতে আনন্দই হবে। এবং এটা হওয়া উচিতও। ঈদের দিনে আনন্দিত হওয়াও ইবাদত। কেননা এই আনন্দের ঘোষণা তো ওহির মাধ্যমে এসেছে।

অনুবাদ: ওলিউর রহমান ।।

বিজ্ঞাপন