হযরতপুরে প্রশান্তিময় ইতেকাফের দিন-রাত

শরীফ মুহাম্মদ।।

তিনি আরো ২/১ বছর আগে থেকেই সেই নিভৃত গ্রামে দু- একজনকে সঙ্গে নিয়ে ইতেকাফ করেন। সেবার রমজানের বেশ কয়েকদিন আগে তার সঙ্গে মশওয়ারা করলাম, অনুমতি চাইলাম। মোহাব্বতের সঙ্গে উৎসাহমূলক ভাষায় অনুমোদন দিলেন। তিনি হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক ছাহেব।

বিজ্ঞাপন

সম্ভবত ২০১১-এর রমজানের কথা বলছি। অনুমান ভুল হলে এক বছর আগে অথবা এক বছর পর হবে।

মারকাযুদ দাওয়াহর হযরতপুর এমনিতেই শান্ত গ্রাম, তখন ছিল আরো গ্রাম। চারপাশে বাড়িঘর খুব কম, সবুজ মাঠ, জায়গায় জায়গায় ঘন বনের মতো গাছপালা, ঝোপঝাড়। সবদিকে চলাচলের সহজগম্য পথও ছিল না।

২০ রমজান আছর পড়লাম হযরতপুর মারকাযুদ দাওয়াহর মসজিদে। ইফতারের দস্তরখানে লক্ষ করলাম, হযরত মাওলানার সঙ্গে ১২/১৫ জনের মতো এবার ইতেকাফে বসছেন। এরপর সেই দশদিন।…

বয়স কত হবে তাঁর? এখনো বায়ান্নর বেশি নয়। এই বয়সে ইলমে হাদিস এবং উলুমে ইসলামিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, উপমহাদেশ, আর বললে ভুল হবে না, পৃথিবীজুড়ে ইলমি অঙ্গনের একটি আদৃত নাম মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক। এই মানুষটির সঙ্গে ইতেকাফের দশটি দিন এবং দশটি রাত আমাদের কীভাবে কেটেছে, তার যথাযথ চিত্রায়ন এখানে কঠিন, কিছু আমার যোগ্যতার ঘাটতির কারণে, কিছু মুছে যাওয়া স্মৃতির কারণেও। তারপরও কয়েকটি কথা।

প্রথম রাতেই এশার আগে কিংবা পরপর ছোট্ট একটি মশওয়ারা করলেন। সেই মশওয়ারায় প্রতিদিনের তারাবিতে কতটুকু তেলাওয়াত হলে ভালো হয় ( মানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিরও আরাম হয়), এশার নামাজ কখন দাঁড়াবে, তারাবির মাঝে বিভিন্ন সময়ে চা-পান, হাজত পূরণ (প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা) ইত্যাদির জন্য কিছু কিছু বিরতি এবং অহেতুক গল্প ও উঁচু আওয়াজ না করা আর ঘুম ও আমলের সময় নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তগুলো তিনি স্মিত হাসি মুখে নিয়ে এমনভাবে ব্যক্ত করেন, যেন সবার মাথায় হালকা হাত বুলিয়ে দিলেন।

রাতে তারাবির পর প্রায় দিনই হৃদয় নিসৃত কিছু আলোচনা তিনি পেশ করেন। কখনো তারাবিতে পড়া আয়াতে কারিমাকে কেন্দ্র করে, কখনো একটি জিজ্ঞাসিত মাসআলাকে কেন্দ্র করে, কখনো আম মানুষের সঙ্গে জড়িত কোনো ইলমি বিষয়কে কেন্দ্র করে এবং কখনো ইলমি অঙ্গনে আলোচিত অথবা আধা বিতর্কিত কোনো বিষয়ের মীমাংসা নিয়ে, আলাপের মতো করে করে গভীর কথাগুলো বলেন।

এরপর হতো চোখের পানিতে মালামাল হওয়া দোয়া- মোনাজাত। সে এক অন্য কাইফিয়াত। একদিন কোনো এক বা একাধিক দেশে মুসলমানদের দুর্দশা ও কষ্টের কথা উঠলো‌। মার খাওয়া ও নির্যাতিত হওয়ার প্রসঙ্গ এলো। দোয়ায় হাত উঠিয়ে আল্লাহর এই বান্দা এত পাগল করা ভাষায় ঝারঝার হয়ে কাঁদতে থাকলেন যেন বুকটা ফেটেই যাবে।

দোয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় টুকরো টুকরো অনেক হেকমতের কথা তিনি বলেন।  দোয়ায় সব মুসলমানকে শরিক করা।  খাসভাবে নাম মনে না থাকলে অথবা উচ্চারণ না করলে কোনো সমস্যা নেই, সকল মুসলমানকে শরিক করে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা সবার জন্যই সেটা কবুল করবেন।  দোয়া বা মুনাজাতের কোনো এক্তেদা নাই। একসঙ্গে (ইজতিমায়ী) দোয়া হতে থাকলে সাচ্ছন্দ অনুযায়ী যে কেউ নিজের দোয়া সমাপ্ত করে দিতে পারেন। জরুরত থাকলে নিজস্ব দোয়া শেষ করে চলে যেতে পারেন। একসঙ্গে দোয়া শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।  অমনোযোগী বা উদাস অবস্থায় দীর্ঘ সময় দোয়া করার চেয়ে অল্প সময় পূর্ণ মনোযোগ ও আল্লাহর প্রতি মুতাওয়াজ্জেহ হয়ে দোয়া করা বেশি ভালো। যখন তিনি মারকাযুদ্দাওয়ার জন্য দোয়া করেন, সঙ্গে সঙ্গেই সকল দ্বীনি মাদ্রাসা, দ্বীনী মারকাজ, সহী দীনি সকল মেহনতের জন্য দোয়া করেন। এ বৈশিষ্ট্যটি প্রায় অবধারিত, দেখেছি।

কঠোরতার পরিবর্তে এক ধরনের আরাম, আন্তরিক পরিবেশ ও আপন আপন অনুভূতি জাগ্রত থাকতো পুরো ইতেকাফে। জোহরের নামাজের পর কিছু তালিম এবং আলোচনা হতো। এছাড়া বাকি সময় ব্যক্তিগত আমল, তেলাওয়াত, নামাজ ও ব্যক্তিগত বিশ্রাম। হঠাৎ হঠাৎ বড় বড় শায়খদের জীবনের গল্প, ইলমি ও আমলি কিছু স্মৃতি এবং নিজেদের মধ্যে নির্মল হাসি আনন্দ-বেদনার স্মৃতিও উঠে আসতো কখনো কখনো। আলোচনার মধ্যেই কেউ কেউ ছোট ছোট প্রশ্ন করতেন, তিনি সেসব প্রশ্নের সুন্দর করে উত্তর দিতেন। যেন এক ঘরোয়া ইতেকাফ।

মারকাযুদ দাওয়াহর টিনের মসজিদটির মেঝে তখন ছিল মাটি। উপরে চাটাই বিছানো। মাঝে মাঝে পিপঁড়ার উৎপাত হতো। হঠাৎ হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে যাওয়া কেঁচো চোখে পড়তো। সবাই হাসিমুখে যার যার পরিস্থিতি সামলে নিতেন। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চলে যেত। মাঝেমাঝে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতো। গরম আর বৃষ্টির শব্দের মধ্যে এক অদ্ভুত গ্রামীণ, পুণ্যময় সুখী সময় কাটতো।

আরো পড়ুন: করোনায় রমযান: তারাবীতে তিলাওয়াতের সুরে গুঞ্জরিত মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মহল্লা

জানালা দিয়ে বাইরে চোখ পড়লে কিংবা মসজিদের বারান্দায় এসে দাঁড়ালে দূর থেকে বহুদূর পর্যন্ত শুধু সবুজ ধানক্ষেত চোখে পড়তো। তখনকার কথা বলছি। একবার দৃশ্যের সৌন্দর্য নিয়ে তার সঙ্গে কথা বললাম। তিনি অদ্ভুত কয়েকটি শব্দ বললেন: ‘মাসনু’র চেয়ে মাখলুকের সৌন্দর্য অনেক বেশি’। অর্থাৎ মানুষের নির্মাণ করা জিনিসের চেয়ে আল্লাহ তাআলার সরাসরি সৃষ্টি করা জিনিসের সৌন্দর্য অনেক বেশি। ( স্মৃতি থেকে শব্দগুলো উদ্ধৃত করেছি। আমার উদ্ধৃতিতে শব্দগত ভুলও হতে পারে।)

প্রজ্ঞাবান আলেমের চোখ ও চিন্তা হয় অনেক গভীর। একটি ছোট্ট দৃশ্যের কথা এখানে বলবো। তারাবির পর আলোচনা শেষে দোয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ সময়টাতে সাধারণত বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়। হঠাৎ দোয়ার আগে তিনি বললেন, আবার লাইট জ্বালান। ‘আচ্ছা বলুন তো, দোয়ার আগে এভাবে মসজিদে লাইট কেন নিভিয়ে দেওয়া হয়?’ একেক জন একেক রকম উত্তর দিচ্ছেন। প্রধান উত্তর এটাই ছিল, দোয়ার পরিবেশে কান্নাকাটির সময় লাইট নেভানো থাকলে ভালো লাগে। তিনি বললেন, এই কথাটা মনে রাখতে হবে। দোয়ার আগে এভাবে লাইট নেভানো যে কোনো আলাদা আমল নয়, এর যে কোনো আলাদা ফজিলত নেই, এটা যেন কেউ ভুলে না যাই। বরং এটা নিছক পরিবেশ তৈরীর একটি এন্তেজাম, কেউ চাইলে করতে পারেন, না চাইলে না করতে পারেন। দোয়া কবুল হওয়া, দোয়া কবুলের সহযোগী হওয়া, এর সঙ্গে এই লাইট নেভানোর কোনো সম্পর্ক নেই।

আরো পড়ুন: রমযানের বাকী সময়টুকু গনিমত মনে করে ইবাদতে কাটান: মুফতি তাকী উসমানী

আমি অবাক হয়ে গেলাম। কত সাধারণ একটি বিষয়, আবার কত সূক্ষ্ম । বিষয়টিকে ছোট্ট বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদআত বিস্তারের ক্ষেত্রে এজাতীয় অসতর্কতা বড় ভূমিকা রেখেছে। খোঁজ নিলে এমন অনেক ব্যাপার পাওয়া যাবে।

অনেক স্মৃতি, অনেক উপলব্ধির পাঠ সেখানে ছিল। স্মৃতির খাতা থেকে টুকে টুকে এখানে সবকিছু তুলে ধরার সামর্থ্য আমার নেই।

হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব প্রায় সবার দিকে ব্যক্তিগতভাবেও খেয়াল রাখতেন। আমার মনে আছে, ঠান্ডা শরবত, ইফতারের সময় চিড়া, রাতে কোনো নাস্তার প্রয়োজনীয়তা, এমনকি আমার পান খেতে সমস্যা হচ্ছে কিনা এটাও খোঁজ নিতেন। তখনো মারকাযের রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ এবং মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক ছাহেবদ্বয়ের বাসা মিরপুরের পল্লবীতে। তখন দুদিন, তিন দিন পর পর মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ছাহেব হযরতপুর হাজির হয়ে যান। কোনো কোনো দিন আমাদের সঙ্গে ইফতার করেন, তারাবি পড়েন তারপর পল্লবীর উদ্দেশে রওনা করেন। অনেক সময় আমাদের কারো ছোট্ট কোনো জরুরত থেমে আছে কিনা, শহর থেকে কোনো কিছু এনে দিতে হবে কিনা, তিনি খুব মোহাব্বতের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন। এবং জানার পর সেই জিনিস এনেও দিয়েছেন।

আরো পড়ুন: রমযানের শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটানো উচিত

হযরতপুরের সবুজ আঙিনায় মাটির বিছানায় টিনের ওই মসজিদে ইতেকাফের প্রশান্ত সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে, ঈদের চাঁদ উঠে যাওয়ার পর আমরা যখন ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তোরজোড় করছি, তখন মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক ছাহেবের দুচোখে রমজানুল মোবারক বিদায় হয়ে যাওয়ার বিয়োগ-বিন্দু চিকচিক করছে। আমাদের সামনে ঈদ, তাঁর সামনে তখন রমজান শেষ!

আল্লাহ তাআলা এই মনীষী আলেম এবং আমাদের উপর ছায়া বিস্তার করে রাখা সকল আল্লাহওয়ালা মনীষী আলেমদের হায়াত দারাজ করুন। বা-বরকত হায়াত দিন। তাদের থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন।

আরো পড়ুন: সাক্ষাৎকার: যেভাবে কাটতে পারে করোনাকালীন ইতিকাফ

বিজ্ঞাপন