তপ্ত রৌদে জীবন সংগ্রামে উত্তীর্ণ এক প্রবাসীর কথা

মোহাম্মদ নাজমুল হুদা ।। মক্কা থেকে

আসলাম ভাই। টাঙ্গাইল জেলায় বাড়ি। জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাস জীবনে। এদের জীবনে থাকে কষ্ট-ক্লেশ, ত্যাগ-তিতিক্ষার নানা পাঠ। পাওয়া না পাওয়া, অর্জন-বিসর্জনের অপরাপর হিসেব-নিকেশ। নিজেদের কষ্টকে লুকিয়ে রেখে এরা নিত্যই দেশে রেখে আসা বাবা-মা, স্ত্রী-পরিজনের মুখে হাসি ফোটানোর এক জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ করেছেন নিজেদের। করোনার এ সময়ে সবকিছু থমকে গেলেও এদের কাজ থেমে নেই। কোম্পানীর গাড়ি এসে নির্দিষ্ট স্পটে নামিয়ে দিয়ে যায়। আবার সময় শেষে উঠিয়ে নেয়। দৈনিক আট ঘন্টা কর্ম সময়। রমজানে দু ঘন্টা কমিয়ে ছয় ঘন্টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এসেছেন চার বছর হতে বেশি সময়। শুরু হতে এখন পর্যন্ত একই ধাঁচের কাজে নিয়োজিত আছেন।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ করার মতো বেতন না থাকলেও একবারে অসুখী নন তিনি। অভাবকে কাটিয়ে উঠেছেন। বাবা-মা, স্ত্রী, ুই কন্যা ও এক ছেলে নিয়ে সুখেই আছেন তিনি। একমাত্র ছেলেটির পড়াশোনা বেশিূর না এগোলেও বড় মেয়েটিকে পাশের পাশের মহিলা সাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। পরিবারের জন্য খরচের উদ্ধৃতাংশ নিজের বাবার নামেই পাঠান। বাবার পরশ ছোঁয়া নিয়েই সে খরচ স্ত্রীর কাছে যায়। সব মিলিয়ে সুখেই আছেন তিনি। বেতন কম থাকলেও নানাজনের উপঢৌকনে মাস শেষে রোজগারে হাসিমুখ থাকে। গত চার বছরের সময়কালে আল্লাহর রহমতে এতো রোজগার করেছেন, অন্যরা যেটি দ্বিগুণ সময় থেকেও পারে না। যাকাতও দেন। সবকিছু হিসাব করে নিকটের গরীব আত্মীয়কে দিয়ে দিতে ছেলেকে নির্দেশ দিয়েছেন।

মক্কায় আসার আগে দেশে ট্রাক ড্রাইভার ছিলেন। দেশ ছাড়তে চার লাখ সত্তর হাজার টাকা গুণতে হয়েছে সবমিলিয়ে। আগে নামাজ কালামের ধারধারে ছিলেন না। কিš‘ এখানে এসে একটি বিশাল পরিবর্তনে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে পরিশুদ্ধির পথে পরিচালিত করলেন। ধূমপায়ী ছিলেন, ছেড়ে দিয়েছেন। এখন পূর্ণ নামাজী তিনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পূর্ণ পাবন্দীর সাথে আদায় করছেন। নামাজ আদায়ে যথেষ্ট হয়, সে পরিমাণ সূরা জানা আছে। রোজা রাখছেন। কোনক্রমেই তাহাজ্জুদ বাদ দেন না। ুপুর বারোটা হতে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ডিউটি করেন। মসজি বন্ধ থাকায় ডিউটিকালীন জোহর আসর একটু টুকরো ছায়া খুঁজে গামছা বিছিয়ে পড়ে নেন। এখানে এসে নিজে একা পরিবর্তন হননি। সাথের একশোর অধিক মানুষকে নামাজী বানিয়েছেন। ধূমপান ছাড়িয়েছেন।

এই স্তরের কাজ করছেন, কষ্ট হচ্ছে না? বলতেই যা বললেন, তা রীতিমত বিস্মিত হবার মতো। বাহ্যিকভাবে এটি নিচুমানের কাজ হলেও এটিকে তিনি বড় চোখেই দেখেন। পবিত্র মসজিদুল হারামের নিকটে হওয়ায় আগত আল্লাহর মেহামানদের সেবা করাকে নিজের জন্য অনেক সৌভাগ্য হিসেবে দেখেন তিনি। এই যে তাদের ছুঁড়ে ফেলা বর্র্জ্য তুলে পরিবেশকে পরি”ছন্ন রাখা, তারা পথ হারিয়ে গেলে হোটেলের কার্ড দেখিয়ে জায়গা মতো পৌঁছতে সহযোগিতা করা- এসবকে তিনি পরকালের বিশাল পুঁজি মনে করেন। অনেক সময় হাজীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে যান, মুহুর্তেই তাদের সেবা করে বুকভরা দোয়া নেয়ার সুযোগ হয়। ভারী কোন বোঝা বহন করতে অক্ষম হলে সেটিকে নিজের মাথায় তুলে নেন। সবমিলিয়ে তিনি পরমসুখ লাভ করছেন। আসছে হজ মৌসুমের পর একবারে দেশে চলে যাবেন এবং দ্বীনের ওপর অটল থাকতে দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে যুক্ত হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

করোনার এই সময়ে বেশ শঙ্কা কাজ করে তার ভেতরে। বিশেষ করে দেশের মানুষের জন্য। প্রতিনিয়ত বাইরে কাজ করার সুবাদে নিজের উপর একধরণের আশঙ্কা থাকলেও বেশি ভাবেন দেশ নিয়ে। দেশ বাঁচলে তিনি বাঁচবেন। নিজেদের রেমিটেন্সে দেশ ভালো থাকুক। এগিয়ে যাক। তপ্ত রৌদে, কাঠখড় পুড়িয়ে, শ্রম-ঘাম ব্যয়ে অর্জিত উপার্জনে দেশের চাকা সচল থাকুক, সেই প্রত্যাশ্যা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন