বিশেষ প্রতিবেদন: ঈদের পর মাদরাসাগুলো খুলে দেওয়া নিয়ে যা ভাবছেন দায়িত্বশীলরা

ওলিউর রহমান ।।

বাংলাদেশে দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি। মৃত্যু সংখ্যা ইতোমধ্যে তিনশো’ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সপ্তম দফায় ৩০ মে পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার পাশাপাশি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনের হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়ে কল কারখানাসহ আরও কিছু প্রতি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও শিগগিরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের কথা থেকে পাওয়া যায়নি। বরং ‘পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে পারে’- কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য থেকে অনেকে ধারণা করছেন, খুব তাড়াতাড়ি হয়ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে না।

তবে ‘আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না’ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সহ আরও কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্যের ভিত্তিতে অনেকে স্বাস্থ্যবিধি নেমে কিছু শর্ত পালনের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ অন্যসব কর্মক্ষেত্র খুলে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

দেশের প্রায় এক লাখ কওমি মাদরাসা বেসরকারি অনুদান এবং নিজস্ব নীতি নির্ধারণীতে চলা প্রতিষ্ঠান। দেশে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে কওমি মাদরাসাও ছুটি ঘোষণা করা হয়। সে হিসেবে কওমি মাদরাসার একটি শিক্ষাবর্ষ অপূর্ণাঙ্গ অবস্থায় সমাপ্ত হয়েছে। বিভিন্ন বোর্ড ও মাদরাসার সমাপনী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে কওমি মাদরাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ দোরগোড়ায়। রমযানের ঈদের অব্যাবহিত পরেই অন্যসময় শুরু হয় নতুন বছরের ভর্তি ও শিক্ষা কার্যক্রম। তাই তিন মাস শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত থাকা কওমি মাদরাসাগুলো ঈদের পরেই খুলে দেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

সম্প্রতি সরকারের কাছে কওমি মাদরাসাসমূহ খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে দেশের মুরুব্বি চব্বিশজন আলেমের বিবৃতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক অনেক বোর্ড থেকেও রোযার পরে মাদরাসার খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এসব বিবৃতির প্রেক্ষিতে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিভিন্ন মাদরাসার কয়েকজন দায়িত্বশীলের সাথে। কী কী শর্তে মাদরাসাসমূহ খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে, আবাসিক ব্যবস্থাপনায় সেগুলো বাস্তবায়নের সামর্থ মাদরাসাগুলো কতটুকু রাখে, আবাসিক ব্যবস্থাপনার ভালো-মন্দ দিক নিয়ে কথা হয় তাদের সাথে।

ময়মনসিংহের জামিয়া আরাবিয়া মাখযানুল উলূম মাদরাসার নায়েবে মোহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামী ৩০ মে মাখযান মাদরাসা খোলার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সামর্থ ও সাধ্যের মধ্যে ছাত্রদের তাপমাত্রা পরীক্ষাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, আবাসিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

‘টেলি যোগাযোগের মাধ্যমে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক মাদরাসায় ইতোমধ্যে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে সব প্রতিষ্ঠানই হয়ত ঈদের কিছুদিনের মধ্যে খুলে দেওয়া হতে পারে’। যোগ করেন মাওলানা মুহাম্মদ।

ময়মনসিংহের আঞ্চলিক শিক্ষাবোর্ড ইত্তেফাকুল উলামার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ঈদের পরে কওমি মাদরাসাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হয়েছে।

রাজধানী মিরপুরের দারুল উলূম মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ। বিদ্যমান আবাসিক ব্যবস্থা কাঠামোতে মাদরাসা করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি কীভাবে পালন করবে?- এই প্রশ্নটি করেছিলাম তার কাছে।

মাদরাসা বন্ধের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এই আলেম তার অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, মাদরাসায় আবাসিক ব্যবস্থাপনায় কোয়ারাইন্টাইন সবচেয়ে ভালভাবে সম্পন্ন হয়। তাই ছুটি না দেওয়াটাই কল্যাণকর ছিল। এখন যত দ্রুত সম্ভব মাদরাসা খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি ভালভাবে মেনে চলতে হবে। আবাসিক ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করতে হবে। কোনো ছাত্রের যেন বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি প্রতিটা মাদরাসায় কিছু খালি কামরা রাখা লাগবে যেখানে কারো শনাক্ত হলে বা করোনা রোগীর সংস্পর্শে যাওয়া ব্যক্তিরা যেন কোয়ারান্টাইন পালন করতে পারে। এ পরামর্শও যুক্ত করেন মাওলানা রেজাউল হক।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর আরেকটি প্রাচীন মাদরাসার একজন দায়িত্বশীল বলেন ভিন্ন কথা। ঢাকা বা ঢাকার বাইরের মাদরাসাগুলোর গড়পরতা যে আবাসিক ব্যবস্থাপনা তাতে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা যাবে কি না এ ব্যাপারে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। অবশ্য তিনমাস বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তাতে খুব শীঘ্রই মাদরাসাগুলো খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে এই আলেমের সাথে আলোচনায়।

রমযান পরবর্তী শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে হাইআতুল উলয়া এবং বেফাকের ভাবনা কী জানতে যোগাযোগ করা হয় বোর্ড দু’টির শীর্ষ দায়িত্বশীল এবং রাজধানীর আরজাবাদ মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়ার সাথে।

তিনি জানান বেফাকের সর্বশেষ মিটিং-এ বোর্ডটির মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুসকে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে শিগগিরই মাদরাসাগুলো খুলে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া।

তবে স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে বেফাক বা হাইআর বিশেষ কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশনা আছে কি না প্রশ্ন করলে- এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল পর্যায়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান বোর্ড দু’টির এ শীর্ষ দায়িত্বশীল। বরং মাদরাসা খুলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দেশনা পাওয়ার পরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকার আঞ্চলিক বোর্ডগুলো কেন্দ্রীয় বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে বলে জানা গেছে।

কুমিল্লা জেলা কওমি মাদরাসা বোর্ডের সহ সেক্রেটারি মুফতি জিলানীর এমনই অভিমত। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মুরুব্বীদের বৈঠকে যে ফায়সালা হবে সে মোতাবেকই তারা তাদের আঞ্চলিক বোর্ডের কার্যক্রম চালাবেন।

সব মিলিয়ে অস্থির পরিস্থিতি। মহা অনিশ্চিত ভবিষ্যত। সুস্থির কোনো বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।  করোনার এই আপদকালীন সময়ে সরকারি অনেক সিদ্ধেন্তেই দেখা গেছে সমন্বয়হীনতা, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি কতদূর ভয়াবহ হবে তার আগাম কিছুই বলা যাচ্ছে না।

তাছাড়া অনিশ্চয়তার মধ্যে খুলে দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে যেতে বা অভিভাবকরা তাদের পাঠাতে কতটা নিরাপদ বোধ করবেন সেটাও অস্পষ্ট। জীবনের চেয়ে শিক্ষা তো বড় নয়।

তাই ঈদের পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি করাটা আশাবাদ পর্যন্তই থাকতে পারে। কারণ সবাই পরিস্থিতির শিকার। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে অনেক হিসেব নিকেশ পাল্টে যাবে।

তবে আমাদের আশা দ্রুতই পরিস্থিতি নিরাপদ হোক। মানুষ ফিরে পাক স্বস্তির জীবন। গ্রামের মহল্লায় মহল্লায়, শহরের গলিতে গলিতে গড়ে ওঠা মাদরাসাগুলোতে কুরআনের তিলাওয়াত হোক। হাদিসের মসনদে ‘ক্বালা রাসুলুল্লাহর’ সুর ঝংকৃত হোক। নূর, রৌশনি এবং আধ্যাত্মিক বিভায় ভরে উঠুক পৃথিবী।

বিজ্ঞাপন