সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবীর শেষ কয়েকটি দিন

কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ ।।

১৭সফর  ৫৮৯ হি.

বিজ্ঞাপন

সুলতান শনিবার রাত থেকে কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করেন । মধ্যরাতে আবার তিনি জন্ডিসে আক্রান্ত হন।  তার রোগ শরীরের বাহির থেকে ভিতরে ছিল বেশি । তিনি জ্বরের কারণে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন।  কিন্তু তার অসুস্থতার খবর তখনও মানুষের নিকট জানানো হয়নি । আমি ইবনে শাদ্দাদ এবং কাজী সাহেব ( সুলতানের বিশেষ সহকারী আবু আলি আব্দুর রহিম) তার নিকট গেলাম।  তখন সেখানে খলিফার ছেলেও উপস্থিত ছিল । আমরা অনেকক্ষণ যাবৎ তার নিকট বসেছিলাম । তিনি রাতে তার অস্থিরতার কথা বললেন । প্রায় জোহর পর্যন্ত অনেক কথাবার্তা হল । এরপর চলে এলাম কিন্তু আমাদের অন্তর তার কাছেই পড়ে থাকল । সুলতানের বড় ছেলে নুরুদ্দিন আলী আমাদের কাছে খাবার নিয়ে এলেন । কাজী সাহেবের অভ্যাসের বিপরীত হওয়ায় তিনি চলে গেলেন ।

অসুস্থতার ষষ্ঠ দিন আমরা তার নিকট বসেছিলাম। তাকে বালিশে হেলান দিয়ে বসোনো হল। ঔষধ খাওয়ার পর  কুসুম গরম পানি পান করতে গিয়ে দেখেন বেশি গরম। তিনি পানি বেশি গরম হওয়ার কথা বললেন। আবার পানি আনা হলো। এবার পানি  ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। তিনি শুধু পানি ঠান্ডার কথাই বললেন। একটু রাগ করেননি।

এরপর আমি এবং কাজী সাহেব সেখান থেকে বের হয়ে এলাম। তখন আমাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। কাজী সাহেব আমাকে বললেন, দেখুন, এই যে সুন্দর আখলাক-এটা কিন্তু আজ আমরা মুসলমানরা হারাতে বসেছি। আল্লাহর কসম, অন্য সাধারণ মানুষের সাথে যদি এই আচরণ করা হতো তাহলে তো যে পানি এনেছে তার মাথায় ছুড়ে মারতো।

সপ্তম অষ্টম দিনে তার রোগ শুধু বাড়তেই থাকল। আস্তে আস্তে তার ব্যথা বাড়ছিল। স্মরণ শক্তি লোপ পাচ্ছিল।  নবম দিনে বেহুশ হয়ে পড়লেন। খানাপিনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সর্বত্র  আতঙ্ক বিরাজ করছিল। মানুষ ভয় পেয়ে গেল। বাজার থেকে আসবাবপত্র সরিয়ে রাখছিল সবাই। সবাই  এমন দুঃখিত হল যে বর্ণনা করার মত না। আমি এবং কাজী সাহেব প্রতি রাতের তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকতাম। আমরা তার ঘরের দরজার কাছেই বসে থাকতাম।  যখনি সুযোগ পেতাম ঢুকে যেতাম তাকে দেখার জন্য।  আমরা ফিরে আসি। মানুষ আমাদের থেকে তার অবস্থা জানার জন্য  অপেক্ষায় থাকত।

২৬ সফর ৫৮৯

আমরা তার নিকট গেলাম। তার অবস্থান জানতে চাইলে জানানো হলো যে তার একটু বেশি ঘাম ঝরছে। ঘামে  তার বিছানায ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু  ভিতরে শুষ্কতা কেবল বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকরা দিশেহারা হয়ে পড়লেন।  তার অবস্থা আগের মত হয়ে গেল।  তিনি অন্দর মহলে  সবার থেকে আড়াল হয়ে গেলেন।

আমি, কাজী সাহেব এবং ইবনে যাকিকে আজ রাতে তাঁর নিকট থাকার জন্য বলা হলো। কিন্তু অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো আমরা নেমে যাব আর শহরের ইমাম আবু জাফর যিনি অনেক সৎ লোক তিনি তার নিকট থাকবেন। যখন অন্তিম মুহূর্ত শুরু হল,  তিনি কালিমার তালকিন করলেন। আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। কাছে বসে কোরআন তেলাওয়াত করলেন। সুলতান তখন বেশীর ভাগ সময় অচেতন থাকতেন। ইমাম আবু জাফর যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ‘তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই,  তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে  অবগত তিনি জেগে উঠলেন। বললেন, আল্লাহ  সত্য বলেছেন।

২৭ সফর ৫৮৯ হি বুধবার

কাজী সাহেব ফজরের পরে সুলতানের নিকট চলে আসেন । তিনি সেখানে পৌছামাত্র তার ইন্তেকালে হয়ে যায় ।  বলা হয়, শায়খ আবু জাফর  যখন তিলাওয়াত করলেন ‘ তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।  তার উপরই আমি ভরসা করি।’  তার আলোকিত চেহারায় মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এবং তিনি নিজেকে  আপন প্রভুর কাছে সমর্পণ করেন।

সম্ভবত খোলাফায়ে রাশেদীনকে হারানোর পর থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের উপর এমন কঠিন দিন আর আসেনি। সারা পৃথিবীকে যেন নিঃসঙ্গতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

আল্লাহর কসম, অনেক মানুষকে তো আমি নিজে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তারা নিজেকে তার জন্য উৎসর্গ করার আশা ব্যক্ত করছে।

যখন সবাই তার গোসল কাফন দাফনের ব্যস্ত হল তখন দেখা গেল, তার কাছে কাফন দাফনের মত কোনো অর্থও নেই। শেষে ধার করে তার কাফন দাফনের ব্যবস্থা করা হল।

আমি তার গোসলে শরীক থাকার জন্যে যেখানে গোসল দেওয়া হচ্ছে  সেখানে গেলাম। কিন্তু সে দৃশ্য দেখার আমার ধৈর্য হলো না। এরপর তাকে কাফনে সজ্জিত করে আনা হলো। তার কাফনের কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিলেন কাজী সাহেব।

কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের ‘আন নাওয়াদিরুস সুলতানিয়া ফিল মাহাসিনিল ইউসুফিয়্যা ’থেকে

অনুবাদ, সংক্ষেপন ও সজ্জায়ন : এনাম হাসান জুনাইদ 

বিজ্ঞাপন