চিকিৎসা শাস্ত্রে অবদান রাখা আলোকিত মনীষী রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: রাযি উদ্দিন আর-রাহবি। ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা শাস্ত্রে অবদান রেখে খ্যাতি অর্জন করা আলোকিত মনীষীদের একজন। পুরো নাম,রাযি উদ্দিন আবু আল-হাজ্জাজ ইউসুফ ইবনে হায়দারাহ ইবনে আল-হুসেন আল-রাহবি। ৫৪৪ হিজরি মোতাবেক ১১৪০ খ্রিস্টাব্দের জুমাদালউলা মাসে তৎকালীন তুরস্কের ইবনে ওমর উপদ্বীপে জন্ম এই ক্ষণজন্মা মহা মনীষীর।

রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ-এর দূরন্ত শৈশব কাটে এ উপদ্বীপেই। বাবার কাছেই চিকিৎসা শাস্ত্রের পড়াশোনার  হাতেখড়ি হয় এ মনীষীর। এরপর এবিদ্যায় পাণ্ডিত্ব অর্জন করতে চষে বেড়ান তিনি তৎকালীন চিকিৎসাবিদ্যায় খ্যাতি ছড়ানো দক্ষিণ তুরস্ক, বাগদাদ, কায়রোর খ্যাতনামা বিদ্যালয়গুলোতে। ইসলামী ইতিহাসের সোনালী সে অধ্যায়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন খ্যাতনামা  চিকিৎসকদের থেকে।

বিজ্ঞাপন

সুলতান নুরুদ্দিন জেনকির শাসনামলে ৫৫৫ হিজরি মোতাবেক ১১৬০ খ্রিস্টাব্দে বাবার সাথে সিরিয়ার দামেস্কে আসেন। অসুস্থদের সেবায় নিয়োজিত করেন নিজেকে। খোলেন ব্যক্তিগত চিকিৎসালয়। ডাক্তারি পেশার পাশাপাশি নিজ হাতে লিখতেন চিকিৎসাবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি।

এক সময় সাধারণের  চিকিৎসায় নিবেদিতপ্রাণ রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ-এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সবার প্রিয় হয়ে ওঠা চিকিৎসকের জন্য তাঁর শায়েখ ও উস্তাদ মাজহাবুদ্দিন বিন নুকাশ সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির কাছে তাঁর পদোন্নতি  ও মাসিক বেতন ত্রিশ দিনার ধার্য করতে সুপারিশ করলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবি তাঁকে সফরকালীন সময়ে ব্যক্তিগত ডাক্তার হওয়ার প্রস্তাব দেন।

কিন্তু এমহান মনীষী সুলতানের ব্যক্তিগত ডাক্তার হওয়ার থেকে দামেস্কের সাধারণ জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়েজিত করতেই বেশি পছন্দ করতেন। তাই সুলতানের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তিনি।

রোগ নির্ণয়ে রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ-এর ছিল অনন্য দক্ষতা। এব্যাপারে বহুল প্রচলিত একটি ঘটনা হল,  একবার সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মন্ত্রী সফি উদ্দীন বিন শোকরের শরীর  ফ্যাকাসে রঙ ধারণ করতে শুরু করল। বিভিন্ন ওষুধ ও ডাক্তারের পরামর্শের পরেও তেমন কোন ফলাফল এলোনা।

মন্ত্রী সফি উদ্দীন বিন শোকর রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ-এর দ্বারস্থ হলেন। রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ মন্ত্রীর খাবারের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন তিনি কেবল মুরগির গোশতো খান। অন্য কোন গোশতো খান না। আর-রাহবি রহঃ তাকে ‘মেষের গোশতো  খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বললেন, আপনি মেষের গোশতের রঙ আর মুরগির গোশতের রঙ দেখলেই বুঝতে পারবেন’।

আর-রাহবি রহঃ-্এর এই চিকিৎসার ব্যাপারে মন্ত্রী সফি উদ্দীনের পরবর্তী মন্তব্য অনেকটা এমন, ‘ আমি মেষের গোশতো খেতে শুরু করলাম। ফলে আমার শরীরের রঙে স্বাভাবিকতা ফিরে আসলো। কেননা মেষের গোশতো ভক্ষনে সুসংহত রক্ত উৎপন্ন হয়। কিন্তু মুরগির গোশতো ভক্ষনে তা হয় না।

রাযি উদ্দিন আর-রাহবি রহঃ ব্যক্তিগত জীবনে ‘শরফুদ্দিন আলী আর রাহবি ও জামালুদ্দিন ওসমান আর রাহবি’  নামের সে যুগের বড় ও প্রসিদ্ধ এই দুই চিকিৎসকের গর্বিত জনক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

ইসলামী ইতিহাসের সোনালী যুগে চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিভাগে ‘আর রাহবি পরিবার’ প্রায় দুই শতাব্দী ধরে জনসেবা করেছে – এমন তথ্যই সংরক্ষিত হয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

পৃথিবীর চিকিৎসাশাস্ত্রকে প্রায় এক শতাব্দী রূদ্ধ-সমৃদ্ধ করে ৬৩৪ হিজরি মোতাবেক  ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাযি উদ্দিন আর-রাহবি দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। কাসিয়োন পর্বতমালায় বাবার কবরের পাশে  সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে।

আল জাজিরা আরবি আবলম্বনে:  আব্দুর রহমান মুজিব

বিজ্ঞাপন