পঞ্চাশের মন্বন্তর: প্রত্যক্ষদর্শীর জবানীতে

ইসলাম টাইমস ডেস্ক:  ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তৎকালীন ভারতবর্ষে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যান। ১৩৫০ বঙ্গাব্দে ( খ্রি. ১৯৪৩) এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে একে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়। বিশেষ করে দুই বাংলায় দুর্ভিক্ষের করাল থাবা ছিল সবচেয়ে করুণ। এই করুণ পরিণতির জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়।

এই দুর্ভিক্ষের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বিশিষ্ট আলেম ও লেখক মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। তিনি তার আত্মজীবনী গ্রন্থ জীবনের খেলাঘরে বইয়ে এই দুর্ভিক্ষের স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে-

বিজ্ঞাপন

“দুর্ভিক্ষটা শুরু হয়েছিল ভাদ্রমাস থেকেই।আশ্বিন-কার্তিক মাসে তা প্রচন্ড রূপ ধারণ করে।কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান উঠার পর পেটের ব্যামোতে আক্রান্ত হয়েও মারা যায় অনেক মানুষ।অমানুষ বৃটিশ আমলারা বলতো মানুষ না খেয়ে মরেনি; অগ্রহায়ণ মাসে নতুন চালের ভাত খেয়েই পেটের পীড়া দেখা দিয়েছে এবং মানুষ মরেছে।

“ভাদ্রমাস থেকেই ধান-চালের উপর নানা ধরনের সরকারী নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু হলো। মূল্যবৃদ্ধিও শুরু হলো সঙ্গে সঙ্গেই। সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা মণদরের চাউলের মূল্য বাড়তে বাড়তে আশ্বিনের শুরুতে পঁচিশ থেকে ত্রিশটাকা মণ হয়ে গেল।তারপর চল্লিশ টাকা অর্থাৎ একসের চাউল এক টাকায়। তারপর শুনেছি একসের চাউল দেড়টাকায় পর্যন্ত বেচা-কেনা হয়েছে।”

“অকালের সবচাইতে ভয়াবহ দিকটা ছিল হাতে টাকা নিয়েও অনেক সময় হাট-বাজারে চাউল কিনতে পাওয়া যেত না। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের আত্মঘাতী নীতির ফলে ধান-চাউল যাও দেশে ছিল সেগুলিও অনেকেই হাটে নিয়ে আসতে সাহস পেত না।”

“আম্মা প্রতিদিন সকাল বেলায় বড় ডেগে এক ডেগ খিচুড়ি পাক করতেন।চাল-ডাল,লাউ-কুমড়া ইত্যাদি মিলিয়ে লাবড়া ধরনের খিচুড়ি খেতে খুব সুস্বাদু হতো। এভাবে রাতের জন্য আরেক ডেগ (রান্না হতো)।
ঘটনাক্রমে সে বছর আমাদের মিষ্টি আলুর ফলন খুব ভালো হয়েছিল।সে আলুও সিদ্ধ করে রাখা হতো।বাড়ীর ভেতর যারাই এসে হাঁক দিত তাদেরকেই এক/দু হাতা(বড় চামচ) খিচুড়ি খেতে দিতেন।কারো পক্ষে জানার উপায় ছিল না যে এ ছোট্ট বাড়িটিতেও চলছে নিয়মিত একটা লঙ্গরখানা।”

“প্রায় প্রতিদিনই গরীব আত্মীয়-স্বজন আসতেন।মুখ দেখেই বুঝা যেত,হয়ত দিনমানে কিছু খাননি।সে সময়টা এমনই ভয়াবহ হয়ে পড়েছিল যে,কেউ কোন আত্মীয় বাড়ীতে যেতে সাহস পেত না। আমাদের পাশের গ্রামের এক বাড়ীতে মেয়ে এবং জামাই এসেছিল বেড়াতে।অভাবী মা তাদের পাতে দেয়ার মতো কিছু জোগাড় করতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়েছিলেন।সে মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি আমাদের অঞ্চলে বহুদিন পর্যন্ত মানুষকে কাঁদিয়েছে।
আম্মার কাছে আশেপাশের মহিলারা আসতেন।তাদেরকে আম্মা কিছু না কিছু খাইয়ে দিতেন।”

“বাংলার মুসলিম মহিলাদের বিশেষত: কৃষক পরিবারের বৌ-ঝিদের মাঝে পর্দা-পুশিদা ও হায়া-শরম ছিল জীবনের চাইতেও প্রিয়।প্রতিটা গ্রামে অনেক পরিবার এমন ছিল যারা আর্থিক বিচারে নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা নিতান্ত নিম্নবিত্ত হলেও তাঁদের ধর্মীয় বিধিবিধান ও ঐতিহ্যপ্রীতি ছিল অনুকরণীয়।”

“আমার ধারণায় পঞ্চাশের মন্বন্তরের (১৩৫০সালের দুর্ভিক্ষের)সময়ই গ্রামাঞ্চল থেকে খান্দানী পর্দা এবং ঐতিহ্যের ভিত নড়ে গেছে।মেয়েরা তখনই পেটের ক্ষুধায় বাড়ির বার হয়েছে। অনেক অসহায় স্বামী দু’টি-তিনটি বাচ্চাসহ ঘরের বৌকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।”

“এই অসহায় নারী ও শিশুর কাফেলা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে, বাজার-গন্জে কিলবিল করেছে। লঙ্গরখানার ভরসায় ইউনিয়ন বোর্ডের অফিস চত্বরে জটলা করেছে। ধাক্কাধাক্কি করে লাইনে কাতারে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। এভাবেই তাদের লজ্জা-শরম বিদায় হয়ে গেছে।”

 

বিজ্ঞাপন