শরীফ মুহাম্মদ ।।
সন্দ্বীপ শব্দটা সম্ভবত আমি প্রথম শুনেছি, আমাদের এই উস্তাযের নামের অংশ হিসেবে। মাদ্রাসা জুড়ে তাঁর নাম ছিল ‘সন্দ্বীপ হুজুর’। তিনি ছিলেন আমাদের ‘সন্দ্বীপ হুজুর’।
আজকের জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, আগে ছিল মাদ্রাসায়ে নুরিয়া আশ্রাফাবাদ। ঢাকা কামরাঙ্গীরচরের বড় মাদ্রাসা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে এই মাদ্রাসার সিনিয়র উস্তাযদের অন্যতম ছিলেন ‘সন্দ্বীপ হুজুর’-হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ রহ.। তিনি ছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ-এর অন্যতম খলিফা।
সব সময় জুব্বা পরতেন। বাংলাদেশে যে ধরনের জুব্বা পরা হয়। বেশিরভাগ সময় মাথায় থাকতো পাগড়ি। ঝিমঝাম, চুপচাপ চলতেন। মাদ্রাসায় ছাত্র কিংবা উস্তাযদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও বলয়ের কোনো কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন, এমন বলা যাবে না। কিন্তু নির্বিরোধ ও একাকিত্ব লালনকারী অন্যরকম কিছু মাধুর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। সবার শ্রদ্ধাভাজন ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। নিজের নেজাম ও রুটিন নিয়ে মনে হতো, বরাবর এক পাশ ধরে চলতেন।
নুরিয়ায় আমাদের উস্তাযদের একেকজনের ছিল একেক রকম সুন্দর বৈশিষ্ট্য। হয়তো সব ছাত্রের চোখেই তার উস্তাযদের মাঝে এমন সুন্দর বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। এটাই ভদ্রোচিত স্বাভাবিকত্ব। আজ শুধু ‘সন্দ্বীপ হুজুর’কে নিয়েই দু’একটি কথা বলি।
হযরত হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায় যখনই হাফেজ্জী হুজুর কখনো দেশের বাইরে যেতেন অথবা মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থাকতেন, রুটিন কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য নায়েবে মুহতামিম হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁকে। ছাত্ররা ছুটির দরখাস্ত নিয়ে গেলে তিনি দস্তখত করতেন।
বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব অথবা শুক্রবার বাদ ফজর তেলাওয়াত ও দুরুদ শরীফের মজলিস শেষে হাফেজ্জী হুজুর উপস্থিত না থাকতে পারলে উস্তাযদের কেউ কেউ বয়ান করতেন। ‘সন্দ্বীপ হুজুর’ যেদিন বয়ান করতেন, তাঁর ভাষায় ইসলাহ, ইস্তেগফার ও তাআল্লুক মাআল্লাহ (আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন) বিষয়ে ব্যাকুল হয়ে কথা বলতে থাকতেন। শব্দের মাধুর্যের চেয়ে বিষয় ও ব্যাকুলতার উত্তাপটা ছড়িয়ে পড়তো বেশি। মাঝে মাঝে বয়ান করার সময় চোখের পানি তাঁর গড়িয়ে পড়তে থাকতো, গলা ভেঙে যেতে থাকতো। রুমাল দিয়ে চোখ মুছতেন।
বলা যায়, বিশেষ বিশেষত্বহীনতাই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। নীরব এবং একটু পরোয়াহীন ভাব ছিল তাঁর আচরণে। ইতিবাচক অর্থে পরোয়াহীনতার কথাই বলছি। আধ্যাত্মিক ধারার প্রাবল্য ছিল। শুনেছি, হাফেজ্জী হুজুর রহ. ইন্তেকালের পর মাদ্রাসার কোনো এক কর্তৃপক্ষ কোনো এক জটিলতার সময় তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি তাহলে চলে যান।’ উত্তরে দ্বিধাহীন ভাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কেন যাব? আপনি চলে যান’।
শুনেছি, কাছের মানুষদের তিনি বলতেন, ‘আমার শায়েখ (হাফেজ্জী হুজুর) আমাকে ওসিয়ত করে গিয়েছেন আমি যেন আমৃত্যু এই মাদ্রাসায় থাকি। আমাকে এক দরজা দিয়ে বের করে দিলে আমি আরেক দরজা দিয়ে এখানে চলে আসবো। শায়খের কথা তো অমান্য করতে পারবো না।’
বয়ানের সময় একটি আরবি শের তিনি প্রায়ই বলতেন। হুজুরের মুখে শুনতে শুনতেই আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে। এই শেরটি উচ্চারণের সময় তাঁর দু চোখ ভিজে উঠতো। কান্নাভেজা গলায় তিনি বলতেন:
احب الصالحين و لست منهم – لعل الله يرزقنى صلاحا
“নেককারদের ভালোবাসি, আমি তো নেককার নই
হয়তো আল্লাহ তাআলা আমাকেও নেককার বানিয়ে দেবেন।”
এই নেককার ‘গুমনাম’ মহান বুজুর্গ তাঁর শায়েখের ওসিয়ত মান্য করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নুরিয়া মাদ্রাসাতেই ছিলেন। ২০০৪ সালে প্রায় ৭০ বছর বয়সে তাঁর ইন্তেকাল হয়।
এবং তিনি এখন শুয়ে আছেন তাঁর শায়খের পাশে, মাদ্রাসায়ে নুরিয়ার মাকবারায়ে হাফেজ্জিতে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং আল্লাহর কাছে চলে যাওয়া আমাদের সকল উস্তাযকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।
















