৬ এপ্রিল: শাপলায় আঁছড়ে পড়া নবী প্রেমের ঢেউ

নুরুদ্দীন তাসলিম ।।

৬ এপ্রিল ২০১৩। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মুসলিম হৃদয়ের স্পন্দন নবী মুহাম্মদ সাঃ এর পবিত্র চরিত্রে কালিমা লেপন ও মঞ্চের পক্ষ থেকে এর জন্য ক্ষমা না চেয়ে উলটা ধৃষ্টতা প্রদর্শন, উত্তপ্ত ও নাজুক করে তুলেছিল সেই মুহুর্তটাকে। নাস্তিকদের দৌরাত্ম্য  ক্রমেই বেড়ে উঠছিল,  মনে হচ্ছিল চারপাশের পরিবেশ মুষ্টিমেয় অবিশ্বাসীর দখলে। আল্লাহতে বিশ্বাসী সরলপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান যেন কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল নিজ দেশে।

বিজ্ঞাপন

নবীজী সাঃ এর পবিত্র চরিত্রে কালিমা এঁটে দেওয়া নাস্তিকদের রুখতে এসময় হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কোটি মুসলিম হৃদয়ের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরব্বি আল্লামা শাহ আহমদ শফী (মা.যি.)ডাক দিয়েছিলেন এক লংমার্চের। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এ লংমার্চ। ইতিহাসের কাগজে নতুন এক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল‘হেফাজতে ইসলাম ও লং মার্চ’।

আল্লামা আহমদ শফীর ডাকা লংমার্চে অভূতপূর্ব সাড়া পরে দেশব্যাপী। লংমার্চকে কেন্দ্র করে পুরো দেশে শুরু হয় চাঞ্চল্য – উত্তেজনা। মিডিয়ার টকশো, গোল টেবিলগুলোতে চলে পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক। দেশব্যাপী নবীপ্রেমীদের মুখে চর্চিত নাম হয়ে উঠে ‘হেফাজতে ইসলাম’।দেশের সাধারণ জনগন থেকে ঈমানদ্বার ধর্মপ্রাণ মুসলমান সবাই লংমার্চ সফল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

আরো পড়ুন: ৪ এপ্রিল মুফতি আমিনী রহঃ-এর ডাকা ঐতিহাসিক হরতাল

এদিকে লংমার্চ বানচাল করতে বামপন্থীরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। সে সময় শুক্রবার হরতাল ডাকার মত হাস্যকর এক ইতিহাসের সাক্ষী হয় এদেশের জনগণ। লোক মুখে শ্রুত এ হরতালে বামদের  মদদ দিয়েছিল সরকার।

তবে বামদের ডাকা এ হরতাল চির ধরাতে পারেনি ধর্মপ্রাণদের ঈমানী জযবায়।। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাস্যকর হরতালের জন্য অনেকে যোগ দিতে পারেনি লংমার্চে, তবে শাপলায় যোগ দিতে না পারা মানুষগুলো দেশের প্রায় জেলাতে গড়ে তুলেছিলেন আলাদা আলাদা শাপলা চত্বর ও লংমার্চ।

সেদিন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্রে যেন আঁছড়ে পড়েছিল নবীপ্রেমীদের ঢেউ, যার মোহনা ছিল শাপলা চত্বর। বিশ্ব দেখেছিল নবীজী সাঃ এর প্রতি গরিব দেশের দুর্বল ঈমানওয়ালাদের হৃদয়ের উত্তাপ -নিখাঁদ ভালবাসা।

হরতালের কারণে বড় একটা অংশ শাপলায় যোগ দিতে না পারলেও অনেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হেঁটে এসেছেন ঢাকায় শুধু নবী বিদ্রোহীদের বিচারের দাবীতে ডাক দেওয়া লংমার্চে যোগ দিবেন বলে। শাপলায় নবীপ্রেমীদের আঁছড়ে পড়া ঢেউয়ে অংশ গ্রহণ করা অপরিচিত অনেকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল মুহূর্তেই, এ সখ্যতা-ভালবাসা ছিল শুধু নবীপ্রেমকে কেন্দ্র করে। যেন হাদীসের বাণী ‘ দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একত্রিত হয়… এর জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল ৬ এপ্রিল ২০১৩-তে।

বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হয়েছিল যারা শুধু লংমার্চে অংশ নিবেন বলে হেঁটে এসেছেন উত্তরের সিরাজগঞ্জ থেকে। কেউ বলছিলেন তিনি হেঁটে এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। নবীজী সাঃ এর প্রতি তাদের ভালবাসা দেখে নিজেকে বেশ অসহায় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ সাঃ এর প্রতি আমার না আছে এমন ভালবাসা না আছে তার পবিত্র ভালবাসার প্রতি এমন উত্তাপ।

আরো পড়ুন: শাপলায় ঘটে যাওয়া এক আবেগময় অধ্যায়

৬ এপ্রিলের লংমার্চ প্রতিটি বাঙালী মুমিনের হৃদয়ে স্মৃতির এক রঙিন মখমল দিন। বয়োজ্যেষ্ঠ নেতার ডাকা লংমার্চ জাতির আত্মার আহবান এবং জাতীয় এক আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। তাইতো  লংমার্চের বিপক্ষে প্রভাবশালী মহল শক্ত অবস্থান সত্ত্বেও  পরিস্থিতি ছিল  নবী প্রেমীদের  পক্ষে। শান্তিপূর্ণ লংমার্চ সফল করতে প্রশাসনও সেদিন বেশ আন্তরিক ছিলেন। আর বিভিন্ন মহল থেকে যেভাবে খাবার পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছিল মনে হয়েছিল,আমরা যেন সবার হৃদয়ের আকুতি নিয়ে হাজির হয়েছি শাপলায়। সরাসরি অনেকে এখানে হাজির হতে না পারলেও তারা তৌহিদী জনতাকে সাপোর্ট দিয়েছেন, সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। সেদিন তো এমন হয়েছিল দাঁড়িয়ে, বসে আছি একটু পর পর খাবারের ঝাঁপি এসে হাজির হচ্ছে, বনী ইসরাইলের মান্না সালওয়ার ইতিহাস যেন  জীবন্ত হয়েছিল এ প্রজন্মের উম্মতে মুহাম্মদীর সামনে। শুধু রাজধানীর নয় পুরো দেশে ছিল অভিন্ন চিত্র।

আরো পড়ুন: শাপলা চত্বরের ঘটনায় তৌহিদী জনতার পরাজয়ের কিছু নেই: আল্লামা কাসেমী

লংমার্চ পরবর্তী এক মাসে বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত শানে রিসালাত মাহফিলগুলোতেও ছিল নবীপ্রেমীদের আঁছড়ে পড়া ঢেউ। মন ভরে যেত সে মাহফিল দেখে। জীবনের দূরন্ত সময়টাতে শুক্রবার এলেই দলবেঁধে ছুটতাম নবী প্রেমীদের ভালবাসায় উপচে পড়া ঢেউ দেখতে। বক্তাদের মুখে নবীপ্রেমের গল্পগুলো উজ্জীবিত করতো, অন্য রকম ভাল লাগায় মন ভরে যেত। রাসূল সাঃ এর প্রতি এ দেশের মানুষ হৃদয়ে এতো বেশি ভালবাসা লালন করে সে সময়ের দিনপঞ্জীগুলোর সাক্ষী না হলে তা অজানাই থেকে যেত।

আরো পড়ুন: বালাকোট থেকে মতিঝিল: মিল-অমিল

পরবর্তী ইতিহাস  বেশ তিক্ত হলেও লংমার্চ ও মাসব্যাপী চলা শানে রিসালাত মাহফিলগুলো দীর্ঘ সময় রেখাপাত করে যাবে বাংলাদেশের মানচিত্রে।

২০১৩ -তে নবী প্রেমীদের জৌলুসে ভরা এপ্রিল না এলে দিন দিন বেড়েই চলত নাস্তিকদের দৌরাত্ম্য তাই আমরা কোনভাবেই ৬ এপ্রিল ও পরবর্তী আন্দোলনকে বিফল বলার পক্ষপাতি নই। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে প্রতি বছর এপ্রিল আসবে ৬ তারিখ নিয়ে, বদর উহুদ খন্দকের পাশে নাম লিখিয়ে এ লংমার্চ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে উজ্জীবিত করবে নতুন উদ্দীপনায়।

আরো পড়ুন: শাপলা চত্বরে এক বিষণ্ন বিকেল : হয়তো এটিই আমার শেষ মুনাজাত

বিজ্ঞাপন