ঐতিহাসিক লংমার্চ: অংশগ্রহণকারীদের আবেগ, অনুভূতি

তারিক মুজিব ।।

৬ এপ্রিল, ২০২০। হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক লংমার্চের সাত বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১৩ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ সাল পরবর্তী দেশের রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ হয়েছে। তবে ১৩ সালটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ বলা যায় সে বছরের ৬ তারিখে সংগঠিত হওয়া প্রায় অর্ধকোটি মানুষের ঐতিহাসিক লংমার্চটি।

বিজ্ঞাপন

‘ঈমান রক্ষা’র আন্দোলনে যোগ দিতে সারাদেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ সেদিন যাত্রা করেছিল রাজধানী অভিমুখে। তাওহিদী জনতার সফেদ স্রোত মিলিত হয়েছিল শাপলার মোহনায়। পথে পথে ছিল নানা বাধা বিপত্তি। লংমার্চ কর্মসূচি বানচাল করতে রাজধানীতে বাম রাজনৈতিক দলের কথিত হরতালের পাশাপাশি সারাদেশেই স্থানীয়ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল গণ পরিবহন। শাসকগোষ্ঠীও বন্ধ করে দিয়েছিল রেল, লঞ্চ এবং দূর পাল্লার যাতায়াতের অন্যসব মাধ্যম। রাজধানী থেকে সারাদেশ ছিল কার্যত বিচ্ছিন্ন। তবুও থামানো যায়নি তাওহিদী জনতার অগ্রযাত্রাকে। ঈমানী পরীক্ষার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে পায়ে হেঁটে দূর দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষ সফল করেছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকা সেদিনের ঐতিহাসিক লংমার্চ।

প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে মতিঝিল অভিমুখে হেঁটেই রওয়ানা দেন গাজীপুরের বোর্ড বাজারের মাওলানা আবদুল আলীম। তিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং এক মাদরাসার শিক্ষক। সেদিন ৭৮ জনের লোকের এক জামাত নিয়ে তাদের বাস যোগে ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস বন্ধ করে দেওয়ায় মাওলানা আবদুল আলীমের কাফেলা হেঁটেই রওয়ানা দেন শাপলার অভিমুখে।

জামালপুরের নান্দিনায় এক মহিলা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা দিলাওয়ার হুসাইন। হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক লংমার্চে যোগদানের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিনের আন্দোলন ছিল ঈমান, ইসলাম রক্ষার আন্দোলন। ইসলাম বিদ্বেষীরা আমাদের ধর্মকে অবমাননা এবং আল্লাহ, রাসূলকে কটূক্তির একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি ঘৃণ্য এক ষড়যন্ত্র নিয়ে তারা মাঠে নেমেছিল। তাদেরকে প্রতিহত করতে লংমার্চের মতো কঠোর কর্মসূচি ছিল সময়ের দাবি। সময়ের সে দাবি পূরণ করতেই আমরা সেদিন আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম।

মাওলানা দেলাওয়ার হুসাইন জানান, আমাদের জামাতটি আগের দিনই ঢাকায় পৌঁছতে পেরেছিল। মুহাম্মদপুরের রাহমানিয়া মাদরাসায় আমাদের অবস্থানের জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৬ এপ্রিল ফজরের পর কয়েক হাজার লোকের একটি মিছিলের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা মতিঝিল শাপলা চত্বরে পৌঁছি। চলতে চলতে প্রতিটা তাকবির ধ্বনি আমাদেরকে আন্দোলিত করেছিল। সেদিনের মিছিল, বিশাল গণ জমায়েত, মানুষের আথিতেয়তা আজও আমার চোঁখে লেগে আছে।

বরিশালের মাওলানা জুবাইর আহমদ বলেন, আমাদের মাদরাসায় দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল ঢাকার লংমার্চে যোগ দেওয়ার। কিন্তু লঞ্চ, ফেরি বন্ধ করে দেওয়ায় তা আর হলো না। পরে স্থানীয়ভাবেই অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হলো। সেখানেও কয়েক লক্ষ লোকের জমায়েত হয়েছিল। মাওলানা জুবাইর আহমদ বলেন, ‘প্রশাসনের বাধার মুখে পড়ে ঢাকায় পৌঁছাতে না পেরে সারাদেশের বড় বড় শহরগুলিতে অনুষ্ঠিত হওয়া জনসমাবেশও লংমার্চের অবিচ্ছেদ্ব অংশ বলেই মনে হয় আমার কাছে। লংমার্চ শুধু ঢাকা অভিমুখে ছিল না। বরং সেদিনের অভিযান ছিল সত্যের দিকে। তাই সেদিনে অনুষ্ঠিত হওয়া দেশের সব জনসমাবেশই ছিল লংমার্চের অবস্থানস্থল।

ঢাকা ছাড়াও সেদিন চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ দেশের অন্য বড় শহরগুলোতে গণ সমাবেশ থেকে ঢাকার লংমার্চের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়েছিল।

নেত্রকোণার এক পরিচিত মাদরাসার সাবেক শিক্ষক মাওলানা ইসমাঈল। তিনি শহরের এক মসজিদের ইমাম ছিলেন। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে যোগ দেওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মসজিদের পরিবেশ ছিল বৈরি। ঘোষণা দিয়ে তাই লংমার্চে যোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। দু’দিনের জন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে গোপনে এক জামাতের সাথে রওয়ানা দিয়ে দিলাম। ঢাকায় আমার পরিচিতি কম ছিল। মহাখালী গিয়ে জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তখন চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, কীভাবে কী করব! কিন্তু সেদিন আসলে পথ হারানোর কোনো সুযোগ ছিল না।

‘যেদিকেই তাকাই বিশাল বিশাল মিছিল শাপলার দিকে ছুটছে। আমিও একটি মিছিলে মিশে গেলাম। ঘন্টা খানেক হাঁটার পর একটি বিশাল জন সমাবেশে গিয়ে থামে আমাদের মিছিল। পথে পথে দেখেছি মানুষের ঈমানী জযবা। ঢাকাবাসীর আথিতেয়তা-আন্তরিকতা’।

এমনই আবেগ অনুভূতি ছিল ৬ এপ্রিলের লংমার্চে যোগ দেওয়া সকল মানুষের। নবীজীর সম্মানের হানি কোনো মুমিন প্রাণই সহ্য করতে পারে না। তাই সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মানুষ সেদিন যোগ দিয়েছিল হেফাজতে ইসলামের ডাকা ঐতিহাসিক লংমার্চ।

বিজ্ঞাপন