“করোনা নিয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ শোভনীয় নয়”

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্যে প্রবাসীদের ভূমিকা সকলেই স্বীকার করেন। কিন্তু সম্প্রতি করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে সরকার এবং দেশের নাগরিক, এমন কি আত্মীয়স্বজনদের দ্বারাও প্রবাসীরা অনেক নিগ্রহের স্বীকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন।   গণ মাধ্যমে  বিভিন্ন বক্তব্য দেখে মনে হয়, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার একমাত্র কারণ প্রবাসীরা৷

সম্প্রতি এক ব্যক্তি পশ্চিমের কোনো দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। এয়ারপোর্টগুলোতে জায়গায় জায়গায় তার পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। সকল পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, তার মধ্যে ভাইরাস নেই। এভাবে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন।

বিজ্ঞাপন

উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে ভাইরাসমুক্ত হওয়ার সনদ ধারণ করা সত্বেও তার ভাইয়েরা তাকে ঘরে জায়গা দেয়নি।

অবশেষে তাকে কোনো হোটেলে তোলা হয়েছে। হোটেলে উঠতে না উঠতেই হোটেল কর্তৃপক্ষ কীভাবে যেন জানতে পেরেছে যে, এ লোক বিদেশ থেকে এসেছে। ব্যস, তারা পুলিশকে খবর দিয়ে দেয়। পরিস্থিতি টের পেয়ে এ ব্যাক্তি কোনোমতে সেখান থেকে কেটে পড়তে সক্ষম হয়।

 

করোনা ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষা পেতে সতর্কতার অবলম্বন দোষণীয় কিছু নয়। বরং আবশ্যকীয় বটে। কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে  দলীল-প্রমাণবিহীন ধারণার ভিত্তিতে অনেক জায়গায় এমন  বাড়াবাড়ির খবর ওঠে আসছে গণমাধ্যমে। কোথাও কোথাও প্রবাসীদের প্রতি যেন সামাজিক বয়কটের মত পরিস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। প্রবাসীদের প্রতি দেশের মানুষের এমন বিমাতাসুলভ আচরণের জন্য প্রবাসীরাও অনেকটা দায়ী৷ কারণ দেশে ফিরে তাঁদের কোয়ারান্টিনে থাকার কথা থাকলেও অনেকেই তা মানছেন না৷

প্রবাসীদের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের এই আগ্রাসী মনোভাব কতটা যুক্তি সঙ্গত এ নিয়ে মাদানী নগর মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি নূর মহাম্মদের নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, প্রবাসীদের অসাবধানতা ও নিয়ম না মানার ফলে আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর কিছু অভিযোগ তো গণমাধ্যমে অনেক আগ থেকেই ওঠে আসছে। এর দায় প্রবাসীরা এড়াতে পারেন না। তাদের উচিত, সরকারের পক্ষ থেকে যে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়, সে সকল ‍পরীক্ষা করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় কোয়ারেনটাইনে থাকা।

এসময়ে কাউকে তাদের সংস্পর্শে যেমন আসতে দেওয়া উচিত নয়, তেমনি কারো তাদের ও উচিত নয় কারো সংস্পর্শে যাওয়া। এটা তাদের জন্য যেমন জরুরি, অন্যদের জন্যও জরুরি।

তবে এ সতর্কতার অর্থ কখনোই এই নয়, তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে। তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করা হবে।

পরিবারের সদস্য হিসাবে তাদের যে হক রয়েছে, তাদের হক তাদেরকে দিতে হবে। তাদের ঘরে জায়গা না দেওয়া এটা খুবই অন্যায়। একজন মুসলমান হিসাবে, এক সম্মানিত নাগরিক হিসাবে তাদের যা প্রাপ্য তাতো তাদের দিতে হবে। তাদেরকে অসম্মান করা, তাদের বাঁকা চোখে দেখা এটা খুবই স্বার্থপরতা এবং কৃতঘ্নতা। তবে ঘরের ভিতরে তাকে কিছুদিন (সংস্পর্শহীন) অবস্থায় রাখাতে দোষের কিছু নেই। যোগ করেন মুফতি নূর মুহাম্মদ ।

মুফতি নূর মুহাম্মদ আরও বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের মত নব্য জাহেলিয়াতে আক্রান্ত অনেক মানুষের মাঝেও এ ধ্যান-ধারণা রয়েছে যে, কিছু রোগ এমন রয়েছে, যা নিজ শক্তিবলেই সংক্রমিত হতে পারে। যেন আল্লাহ তাআলার কুদরত ও তাকদীরের বাইরে এ রোগ নিজেই কাউকে আক্রান্ত করার শক্তি রাখে। কোনো সন্দেহ নেই, এটা কুফরি ও শিরকী আকীদা, ঈমান ও তাওহীদ পরিপন্থী আকীদা। এই আকীদার ফলাফল আমাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও প্রকাশ পাচ্ছে। সতর্কতা ভাল, জরুরি বিষয় কিন্তু বাড়াবাড়ি ভাল না।

তবে এটি একটি বাস্তবতা যে, কিছু রোগ-ব্যাধি এমন আছে, তাতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংশ্রব আল্লাহ্র হুকুমে কখনো কখনো অন্যের জন্য আক্রান্ত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরকম বাহ্যিক কারণপ্রসূত সংক্রমণ, যা আল্লাহ্র হুকুমে হয়ে থাকে তা আকীদায়ে তাওহীদের পরিপন্থী নয়; বরং আল্লাহ্র সৃষ্ট অন্যান্য বাহ্যিক কারণের মত এটাকেও ইসলামী শরীয়ত একটি কারণ হিসেবে স্বীকার করে এবং এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে জোর তাকিদ করে যে, এক্ষেত্রে কোনো অমূলক ধারণা ও ওয়াসওয়াসার পিছে পড়া যাবে না। ইসলামে সতর্কতা কাম্য, কিন্তু অমূলক ধারণা ও ওয়াসওয়াসার অনুগামী হওয়া নিষেধ। যোগ করেন মুফতি নূর মুহাম্মদ ।

বিজ্ঞাপন