অ্যালকোহল : পরিচিতি ও শরঈ বিধান

1641

মনজুরুল হাসান চৌধুরী ।।

অ্যালকোহলের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। একজন ধার্মিক মাত্রই অ্যালকোহল ভীতি রয়েছে। কিন্তু অ্যালকোহল মাত্রই কি হারাম? মদতো একটি বিশেষ শ্রেণীর অ্যালকোহল। এ ছাড়াও তো রয়েছে অসংখ্য অ্যালকোহল, যা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এবং অ্যালকোহলের ব্যবহার ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। চিকিৎসা ও ঔষধ তৈরীতে ব্যবহার, বাহ্যিক ব্যবহার, খাবার ও পানীয়তে ব্যবহার ইত্যাদি। তাহলে সব অ্যালকোহলই কি হারাম? এ নিয়ে আমাদের মনে অসংখ্য প্রশ্ন। অ্যালকোহল সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তাদের তো কথাই নেই, যারা জানেন তাদের মনেও হাজারো প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি দেয়। সে কারণে আমাদের এবারের আলোচনা শরীয়তের দৃষ্টিতে অ্যালকোহল।

“অ্যালকোহল; পরিচিতি ও শরঈ বিধি-বিধান” এই শিরোনামে উস্তাযে মুহতারাম মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম হাফিযাহুল্লাহ আমাদেরকে মুহাযারা পেশ করেছিলেন। তখন আমি টুকিটাকি লিখে রেখেছিলাম। পরবর্তীতে শীট আকারে প্রস্তুত করার পর হুজুর পুনরায় দেখে দিয়েছিলেন। এবং কিছু কাজও দিয়েছিলেন। ফতোয়া বিভাগে খেদমত করার সুবাধে এই বিষয়ে নতুন করে আবার দৃষ্টি দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। ফলে এই বিষয়ে সময় নিয়ে অধ্যয়ন করে নতুনভাবে আবার উপস্থাপন করেছি এই শীটে।
নিম্নে প্রথমে অ্যালকোহলের জেনারেল পরিচিত তুলে ধরা হল। অতঃপর শরঈ দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করা হয়েছে।
অ্যালকোহল বিষয়ে এই প্রবন্ধ আমার প্রাথমিক গবেষণা। তাই ভুলত্রুটি হওয়াটাই স্বাভাবিক। পাঠকের দৃষ্টিতে কোন ভুল নজরে এলে দয়া করে আমাকে জানানোর জন্য বিশেষ অনুরোধ রইল।

অ্যালকোহল পরিচিতি

অ্যালকোহল: রসায়নে অ্যালকোহল বলতে এমন সব জৈব যৌগকে বোঝায়, যাদের হাইড্রক্সিল কার্যকারী গ্রুপটি একটি অ্যালকাইল বা অ্যারাইল গ্রুপের কার্বনের সাথে একটি বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
অথবা, অ্যালকোহল হলো সে সব যৌগ, যা কিনা হাইড্রোকার্বনের এক বা একাধিক হাইড্রোজেন পরমানুকে অনুরূপ সংখ্যক হাইড্রক্সিলমূলক (OH) দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলে যা পাওয়া যায়। যেমন,
CH4 (মিথেন) মিথাইল অ্যালকোহল CH3-CH3(ইথেন) ইথাইল অ্যালকোহল। CH3-CH3-CH3(প্রোপেন) প্রোপোইল অ্যালকোহল।
কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রেই অ্যালকোহল বলতে ইথাইল অ্যালকোহলকেই বোঝানো হয়েছে। অন্যান্য অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ নাম ব্যবহার করলেও অ্যালকোহলের আলোচনায় শুধুমাত্র ইথাইল অ্যালকোহল নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
অপরদিকে অ্যালকোহল শব্দটি আরবি শব্দ “আল-কুহ” থেকে এসেছে। যার অর্থ সাধারণভাবে ইথানল। ইথানল বর্ণহীন এক ধরণের উদ্বায়ী তরল যা গাঁজনের মাধ্যমে আখ থেকে তৈরি করা যায়।

অ্যালকোহলের শ্রেণীকরণ: অ্যালকোহলকে বিভিন্নভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা যেতে পারে। (ক) হাউড্রোক্সিমূলকের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে যথাক্রমে ১. মনোহাইড্রিক অ্যালকোহল। যেমন: মিথানল ও ইথানল। ২. ডাইহাইড্রিক অ্যালকোহল। যেমন: ইথিলিন গ্লাইকল। ৩. ট্রাইহাইড্রিক অ্যালকোহল। যেমন: গ্লিসারিন। ৪. পলি হাইড্রিক অ্যালকোহল। (খ) হাইড্রোক্সিমূলকের অবস্থান অনুসারে যথাক্রমে:- প্রাইমারি (১ ডিগ্রি), সেকেন্ডারি (২ ডিগ্রি) ও টারসিয়ারি (৩ডিগ্রি) অ্যালকোহল।

সাধারণ অ্যালকোহল: সবচাইতে সরল ও বহুল ব্যবহৃত অ্যালকোহলের মধ্যে মিথানল ও ইথানল উল্লেখযোগ্য। ইথানল ও মিথানল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

মিথানলের পরিচয়: মিথানল হালকা, উদ্বায়ী, দহনশীল ও বর্ণহীন তরল। ইথানলের মত গন্ধ থাকলেও মিথানল পানযোগ্য নয়। এটি খুবই বিষাক্ত এবং হজমের অনুপযোগী। এন্টিফ্রিজ, দ্রাবক, জ্বালানী হিসেবে মিথানল ব্যবহার করা হয়।

ইথানলের পরিচয়: ইথানল যা ইথাইল অ্যালকোহল নামে পরিচিত এক প্রকার অ্যালকোহল। এটি দাহ্য, স্বাদবিহীন, বর্ণহীন, সামান্য বিষাক্ত ও বিশিষ্ট গন্ধযুক্ত। এবং অধিকাংশ মদ এর প্রধান উপাদান। এর এমন একটা গন্ধ আছে যা বেশ মধুর। পাতলা জলীয় দ্রাবনে এটি মিষ্টি গন্ধের, কিন্তু ঘন দ্রবনে এর গন্ধ কিছুটা জ্বালার সৃষ্টি করে। এতে ৯৯% বিশুদ্ধ অ্যালকোহল থাকে।
মদ, বিয়ার, হুইস্কি, ব্রান্ডি প্রভৃতি পানীয় ইথাইল অ্যালকোহল হতে প্রস্তুত করা হয়। এ পানীয়সমূহ প্রকৃতপক্ষে ইথাইল অ্যালকোহলের বিভিন্ন ঘনমাত্রার জলীয় দ্রবণ বিশেষ। এসকল পানীয়ের উপর প্রচুর আবগারী শুল্ক দিতে হয়। তাই এগুলো অত্যন্ত মহার্ঘ।
অনেক সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা বাজার হতে সস্তা দামের ইথাইল অ্যালকোহল কিনে এর সঙ্গে প্রয়োজন মত পানি মিশ্রিত করে দামী বাণিজ্যিক মদের বিকল্প হিসেবে পান করে।

ইথানল নামকরণ: রসায়নের নামকরণের আন্তর্জাতিক সংস্থা এর নিয়ম অনুসারে ইথানলের নামকরণ করা হয়েছে। ইথানলের অনুতে দুটি কার্বন থাকায় পূর্বপদে ‘ইথ’ এবং হাইড্রোক্সিল মূলকের উপস্থিতির কারণে পরপদে ‘অল’ ব্যবহার করা হয়েছে।
১৮৩৪ সালে জার্মান রসায়নবিদ জাস্টান ফন লিয়েবেগ প্রথম ইথাইল শব্দটি ব্যবহার করেন। ইথাইল শব্দটি ফরাসি শব্দ ‘ইথার’ এবং গ্রিক শব্দ ‘হাইল’ সমন্বয়ে গঠিত। ফারসি ভাষায় ইথার বলতে সেই পদার্থকে বোঝায় যা কক্ষ তাপমাত্রায় বাষ্পীভূত হয় এবং গ্রিক ভাষায় হাইল অর্থ বস্তু বা পদার্থ।
১৮৯২ সালে জেনেভা, সুইজারল্যান্ডেঅনুষ্ঠিত রসায়নিক নামকরণের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইথানল নামটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
রসায়নের পরিভাষায় অ্যালকোহল বলতে একটি রাসায়নিক পদার্থের গ্রুপকে বোঝালেও প্রচলিত অর্থে সাধারণ মানুষ অ্যালকোহল বলতে ইথানলকে বোঝায়।

বিভিন্ন রকমের ইথানল:

রেক্টিফাইড স্পিরিট: ইথানলের ৯৫.৬% ইথানল ও ৪.৪% পানির সমস্ফুটন মিশ্রণকে রেক্টিফায়েড স্পিরিট বলে।
মেথিলেটেড স্পিরিট (Methylated sprit): ঔষধ ও খাদ্য শিল্প ব্যতীত অন্য শিল্পে ব্যবহৃত রেক্টিফায়েড স্পিরিট সামান্য মিথানল যোগে বিষাক্ত করে ব্যবহার করা হয়, তাকে মেথিলেটেড স্পিরিট বলে।
ইথানল একমাত্র অ্যালকোহর যা পানীয় হিসেবে পান করা যায়। অধিক পরিমাণ ইথানল পান বিষক্রিয়া প্রদার্শন করে। রেকটিফাইড স্পিরিটকে বা শিল্পে ব্যবহৃত ইথানলকে মানুষের পানের অযোগ্য করার জন্য এতে নানা রকম বিষাক্ত পদার্থ যেমন মিথানল (৪%), বেনজিন, পিরিডন (দুর্গন্ধযুক্ত) এবং সামান্য পরিমাণ রঙিন পদার্থ সতর্ক-সংকেত ( as Warning) হিসাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মিথানল মিশ্রিত এ ধরণের রেকটিফাইড স্পিরিটকে মেথিলেটেড স্পিরিট বলে। একে ডিনেচারড অ্যালকোহলও (Denatured alcohol) বলা হয়ে থাকে।

অ্যালকোহলের শিল্পোৎপাদন:
মিথানল: মিথানল সম্পৃক্ত মনোহাইড্রিক অ্যালকোহল গোত্রের প্রথম অ্যালকোহল। প্রকৃতিতে মিথানল এস্টার হিসাবে পাওয়া যায়। এক সময় কাঠের বিধ্বংসী পাতনের মাধ্যমে এ অ্যালকোহল উৎপাদিত হতো বলে এর আরেক নাম উড স্পিরিট (ডড়ড়ফ ঝঢ়রৎরঃ)।

ইথানল: সম্পৃক্ত অ্যালকোহল গোত্রের দ্বিতীয় সদস্য হচ্ছে ইথানল যা অ্যালকোহল হিসাবে সমধিক পরিচিত। প্রাপ্ত কাঁচামালের আমদানীর উপর ভিত্তি করে নানা পদ্ধতিতে ইথানল উৎপন্ন করা হয়। ফারমেন্টেশন বা গাঁজন পদ্ধতিতে শ্বেতসার বা চিটাগুড় হতে অ্যালকোহল প্রস্তুত করা হয়।

ইথানল উৎপাদন:
প্রাচীনকাল থেকেই আখের রস গেঁজিয়ে ইথানল তৈরীর পদ্ধতি চালু আছে। আজও পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত ইথানল এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত অর্ধেকের বেশি ইথানল এই পদ্ধতিতে তৈরী করা হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে আখ, মিষ্টি বাজরা, আঙ্গুর, বিট, চাল, গম, আলু, ভূট্টা ও আপেল থেকে গাঁজন পক্রিয়ায় অ্যালকোহল প্রস্তুত করা হয়। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمِن ثَمَرَاتِ النَّخِيلِ وَالأَعْنَابِ تَتَّخِذُونَ مِنْهُ سَكَرًا وَرِزْقًا حَسَنًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَةً لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
এছাড়া চিনি শিল্পের উপজাত উৎপাদন চিটাগুড় থেকে একই পক্রিয়ায় ইথানল পাওয়া যায়। নিম্নে কয়েকটি পদ্ধতি তুলে ধরা হল:-
১. শ্বেতসার হতে ইথানল উৎপাদন: শ্বেতসার জাতীয় পদার্থ যেমন- আলু, চাল, গম, বার্লি ইত্যাদি থেকে ইথানল প্রস্তুত করা হয়।
২. চিটাগুড় বা মোলাসেস থেকে ইথানল উৎপাদন: ইক্ষুরস গাঢ় করে তা থেকে চিনি কেলাসিত করার পর যে গাঢ় বাদামী বর্ণের সিরাপী তরল পাওয়া যায়, তাকে চিটাগুড় বলে। সেই চিটাগুড় থেকে ইথানল প্রস্তুত করা হয়।
৩. রেকটিফাইড স্পিরিট থেকে বিশুদ্ধ ইথানল: রেকটিফাইড স্পিরিট (৯৫.৬% ইথানল ও ৪.৪% পানির সমস্ফুট মিশ্রণ) চুনসহ (ঈধঙ) রিফ্লাক্স করে এবং শেষে পাতন করলে পাতিত তরল রূপে ৯৯.৫% বিশুদ্ধ অ্যালকোহল পাওয়া যায়। এ অ্যালকোহলকে অনার্দ্র অ্যালকোহল (অহযুফৎড়ঁং ধষপড়যড়ষ) বা নির্জন বা পরমা অ্যালকোহল (অনংড়ষঁঃব ধষপড়যড়ষ) বলে।
বাংলাদেশের দর্শনায় কেরু এন্ড কেরু কোম্পানীতে ইথানল প্রস্তুত করে দেশীয় ও বিদেশী চাহিদা পূরণ করা হয়।

অ্যালকোহলের ব্যবহার:

মিথানল:
(ক) ফরমালিন বা মিথান্যাল ও মিথাইলেটেড স্পিরিটের শিল্পোৎপাদনে মিথানল ব্যবহৃত হয়।
(খ)সেলুলোজ নাইট্রেট একমাত্র শিথানলে দ্রবণীয়। তাই মিথানল সেলুলয়েড, গান-কাটন ইত্যাদির
প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়।
(গ) মোটরযানে জমাট নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
(ঘ) ইথানলকে পান-অযোগ্য করার জন্য বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ইথানল:
ইথানল একমাত্র অ্যালকোহল যা পানীয় হিসেবে পান করা যায়।ইথানলের বিশেষ স্বাদের জন্য মানুষ তা গ্রহণ করে। ইথানল শক্তি বর্ধক হিসেবে কাজ করে না। বরং দেহ ও মনে অবসাদ এনে দেয়। তবে অধিক পরিমাণ ইথানল পান বিষক্রিয়া প্রদর্শন করে।
ইথানলকে প্রধানত পারফিউম, কসমেটিক্স ও ঔষধ শিল্পে দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেডের ইথানলকে ঔষধ শিল্পে এবং রেকটিফায়েড স্পিরিট হোমিও ঔষধে ব্যবহার করা হয়। পারফিউমে ইথানল ব্যবহারের পূর্বে তাকে গন্ধমুক্ত করা হয়। এছাড়াও রয়েছে ইথানলের অন্যান্য ব্যবহার:-
(১) ইথানল ও মিথানল ‘মিথাইলেটেড স্পিরিট’ হিসেবে বার্নিস ও রঙ তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও নানা রকম জৈব যৌগ প্রস্তুতিতে অ্যালকোহল প্রাথমিক বিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ঔষেধে ইথানল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
(২) জ্বালানী হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ইথানল ও বেনজিনের নির্দিষ্ট অনুপাতের মিশ্রণ মটর গাড়ীর জ্বালানী রূপে ব্যবহার করা যায়। শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় বলে এ জাতীয় মিশ্রণকে “পাওয়ার অ্যালকোহল” (চড়বিৎ ধষপড়যড়ষ) বলে।
(৩) অ্যালকোহলীয় পানীয় যেমন বিয়ার, ওয়াইন, পোর্ট, মেরী, হুইস্কি, জিন, ব্র্যান্ডি, রাম ইত্যাদিতে ইথানল বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত থাকে। তাই অ্যালকোহল দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অ্যালকোহল ব্যবহার; শরঈ দৃষ্টিভঙ্গি

একজন মুসলমান মাত্রই তাকে শরীয়তের পরিপূর্ণ অনুসারী হতে হবে। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান এ সকল ক্ষেত্রেই তাকে হালাল হারামের বিষয়টি মেনে চলতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ ادْخُلُواْ فِي السِّلْمِ كَآفَّةً وَلاَ تَتَّبِعُواْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
“ হে মুমিনগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের স্পষ্ট শত্রæ।” সূরা:বাকারাআয়াত নং ২০৮
অপর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“হে নবী! আল্লাহ তা’আলা আপনার জন্য যা হালাল করেছেন, তা কেন আপনি হারাম করছেন।” সূরা:তাহরীমআয়াত নং ০১
বর্তমান মুসলিম সমাজে এই দু’টি বিষয় উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেউ কেউ তো মুসলিম হওয়া সত্তে¡ও হালাল হারামের বিষয়টি তোয়াক্কা করছে না। আবার অনেক ধার্মিক মুসলমান না জানার কারণে হালাল বিষয়কেই হারাম অথবা হারাম বিষয়কে সাব্যস্ত করে এর থেকে বেঁচে থাকছেন। অথচ এ দু’টোর কোনটাই কাম্য নয়।
অ্যালকোহলের ব্যাপারেও ঠিক তেমনটাই হচ্ছে। অনেকে তো অ্যালকোহলের বাহ্যিক ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত অ্যালকোহল পানও করে যাচ্ছে। অপরদিকে ধার্মিক মুসলমানগণ অ্যালকোহল থেকে নিজেদেরকে পুরোপুরি মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন। খুব কম সংখ্যক মুমিন বান্দা রয়েছেন যারা জেনেশুনে শরীয়ত অনুযায়ী আমল করছেন।
তাই পাঠকের সুবিধার্থে অ্যালকোহলের শরঈ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিম্নে বিশদ আলোচনা করা হল।
অ্যালকোহর ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ: সামষ্টিভাবে অ্যালকোহলের ব্যবহারকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১. চিকিৎসা ও ঔষধ তৈরীতে অ্যালকোহল ব্যবহার।
২. খাবার ও পানীয়তে অ্যালকোহল ব্যবহার।
৩. অ্যালকোহলের বাহ্যিক বিবিধ ব্যবহার। যেমন: আতর, সেন্ট, রং ও কালি ইত্যাদি।

চিকিৎসা ও ঔষধ তৈরীতে অ্যালকোহল ব্যবহার

আধুনিকাতার এই যুগে চিকিৎসা শাস্ত্রে অনেক উন্নতি সাধণ হয়েছে। ফলে বেড়েছে অ্যালকোহলের ব্যবহার। এমনকোন ঔষধ পাওয়া যাবে না যাতে অ্যালকোহল নেই। মেডিসিন তৈরীতে ব্যবহার করা না হলেও পিজারভেটিভ হিসেবে তো অবশ্যই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমাদের জানা নেই অ্যালকোহল মিশ্রিত এই ঔষধ ব্যবহারের বিধান কি?
চিকিৎসা ও ঔষধ তৈরীতে অ্যালকোহলের ব্যবহার নিয়ে চার মাযহাবের মতভিন্নতা রয়েছে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী অ্যালকোহল ব্যবহারের বিধানটা খুবই সহজ। কেননা, আঙ্গুর এবং খেজুর ছাড়া অন্য কিছু থেকে তৈরী অ্যালকোহল ইমামে আ’যম আবু হানীফা রহ. এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর নিকট হালাল, যদি তা নেশা সৃষ্টি না করে। অর্থাৎ ততটুকু পরিমাণ গ্রহণ করা যাবে যতটুকু করলে নেশার সৃষ্টি করে না। আর বর্তমান যুগে ঔষুধে ব্যবহৃত অ্যালকোহল আঙ্গুর এবং খেজুর থেকে তৈরী করা হয় না। বরং গম, যব ভুট্টা, তথা বিভিন্ন শস্যদানা ও পেট্রোল ইত্যাদি থেকে প্রস্তুত করা হয়। তদ্রুপ পানিতে এক প্রকার পোকার চাষ হয় যা অনুবীক্ষণযন্ত্র ব্যতীত দেখা যায় না। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রদানের মাধ্যমে এগুলোর পরিচর্যা করা হয়, নির্ধারিত সময়ের পর নিংড়িয়ে ও নিস্কাশনে ঐ পোকা থেকে রস বের করে অ্যালকোহল তৈরী করা হয়। কারণ, এতে আঙ্গুর, খেজুর ও বিভিন্ন শষ্য দানা থেকে অ্যালকোহল তৈরী করার তুলনায় খরচ অনেক কম হয়।
সুতরাং চিকিৎসা ও ঔষুধ তৈরীতে ব্যবহৃত অ্যালকোহল যদি আঙ্গুর ও খেজুর ভিন্ন অন্যকিছু থেকে প্রস্তুত করা হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা ইমামে আ’যম আবু হানীফা রহ. এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর নিকট বৈধ। তবে শর্ত হলো, তা নেশা সৃষ্টি করে সে পরিমাণের চেয়ে কম হতে হবে।
চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কারণে বর্তমানে আবু হানীফা রহ. ও আবু ইউসুফ রহ.-এর মতানুযায়ী ফতোয়া প্রদান করা যেতে পারে।
অপরদিকে যে অ্যালকোহল আঙ্গুর ও খেজুর থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে, তা সাধারণভাবে চিকিৎসার কাজেও ব্যবহার করা বৈধ নয়। কারণ, হালাল বস্তু দ্বারা চিকিৎসা সম্ভব হলে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা জায়েয নেই। হালাল বস্তু দ্বারাচিকিৎসা সম্ভব না হলে হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা বৈধ। তবে এর জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। যথা:
১. রোগ এমন মারাত্মক হওয়া যা বরদাশত করা সম্ভব নয়।
২. মুসলমান বিজ্ঞ ডাক্তারগণ একথা বলতে হবে যে, কোন হালাল বস্তু দ্বারা এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব নয়।
৩. এ হারাম বস্তুই তার জন্য একমাত্র চিকিৎৎসা। তখন চিকিৎসার জন্য হারামের আশ্রয় গ্রহণ করা জায়েয। আদ্দুররুল মুখতারে বলা হয়েছে, “হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা করা বৈধ। যদি এর মধ্যে আরোগ্য আছে বলে জানা যায় এবং এ ছাড়া অন্য কোন ঔষধ জানা না থাকে।

এখানে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল, আঙ্গুর ও খেজুর থেকে প্রস্তুতকৃত অ্যালকোহলকে যখন ঔষধ ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হবে তখন দেখতে হবে অ্যালকোহল মেশানোর পর তার আসল সত্তা বা মূল উপাদান অবশিষ্ট থাকে কি না। এ সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুফতি তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহ তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘বুহুছ ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআছারা’ গ্রন্থে লেখেন, “এখানে আরেকটি দিক রয়েছে আর তা হল, অভিজ্ঞ রসায়নবিদ তথা ঔষুধ প্রস্তুতকারকদেরকে জিজ্ঞেস করা চাই যে, এ সমস্ত অ্যালকোহল বিভিন্ন ওষুদের সাথে মেশানোর পর তার আসল সত্তা বহাল থাকে, না কি ওষুধের সাথে সংমিশ্রণের ফলে তার মূল সত্তা বিলূপ্ত হয়ে যায়। যদি ওষুধের সাথে মেশানোর পর তার মূল সত্তা অবিশিষ্ট ও বহাল না থাকে, (আর অবশিষ্ট না থাকাই স্বাভাবিক) তাহলে ঐ অ্যালকোহল আর অ্যালকোহল থাকে না। বরং ভিন্ন কোন বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়। তখন তা ব্যবহার করা ও খাওয়া সকর ইমামাদরে নিকট সম্পূর্ণরূপেট জায়েয। কেননা, মদ সির্কা হয়ে গেলে বাস্তব সত্তা পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার কারণে তা পান করা সকলের নিকট জায়েয হয়ে যায়। খ.১ পৃ.৩৪১;
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বর্তমানের ‘ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রেডের ইথানলকে’এলোপ্যাথিক ঔষধ শিল্পে এবং ‘রেকটিফায়েড স্পিরিট’ হোমিও ঔষধে ব্যবহারের হুকুমও প্রতীয়মান হয় যে, যদি বাস্তবে অ্যালকোহলের মিশ্রণ ব্যতীত কোন ঔষুধ ভাল না থাকে এবং যথাযথ ক্রিয়া ও প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তাহলে প্রয়োজনের খাতিরে অ্যালকোহল মিশ্রিত ওষুধ ব্যবহার করা শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ হবে না।

খাবার ও পানীয়তে অ্যালকোহল ব্যবহার

অ্যালকোহল কখনও সরাসরি কখনও প্রসেসিংয়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন, পেকটিন, ভিটামিন্স, হরমোন্স, এন্টিবায়েটিক, এলকায়েড এবং ব্লাড প্রোডাক্ট প্রভৃতি দ্রব্য প্রসেসিংয়ে ঝ.উ অষপড়যড়ষ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মূল পদার্থে অ্যালকোহলের কোন উপস্থিতি থাকে না। অপরদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বৈশিষ্ট বজায় থাকে। যেমন, ক্লিনিং সলিউশন, ভিনেগার,External Pharmaceuticals ইত্যাদি।
খাবার ও পানীয়তে যে অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়, তা কোন কোন ক্ষেত্রে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর কোন কোন ক্ষেত্রে পিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে এসকল খাবার ও পানীয় গ্রহণের বিধান কি হবে এ নিয়ে খোদ ইমামে আ’যম আবু হানীফা রহ.-এর সাথে ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতবিরোধ রয়েছে।
খাবার ও পানীয়তে অ্যালকোহল মেশানোর পর দেখতে হবে তার আসল সত্তা বহাল থাকে, না কি খাবার ও পানীয়ের সাথে সংমিশ্রণের ফলে তার মূল সত্তা বিলূপ্ত হয়ে যায়। যদি খাবার ও পানীয়ের সাথে সংমিশ্রণের পর তার মূল সত্তা অবিশিষ্ট ও বহাল থাকে, তাহলে ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মত হল, যতুটুক গ্রহণ করলে নেশা সৃষ্টি হবে না, ততটুকু গ্রহণ করা বৈধ। অ্যালকোহেলিক বেভারেজ যেমন, বিয়ার, ওয়াইন, স্পিরিট ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে।
জুমহুর হানাফী ফকীহগণ আবু হানীফা রহ.-এর মতানুযায়ী ফতোয়া প্রদান করেন না। বরং এক্ষেত্রে ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মত গ্রহণ করেন। তা হচ্ছে, ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল যা নেশাকর পানীয়তে এবং খাবারে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সংমিশ্রণের পর তার মূল সত্তা অবিশিষ্ট ও বহাল থাকে, তা সামান্য পরিমাণও হারাম হিসেবে বিবেচিত হবে। কম-বেশি কোনরূপ পার্থক্য করা হবে না।
সুতরাং আমরা বলতে পারি,খাবার ও পানীয়তে অ্যালকোহল সংমিশ্রণের পর তার মূল সত্তা যদি অবিশিষ্ট ও বহাল থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা বৈধ নয়। কম হোক চাই বেশি হোক।
অপরদিকে যদি খাবার ও পানীয়তে অ্যালকোহল সংমিশ্রণের পর তার মূল সত্তা অবিশিষ্ট ও বহাল না থাকে, তাহলে ঐ অ্যালকোহল আর অ্যালকোহল থাকে না। বরং ভিন্ন কোন বস্তুতে পরিণত হয়ে যায়। তখন তা ব্যবহার করা ও খাওয়া সকল ইমামাদের নিকট সম্পূর্ণরূপে জায়েয। যেমন, বিস্কুট, কফি, চকলেট, কোল ড্রিংক ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য এগুলোর সাথে অ্যালকোহল সংমিশ্রণ করা হয়ে থাকে।

অ্যালকোহলের বাহ্যিক ব্যবহার

অ্যালকোহলের বহিরাগত ব্যবহারের বিধান নির্ভর করে অ্যালকোহল পবিত্র-অপবিত্র হওয়ার উপর। অর্থাৎ যে উপাদান থেকে অ্যালকোহল তৈরী করা হচ্ছে তা পাক নাকি নাপাক তা বিবেচ্য বিষয়। নেশা জাতীয় হওয়ার বিষয়টি এখানে কোনরূপ ভূমিকা রাখবে না।
আর বর্তমানে যে ধরণের অ্যালকোহল আতর, পারফিউম, সেন্ট, প্রসাধনী, রঙ ও কালি ইত্যাদিতে ব্যবহার হয়, তা সাধারণত আঙ্গুর ও খেজুরের নির্যাস থেকে প্রস্তুত করা হয় না। বরং তা আখ, মিষ্টি বাজরা, চাল, গম, আলু, ভূট্টা, আপেল ও পেট্রোল ইত্যাদি থেকে গাঁজন পক্রিয়ায় অ্যালকোহল প্রস্তুত করা হয়। এ ধরণের অ্যালকোহল ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতানুসারে নাপাক ও হারাম নয়। তাই ব্যাপক প্রচলনের কারণে এর ব্যবহার নাজায়েয বা হারাম হবে না।
আধুনিকতার এই যুগে উল্লিখিত বস্তুসমূহ থেকেও অ্যালকোহল খুব কমই বানানো হয়। বরং পানিতে এক প্রকার পোকার চাষ হয় যা অনুবীক্ষণযন্ত্র ব্যতীত দেখা যায় না। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রদানের মাধ্যমে এগুলোর পরিচর্যা করা হয়, নির্ধারিত সময়ের পর নিংড়িয়ে ও নিস্কাশনে ঐ পোকা থেকে রস বের করে অ্যালকোহল তৈরী করা হয়। কারণ, এতে আঙ্গুর, খেজুর ও বিভিন্ন শষ্য দানা থেকে অ্যালকোহল তৈরী করার তুলনায় খরচ অনেক কম হয়।
উক্ত অ্যালকোহল যেহেতু পানিতে বসবাসকারী প্রাণী থেকে তৈরী করা হয়, তাই তা নাপাক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কেননা, পানিতে বসবাসকারী সকল জীবিত ও মৃত প্রাণী সর্বাবস্থায় পাক ও পবিত্র। আর আমরা পূর্বে বলে এসেছি যে,অ্যালকোহলের বহিরাগত ব্যবহারের বিধান নির্ভর করবে যে উপাদান থেকে অ্যালকোহল তৈরী করা হচ্ছে তা পাক নাকি নাপাক তার উপর। যেহেতু উপাদান পাক তাই তা বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করাও বৈধ এবং জায়েয।
হাঁ, তবে যদি কোন পণ্যের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, তাতে ব্যবহৃত অ্যালকোহল আঙ্গুর অথবা খেজুর থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে, তাহলে তা ব্যবহার করা যাবে না।

লেখক :  মুশরিফ, ফতোয়া বিভাগ
জামিয়া কাসিমিয়া দারুল উলূম, ভুঁইগড়, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ