করোনা ভাইরাস : কিছু ব্যথার দান

580

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : গোটা পৃথিবীবাসী এক কঠিন সময় পার করছে। দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। দেশের পর দেশ লক ডাউন হয়ে যাচ্ছে। দেশে দেশে মানুষ গৃহবন্দী থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এসব কষ্টের খবরের মধ্যেও এ কথা স্বীকার করতেই হবে, করোনা ভাইরাস আমাদের মধ্যে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও এনেছে। কুরআন মাজিদে এসেছে, কখনো এমন হয়, একটা জিনিস তোমরা অপসন্দ কর অথচ সেটি তোমাদের জন্য ভাল। একটা জিনিস তোমরা পসন্দ কর অথচ সেটি তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন তোমরা জান না।

করোনা ভাইরাসের ফলে আগত  ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে  যেমন আছে কিছু দ্বীনী পরিবর্তন, তেমনি দুনিয়াবীও পরিবর্তনও আছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্বে ক্ষতিকর তাপমাত্রা  কিছু সময়ের জন্যে হলেও কমছে। ভেনিসে নদীর পানি এখন এমন স্বচ্ছ হয়েছে যে  সেখানে এখন মাছও দেখা যায়। কিন্তু এর চেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন  মানুষের ধর্মীয় জীবনে এসেছে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট আলেম  নারায়ণগঞ্জ কাশিফুল উলুম মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মামুন। .

মুফতি মামুন বলেন, হাদীসে এসেছে, মুমিনের বিষয় বড় আশ্চর্যজনক। ভালোমন্দ সুখদুখ সবকিছুই তার জন্যে কল্যাণ কর।  যদি তার বিপদ আসে আর সে সবর করে  তাহলে সেটাও তার জন্যে কল্যাণ বয়ে আনে। আর যদি কোনো সুখ আসে আর সে শোকর করে তাহলে সেটাও তার জন্যে তার কল্যাণকর হয়।

নিঃসন্দেহে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এটি আল্লার পক্ষ থেকে অনেক বড় পরীক্ষা। এতে   আল্লাহর অনেক হিকমত লুকায়িত আছে। তবে খালি  চোখে এর যে ইতিবাচক ফলাফল দেখতে পাই তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যোগ করেন মুফতি মামুন।

মুফতি মামুন বলেন, আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে এর মাধ্যমে শাহাদাতের মর্যাদা দিচ্ছেন। নি:সন্দেহে শাহাদাতের মৃত্যু প্রত্যেক মুসলমানের কামনার বিষয়। মরতে তো হবেই। কিন্তু শাহাদাতের মৃত্যু নসীব হওয়া তো অনেক সৌভাগ্যের।

এই পরিস্থিতির দ্বিতীয় যে উপকারিতা আমার নজরে আসছে, তা হল,  এর মধ্য দিয়ে আমরা ঈমান নবায়নের সুযোগ পাচ্ছি। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে বলেছেন তোমরা তোমাদের ঈমানকে তাজা কর। সাহাবাগণ বললেন, আমরা কীভাবে ঈমানের নবায়ন করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বেশী করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর যিকির কর।

শোনা যায়, করোনা ভাইরাস এর আকৃতি, এটি চাল বা গমের দানার  এক লক্ষ ভাগের এক ভাগও না। অত্যাধুনিক  যন্ত্র দিয়েও এটা  দেখা যায় না। কিন্তু  এর ভয়ে সারা বিশ্ব নেতৃবৃন্দ,  যারা মুহুর্তে বড় বড় দেশ ধংস করে দিতে পারে বলে  অহংকার করে তারা আজ তটস্থ।

এই পরিস্থিতির আরেকটি ইতিবাচক দিক,  আমরা মৃত্যুকে বেশী বেশী স্মরণ করছি। হাদীস শরীফে এসেছে, তোমরা সকল স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুর কথা বেশী বেশী স্মরণ কর। সাহাবায়ে কেরাম ও বুজুর্গদের একটা কাজই ছিল মৃত্যুকে স্মরণ করা। হযরত আবু বকর র. বলতেন, মৃত্যুকে  স্মরণ কর। জুতার ফিতার চেয়ে বেশি কাছে  মৃত্যু।  এই ভাইরাস আমাদেরকে আবার মনে করিয়ে দিল ইসলামের  এই শিক্ষা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। আমরা দুনিয়া নিয়ে অনেক বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছি।

এই পরিস্থিতির তৃতীয় আরেকটি ইতিবাচক দিক, আমরা তাকদীরের শিক্ষা নতুনভাবে লাভ করেছি। ছোট বেলা সবাই শিখেছি, ভাল মন্দ যা কিছু হয় সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়।  এর গভীর মর্ম বুঝিনি। আর যখন বুঝার বয়স হয়েছে তখন আমরা দুনিয়ার কাজে এত বেশী লিপ্ত হয়ে গেছি যে এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি।  এই এক ব্যাধির কারণে আবার আমাদের মধ্যে তাকদিরের উপর  বিশ্বাস রাখার শিক্ষা ফিরে এসেছে। একজন মুসলমানের  এ বিশ্বাস রাখতেই হবে যে, এ ভাইরাসের কোনো ক্ষমতা  নেই।  যা কিছু হচ্ছে সব আল্লাহর ফায়সালা মোতাবেক হচ্ছে। এবং তার ফায়সালার উপর রাজি থাকার মধ্যেই আমাদের কামিয়াবি।

তবে আমার কথার অর্থ এই নয়, আমরা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করব না। বরং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ তো ইসলামের আরেক শিক্ষা। এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ইসলামের অজু গোসল হালাল হারাম ইত্যাদি বিধানের মহিমাও ফুটে ওঠেছে।

নিঃসন্দেহে  এ পরিস্থিতি আল্লাহর বিরাট এক পরীক্ষা। এটাকে  ঢালাওভাবে আযাব বলার সুযোগ নাই। মুমিন আক্রান্ত হলে আযাব বলার সুযোগ নেই। মুমিনের পায়ে কাটা বিধলেও গোনাহ মাফ হয়। তবে কাফেরদের জন্যে এটি শাস্তি। একজনের  মুমিনের আক্রান্ত হওয়া আর একজন কাফেরের আক্রান্ত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ তারাও ব্যাথা পায় যেভাবে তোমরা ব্যাথা পাও। তবে তোমরা আল্লাহর কাছে যে আশা করতে পার তারা সে আশা করতে পারে না।’

আল্লাহ তাআলার কাছে মুমিন বান্দার জন্যে একটা মর্যাদা ঠিক করা থাকে, যেভাবে দাওয়াত দিলে আমরা একেকজনের জন্যে একেক আসন ঠিক করে রাখি। তো কোনো মুমিন যখন তার আমালের মাধ্যমে সেই মর্যাদা লাভে সক্ষম না হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বিভিন্ন বালা মুসিবত দিয়ে সে মর্যাদার উপযুক্ত করে দেন।

এ পরিস্থিতির আরেকটি ইতিবাচক দিক হল, এর উসিলায় রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখান দোয়াগুলো, যা দুনিয়া আখেরাতে আমাদের রক্ষাকবচ,   আবার চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছি। সকাল সন্ধ্যায় আমরা হেফাজতের দোয়া পড়ার প্রতি মনোযোগী হচ্ছি। শুধু মহামারিই নয়, সাধারণ অবস্থাতেও নিরাপদ ও সুস্থ জীবন লাভের জন্যে রাসূল সাল্লাল্লহু আলাহি ওয়া সাল্লামের শেখানো দোয়াগুলো  ছাড়া আমাদের জন্যে বিকল্প কিছু নেই।

সবশেষে আমি আবেদন করব, আমরা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হই। সব সময় অজু অবস্থায় থাকি। কারো সাথে মুসাফাহা না করি। সালাম দেয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। বেশী করে তওবা এস্তেগফার করি। দান খয়রাত করি। নেক কাজ করি। কেউ আক্রান্ত হলে তার দিকে বাকা চোখে না দেখি। তার প্রতি সহানুভূতিশীল হই। আল্লাহর তাআলার রহমতের উপর আশা রাখি।

জুমার বয়ান থেকে প্রস্তুতকৃত : এনাম হাসান জুনাইদ।।