মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রাহ : কুরআনের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ মনীষী

253

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

নূরানী পদ্ধতির মতো নাদিয়া পদ্ধতিতেও এদেশে ব্যাপক খেদমত হয়েছে। অসংখ্য মানুষ এর মাধ্যমে সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করতে শিখেছে।

উভয় পদ্ধতির প্রবর্তন কাছাকাছি সময়ে হলেও মেহনতের অঞ্চল ছিল ভিন্ন। নূরানী শুরু হয় এবং ব্যাপকতা লাভ করে চাঁদপুর, নোয়াখালীসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। নাদিয়া শুরু হয় এবং ব্যাপকতা লাভ করে শহীদ বাড়িয়া (বি. বাড়িয়া), সিলেট ও পূর্বাঞ্চলে। পরবর্তীতে উভয় পদ্ধতিই রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্র স্থাপন করে। এরপর ধীরে ধীরে সারাদেশে, হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে পৃথিবীর বহু মানুষ এই মনীষীদের মেহনতের বদৌলতে বিশুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করতে শেখে এবং কুরআনের ছায়াতলে দ্বীন ও ঈমানমুখী শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদের সকলের মেহনতকে সদকায়ে জারিয়া হিসাবে কবুল করুন। আমাদেরকে তাঁদের উত্তম উত্তরসূরি হিসাবে গ্রহণ করুন- আমীন।

নাদিয়া পদ্ধতির উদ্ভাবক হলেন হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ.। তিনি ১৯১৭ ঈসায়ী সনে শহীদ বাড়িয়া (বি. বাড়িয়া) জেলার সদর থানাধীন ভাদুঘর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা মরহুম তাজুদ্দীন ভূঁইয়া সাহেব ছিলেন বিশাল ভূ-সম্পত্তির অধিকারী, সমাজের খুবই মান্যগণ্য ও বদান্য ব্যক্তি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে তিনি অনেক সম্পত্তি ওয়াকফ করে যান। তাঁর চার ছেলে। আলতাফুদ্দীন ভূঁইয়া, আবদুর রশীদ ভূঁইয়া, আবদুস সামাদ ভূঁইয়া ও আবদুল লতীফ ভূঁইয়া। তন্মধ্যে প্রথম ছেলে জনাব আলতাফুদ্দীন ভূঁইয়া বাবার অবর্তমানে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

জনাব আলতাফুদ্দীন ভূঁইয়া সাহেব ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী ধনী, মুখলিস দ্বীনদার, প্রাথমিক দ্বীনী ও ফারসী জ্ঞানের অধিকারী একজন মহৎ মানুষ। উলামায়ে কেরামকে খুব ভালবাসতেন। তাঁদের খেদমত করতে পারাকে পরম সৌভাগ্য মনে করতেন। এছাড়া এলাকার লোকদের মাঝে দ্বীনদারী ও মহল্লায় দ্বীনী পরিবেশ তৈরির ব্যাপারে ছিলেন খুবই উৎসাহী, আগ্রহী এবং নিবেদিতপ্রাণ একজন কর্মী।

দীর্ঘ জীবন তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। বহু দুআ-মুনাজাত ও চেষ্টা তদবীরের পরও কোনো সন্তান হচ্ছিল না। একদিন তিনি সে অঞ্চলের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা ইউনুছ ছাহেব রাহ.-এর সাথে নৌকায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে মাওলানা ইউনুছ ছাহেব রাহ. ভাদুঘর বাজার থেকে গোলাপজাম কিনলেন। সেখান থেকে তিনটি গোলাপজামে দুআ পড়ে তাকে দিয়ে বললেন, ‘আলতাফুদ্দীন! এই জামগুলো থেকে একটি তুমি খাবে আর দুটি তোমার দুই স্ত্রীকে দেবে। আশা করি, আল্লাহ তাআলা তোমাকে গোলাপজামের মতো সুন্দর চেহারার ছেলে দান করবেন।’

এর কিছুদিন পর এক রাতে জনাব আলতাফুদ্দীন সাহেব স্বপ্নে দেখেন, আরবী পোশাক পরা দুটি ছেলে দূর থেকে তার দিকে দৌড়ে এসেছে। একজন কাছে এসে সালাম দিয়ে তার হাত ধরে রেখেছে। অন্যজন চলে গেছে। আশ্চর্য এই স্বপ্ন আল্লাহ্র হুকুমে সত্য হল। তার দুই স্ত্রীর গর্ভেই সন্তান এল। এক সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপর মারা গেল। আরেকজন বেঁচে রইল; যার নাম রাখা হল আবদুল ওয়াহহাব।

 

* * *

 

জনাব আলতাফুদ্দীন ভূঁইয়া সাহেব দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও দুআ-মুনাজাতের পর পাওয়া সন্তানকে হযরত মাওলানা ইউনুছ সাহেব রাহ.-এর কাছে ‘বিসমিল্লাহ পাঠে’র উদ্দেশ্যে আড়ম্বরপূর্ণ এক মজলিসের আয়োজন করেন। তাতে জামিয়া ইউনুছিয়ার আসাতিযায়ে কেরামসহ অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হন। এর কিছুদিন পর ছেলের বয়স যখন চার বছর তখন তিনি পরপারের সফরে রওয়ানা হয়ে যান।

তৎকালীন জামিয়া ইউনুছিয়ার উস্তায, হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযূর রাহ. ভূঁইয়া বাড়িতে অবস্থান করতেন। সেই সুবাদে বালক আবদুল ওয়াহহাবের কুরআন তিলাওয়াত ও প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর কাছেই সম্পন্ন হয়।

১৯২৫ সালে যখন তাঁর বয়স আট বছর, তাঁকে বি. বাড়িয়া জর্জ স্কুল (বর্তমান নিয়াজ মুহম্মদ হাইস্কুল)-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন বছর লেখাপড়া করেন তিনি। পরে এক আত্মীয় কারী আফিল উদ্দীন সরকার তাঁর তত্ত্বাবধান গ্রহণ করেন এবং নিজ গ্রাম ‘বড়াইলে’র একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। তখন কয়েক বছর তিনি তাদের কাছেই থাকেন এবং আপন সন্তানের মতোই আদর-যতেœ প্রতিপালিত হন। পরবর্তী জীবনে সেই সময়ের আদর যতেœর অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি।

১৯৩১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণি পড়া শেষ করে তিনি ঢাকার জামিয়া হুসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হন। দীর্ঘদিন ওখানে পড়াশোনা করার পর ১৯৪৫ সালে চলে যান নিজ এলাকার ‘জামিয়া ইউনুছিয়া’য়। সেখানে ভর্তি হন জামাতে পাঞ্জমে। সারাদেশে তখন ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তুঙ্গে। তিনি সেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ছাত্র জমিয়তের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এর কিছুদিন পর তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে গিয়ে ভর্তি হন। সেখানে দু’বছর লেখাপড়া করার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে চলে আসেন। পরে পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে পড়াশোনা সমাপ্ত করেন।

অল্প বয়সে বাবা হারানোর ফলে তিনি অনেকটা অভিভাবকহীন জীবন কাটান। এর প্রভাব তাঁর পড়াশোনা জীবনে যেমন পড়ে তেমনি পড়ে পারিবারিক জীবনে। বাবার বিপুল সহায়-সম্পত্তি থাকার পরও তিনি সেগুলো থেকে বঞ্চিত হন। স্নেহময়ী মা জোবায়দা খাতুন (ওরফে মেওয়ার মা) ছিলেন ইবাদতগুযার, আল্লাহওয়ালা ও দুনিয়া বিমুখ একজন বিদুষী নারী। স্বামীর সম্পত্তি উদ্ধার ও দখল করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তিনি শুধু নিজ সন্তানের জন্য রাতদিন কেঁদে কেঁদে দুআ করতে

থাকেন। হয়ত মায়ের সে দুআর ওসিলায়ই আল্লাহ তাআলা তাঁকে দ্বীনের জন্য কবুল করেছেন। তাঁর পাক কালাম কুরআন মাজীদ ও দ্বীন শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত রেখেছেন।

 

* * *

 

১৯৪৩ সালে ছাত্রজীবনেই মুফাসসির হুযূর হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ.-এর বড় মেয়ে মুসাম্মাৎ সালেহা খাতুনের সাথে তাঁর বিয়ের আকদ সম্পন্ন হয়। আকদের মজলিস অনুষ্ঠিত হয় জামিয়া ইউনুছিয়ার মসজিদে। বিয়ে পড়ান শাইখুল আরব ওয়াল আজম সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রাহ.। এ বিয়ের মাধ্যমে তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় এবং সৌভাগ্যের প্রশস্ত দরজা খুলে যায়।

তাঁর স্ত্রী ছিলেন নিজ বংশের নেক প্রভাব ধারণকারী, বিনয়ী ও ইবাদতগুযার নারী। পরবর্তীতে যার একান্ত প্রচেষ্টা ও মেহনতে বাড়িতে একটি মক্তব ও মহিলাদের উদ্দেশ্যে দ্বীনী তালীম শুরু হয়। বর্তমানে সেই মক্তবটিই বিরাট মাদরাসায় উন্নীত হয়েছে।

 

* * *

 

১৯৪৬ সালে দেওবন্দে পড়াশোনাকালে প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হযরত মাওলানা আলী আকবর ছাহেব (তাবলীগ জামাতের আমীর, বাংলাদেশ) রাহ., মাওলানা ফয়যুদ্দীন ছাহেব রাহ. ও তিনি একসাথে মেওয়াত মারকাযে শবগুযারী করতেন। তখন থেকেই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে দেশে এসে এই কাজে খুব মজবুতভাবে নিজেকে যুক্ত রাখেন। এই কাজের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে বহু সফর করেন।

১৯৬৩-৬৪ সালে তাবলীগের সফরেই প্রথম ওমরা পালন করেন। পরে উলামায়ে কেরামের এক জামাতের সাথে পবিত্র হজ্ব আদায় করেন।

দাওয়াত ও তাবলীগের সফরে তিনি যেসব দেশ সফর করেন তন্মধ্যে রয়েছে, সৌদি আরব, ওমান, ইয়ামান, পাকিস্তান, ভারত, বার্মা, লন্ডন ইত্যাদি।

১৯৭১-৭২ সালে তিনি কাকরাইল থেকে পাঠানো একটি বড় জামাতের সঙ্গে পাকিস্তানের রাইবেন্ডে ছিলেন। সেই জামাতের যিম্মাদার ছিলেন বড় হুযূর হযরত মাওলানা আবদুল আযীয রহ.। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের প্রায় আড়াইশ সাথী ছিলেন। তন্মধ্যে আলেম ছিলেন প্রায় পঞ্চাশ জন। এই বড় জামাতটিকে ছোট ছোট ১০/১৫ জনের জামাত আকারে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে এক চিল্লা বা কম বেশি সময়ের জন্য পাঠানো হতো। নির্ধারিত সময় পুরা করে আবার রাইবেন্ডে ফিরে আসত।

সেই সময় হঠাৎ বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। তখন সেখানকার মুরুব্বীগণ তাদেরকে আসহাবে কাহফের মতো নিভৃতে আমল ও দুআ মুনাজাতে মগ্ন থাকার উপদেশ দেন। দেশের এই ভয়ানক পরিস্থিতি কাটিয়ে নিজ দেশে ফেরার জন্যও দুআ করতে বলেন। এরপর আল্লাহ্র মেহেরবানীতে যুদ্ধ সমাপ্তির পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে খুব সহজে এবং বিমান ভাড়া ছাড়াই সসম্মানে তাঁদের দেশে পৌঁছার ব্যবস্থা হয়।

 

* * *

 

১৯৫২ সালের কথা। বি. বাড়িয়া জেলার এক জায়গায় কয়েকটি মক্তবের সমন্বিত আয়োজনে একটি ওয়ায মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুফাসসির হুযূর হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ. সভাপতি হিসাবে উপস্থিত হন। তিনি আসন গ্রহণ করার পর গজল পরিবেশনের অনুমতি চাওয়া হলে তিনি কুরআন মাজীদ থেকে তিলাওয়াত করতে বলেন। তখন কেউই অগ্রসর হতে চাচ্ছিল না। উপস্থিত কারী সাহেবগণও কাউকে নির্দিষ্ট করতে পারলেন না। অগত্যা একজনকে দাঁড় করালেন। সে সূরায়ে ফাতেহা তিলাওয়াত করলে দেখা গেল, তাতে অনেক ভুল। এই ঘটনায় মুফাসসির হুযূর রাহ. খুব পেরেশান হন। মক্তবগুলোর এই অবস্থা টের পেয়ে তাঁর জামাতা নবীন আলেম হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব সাহেব রাহ.-কে এই খেদমতে নিয়োজিত হওয়ার পরামর্শ দেন। কিছুদিন পর ‘মাদরাসায়ে তা‘লীমুল মুয়াল্লিমীন’ নামে একটি মক্তব চালু করেন। সেখানে মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ.-এর সঙ্গে আরও তিনজন উস্তায নিযুক্ত করেন।

মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. তাদেরকে নিয়ে এলাকার বাচ্চাদের পেছনে মেহনত শুরু করলেন। তখন প্রত্যেকদিন ছুটির পর উস্তাযদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা শুনতেন। কীভাবে সহজে এবং অল্প সময়ে কুরআন মাজীদের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শেখানো যায় সে বিষয়ে পরামর্শ ও চিন্তা-ফিকির করতেন। সেইসঙ্গে জরুরি দ্বীনী ইলম, মাসআলা-মাসায়েল, অযু, গোসল, নামায ইত্যাদি প্রশিক্ষণেরও একটি নমুনা প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেন। এভাবে দীর্ঘদিন একটানা মেহনত অব্যাহত রাখেন।

কিছুদিন পর পর নতুন অভিজ্ঞতাগুলো মুফাসসির হুযূর রাহ.-এর সামনে পেশ করলে তিনি খুব খুশি হতেন, দুআ দিতেন এবং সবকিছু আদ্যোপান্ত শুনে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতেন। এভাবে বেশ কয়েক বছরে মোটামুটি একটি খসড়া প্রস্তুত হয়। সেই খসড়া অনুযায়ী আশপাশের বিভিন্ন মক্তবে মেহনত করে করে আরও নতুন নতুন চিন্তা আসে। বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা হয়। এসব ক্ষেত্রে মুফাসসির হুযূর রাহ.-এর সার্বিক তত্ত্বাবধান অব্যাহত থাকে। এবং তাঁর মতামতের ভিত্তিতেই বিভিন্ন উসূল নির্ধারণ করা হয়। তখন তিনি প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বের হতেন। এক মসজিদে মক্তব পড়িয়ে আরেক মসজিদে যেতেন। এভাবে একই দিনে অনেকগুলো মক্তব পড়াতেন। বাড়ি থেকে বেরুবার সময় সাইকেলের পেছনে চিড়া ও গুড় নিয়ে যেতেন। এগুলো দিয়েই নাস্তা করতেন। কারো দাওয়াত কিংবা হাদিয়া গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন।

এভাবে দীর্ঘদিনের একটানা মেহনত ও সূক্ষ্মদর্শী এক বুযুর্গের নির্দেশনা, সেইসঙ্গে শেষ রাতের দুআ-মুনাজাত ও রোনাযারির পর আল্লাহ্র ফযল ও করমে প্রায় পূর্ণাঙ্গ একটি নেসাব প্রস্তুত হয়। সেই নেসাব অনুযায়ী মজবুত মেহনত হতে থাকলে একসময় মক্তবটি অন্যদের জন্যও আদর্শ হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তাতে ছাত্র সংখ্যাও অনেক বাড়তে থাকে। তখন একবার আশপাশের মাদরাসা ও এলাকার লোকজনকে দাওয়াত করে বড় আকারে শিশুশিক্ষা প্রদর্শনীমূলক একটি অনুষ্ঠান হয়।

ওদিকে মুফাসসির হুযূর রাহ. যেখানেই যান এই শিক্ষা পদ্ধতির কথা বলেন। এতে অন্যরাও এর প্রতি খুব আগ্রহী হয়। ফলে তাদেরকে নিয়ে স্বল্প পরিসরে দুটি মুয়াল্লিম প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর এই দাওয়াত সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশের অনেক উলামায়ে কেরামকে দাওয়াত করে ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি কনফারেন্স হয়। তাতে সংক্ষিপ্তাকারে শিশুশিক্ষা প্রদর্শনীও হয়। পরে সকলের সামনে দেশের কুরআনী শিক্ষার দুরবস্থা ও তার প্রতিকার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনা হয়। তখন সবাই এই নেসাবের বহুল প্রচার প্রসারের জোর প্রস্তাব পেশ করেন। ফলে এ সভাতেই একটি বোর্ড গঠন করা হয় এবং জেলার সকল দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

ছদরকে উক্ত বোর্ডের সদস্যভুক্ত করা হয়।

সেই মজলিসে সদর সাহেব হুযূর হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহ.-ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই কার্যক্রম ও বাচ্চাদের অগ্রসর পড়াশোনা দেখে খুবই মুগ্ধ হন এবং বলেন, ‘মৌলভী আবদুল ওয়াহহাবের এই কার্যক্রম আমার এত ভালো লেগেছে যে, ইচ্ছে হচ্ছে ঢাকার পল্টন ময়দানে এমন প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রদর্শনীর আয়োজন করি।’ এরপর কর্মশালা ও পাঠপদ্ধতির উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য খুব দুআ করেন।

পরবর্তীতে উলামায়ে কেরামের একটি খাস মজলিসে জামিয়া ইউনুছিয়ার সদরুল মুদাররিসীন ফখরে বাঙ্গাল হযরত মাওলানা তাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ.-কে বোর্ডের প্রধান নির্বাচন করা হয়। বোর্ডের নাম দেওয়া হয় ‘নাদিয়াতুল কুরআন’ (কুরআনের মজলিস)। তাঁর ইনতিকালের পর মুফাসসির হযূর হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ. প্রধান নির্বাচিত হন। এভাবে বোর্ডটির কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে থাকে এবং দেশ ও দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।

হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. তাঁর লিখিত ‘তালীমুল মুয়াল্লিমীন’ কিতাবের ভূমিকায় বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালার ফযল ও করমে বর্তমানে উহার কার্যক্রম দেশের সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে এবং বিভিন্ন জেলায় উহার মুয়াল্লিম ট্রেনিং সেন্টার খোলা হইয়াছে।

আসাম প্রদেশের নওগাঁ ও কাছাড় জিলায় এবং বার্মার রেঙ্গুন টাউন ও আরাকানের কোনো কোনো এলাকায় নাদিয়ার ট্রেনিংপ্রাপ্ত উস্তায পৌঁছিয়াছেন। এবং এই স্কীমানুসারে তালীম চালু করিয়াছেন। লন্ডন ফোর্ড স্কোয়ার মসজিদ, বার্মিংহাম ও লোটনে এই তরযে বেশ কিছু ফুরকানিয়া মক্তব চালু হইয়াছে। লন্ডনে ‘ব্রিটেন নাদিয়াতুল কুরআন’ নামে একটি সংস্থাও স্থাপিত হইয়াছে এবং তাহার অধীনে সেখানে কিছু ক্যাম্পও পরিচালিত হইয়াছে। আল্লাহ তাআলা মুসলিম বিশে^র প্রতিটি পল্লীতে পল্লীতে এই স্কীম চালু করিয়া কুরআনী শিক্ষার উন্নতি বিধান করুন। আমীন।’ পৃষ্ঠা : ১৮

 

* * *

 

নাদিয়া পদ্ধতির শিক্ষার্থীকে প্রথমে মুখে উচ্চারণ করে করে আরবী হরফগুলো মুখস্থ করানো হয়। বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ শেখার পর বোর্ডে লিখে হরফগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় ধাপে তাঁর হাতে দেওয়া হয় ‘নাদিয়াতুল কুরআন কায়েদা’। তবে কায়েদার যাবতীয় পড়া উস্তায বোর্ডে লিখে লিখেই ছাত্রদেরকে আত্মস্থ করান। এক্ষেত্রে প্রতিটি হরফের আপনরূপ চেনার পর তার শুরু অংশ ও মধ্যস্থ অংশ আলাদাভাবে আত্মস্থ করানো হয়। সেক্ষেত্রে আরবী লিপিতে, বিশেষভাবে কুরআন মাজীদে হরফটি শব্দের শুরুতে এলে কেমন রূপ ধারণ করে, মাঝে এলে কেমন, শেষে এলে কেমন- এসব চেনানো হয়। পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘পূর্ণ হরফের পরিচয়’ ও ‘অপূর্ণ হরফের পরিচয়’। এভাবে অগ্রসর হওয়ার পর দুই হরফের মিলিত রূপ, তিন হরফের মিলিত রূপ, চার পাঁচ ছয় সাত আট হরফের মিলিত রূপ ইত্যাদি মশক করানো হয়। এখানেও কুরআন মাজীদের দীর্ঘ শব্দগুলোকেই নির্বাচন করা হয়। পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘শব্দ গঠন প্রণালী’।

হরফ চেনানোর ধাপ সমাপ্ত হলে হরকত ব্যবহার করে হরফগুলোর উচ্চারণ আত্মস্থ করানো হয়। তারপর তানভীন, জযম, খাড়া যবর, মদ, গুন্নাহ ইত্যাদি শেখানো হয়। তবে গুরুত্বের সঙ্গে যে বিষয়টি খেয়াল রাখা হয় তা হল, সবকিছু উস্তাযের মুখ থেকে শুনে মুখস্থ করা। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর হাতে নিয়ম-কানুনের কোনো বই না দিয়ে সবকিছু উস্তায নিজেই পড়িয়ে দেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সহজ থেকে কঠিন ও অপেক্ষাকৃত জটিল বিষয়ের দিকে শিক্ষার্থীকে অগ্রসর করা হয়। তার শৈশবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে, যেন কোথাও নিয়ম-কানুনের চাপ ও বোঝা অনুভব না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হয়। এটাকে হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. বলতেন মনোবিজ্ঞানের আলোকে পাঠদান। অর্থাৎ বাচ্চাদেরকে নিয়মের আওতায় না এনে সরাসরি উস্তাযের মুখ থেকেই সবকিছু শেখানোর চেষ্টা। এজন্য নাদিয়া শিক্ষককে অবশ্যই ৪৫ দিনের ট্রেনিং গ্রহণ করতে হয়। ট্রেনিংয়ে হযরতের লেখা ‘তালীমুল মুআল্লিমীন’ কিতাবটিকে অবলম্বন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

শিশুদের মনোজ্ঞানের বিষয়টি অত্যধিক গুরুত্ব পাওয়ার কারণ হল, নাদিয়াতে প্রথমে চার বছরের বাচ্চাকেই ভর্তি করানো হত। আর স্পষ্ট কথা যে, সেই বয়সের শিশুর কাছে নিয়ম-কানুন অনেক ভারী বিষয় মনে হয়ে থাকে। তাই মদ, গুন্নাহ ও তাজবীদের অন্যান্য বিষয় যেন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের মুখ থেকেই, শিক্ষকের উচ্চারণ ও ব্যবহার ভঙ্গি দেখেই শিখে নিতে পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হয়েছে।

পরবর্তীতে সদর সাহেব হুযুর  হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরীদপুরী রাহ. একদিন মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব সাহেবকে ডেকে বলেন, ‘আবদুল ওয়াহহাব! শরীয়ত যেহেতু বাচ্চাদেরকে সাত বছরে নামাযের আদেশ করেছে তাই তুমি পাঁচ বছরের বাচ্চাদেরকে ভর্তি করো। যাতে সাত বছর বয়স হতে হতে সে সুন্দরভাবে নামায ও কুরআন শিখে নিতে পারে। চার বছরের বাচ্চাদের জন্য পড়া কঠিন।’ তখন থেকে নাদিয়ায় পাঁচ বছরের বাচ্চাদেরকে ভর্তি করা হয়।

প্রথম বছরে নাদিয়ার বাচ্চাদেরকে কুরআন মাজীদ নাযেরার পাশাপাশি ‘আদইয়ায়ে মাসনূনাহ’ নামক দুআর বইটি মুখস্থ করানো হয়। তাতে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় দুআ সংকলন করা হয়েছে।

 

* * *

 

হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. শিশুশিক্ষার সাথে সাথে নারীশিক্ষা বিষয়েও গভীর চিন্তা-ফিকির করেন। সমাজের অশিক্ষা ও কুসংস্কার দূর করার পেছনে নারীশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করেন। নারীদের দ্বীনী দুরবস্থা ও দ্বীনী তালীমের ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারে তার যে অনুভূতি ও আক্ষেপ ছিল তা বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেন।

তিনি বলতেন, বর্তমান বাংলাদেশে ফরযে আইন পরিমাণ দ্বীন শেখার এবং উচ্চতর দ্বীনী ইলম চর্চার বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এইসকল প্রতিষ্ঠান কেবল পুরুষদের জন্য। নারীদের জন্য নয়। এতে কেবলই যে নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়; তাদের অভিভাবকগণও বহুমুখী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ, একজন নারী যেমনিভাবে স্ত্রী তেমনি মা এবং সন্তানদের প্রথম শিক্ষিকা। সেইসঙ্গে গৃহিনী। ফলে তার দ্বীনী ইলম না থাকার ক্ষতি নানা ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের ফরযে আইন পরিমাণ ইলম না থাকায় সমাজে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে তা এককথায় অপূরণীয়। তাদের উচ্চতর দ্বীনী ইলম থাকার যে সুদূরপ্রসারী ফায়েদা তাও এককথায় বে হিসাব। এছাড়া দ্বীন সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা-অজানার দরুন বহু বদ-রসম ও কুসংস্কারের বিস্তার ঘটে।

তিনি আরও বলতেন, বাংলাদেশের প্রায় ছয় কোটি নারীর (তখনকার হিসাব অনুযায়ী) দ্বীন জানা ও দ্বীন মানার অবস্থা

এত করুণ যে, শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি নামায পড়ে না। যারা নামায পড়ে তাদের চল্লিশ ভাগ অশুদ্ধভাবে নামায পড়ে। তাদের অধিকাংশই পাক-নাপাকের মাসআলা সম্পর্কে অজ্ঞাত। বহু মা-বোন এমন আছেন, যারা কোনোরকম শুধু কালিমাটুকু পড়তে পারে। দ্বীন সম্পর্কে এরচে বেশি কিছুই জানে না। তারা এ অবস্থায়ই পরজগতে পাড়ি জমাচ্ছে। এ দায় কার?’

এসব দিক বিবেচনা করে তিনি বেশ কিছু মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে এ উদ্যোগকে অনেকে ভুল মনে করলেও পরবর্তীতে এর বেশ ফায়েদা লক্ষ্য করে উলামায়ে কেরামও সমর্থন দেন।

মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও তাদের জন্য সহজ সুন্দর কিছু কিতাব রচনা করেন তিনি। তন্মধ্যে রয়েছে ‘তাহারাতুন নিসওয়ান’, ‘তালীমুন নিসওয়ান’ ও ‘মাআরিফুন নিকাহ’। তাঁর রচিত ‘তালীমুন নিসওয়ান’ কিতাবে তিনি মহিলাদের শিক্ষা বিষয়ে মৌলিকভাবে তিনটি স্তর নির্ধারণ করেন। যথা : ১. মাদরাসাতুল বানাত ২. মাদরাসাতুন নিসওয়ান ৩. মাদরাসাতুল উম্মাহাত। ‘বাংলাদেশ নাদিয়াতুল কুরআনে’র তত্ত্বাবধানে এজাতীয় বেশ কিছু কাজও করে যান তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে নাদিয়ার কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে-

নাদিয়াতুল কুরআন হাফিযী মাদরাসা।

নাদিয়াতুল কুরআন কিন্ডার গার্টেন।

নাদিয়াতুল কুরআন মহিলা মাদরাসা।

নাদিয়াতুল কুরআন মুয়াল্লিম ট্রেনিং, সেইসঙ্গে নাদিয়াতুল কুরআন প্রকাশনী।

এছাড়া সমাজের নানা কুসংস্কার, বিদআত ও বদ-রসম দূর করার লক্ষ্যেও তিনি স্বতন্ত্রভাবে মেহনত করেন। বিশেষ করে বিয়ে-শাদী ও সামাজিক নানা আচার-অনুষ্ঠানের কুসংস্কার রোধে তিনি একরকম সংগ্রাম করেন। এ উদ্দেশ্যে কিতাব লিখেন ‘মাআরেফুন নিকাহ’। এই কিতাবে সমকালীন বিভিন্ন কুসংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং মুসলিম সমাজকে এসব পরিহার করার জোর আবেদন জানান। পাশাপাশি তাঁর ছেলেমেয়ে, অধীনস্থ ও ঘনিষ্ঠজনদের ক্ষেত্রে যাবতীয় কুসংস্কারমুক্ত সুন্নতী বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পাদন করে সমাজের জন্য উত্তম নমুনা পেশ করেন। এমনকি এব্যাপারে তিনি বলতেন, আমার ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে বিলম্ব হলেও কখনও সুন্নতের খেলাফ কোনো আচার আচরণ হতে দিব না।

 

* * *

 

হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. জীবনের দীর্ঘ সময় বিভিন্ন মনীষীর সান্নিধ্যে থেকে ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির মেহনত করেন। দেওবন্দে থাকাকালে সর্বপ্রথম বাইআত হন হযরত মাওলানা আবদুল কাদের রায়পুরী রাহ.-এর কাছে। তাঁর ইন্তিকালের পর হযরতজী হযরত মাওলানা ইউসুফ রাহ.-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলবী রাহ.-এর নিকট বাইআত গ্রহণ করেন। তাঁর ইনতিকালের পর হযরত থানবী রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর কাছে বাইআত হন। হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. তাকে (১৩৮৫ হিজরীতে) বাইআতের মজলিসেই খেলাফত প্রদান করেন। এরপর দেশের প্রতিটি মুসলমানের ঘরে ঘরে বিশেষভাবে তালীমুল কুরআন পৌঁছানোর দায়িত্ব দেন।

কর্মজীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি জাতীয় কল্যাণ ও সমাজ সংস্কারমূলক বেশ কয়েকটি কিতাব রচনা করেছেন। কিতাবগুলোর সাবলীল ভাষা ও দরদী উপস্থাপন পাঠকহৃদয়ে তীব্র আবেদন সৃষ্টি করে। তাঁর রচিত ও অনূদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে-

তাকমীলুল ঈমান, খাওফে খোদা, পরকাল, পুলসিরাতের আগে ও পরে, ফাযায়েলে আযকার, হক্কুল ইবাদ, তাহারাতুন নিসওয়ান, তালীমুন নিসওয়ান, মাআরিফুন নিকাহ, মহিলা সাহাবীদের জীবনাদর্শ, আদইয়ায়ে মাসনূনা, মুসলিম শিশু শিক্ষা সংস্কারের ডাক, তালীমুল মোয়াল্লিমীন ও আদর্শ প্রশ্নাবলী ইত্যাদি।

এদেশে তার উস্তাযগণের মধ্যে রয়েছেন-

হযরত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযূর রাহ. ও হযরত মাওলানা সফিউল্লাহ ছাহেব রাহ. প্রমুখ সমাজ সংস্কারক মনীষীগণ। এছাড়া ফখরে বাঙ্গাল হযরত মাওলানা তাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ., হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ., হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুযূর রাহ. ও মুফাসসির হুযূর হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ. থেকে বিশেষভাবে শিক্ষা ও দীক্ষা লাভ করেন।

তাঁর অসংখ্য ছাত্রদের মাঝে রয়েছেন-

মাওলানা আশরাফ আলী ছাহেব রাহ. (বি. বাড়িয়া)।

মাওলানা আবদুল মুমিন ছাহেব রাহ. (প্রশিক্ষক)

কারী ফযলুর রহমান ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম

কারী নূরুল ইসলাম সাহেব রাহ. দামাত বারাকাতুহুম

মাওলানা আবদুল মতীন সাহেব দামাত বারাকাতুহুম (সিলেট)

মাওলানা মনসূর আহমদ দামাত বারাকাতুহুম  (ফেনী) প্রমুখ।

তাঁর নয়জন সন্তান। চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। ছেলেদেরকে যেমনিভাবে তিনি উচ্চতর দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন, মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তেমনি অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপর সবাইকে আলেমের কাছে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা (ছেলে, মেয়ে ও মেয়েদের জামাই) সকলেই বিভিন্ন জায়গায় দ্বীনী খেদমতে নিয়োজিত।

বর্তমানে তাঁর শতাধিক নাতি-নাতনি। সবাই আল্লাহ্র মেহেরবানীতে দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা মাদরাসায় অধ্যয়নরত। ছোটরা নিজ নিজ পরিবারে দ্বীনী পরিবেশে প্রতিপালিত।

তাঁর স্ত্রী আজীবন মহিলাদের মাঝে দ্বীনী শিক্ষা ও দ্বীনী তালীমের খেদমত করে গেছেন। তিনি ২০১৪ সালের ৮ নভেম্বর ইনতিকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মাকাম নসীব করুন-আমীন।

* * *

 

হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রাহ. শেষজীবনে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন অনেক কষ্ট করেন। ঢাকার বারডেম হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণ করেন। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয় না। একপর্যায়ে তাঁর বাকশক্তি লোপ পেয়ে যায়। এরপর ১৯৯৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে, সুবহে সাদিকের পরপর এই নশ্বর দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। জুমার নামাযের পর ভাদুঘর ফাটাপুকুর মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাযা আদায় করা হয়। জানাযার ইমামতি করেন তাঁর শ্বশুর মুফাসসির হুযূর হযরত সিরাজুল ইসলাম ছাহেব রাহ.। জানাযার পর চারজন হাফেয তাঁর খাটিয়া বহন করেন এবং চারজন হাফেয তাঁকে কবরে নামান। ভাদুঘর গ্রামেই পারিবারিক গোরস্তানে তিনি সমাহিত।

رحمه الله تعالى رحمة واسعة، وأدخله في فسيح جنانه. اللهم اكتبه عندك من المحسنين، واجعل كتابه في عليين، واخلفه في أهله في الغابرين، ولا تحرمنا أجره، ولا تفتنا بعده.

 

তথ্যসূত্র : এই লেখার অধিকাংশ তথ্য নেওয়া হয়েছে হযরতের চাচাতো ভাই কারী মোঃ শামছুল ইসলাম ভূঁইয়া সাহেবের বই ‘হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রাহ.-এর বৈচিত্র্যময় সংক্ষিপ্ত জীবনী’ ও বড় ছাহেবযাদা মাওলানা মাহমুদুল হাসান ছাহেবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি বইয়ের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : হযরতের জামাতা শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা হাবীবুর রহমান ছাহেব দামাত বারাকাতুহু কর্তৃক সংকলিত ‘আমরা যাদের উত্তরসূরী’, হযরত মাওলানা মুবারকুল্লাহ ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের তত্ত্বাবধানে গ্রন্থিত ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উলামা-মাশায়েখ : জীবন ও কর্ম’, মাওলানা মুহাম্মাদ আবুল ফাতাহ ভূঁইয়া ছাহেব রাহ. কর্তৃক রচিত ‘সীরাজ চরিত’ এবং স্বয়ং হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ.-এর লেখা ‘তা‘লীমুল মোয়াল্লিমীন’, ‘মাআরিফুন নিকাহ’ ইত্যাদি। লেখা প্রস্তুত করার পর হযরতের বড় ছাহেবজাদা মাওলানা মাহমুদুল হাসান ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমকে শোনানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কিছু সম্পাদনাও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রথমোক্ত বইটির মুদ্রণ দীর্ঘদিন আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় বইটি সংগ্রহ করতে অনেক খোঁজাখুঁজি করতে হয়। একপর্যায়ে সরাসরি ছাপাখানায় গিয়ে পেস্টিং ফাইল থেকে ছবি তুলে এনে কিতাব প্রস্তুত করা হয়। এক্ষেত্রে মুহতারাম মাওলানা সায়ীদুল হক ভাই অনেক সময় দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে সর্বোত্তম জাযা দান করুন- আমীন।