সফরের সুন্নতসমূহ আপনাকে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে পারে

1631

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশে। ঘর থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসার নিশ্চয়তা নেই। রাস্তাগুলো হয়েছে যেন মরণফাঁদ। এর জন্য দায়ী যেভাবে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে আমাদের অসচেতনতা, তেমনি সড়ক বিষয়ক আইনের প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন যথাযথ ভাবে না থাকাও এর জন্যে অন্যতম দায়ী।

সিরাজগঞ্জের নলকায় গত শনিবার দিবাগত রাতে তেজগাঁও বেগুনবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার একটি বাস ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ৪ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক ছাত্র হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত হৃদয় বিদারক ও মর্মভেদী একটি ঘটনা। এর আগে সেবামূলক কাজে বের হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হাফেজ্জী হুজুর রহ.সেবা সংস্থার সদস্য ও যাত্রাবাড়ী মাদরাসার ছাত্র মুহাম্মদ আশিকুর রহমান নিহত ও আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান মুরব্বী আলেম সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি তার বিবৃতিতে সফরের আদাব বজায় রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি  বলেন, সফরের যেসব ‘আদব’ বা করণীয় শিষ্টাচার রয়েছে, সেসব মেনে চলাফেরা করলে দুর্ঘটনা থেকে অনেকাংশে নিরাপদ থাকা যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন তুমি ঘর থেকে বের হবে, তখন দুই রাকাত নামাজ পড়বে। সেই নামাজ তোমাকে ঘরের বাইরের বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করবে। তাই যাত্রাপথে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করুন। সফরে দুআ দরূদ পড়তে থাকুন। গান-বাজনা, বেপর্দা ইত্যাদি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। গুনাহের কারণে অনেকটা আযাব আসে।

এদিকে মুফতি মনসূরুল হক তার সুন্নত সংক্রান্ত এক কিতাবে সফরের আদাব সম্পর্কে কিছু হাদীস উল্লেখ করেছেন। মুফতি  মনসূরুল হক নবীজীর সুন্নত কিতাবে লেখেন,

১. কমপক্ষে দুই ব্যক্তি এক সাথে সফরে যাওয়া, পারতপক্ষে একা সফর না করা। (তিরমিযী, হাদীস নং- ২১৬৫)

২. বাড়ী থেকে بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهْ পড়ে বের হওয়া। (আবু দাউদ, হাদীস নং- ৫০৯৫)

৩. যানবাহনের দরজায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে বলতে পা রাখা। (আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৬০২)

৪. যানবাহনে ভাল ভাবে আসন গ্রহণের পর তিনবার আল্লাহু আকবার বলে এই দু‘আ পড়াঃ

اَلْحَمْدُ لِلّهِ سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنْ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ
– اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَسُوْءِ الْمَنْظَرِ فِيْ وَ الْمَالِ الْأَهْلِ.

(মুসলিম, হাদীস নং-১৩৪২/ নাসাঈ, হাদীস নং ৫৫১৩/ আবু দাউদ, হাদীস নং ২৫৯৮, ২৫৯৯)

৫. সফরে কোথাও অবস্থানের প্রয়োজন হলে, কোন জায়গায় এমনভাবে অবস্থান করা, যাতে মানুষের চলাফেরা ইত্যাদির ব্যাঘাত না ঘটে। (বুখারী, হাদীস নং- ৬২২৯)

৬. নিজে বা যানবাহন উপরের দিকে উঠতে লাগলে আল্লাহু আকবার বলা। (মুসলিম, হাদীস নং- ১৩৪৪)

৭. নিজে বা যানবাহন নীচের দিকে নামতে বা অবতরণ করতে লাগলে সুবহানাল্লাহ বলা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ২৯৯৩)

৮. দূর হতে গন্তব্যস্থান দৃষ্টিগোচর হতেই এই দু‘আ তিন বার পাঠ করাঃ

اَللّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْهَا
(তাবারানী আউসাত, হাদীস নং- ৪৭৫৫)

৯. গন্তব্যস্থানে প্রবেশ কালে এই দু‘আ পড়াঃ

اَللّهُمَّ ارْزُقْنَا جَنَاهَا وَحَبِّبْنَا إلَى اَهْلِهَا وَحَبِّبْ صَالِحِىْ اَهْلِهَا إلَيْنَا.
(তাবরানী আউসাত, হাদীস নং- ৪৭৫৫)

১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : সফরের কার্য শেষ হলেই তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে আসবে। অযথা সফরকে দীর্ঘ করা ভাল নয়। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ১৮০৪)

১১.দীর্ঘ দিনের সফর শেষে বাড়ী প্রত্যাবর্তনকালে হঠাৎ করেই ঘরে প্রবেশ না করা। বরং প্রথমে নিজ গ্রাম বা মহল্লার মসজিদে এসে অবস্থান করা ও দু‘রাক‘আত নামায পড়া। অতঃপর বাড়ীতে আসার সংবাদ পৌঁছিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করে নিজ বাড়ীতে প্রবেশ করা। তেমনিভাবে দীর্ঘদিন সফর হতে পিরে এসে গভীর রাতে বাড়ীতে প্রবেশ না করা। (মুসলিম, হাদীস নং- ২৭৬৯/ বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ১৮০০)

বি.দ্র. সফরের প্রোগ্রামই এরূপ বানাবে যাতে সকাল হলে বাড়ী পৌঁছা যায়। তবে ঘরের লোকদের যদি তার গভীর রাতে পৌঁছার সংবাদ জানা থাকে এবং তারা তার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তবে রাতে এসে সরাসরি ঘরে প্রবেশ করায় কোন দোষ নেই। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং- ৫২৪৭)

১২. সফরে কুকুর, ঘুঙরু ও গলঘন্টী সঙ্গে না রাখা। কেননা, শয়তান এগুলোর পিছু নেয়, তাতে সফরের বরকত চলে যায়। উল্লেখ্য, সখ করে বাড়ীতে কুকুর পালা শরী‘আতে নিষেধ। (মুসলিম, হাদীস নং- ১৫৭৪/ মুসলিম শরীফ, হাদীস নং- ২১১৩)

১৩. সফর হতে প্রত্যাবর্তন করে এই দু‘আ পড়া : آيِبُوْنَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُوْنَ.
(তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৪৪০)

এছাড়াও বুজুর্গরা সফরের আরও বিভিন্ন আদাবের কথা উল্লেখ করে থাকেন, যার মধ্যে সফরে বের হওয়ার আগে নফল দান সদকাও রয়েছে। হাদীসে এসেছে, নফল দান আল্লাহর ক্রোধকে ঠান্ডা করে দেয়।

চলুন, আমরা কোথাও বের হওয়ার আগে সফরের সুন্নতসমূহ যথাযথভাবে পালন করি।