মালয়েশিয়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রী: অন্তরালে ইসলামপন্থী বনাম সমাজতন্ত্রের নীরব যুদ্ধ

659

মুকিম আহমাদ ।। মালয়েশিয়া থেকে

মালয়েশিয়ান মুসলিমরা সাধারণভাবে রাজনৈতিক সচেতন এবং ধর্মপ্রাণ হিসেবেই পরিচিত। ভোটের অধিকারে বহাল থাকায় মালায়ু মুসলিম স্বার্থে আঘাত করে কোন সরকারই দীর্ঘস্হায়ী হয় নি এখানে । ২০১৮-এর নির্বাচনে বারিসান ন্যাশনালের পরাজয়ের মূলে যতোটা না ছিল বারিসান আর আমনোর নেতাদের কথিত দুর্নীতি, তার চেয়ে বেশি প্রভাবক ছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আনোয়ার ইব্রাহীমের ধর্মীয় ইমেজ ।

মাহাথির মুহাম্মাদের সঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিমের “পার্টি কেআদিলান রাকায়াত”-এর জোট অপরদিকে চায়নিজ- প্রধান বামপন্হী দলের ( ডেমোক্র্যাটিক এ্যকশন পার্টি) সংযুক্তি সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল । মূল চালিকা শক্তি ছিল আনোয়ার ইব্রাহিম । সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেছিলেন মজলুম নেতা । তাদের ধারণা ছিল মুসলিম বিশ্বে তার ইসলামী ব্যক্তিত্ব, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা অর্থনীতিতে পরিবর্তন সাধন করবে । ছাত্রাবস্হায় আনোয়ার ইব্রাহিম বিভিন্ন ইসলামী সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই পরিচিতি পেয়েছিলেন ।

আজকের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া এবং ইসলামী ব্যাংক মালয়েশিয়া প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আনোয়ার ইব্রাহিমের অবদান অনস্বীকার্য । কারণ যে ABIM (Angkatan Belia Islam Malaysia or Muslim Youth Movement of Malaysia)-এর স্বপ্নের ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয় আর ব্যাংক সে ABIM-এর কো-ফাউন্ডার ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম । তার এইসব কীর্তি আর অবদান তাকে আবারও জনতার “প্রথম পছন্দে” নিয়ে এসেছিল ।তবে নির্বাচন-পরবর্তী আনোয়ার ইব্রাহিমের অতিমাত্রায় চায়নিজপ্রীতি এবং তাদের জোটের চায়নিজকরণে মালায়ু মুসলিম সমাজে অস্বস্তি আর আশংকা বিরাজ করছিল ।

রাষ্ট্রীয় মুফতি ড.জুলকিফলির সাথে পাস প্রেসিডেন্ট গুরু আব্দুল হাদী আওয়াঙ

এমনকি খোদ সরকারদলীয় জোটের মধ্যেই শুরু হয় ভাঙনের গুঞ্জন । মাহাথির মুহাম্মাদ স্বয়ং এই ভাঙনের সুর তোলেন । আর তখনই চায়নিজপ্রধান দল DAP আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোরদার সমর্থন জানায় । তাদের ধারণা আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রীত্ব লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতিতেও দোর্দণ্ড প্রতাপ বিস্তার করতে সক্ষম হবে । যা ইতোমধ্যেই অনেকখানি অগ্রসর হয়েছিল । দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ চায়নিজরা নিজেদের দখলে নিতে পেরেছিল । অর্থমন্ত্রীর পদ পেয়ে যায় লিম গুয়াং ইং,প্রধান বিচারপতির পদ পায় রিচার্ড মালাঞ্জুম এবং এ্যাটর্নি জেনারেলের পদ লাভ করে পর্যায়ক্রমে টমি থমাস ।
অপরদিকে এই বিষয়গুলো প্রধান বিরোধী দুই দল পাস পার্টি (ইসলামী দল) এবং জাতীয়তাবাদী দল আমনোকে এক সূঁতোয় গ্রোথিত করে । যদিও আমনো আর পাস পার্টি দীর্ঘ ষাট বছর পরস্পর পরস্পরের বিরোধীই ছিল ।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এই দুই দলের জোটই্ মূলত বড় প্রভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয় । আমনো মালায়ূ জাতিয়তাবাদী দল, তারা কোনভাবেই দেশের প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন জাতিকে নিয়োগ প্রদানে আগ্রহী নয় । আর আদর্শের এই নৈকট্যই তান শ্রী মুহিউদ্দীন এবং পার্টি কেআদিলান রাকায়াতের কিছু এমপির মাঝে সম্পর্কের সেতু স্হাপন করে ।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তান শ্রী মুহিউদ্দীন পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণে বড় হয়েছেন । ফলে শক্তিশালী ইসলামী দল পাস পার্টির নেতা উস্তাজ আব্দুল হাদী আওয়াং কোন “মেন্ডেট” ব্যতিরেকেই তার প্রতি দলীয় আস্হা ও সমর্থন পেশ করেন । প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় ভাষণ বামপন্হী দলগুলোকে ভীত না করলেও নির্ভার করেনি ।

একদিকে সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর পাস পার্টি সরকার গঠনে শরিক হতে যাচ্ছে, অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর ইসলামী অনুশাসন মেনে জীবন-যাপন করা ও ভাষণে ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার বামপন্হীদের এখনও রাস্তায় রাখছে । সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের কাছে নতুন সরকার দলীয় জোট পারিকাতান ন্যাশনাল শেষ আশার স্হল হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে । তারা তাদের একক প্রাধান্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়ে উঠছে।