‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস রেখেই শান্তির প্রয়োজনে আমরা যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে যাচ্ছি’

1104

আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি চুক্তি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এদিকে যুদ্ধ পরবর্তী আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়ে চলছে আলোচনা পর্যালোচনা। গতকাল শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এ ‘আমরা কী চাই’ শিরোনামে তালেবান উপনেতা সিরাজ উদ্দীন হক্কানীর এ বিষয়ক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ  প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ প্রবন্ধটিতে তালেবান নেতা হাক্কানী যুদ্ধ পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক দায়িত্বশীল আলোচনা করেছেন। গুরুত্ব বিবেচনা করে ইসলাম টাইমসের পাঠকদের জন্য তা অনুবাদ করে দিয়েছেন সাকিব ইমতিয়াজ


 

২০১৮ সালে যখন আমাদের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করল, আমাদের ধারণা ছিল যে এই কথাবার্তার ফলাফল হবে প্রায় শূন্য। ১৮ বছর যুদ্ধের পরে আমরা আমেরিকার উদ্দেশ্য বিশ্বাস করি না এবং বিগত আলোচনার কিছু পদক্ষেপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

যাইহোক আমরা আরেকবার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সুদীর্ঘ যুদ্ধ আমাদের সবার কাছ থেকেই ভয়াবহ মূল্য আদায় করে নিয়েছে। আমরা মনে করেছি যে, শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা যতই কম থাকুক না কেন, তা নাকচ করে দেওয়া হবে নির্বুদ্ধিতা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে, প্রতিদিনই মূল্যবান আফগান জীবন হারাচ্ছে। প্রত্যেকেই তাদের কোন না কোন প্রিয়জনকে হারিয়েছে। সবাই যুদ্ধে ক্লান্ত। আমি আশ্বস্ত যে এই হত্যা এবং প্রাণহানি অবশ্যই থামানো উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিরোধী জোটের সাথে যুদ্ধ আমরা বেছে নেইনি। আমরা বাধ্য হয়েছি আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য। আমাদের প্রথম এবং প্রধান দাবি হল বিদেশি বাহিনীর প্রত্যাহার। আমরা আজ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি শান্তিচুক্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছি, এটি কোন ছোট মাইলফলক নয়। আমার সহকর্মী মোল্লা আবদুল ঘানি বেরাদার এবং শের মোহাম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই-এর নেতৃত্বে আমাদের আলোচনার দলটি গত ১৮ মাস ধরে আমেরিকান আলোচকদের সাথে একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বারবার অসঙ্গতি এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চালানো আমাদের গ্রাম গুলোর উপরে তীব্র বোমা হামলার জন্য আমাদের নিজেদের মধ্যেই যে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং আমেরিকান পক্ষের সর্বদা পরিবর্তনশীল মনোভাব থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের আলোচনায় মনোনিবেশ করেছিলাম।

এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আলোচনা বন্ধ করেছিলেন, আমরা শান্তির দ্বার উন্মুক্ত রেখেছিলাম। কেননা আমরা আফগানরা, এই চলমান যুদ্ধের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কোন শান্তি চুক্তি এরকম রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর, পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া হয় না। আমরা আটকে আছি বিপদজনক আলোচনায় সেই শত্রুর সাথে, যার বিপক্ষে আমরা যুদ্ধ করছি দু’দশক ধরে, এমনকি যদি আকাশ থেকে মৃত্যুর বৃষ্টি হয়, তা সাক্ষ্য দিবে আমাদের প্রতিশ্রুতির- এই শত্রুতা অবসান করার এবং দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার।

বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আমাদের কি ধরনের সরকার হবে, তা নিয়ে আমরা আফগানিস্তানের ভিতরের এবং বাহিরের উদ্বেগ এবং প্রশ্ন সম্পর্কে অবগত রয়েছি। এই বিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া হল এটা নির্ভর করবে আফগান জনগণের মতামতের উপর। আমাদের উচিত হবে না আমাদের দুশ্চিন্তাগুলোকে- এই সঠিক আলোচনা এবং বিবেচনার বিষয়, যা কিনা এবারই প্রথম কোনরকম বিদেশি আধিপত্য এবং হস্তক্ষেপ ছাড়াই হচ্ছে,- তার পথে নিয়ে না আসা।

এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, কোন পূর্ব নির্ধারিত ফলাফল এবং পূর্বশর্তাবলী দিয়ে, এই প্রক্রিয়াটি কেউই উপস্থাপন করবে না। আমরা কাজ করতে ইচ্ছুক অন্য দলের সাথে যথাযথ মূল্যায়নের আলোকে- একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে একমত হওয়ার,যেখানে প্রত্যেক আফগান মানুষের মতামত প্রতিফলিত হবে এবং যেখানে কোন আফগানই বঞ্চিত বোধ করবে না।

আমি দৃঢ় বিশ্বাসী যে বিদেশি আধিপত্য এবং হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীন হয়ে আমরা একত্রে রাস্তা বের করব একটি ইসলামী ব্যবস্থা তৈরি করার, যেখানে সমস্ত আফগানরা পাবে সমান অধিকার, যেখানে মহিলাদের অধিকার যা ইসলাম অনুমোদন দিয়েছে-শিক্ষা অধিকার থেকে শুরু করে কাজ করার অধিকার-থাকবে সুরক্ষিত এবং যেখানে মেধাই হবে সমান সুযোগের ভিত্তি।

আঞ্চলিক ও বিশ্ব সুরক্ষার হুমকিতে বিপর্যয়কর গোষ্ঠীগুলো দ্বারা আফগানিস্তানকে ব্যবহারের সম্ভাবনার যে উদ্বেগ, তা সম্পর্কে আমরা সচেতন রয়েছি। এই উদ্বেগগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে-আফগানিস্তানে বিদেশি গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অতিরঞ্জিত তথ্য, যা ছড়ানো হয়েছে  উভয়পক্ষের অশান্তিপ্রিয় প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলোর মাধ্যমে। এটা কোন আফগানের কামনা নয় যে, এরকম দলগুলোকে আমাদের দেশকে ছিনতাই করার অনুমতি দেওয়া হবে এবং এটাকে একটি যুদ্ধ ক্ষেত্র বানানো হবে।

আমরা ইতিমধ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপ দ্বারা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমরা অন্যান্য আফগানদের সাথে মিলে একত্রে পদক্ষেপ নিব যাতে আফগানিস্তান একটি স্থিতিশীলতার প্রতীক হয় এবং যেখানে আমাদের মাটিতে কেউ হুমকি অনুভব না করে।

আমরা অবগত আছি আমাদের গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে। সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আফগান গোত্রসমূহের পারস্পরিক কলহ দূর করা। তবে আমি নিশ্চিত যে এটি সম্ভব। যদি আমরা কোন বিদেশী শত্রুর সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি তবে আমাদের নিজেদের মধ্যে বিবাদ গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানও করতে পারবো।

আরেকটি দায়িত্ব হবে, শান্তিতে উত্তরণের সময় এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগ্রহ এবং ইতিবাচকভাবে জড়িত করা। আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বিনির্মাণ এবং পুনর্গঠনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র, তার সৈন্য প্রত্যাহারের পর, যুদ্ধ পরবর্তী উন্নয়ন এবং পুনর্বাসনের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আমরা সমস্ত দেশের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্কের গুরুত্ব এবং তাদের উদ্বেগগুলো যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করি। আফগানিস্তান বিচ্ছিন্নভাবে বাস করতে পারে না। নতুন আফগানিস্তান হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একজন দায়িত্বশীল সদস্য। আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তির দ্বারা প্রতিশ্রুতি বদ্ধ থাকবো যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো ইসলামের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আমরা আশা করব অন্য দেশগুলো আমাদের দেশের স্বাধীনতা এবং স্থিতিশীলতার প্রতি সম্মান জানাবে ও এটিকে প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দের পরিবর্তে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করবে।

অতি শীঘ্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের চুক্তি কার্যকর করাও হবে দায়িত্ব। কাতারের দোহায় আমেরিকান আলোচকদের সাথে আমাদের কথাবার্তার মাধ্যমে বিশ্বাসের একটি পর্যায় তৈরি হয়েছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন আমাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করে না তেমনি আমরাও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করা থেকে অনেক দূরে।

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছি এবং আমরা এর প্রতিটি শর্ত, আক্ষরিকভাবে এবং চেতনায়, পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। চুক্তির সম্ভাব্যতা অর্জন, সফলতা নিশ্চিতকরণ এবং স্থায়ী শান্তি অর্জন, নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শর্তগুলোর উপর গঠনতান্ত্রিক নজরদারির দ্বারা। শুধুমাত্র তখনই আমরা পরিপূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারব এবং সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করতে পারব- ভবিষ্যতে যে কোন অংশীদারিত্বে।

আমার আফগান সহকর্মীরা শীঘ্রই এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে উদযাপন করবে । একবার এটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়ে গেলে আফগানরা সমস্ত বিদেশি সৈন্যের প্রত্যাহার দেখতে পারবে। আমরা যখন এই মাইলফলকে পৌঁছেছি আমি বিশ্বাস করি যে এটি খুব দূরের স্বপ্ন নয় যে আমরা শীঘ্রই সেই দিনটি দেখতে পাবো যখন আমরা একত্রিত হব আমাদের সকল আফগান ভাই-বোনেদের সাথে, চলা শুরু করব দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে এবং স্থাপন করব নতুন আফগানিস্তানের ভিত্তি।

আমরা তখন উদযাপন করব এক নতুন সূচনার যেখানে আমরা, সকল নির্বাসিত ভাইদের আমাদের দেশে ফিরে আসার দাওয়াত দিব- আমাদের বাড়িতে যেখানে সবাই সম্মানের সাথে বেঁচে থাকবে এবং শান্তিতে থাকার অধিকার থাকবে।