১৪ ফেব্রুয়ারি: পটিয়ার শায়খ হাজী ইউনুস রহ. ইন্তেকাল করেন এদিনে

সাঈদ হোসাইন ।।

১৪ ফেব্রুয়ারি। আমাদের জন্য একটি শোকাবহ দিবস। ১৯৯২ সালে আজকের এই দিনে ইন্তেকাল করেছিলেন শাইখুল আরব ওয়াল-আজম আলহাজ মুহাম্মদ ইউনুস রহ.। আল্লামা সুলতান যওক নদভী দা.বা. এর আত্মজীবনীতে তাঁর ইন্তেকালের বর্ণনা এল এভাবে-

বিজ্ঞাপন

১৯৯২ইং এর সূচনালগ্নে ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা সংগঠিত হয়। অকস্মাৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এ রকম টর্নেডো আঘাত হানল যেন সমগ্র দেশে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। যে প্রচণ্ড বিপদের আশংকায় পরিচিত-অপরিচিত সবার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছিল, সেটাই হল। কুতুবে যামান, মুর্শিদে বরহক, ওলামাকুল শিরোমণি, দ্বীনি পরিবেশের প্রাণকেন্দ্র, আমাদের শ্রদ্ধাস্পদ শিক্ষক ও আরব-আজমের শাইখ হযরত আলহাজ্জ্ব মাওলানা ইউনুছ সাহেব (রহ.) এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তখন আমি কক্সবাজার ছিলাম। হুজুরের ইন্তিকালের খবর মধ্যরাত্রে শুনে খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোন দোকান হতে টেলিফোন করার জন্য বললাম, কিন্তু যে দোকানদারের কাছে টেলিফোন আছে সে নাই অথবা অর্ধরাত্রিতে ডাকার কারণে সন্ত্রস্ত হয়ে ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। তৎকালে মোবাইলের প্রচলন ছিল না। ইত্যবসরে মাইকের মধ্যে হঠাৎ ঘোষণা শোনা যাচ্ছিল যে, পটিয়া মাদরাসার মুহতামিম হযরত আলহাজ্জ্ব মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুছ সাহেব ইন্তেকাল করেছেন।

এ ঘোষণা এবং ঘোষণাদানকারীর নির্ভরযোগ্যতার কারণে সংবাদের সত্যতার ব্যাপারে বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম। নতুবা মনতো মেনে নিতে চায় না যে, আকস্মাৎ এতবড় একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাবে। এখন চিন্তা করতে আরম্ভ করলাম কিভাবে দ্রুত পটিয়া অভিমুখে যাত্রা করা যায়। ছালামতুল্লাহ সাহেবের কাছে জানতে চাইলাম, যে গাড়িতে করে এসেছেন তা কী গাড়ী? তিনি বললেন, সেটা এ এলাকাগামী একটা টেক্সি ছিল। আমাদেরকে রেখেই চলে গেছে। রাস্তার ধারে প্রতীক্ষা করতে করতে প্রায় সুবহে সাদিক হয়ে গেছে। কক্সবাজার হতে চট্টগ্রাম শহরগামী একটি বাস এসে গেল।

আমরা এতে আরোহন করে পটিয়া অভিমুখে যাত্রা করলাম। আমরা রামু, চকরিয়া, সাতকানিয়া যতদূরই অগ্রসর হচ্ছিলাম দেখতে পাচ্ছিলাম সব জায়গাতেই ভক্ত-অনুরক্তবৃন্দ এভাবে শুধু প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে যে, যদি পটিয়া পৌঁছার জন্য কোন বাহন মিলে যায়! এভাবে ৮/৯টার দিকে পটিয়া পৌঁছে গেলাম। ইতোমধ্যে মাদরাসার ভিতরে বাইরে হযরতের নামাজে জানাযায় অংশগ্রহণকারীদের সমাগমে লোকে লোকারণ্য।

জানাযার নামাজের পর অলেম-ওলামা, ছাত্রবৃন্দ, বন্ধু-বান্ধব সবাই জেহাদের ময়দানে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় স্ব-স্ব স্থানে ফিরে আসলো। আজ কয়েকজন মুরব্বী বিশেষ করে হযরত হাজী সাহেব (রহ.) যিনি ছিলেন সাধারণ ও বিশেষ লোকদের প্রাণকেন্দ্র, শাইখুল আরব ও আজম তাঁর সুশীতল ছায়া তাদের মাথার উপর থেকে অপসৃত হলো। তিনি একটি জগতকে এতিম বানিয়ে চিরস্থায়ী ঠিকানায় পাড়ি জমিয়েছেন। এক দীর্ঘ রাস্তার মুসাফির অসাধারণ পরিশ্রম ও কষ্টের বোঝা নিজের কাঁধ থেকে নামিয়ে আসল ঠিকানায় চলে গেলেন।
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ
অর্থ: হে মানব! তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌঁছতে কষ্ট স্বীকার করতে হবে অতঃপর তাঁর সাক্ষাত ঘটবে। (আমার জীবনকথা, পৃষ্ঠা-৩৬৯-৩৭০)

[লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া]

বিজ্ঞাপন