হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক বিষয়ে মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহর বিশেষ সাক্ষাৎকার: পর্ব-১

দুধপান সম্পর্কিত বিবাহের বিধানটি কেবল দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং দুধমাতার সন্তানদের মধ্যে সীমিত নয়; বরং তা আরো বিস্তৃত পুরো বংশ পরম্পরার সাথেই সম্পৃক্ত।

সম্প্রতি ঢাকার মাতুয়াইলে শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে দ্বীনী মহলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আপত্তি উঠে আসে। এ পর্যায়ে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, একশ্রেণীর গণমাধ্যম ও ব্যক্তিবর্গ মিল্ক ব্যাংক-এর পক্ষে নানা রকম ধর্মীয় যুক্তিতর্ক পেশ করেন। যতদূর জানা গেছে, এ প্রকল্পটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়াও হয়নি। এ অবস্থায় জানা দরকার, আসলে মিল্ক ব্যাংক বিষয়ে শরীয়তের নির্দেশনা কী, মিল্ক ব্যাংকের ঝুঁকি ও বিপদগুলো কী, পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশে মিল্ক ব্যাংক আছে কি না, মিল্ক ব্যাংক সম্পর্কে বিভিন্ন যুক্তিতর্কের ভিত্তি কতটুকু?  এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’র রঈস, মাসিক আলকাউসারের সম্পাদক মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন, মারকাযের ইফতা তৃতীয় বর্ষের তালিবুল ইলম- মুহাম্মাদ তাহের বিন মাহমুদ। এখানে সে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি পেশ করা হলো।

বিজ্ঞাপন

 

প্রশ্ন : সম্প্রতি দেশের বহুল আলোচিত একটি বিষয় হল, শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইসিএমএইচ)-এ বাংলাদেশের প্রথম হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক স্থাপন। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর বৈধতা নিয়ে উলামায়ে কেরাম আপত্তি তুলেছেন। তারা একে হুরমতে রাযাআ তথা দুধ-সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সংক্রান্ত শরীয়তের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছেন। ইতিমধ্যে এর কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ চেয়ে আইনী নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আপনার কাছে জানতে চাই, ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তিটা কতটুকু বাস্তবসম্মত?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: আমরা মনে করি, যারা এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছেন, আপত্তি করেছেন, তাদের উদ্বেগ ও আপত্তি যথাযথ। যারা কাজটি করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তারা প্রথমে এই বিষয়ে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে এর শরয়ী বিধানটা জেনে নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তারা সেটা করেননি। তা না করেই তারা এটা শুরু করে দিয়েছেন, যা ঠিক হয়নি।

প্রশ্ন : তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিধান কী?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: আসলে মিল্ক ব্যাংক অর্থাৎ মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক বা দুধ সংরক্ষণাগার- যে উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে যে কার্যক্রম পরিচালিত হবে, সেগুলোর সাথে শরীয়তের বেশ কিছু জটিল ও স্পর্শকাতর বিধানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। যেমন এখানে একটি বিষয় হচ্ছে, এক মায়ের দুধ অন্য মায়ের সন্তানদের পান করানো হবে। আমরা জানি, এর সাথে حرمة الرضاعة -এর বিষয়টি যুক্ত। যার একটি দিক বিয়ের সাথে সম্পর্কিত। ইসলামী শরীয়তে কাকে বিয়ে করতে পারবে, কাকে বিয়ে করতে পারবে না- সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সূরায়ে নিসায় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

حُرِّمَتْ عَلَیْكُمْ اُمَّهٰتُكُمْ وَ بَنٰتُكُمْ وَ اَخَوٰتُكُمْ وَ عَمّٰتُكُمْ وَ خٰلٰتُكُمْ وَ بَنٰتُ الْاَخِ وَ بَنٰتُ الْاُخْتِ وَ اُمَّهٰتُكُمُ الّٰتِیْۤ اَرْضَعْنَكُمْ وَ اَخَوٰتُكُمْ مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَ اُمَّهٰتُ نِسَآىِٕكُمْ وَ رَبَآىِٕبُكُمُ الّٰتِیْ فِیْ حُجُوْرِكُمْ مِّنْ نِّسَآىِٕكُمُ الّٰتِیْ دَخَلْتُمْ بِهِنَّ ؗ فَاِنْ لَّمْ تَكُوْنُوْا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیْكُمْ ؗ وَ حَلَآىِٕلُ اَبْنَآىِٕكُمُ الَّذِیْنَ مِنْ اَصْلَابِكُمْ، وَ اَنْ تَجْمَعُوْا بَیْنَ الْاُخْتَیْنِ اِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ اِنَّ اللهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِیْمًا.

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে, তোমাদের মা, তোমাদের মেয়ে, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাতিজী, ভাগ্নি, তোমাদের সেই সকল মা, যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের প্রতিপালনাধীন সৎ কন্যা, যারা তোমাদের এমন স্ত্রীদের গর্ভজাত, যাদের সাথে তোমরা নিভৃতে মিলিত হয়েছ। তোমরা যদি তাদের সাথে নিভৃত-মিলন না করে থাক (এবং তাদেরকে তালাক দিয়ে দাও বা তাদের মৃত্যু হয়ে যায়) তবে (তাদের কন্যাদের বিবাহ করাতে) তোমাদের কোনো গুনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীগণও তোমাদের জন্য হারাম এবং এটাও হারাম যে, তোমরা দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করবে। তবে পূর্বে যা হয়েছে, হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা নিসা (৪) : ২৩
এ আয়াতে যাদের বিয়ে করা হারাম তাদের মৌলিক নামগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীসের কিতাবাদিতেও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধি-বিধান বর্ণিত আছে। তাফসীরবিদগণ, হাদীসের ভাষ্যকারগণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন। তো যেসব মহিলা কোনো শিশুকে দুধপান করাবে তাদের ক্ষেত্রেও ঐ শিশুর বিবাহ-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞার বিধান কার্যকর হবে। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে-
وَ اُمَّهٰتُكُمُ الّٰتِیْۤ اَرْضَعْنَكُمْ.
(তোমাদের সেই সকল মা, যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে)

আর দুগ্ধদানকারীর সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার বিধানটা কেবল ঐ মহিলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর দ্বারা তার পরবর্তী বংশধরদের সাথেও ঐ শিশু এবং তার সন্তান, সন্তানের সন্তান… -এর বিবাহ-শাদী হারাম হয়ে যায়।
উপরিউক্ত আয়াত থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা এখানে দুগ্ধদানকারী মহিলাকে একটি শিশুর মা সাব্যস্ত করা হয়েছে।

তারপরও হাদীসে এর আরো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে-
يَحْرُمُ مِنَ الرّضَاعِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النّسَبِ. ঔরসজাত আত্মীয়তার কারণে বা বংশীয় আত্মীয়তার কারণে যা যা হারাম হয়; ‘রাযাআত’ তথা দুগ্ধদানের কারণেও সেগুলো হারাম হয়ে যায়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৪৫
এমনকি দুধ-মায়ের স্বামী (দুধ-পিতা) এবং তার নিকটাত্মীয়দের সাথেও ঐ শিশুর বিবাহ-শাদী জায়েয নয়। হাদীস শরীফে এসেছে-
إِنّهُ عَمّكِ فَلْيَلِجْ عَلَيْكِ.
অর্থাৎ এখানে দুধ পিতার ভাইকে চাচা বলা হয়েছে। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৪৫)
সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি, ইসলামে একটি শিশুকে অন্য মায়ের দুধ খাওয়ানোর সাথে শুধু ঐ শিশুর বিবাহ ঐ মহিলার সাথে নিষিদ্ধ তা-ই নয়; বরং তার পরবর্তী বংশধরদের সাথে, এমনকি তার স্বামী এবং স্বামীর নিকটাত্মীয়দের সাথেও ঐ শিশুর এবং তার সন্তান, সন্তানের সন্তান…-এর বিবাহ-শাদী হারাম হয়ে যাওয়ার মতো বিধান আরোপিত হয়ে যায়। এটি শরীয়তের সুস্পষ্ট একটি বিধান। কারো জন্যই এর খেলাফ করার সুযোগ নেই।

অতএব ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’-এর মাধ্যমে একজন মহিলার দুধ অপর এক অপরিচিত শিশুকে দেওয়ার যে চিন্তা করা হচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে- এর সাথে শরীয়তের এগুরুত্বপূর্ণ মাসআলাটির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই এ বিষয়গুলো আগে ভালোভাবে বোঝা উচিত ছিল।

প্রশ্ন : হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক-এর উদ্যোক্তারা তো বলছেন যে, তারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এব্যাপারে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক-এর সমন্বয়ক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন-
“ধর্মীয় দিক ঠিক রাখতে প্রত্যেক মায়ের দুধ আলাদা কৌটায় রাখা হবে। বুকের দুধদাতা ও গ্রহণকারীর নাম ও পরিচয় সংরক্ষণ করা হবে, প্রত্যেকের জন্য আলাদা ডাটা এবং আলাদা আইডি কার্ড রাখা হবে। দাতা ও গ্রহীতা একে-অপরের বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন। বিবাহ বিষয়ে যে অজ্ঞতা ও অস্পষ্টতার কথা বলা হচ্ছে তা এখানে থাকবে না।”

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: হাঁ, আমিও এটা পড়েছি এবং একাধিক ওয়েবসাইটের ভিডিওতে ওখানকার ডাক্তারদের বক্তব্যও শুনেছি। একদিক থেকে তো তাদের সাধুবাদ জানাতে হয় যে, তারা তাদের বুঝমতো অন্তত ধর্মীয় বিষয়টাকে মাথায় রেখেছেন। যতটুকু তারা বুঝেছেন যে, এতটুকু করলে বিষয়টার সমাধান হয়ে যাবে- সে হিসাবে তারা আইডি-ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছেন অর্থাৎ যে দুধ দান করবে তার একটা পরিচয় এবং যে দুধ পান করাবে তার একটা পরিচয়। একজনকে অন্যজনের পরিচয় দিয়ে দেওয়া- এরকম একটা ব্যবস্থা তারা রেখেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, একটি মুসলিম রাষ্ট্রে -এবং তারা নিজেরাও মুসলমান- এই আয়োজন করতে গিয়ে এই বিষয়টা তাদের মাথায় ছিল; যতটুকু তারা বুঝেছেন। এজন্য তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে , আসলেও কি এতটুকু করার দ্বারা বিষয়টার সমাধান হয়ে যাবে? তারা ধারণা করে নিয়েছেন, শিশুকে দুগ্ধ দানকারী নারীর পরিচয় ধরিয়ে দিলে এবং নারীটিকে শিশুর পরিচয় দিয়ে দিলেই বিষয়টার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু শরীয়তে হারামের বিষয়টা শুধু এই পর্যন্ত নয়। একটু আগে আমরা হাদীসে দেখেছি, দুধ পান করার মাধ্যমে শুধু শিশুর সাথে ঐ মহিলার দুধের সম্পর্ক হওয়ায় তাদের পরস্পরে বিবাহ কিংবা ঐ মহিলার সন্তানদের সাথে ঐ শিশুর বিবাহ অবৈধ হয়ে যায়- বিষয়টি এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা আরো অনেক বিস্তৃত। অতএব শুধু তাদের পরস্পরে প্রত্যেকের একটা করে আইডি কার্ড থাকলেই কথা শেষ হয়ে যায় না।

একটি উদাহরণ দিই : মহিলার দুধ পান করল যে শিশু, ধরে নিই সে বড় হয়েছে। এদিকে ঐ মহিলার শিশুটির সমবয়সী একটা দেবর (স্বামীর ছোট ভাই) আছে। সেও বড় হয়েছে। এখন তাকে ঐ মহিলার স্বামীর ছোট ভাইয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হল। তো স্বামীর এ ভাইটি তো আর এ শিশুটির আইডি রাখে না। ঐ শিশুও জানে না যে, তার সাথে ঐ পুরুষের দুধ-সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু ওদের তো বিবাহ হারাম। মহিলা দুধ দেওয়ার কারণে তার স্বামী এবং স্বামীর নিকটাত্মীয়দের সাথেও বিবাহ হারাম হয়ে গেছে। যেমনটি আমরা একটু আগে হাদীস থেকে দেখিয়েছি যে, হাদীসের মধ্যে দুধ বাবার ভাইকে চাচা বলা হয়েছে। এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

তাছাড়া তাদের বক্তব্য থেকে তো বোঝা যায় যে, তারা আইডি দেবেন কেবল যে শিশু দুধ খেয়েছে তাকে এবং যে মহিলা দুধ দান করেছেন তাকে। কিন্তু কোনো মহিলার দুধ যদি একাধিক শিশু পান করে তাহলে তাদের পরস্পরেও হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কি তারা দুগ্ধদানকারীর আইডির সাথে প্রতিটি শিশুকে তাদের পরস্পরের একাধিক আইডি কার্ডও সরবরাহ করবেন? আর এত আইডি কার্ড সরবরাহ ও তার যথাযথ সংরক্ষণ কি সম্ভব?

তো এই যে, আইডি দিয়ে যে সমাধানটা দিতে চাওয়া হচ্ছে, এতে কি আসলেই সমাধান হয়ে যাবে?
তাছাড়া এ বিষয়টাও আমাদের বুঝা দরকার যে, এদেশে ধর্মীয় শিক্ষা একেবারেই কম। মানুষের মধ্যে এই সূক্ষ্ম মাসআলা-মাসায়েলগুলো সম্পর্কে জানাশুনাও কম। আমরা তো এমনও দেখি যে, বংশীয়ভাবে যাদের মধ্যে বিবাহ হারাম- এরকম লোকদের সাথেও কারো কারো বিবাহ হয়ে যায়। এরকম ঘটনা দারুল ইফতাগুলোতে মাঝেমধ্যেই আসে। অথচ বংশীয় সম্পর্কের বিষয়টা তো মানুষের জানাশুনাই থাকে। তবুও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এরকম কিছু কিছু ঘটনার কথা কখনো কখনো আসে। তো এই যখন আমাদের দেশের মানুষের ধর্মীয় জানাশুনার অবস্থা তখন সেখানে দুগ্ধদানকারী মহিলার একটা আইডি কার্ড শিশুকে ধরিয়ে দিলে এবং মহিলাকে শিশুর পরিচয়টা দিয়ে দিলেই ভবিষ্যতের বিবাহ-শাদীর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, তা যথাযথভাবে হবে। অপাত্রে ঘটবে না। এমন কথা আসলে বলা যায় না।

সাথে এটাও দেখা দরকার যে, ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’-এর উদ্যোক্তারাও একথা বলেছেন যে, এতীম ও অসহায়, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছিন্নমূল শিশুদের তারা দুধ পান করাবেন। প্রশ্ন হল, এই শিশুদের রক্ষা করার মতোই তো লোক নেই। তো তাদের পক্ষে দুগ্ধদানকারী মায়ের পরিচয় কে সংরক্ষণ করবে? কার্ড ধরিয়ে দিলেই তো আর হবে না, সংরক্ষণটাই আসল।
দ্বিতীয় কথা হল, তারা বলছেন, আঠারো মাস পর্যন্ত একজন মায়ের দুধ সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। মা তো দুধ দান করে চলে গেছেন, এখন কি তিনি আবার আঠারো মাস পর আইডিগুলো নিতে আসবেন? আর যদি একাধিক শিশুকে দুধ পান করানো হয় (আঠারো মাসে বহু শিশু পান করবে) বাস্তবে তাহলে কি উদাহরণস্বরূপ একবার ছয়মাস পর আবার বারো মাস পর, আবার সতের মাস পর তাদের পরিচয় নিতে তিনি আসবেন? এখানে আরো অনেক বিষয় আছে। তাই এভাবে আইডি দিয়ে এটার সমাধান শুধু কঠিনই নয়; বরং অসম্ভবই বলা যায়।

প্রসঙ্গত আরেকটি বিষয় এখানে বলছি, তা হল, তারা তো একদিকে বলছেন যে, ধর্মীয় অনুশাসন মেনেই সব কিছু করবেন, আমরা তাদের এ অনুভূতির জন্য সাধুবাদও জানিয়েছি। অন্যদিকে তাদের কেউ কেউ আবার উলামায়ে কেরামের আপত্তিকে ‘ধর্মীয় গুজব’ বলেছেন। শব্দটি খুবই আপত্তিকর। জানি না যিনি বলেছেন, ধর্মীয় বিষয়ে, শরয়ী বিষয়ে তার কী পড়াশোনা আছে? বিষয়টাকে তিনি গুজব কীভাবে বললেন। বাংলায় ভাষায় গুজব কাকে বলে? এটা গুজব নাকি বাস্তবতা। গুজবে তো কেউ কান দেয় না, তিনি কেন কান দিতে গেলেন? আর বাস্তবতা হলে তাকেও কান দিতে হবে, সবাইকেই কান দিতে হবে।

প্রশ্ন : অনেকে বলছেন যে, ইসলামে দুধ ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ হলেও অন্যের দুধ খাওয়া তো নিষিদ্ধ নয়। ’হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ তো আর কোনো ম্যারেজ মিডিয়া নয়, তারা তো কারো সাথে কারো বিবাহ দিয়ে দেয়ার কাজ করে না। হাঁ, পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে দুধ-মা ও ভাই-বোনের বিষয়টি অজানা ও অস্পষ্ট থাকে। যে কারণে পরবর্তীতে সমস্যা হওয়ার একটা আশংকা থাকে। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশ হিসাবে বিষয়টি মেইনটেইন করে নিলেই তো হয়। তাহলে কেন আস্ত মিল্ক ব্যাংককেই নাজায়েয বলা হচ্ছে। আর বর্তমানে আধুনিক যুগে পরিচিতির বিষয়টা মেইনটেইন করা তো আর কোনো কঠিন কাজ নয়। কম্পিউটারে একটি সফটওয়্যার বানিয়ে নিলেই হয়। যে লগে হিসাব রাখবে, কে কার দুধ খেয়েছে। এই রেকর্ড আর্কাইভড হয়ে থাকবে এবং যখন প্রয়োজন হবে তখন ডাটাবেসে নাম, পিতা-মাতার নাম-ঠিকানা, জন্মতারিখ ইত্যাদি দিয়ে সার্চ দিলেই বেরিয়ে আসবে, কে কার দুধ পান করেছে?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: আমাদের দেশে এই একটি জায়গাতেই সমস্যা নয়; বরং অর্থনীতি বলি, রাজনীতি বলি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই একটি সমস্যা হচ্ছে যে, আমরা ভাবনায় এক জগতে বাস করি আর বাস্তব ক্ষেত্রে ভিন্ন আরেক জগৎ তথা উন্নত দেশের নীতি ও পদ্ধতি এবং তাদের কথা চিন্তা করে এখানে কাজ করতে চাই। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কোন্ দেশে বসে এ কথা বলছেন যে, একটা সফটওয়্যার বানিয়ে নিলেই হবে, একটা আর্কাইভ তৈরি করে নিলেই হবে। যেখানে আপনি বলছেনই- এতীম, অসহায়, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছিন্নমূল অভিভাবকহীন পথশিশুকে দুধ পান করাবেন। যেটা এমন এক দেশ, যেখানে আজকেও সাক্ষরতার হার অনেক কম। এখনো দস্তখতের পরিবর্তে হাতের টিপ নিয়ে বহু কাজ করতে হয়।
সে দেশের মধ্যে একটা আর্কাইভ থাকলে, একটা সফটওয়্যার থাকলেই সমাধান হয়ে যাবে? এই সফটওয়্যার ও আর্কাইভ দ্বারা কারা কারা সুবিধা ভোগ করবে, নিজের বিবাহের আগে খোঁজ নিয়ে এমনটা করবে? এটা অনেকটা অলীক কথা, যা আমাদের দেশের সাথে অন্তত কোনোভাবেই মানানসই নয়।

তাছাড়া পরিচয় সংরক্ষণের জন্য এধরনের সফটওয়্যার বাস্তবে কতটুকু শক্তিশালী মাধ্যম? বিশ্বের উন্নত থেকে উন্নততর রাষ্ট্রেও মাঝে-মধ্যেই সফটওয়্যার হ্যাক হয়ে যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা লস হয়ে যায়। তো সেখানে আমাদের মত দেশে এরকম একটা ডাটাবেস বানালে কিংবা একটা সফটওয়্যার তৈরি করলেই সব পরিচয় সংরক্ষিত থেকে যাবে- এটা কতটুকু আস্থা বা বিশ্বাাসযোগ্য কাজ? যে কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা মহলই বুঝতে পারবেন যে, বিষয়টা মুখে বলা যত সহজ কর্মক্ষেত্রে ততটা সহজ নয়।

আরেকটি বিষয়, যদি ধরে নিই যে, আমাদের সমাজের সবাই সু-শিক্ষিত, সবাই আর্কাইভ সংরক্ষণ করে রাখবে, তথাপি আগে আমরা বলে এসেছি যে, দুধ পান সম্পর্কিত বিবাহের বিধানটি শুধু শিশু এবং ঐ মহিলার সন্তানদের মধ্যে সীমিত নয়; বরং বিষয়টি আরো অনেক বিস্তৃত, প্রসারিত এবং পুরো বংশ-পরম্পরার সাথে স¤পৃক্ত। তো শুধু দুগ্ধদানকারী মা ও দুধ পানকারী শিশুর পরিচয় আর্কাইভড করে রাখলে হবে? অন্যদের বিষয়গুলো কে সংরক্ষণ করবে?
তাছাড়া প্রত্যেককে আইডি কার্ড দেওয়া, আলাদা আলাদা কৌটায় দুধ রাখার যে জটিল প্রক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, বিড়ালের গলায় সেই ঘণ্টা বাঁধবে কে? কথাগুলো বলা যত সহজ নিয়মিত যথাযথভাবে প্রয়োগ করা ঠিক ততটাই কঠিন। অন্যান্য সেক্টরের মতো আমাদের দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কত ধরনের খামখেয়ালীর কথা আমরা শুনি। একজনের শিশু আরেকজনকে দিয়ে দেয়। আরো কত সব আশ্চর্য ঘটনা। তো যখন এটা ব্যাপক হবে তখন সবাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই আইডি প্রদান বা এজাতীয় অন্যান্য কাজ করবে- এর নিশ্চয়তা কী?

আর একথা যে, ‘এটা ম্যারেজ মিডিয়া নয়’ কথা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যখন একটা কাজ করবেন তখন দ্বিতীয়টা আপনার কাঁধে এমনিই বর্তাবে। আপনি বিবাহ দেওয়ার কাজ করছেন না, সেটা তো আমরাও বলছি। আপনি যদি বিবাহের কাজও সারিয়ে দিতেন তাহলে তো ভাল ছিল। আপনি তো বুঝে শুনেই দিতেন, তার দুধ-আত্মীয়দের মধ্যে দিতেন না। আপনি দায়িত্ব নিচ্ছেন একটার, আর ওটার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যটি। এটাও একটা সমস্যা। (পুন:প্রকাশ)

ইনশাআল্লাহ দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি

বিজ্ঞাপন