শিশুদের বাংলা শেখা : কঠিন বিষয়কে যেভাবে সহজ ও আনন্দময় করবেন

170

খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ।।

বাচ্চাদের স্বভাব, রুচি, মন ও মেজাজ বড়দের মতো নয়। তাদের পড়ার প্রক্রিয়াটাই হতে হয় খেলা, বিনোদন ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মিশেলে। বিষয়টি শিশু মনস্তত্ত্বের অংশ। যাঁরা শিক্ষাঙ্গণে শিশু পাঠদানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন- তাঁদের পর্যবেক্ষণ হলো, বাচ্চাদের মগজে বিষয়বস্তু গেঁথে যাওয়ার অন্যতম কৌশল হলো কবিতা বা ছন্দের মতো করে পড়া। ছড়া, কবিতা, নাশীদ-জাতীয় ছন্দোবদ্ধ পড়া শিখতে ওদের কষ্টবোধ হয় না, বিরক্তি আসে না। শিশুতোষ বইগুলো তাই কমবেশি ওভাবেই প্রণীত।

সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিসংখ্যান থকেে দেখা যায়, শিশু শ্রেণি প্লে-নার্সারির কথা বাদ দিলেও প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এমনকি ক্ষেত্রেবিশেষে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের বাংলা শেখার বুনিয়াদ খুবই করুণ ও শোচনীয়। এ ‘শোচনীয়’ ও ‘করুণ’ অবস্থার জন্য শিক্ষকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সিলেবাস, পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব কোনোটাকে এককভাবে দায়ী করা সমীচিন হবে না। বহুবিধ কারণ ও অনুঘটক থাকলেও আমাদের পর্যবেক্ষণে প্রধান কারণ যথাযথ পরিকল্পনার অভাব ও সঠিক পাঠ্যবইয়ের অনুপস্থিতি।

পরিকল্পনার বিষয়টি এখানে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন ও অবকাশ নাই। সঠিক পাঠ্যবই এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দু’চারটি কথা বলা যায়। অভিজ্ঞতার আলোকে আপনি দেখবেন, শিশুদের তৃতীয় শ্রেণির চৌকাঠ পার হবার আগেই যেখানে বানান, পাঠশক্তি এবং তার স্তরোপযোগী শ্রুতিলিখন-দক্ষতা গড়ে ওঠার কথা তা গড়ে ওঠছে না। ভাষা শিক্ষা পাঠদানের একটি স্বীকৃত কৌশল হলো অধিক অনুশীলন। যে স্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ভাষার নিয়মকানুন শিখবে সেখানে যে পরিমাণ কায়দা ও নিয়ম শেখানো হবে তার বহুগুণ বেশি চর্চা করতে ব্যবহারিক উদাহরণ। প্রাথমিক স্তরের শুরুদের দিকে বাচ্চাদের বাংলা বিষয়ের বইয়ে পাঠদক্ষতা বাড়ানো এবং বানান রপ্ত করার জন্য দুই, তিন, ও চার অক্ষরের বর্ণযোজনা, কারবিহীন এবং বিভিন্ন কারযোগে প্রচুর শব্দ শেখাতে হয়। এই শেখান যেন তাদের মস্তিষ্কে চাপ তৈরি না করে পড়াগুলো সুচিন্তিতভাবে ছন্দ, গান ও ছড়ার কাঠামোতে তৈরি করা গেলে সমধিক সুফল পাওয়া যায়।

সেইসঙ্গে কোমলমতি ভবিষ্যতের ভালো প্রজন্ম বা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যে দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায় তা যথাযথভাবে পালনের কার্যকর উপায় হলো আবহমান ধর্মীয় মূল্যবোধ, শুদ্ধ সংস্কৃতি, আদব-আখলাক ও নীতি-আদর্শের সবকটি কঁচি বয়সের তাদের মগজে গেঁথে দেওয়া। নৈতিকতার বুনিয়াদের ওপর গড়ে ওঠা সন্তানরা যে, বড় হয়ে সমাজের সম্পদ হবে; আপদ হওয়ার আশঙ্কা নাই এটা সর্বজনস্বীকৃত কথা।

আমরা বিষয় হিসেবে কেবল বাংলা নিয়েই কথা তুলেছি। যদিও এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সফলতা পেতে হলে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম তৈরি করা দরকার। লক্ষ্যবস্তু অর্জনে বিজ্ঞ, চিন্তাশীল ও দরদী একদল ‘কারিগরকে’ পূর্ণ উদ্যমে কাজে নেমে পড়তে হবে। ভাষার মাসে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা কর্তৃকপক্ষ ও সচেতন অভিভাবকদের বিশেষভাবে চিন্তাভাবনার আহ্বান জানাই।

লেখক: আলেমে দ্বীন, লেখক ও সম্পাদক