টিপু সুলতানের দুর্লভ পত্রাবলী

মুহাম্মাদ সাঈদ হুসাইন ।।

টিপু সুলতানের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন একজন খোদাভীরু আলেম,  তেমনি আরেকদিকে ছিলেন দূরদর্শী, জনদরদী, ন্যায়পরায়ন শাসক। বলা যায়, তিনিই হিন্দুস্তানের শেষ ইসলামী শাসক। তিনি ২০-১২-১১৬৩ হিজরী (১০-১১-১৭৫০খৃ.) শনিবার সকালে ‘দিভানাহল্লী’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০-১-১১৯৬ হিজরী (২৭-১২-১৭৮২খৃ.) শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে রাজক্ষমতা গ্রহণ করেন। এবং   ২৮-১১-১২১৩ হিজরী (৪-৫-১৭৯৯) তারিখে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধকালে রনাঙ্গনে শাহাদাত বরণ করেন।

বিজ্ঞাপন

যদিও তাঁর শাহাদাতের ৫৮ বছর পর গোটা হিন্দুস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দখলে আসে তবে মূলত ‘সালতানাতে খোদাদাদের’ পতনের পরই অঘোষিতভাবে ভারতভূমি সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুর ইংরেজদের দখলে চলে যায়।

রণাঙ্গনে তাঁর শাহাদাতের পরই তাঁর রক্তে রঞ্জিত দেহের সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজ জেনারেল হ্যারিস বলেছিলো, ‘আজ হতে হিন্দুস্থান আমাদের’। সত্যিই সেদিন থেকে ভারতভূমি তাদের হয়ে গেল। আমাদের হাত থেকে হিন্দুস্থান চলে গেল তাদের হাতে। এরপর থেকে আমরা …!

টিপুর শাহাদাত ছিলো মূলত ১৩শ বছরের মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজিডি। ‘সালতানাতে খোদাদাদে’র পতনের ৫০-৬০ বছরের মধ্যে মুসলিম জাহানের পরিধি বিশ্বের মোট ভূখন্ডের ১৭% থেকে হ্রাস পেয়ে ৫% তে অর্থাৎ ১ কোটি ৫৭ লক্ষ বর্গমাইলের স্থলে মাত্র ৪৫ লক্ষ বর্গমাইলে নেমে আসে।

তাঁর নিজ হাতে লেখা বেশকিছু চিঠিপত্র নানা সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে আবিস্কার করা হয়েছে। যাতে তার ঈমানি গায়রত ও আত্মমর্যাদা, শাহাদাতের জযবা ও ব্যাকুলতা, এবং রাষ্ট্রীয় দূরদর্শীতা ও কর্মকুশলতা ফুটে উঠে।  পত্রগুলোতে বর্তমান মুসলিম শাসক-প্রশাসকের জন্য একদিকে যেমন রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ হেদায়েত, অপরদিকে ভারতের বর্তমান শাসকদের জন্যেও রয়েছে অনেক শিক্ষা। আবিস্কৃত মূল্যবান সে পত্রাবলী থেকে কয়েকটি পত্র আমরা তুলে ধরছি :

ঐতিহাসিক অঙ্গিকারনামা

১.   আল্লাহর সন্তুষ্টি পরিপন্থী কোন কাজ করবো না। করলে উপযুক্ত শাস্তি মেনে নেব।

২.   যদি কখনো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদ আত্মসাৎ করি তাহলে আমাকে যেন ফাঁসি দেওয়া হয়।

৩.  মিথ্যা বা প্রতারণা করলে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করানো হবে।

৪.   আব্বাজানের অনুমতি ব্যতিত কারো হাদিয়া গ্রহণ করবো না। করলে আমার নাক কেটে দেশান্তর করা হবে।

৫.   রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে যদি আমি কারো সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি বা কাউকে ধোঁকা দিই তাহলে আমি ফাঁসির উপযুক্ত হব।

৬.  যদি রাষ্ট্রের পক্ষ হতে আমাকে কোন দায়িত্ব প্রদান করা হয় অথবা আমার নেতৃত্বে কোন সৈন্যদল প্রেরণ করা হয় তাহলে আমি আহলে শূরার পরামর্শক্রমে দায়িত্ব আঞ্জাম দিব। বিপরীত করলে আমার গলায় ফাঁসির রশি পড়ানো হবে।

৭.   কারো সঙ্গে কোন চিঠিপত্র বা লেনদেন করতে হলে আপনার (পিতার) পক্ষ হতে নিযুক্ত পরামর্শদাতাদের রায় নিয়ে করবো।

৮.  উপরোক্ত প্রতিশ্রুতি আমি স্বেচ্ছায়-স্বপ্রণোদিত হয়ে লিখলাম। মনের পাতায় এগুলো গেঁথে নিলাম। আমি অঙ্গিকার করছি, সমস্ত কাজ এভাবেই আদাই করবো। ব্যতিক্রম হলে গৃহিত যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নিব।

খলীফা সুলতান সালীম বরাবর প্রেরিত পত্রIO Islamic 2379_f3-4

টিপু সুলতান সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝে ঐক্য গড়ে তুলতে এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে সুবৃহৎ রাজনৈতিক ও সামরিক-শক্তি গড়ে তুলতে উসমানী খলীফা সুলতান সালীম বরাবর একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। ৫-১২-১৭৮৭ খৃস্টাব্দে তারা খলীফার দরবারে পৌঁছে মীর গোলাম আলী খলীফার হাতে সুলতানের পত্র পেশ করেন। তাতে টিপু লিখেছিলেন :

“৩৫ বছর যাবত খৃস্টানরা তৈমুর পরিবারের (মোঘল) দুর্লবতা-দুনীর্তি ও অদক্ষতা-অযোগ্যতা অপব্যবহার করে হিন্দুস্থানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর উপর বাণিজ্যের ছদ্মাবরণে দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের সুজলা-সুফলা ভূমির সন্ধান পেয়ে দলে দলে তারা ভারতবর্ষে পাড়ি জমাচ্ছে। বিভিন্ন অপকৌশলে অনেক নগরী একে একে দখল করে নিচ্ছে। বঙ্গদেশ সরকারের বার্ষিক ৩৫ কোটি টাকার আমদানিও দখল করে নিয়েছে। তাদের নৈতিক অবক্ষয়, চারিত্রিক বিশৃঙ্খলা, সাম্প্রকদায়িকতা ও উগ্রবাদীতার কারনে তারা একের পর এক জঘন্য অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ-পরিস্থিতির এই দুর্যোগ ও সঙ্কট আপনাকে অবহিত করতেই আপনার কাছে আমার এ প্রতিনিধিদল প্রেরণ। ইসলামকে শক্তিশালী করতে এবং শত্রুদের নির্মূল করতে আমরা আপনার সার্বিক সহায়তা কামনা করছি।”

এরপর ইংরেজদের বিরুদ্ধে টিপুর সঙ্গে একটি লিখিত চুক্তিনামার অনুরোধ পেশ করে। চুক্তিনামার খসড়া স্বয়ং টিপু সুলতানই প্রস্তুত করেছিলেন। স্বাক্ষরের সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়ে তারা ঐ খসড়া চুক্তি সুলতানের সমানে উপস্থপন করে। খসড়া-চুক্তির কয়েকটি দফা নিন্মরূপ :

১.   ভ্রাতৃপ্রতীম এই দুই ইসলামী রাষ্ট্র পরস্পর সর্বদা সুসম্পর্ক বহাল থাকবে।

২.   বছরার নৌবন্দর টিপু সুলতানকে ইজারা দেওয়া হবে।

৩.  বিনিময়ে উসমানী সুলতান ‘সালতানাতে খোদাদাদের’ যে কোন নৌবন্দর পছন্দ করে নিতে পারেন। নৌবন্দরের এই পারস্পারিক বিনিময় দুই মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝে আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি পাবে। নৌজাহাজের আগমন-নির্গমনের পথ আবিস্কৃত হবে। রাষ্ট্রদ্বয়ের এই কল্যাণকামী চেতনা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহের কল্যাণ বয়ে আনবে।

৪.   ইংরেজদের বিরুদ্ধে উসমানী খেলাফতের সামরিক সহায়তার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার টিপু সুলতান বহন করবে।

৫.   বিনিময়ে প্রয়োজনের সময় মহিসুরের সেনাবাহিনী নিজ খরচে উসমানী খেলাফতকে সামরিক সহায়তা প্রদান করবে।

৬.  মহিসুরে যদিও প্রচুর অস্ত্র কারিগর রয়েছে, তবুও ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে অস্ত্রতৈরীর কিছু বিশেষজ্ঞ তুর্কিস্থানের পক্ষ থেকে সালতানাতে খোদাদাদে প্রেরণ করা হবে।

৭.   বিনিময়ে সালতানাতে খোদাদাদের পক্ষ থেকে তুর্কি প্রশাসনকে প্রার্থিত বিশেষজ্ঞ প্রেরণ করা হবে।”

সোমবার ১৪-১-১২০০ হিজরী                                                                             ১৭-১১-১৭৮৫ খৃস্টাব্দ                                                                                      স্থান : শ্রীরঙ্গপত্তনম

IO Isl 4684 f94v seal

গুরুজীর প্রতিউত্তরে লিখিত পত্র

সালতানাতে খোদাদাদের তখন অন্যতম শত্রু ছিলো মারাঠা। একদিন এই মারাঠারা সিরা নগরীতে প্রবেশ করে চরম সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। মন্দিরগুলো থেকে ব্যাপক লুটপাট করে। ‘সুরঙ্গিরী’ হিন্দুদের মন্দিরে খাঁটি সোনা দিয়ে নির্মিত ও মূল্যবান মাণিক্য জড়ানো একটি পালকি ছিলো। মারাঠারা মন্দির উপড়ে বাইরে ফেলে সেই পালকি, হিরা-জওহারসহ ৬০ লক্ষ রুপির সম্পদ চুরি করে পালিয়ে যায়। মন্দির-রক্ষক ‘শঙ্কর জগৎগুরু’ তখন টিপু সুলতানকে পত্র লিখে অবহিত করেন। ন্যায়পরায়ন মুসলিম শাসক টিপু উত্তরে তাকে সান্তনা দিয়ে পত্র লিখেন। মহিসুরের প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের ডিরেক্টর ড. রায় বাহাদুর নরসিমহা আচার্য ১৯১৬ সালে ‘সুরুঙ্গিনী’ মন্দির থেকে পত্রটি উদ্ধার করেন।

“যারা কোন ধর্মের পবিত্র স্থানগুলোর অবমাননা করবে, মৃত্যুর পর তাদের প্রত্যেককে অবশ্যই আপন কৃতকর্মের জন্য ফলভোগ করতে হবে। মানুষ মন্দকাজ সম্পাদন করে হাসিমুখে, কিন্তু তার পরিণাম ভোগ করতে হয় অশ্রুসজল চোখে।

ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করার অর্থ হল, নিজের উত্তরসূরিদের জন্য ধ্বংস ডেকে আনা। যে বা যারা আমাদের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে আমদের জনগণকে কষ্ট দেবে আমরা অবশ্যই তাদেরকে দেখে নেব।

আপনি আমাদের চোখে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। দুনিয়ার প্রতি নির্লোভ। আপনি আমাদের সাম্রাজ্যের স্থিতি ও নিরাপত্তা এবং শত্রুদের ‘হালাকের’ প্রার্থনা করুন। আপনার প্রয়োজন অনুসারে আমার অধীনস্থ গ্রামগুলো থেকে যে কোন জিনিস গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।”

 

সুলতান সালীমের পত্রের উত্তর

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইঙ্গ-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী-দ্বন্দ চলাকালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান হয়। এদিকে হিন্দুস্থান ইংরেজরা দখলের পাঁয়তারা করছিলো। তখন টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে সামরিক ও কুটনৈতিক সহায়তার জন্য নেপোলিয়নের কাছে চিঠি লিখেন। নেপোলিয়ন ‘সালতানাতে খোদাদাদের’ বিস্তারিত জানতে চেয়ে পত্র পাঠায়। টিপু সেটার উত্তর প্রেরণকালে পথিমধ্যে মক্কার গভর্নরের হাতে ধরা পড়ে যায়। ওদিকে নেপোলিয়ন উসমানী খেলাফতের হাত থেকে মিসর ছিনিয়ে নেয়। ফলে সুলতান সালীম ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ এবং ফরাসিদের সঙ্গে সামরিক ও কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে বার্তা প্রেরণ করেন। জবাবে টিপু সুলতান রহ. আরবীতে লিখেন :

“আপনার পত্র আমাদের হস্তগত হয়েছে। যা ফরাসিদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ইংরেজদের প্রশংসা-বন্দনায় ভরপুর। তাতে আমাদের ও ইংরেজদের মধ্যকার চলমান বিবাদ অবসানের প্রস্তাব ছিলো। আমরা তো কেবল দ্বীনে মুহাম্মাদী সা. -এর পুনরুজ্জীবন ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে রনাঙ্গণে অবতীর্ণ হয়েছি। ফরাসিদের ধোঁকা-প্রতারণা সম্পর্কে আমরা অবগত। কিন্তু বর্তমানে  আমাদের সামনে সবচে বড় সমস্যা ইংরেজরা, ফরাসিরা নয়। ইংরেজরাই ভারতবর্ষের ‘ইসলামী সালতানাত’ ধ্বংসের পায়তারা করছে। যার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ‘অস্ত্র ধারণ’ শুধু আমাদেরই নয়; বিশ্বের সকল মুসলমানের উপর আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আপনি শুধু আমাদের জন্যে আল্লাহর বিশেষ সহায়তা ও তাওফীকের প্রার্থনা করুন। ”

ওয়াস সালাম

টিপু সুলতান

কাবুল শাসকের নিকট প্রেরিত পত্র

আফগানিস্থান ছিলো তখন ‘মোটামুটি’ শক্তিশালি মুসলিম রাষ্ট্র। সা¤্রাজ্যবাদী ইংরেজরা গোটা বিশ^ শাসন করলেও আফগান-মুজাহিদদের কাছে পর্যদুস্ত হয়েছিলো। তৎকালিন সময়ে অত্র অঞ্চলে আহমদ শাহ্ আবদালির পৌপুত্র যামান শাহ্কে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মনে করা হত। তাই টিপু সুলতান কাবুলের শাসকের উদ্দেশে পত্র লিখলেনÑ

“সালতানাতে খোদাদাদে প্রতি শুক্রবার জুমার পর আপনার সালতানাতের বিস্তৃতি ও স্থিতির জন্য দু‘আ করা হয়। আমরা দ্বীন রক্ষা করে মুসলিম শাসকবর্গের সাথে সর্বদাই ঐক্য গড়তে আগ্রহী। বিভিন্ন ইসলাম-বিদ্বেষী শক্তি এখন আমাদের উপর হামলা ও আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাই এখন আমরা আপনার সামরিক সহায়তা কামনা করছি। আশা করি, আপনি আমাদের সহায়তা করে এই নেক কাজে অংশগ্রহণ করবেন।”

 

ইংরেজ খৃস্টান বরাবর টিপুর পত্র

ইংরেজ এডমিরাল ব্রিগেড জেনারেল মেকলোড মঙ্গলোর আক্রমণ করে এবং শক্তি পরীক্ষার জন্য টিপু সুলতানকে রণাঙ্গনে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার উস্কানি দেয়। জ্ঞানী ও নির্ভিক শাসক টিপু তার উস্কানীমূলক পত্রের উত্তরে লিখেন-

“নির্ভরযোগ্য উৎসগ্রন্থের আলোকে স্পষ্ট, আপনারা নিজেদেরকে হযরত ঈসার (আ.) অনুসারী বলে যে দাবী করে থাকেন তা সম্পূর্ণরূপে অবান্তর ও অবাস্তব। আসল ইনজিলের কোথাও ত্রিত্ববাদ নেই। এই ত্রিত্ববাদ সম্পূর্ণ মুশরিকদের কাজ। হযরত ঈসা আ. শুধু এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তোমরা ইনজিলের শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে মদ্যপান, শুকর ভক্ষণ ও সুদ-জুয়ার বিস্তার ঘটাচ্ছ। যে নিকৃষ্ট কাজগুলো নিছক ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু নিষিদ্ধই নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক দিক থেকেও চরম ঘৃনিত ও গর্হিত এমন প্রতিটি কাজে তোমরা লিপ্ত।

মহান আল্লাহ তায়ালা, হযরত ঈসা আ. ও সকল অভিজাত ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টিতে তোমরা অত্যন্ত ঘৃণিত ও ধিকৃত। এ কারণেই তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা আমাদের উপর ফরজ হয়ে গেছে।

আমি যা বলেছি সে সম্পর্কে তোমার যদি বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ থাকে, তাহলে তুমি রণাঙ্গনে আসো। আমাদের মুজাহিদদের শৌর্য-বীর্য দেখে যাও এবং তাদের তরবারির ঝংকার শুনে যাও ! এখানে সিপাহির বিরুদ্ধে সিপাহি এবং অফিসারের বিরুদ্ধে অফিসার আপন আপন যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি হবে। তখনই ফায়সালা হবে, কারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা ?”

 

 মোঘল সম্রাট বরাবর পত্র

দিল্লীর তৎকালীন মোঘল বাদশা শাহ্ আলম বরাবর টিপু সুলতান লিখেন :

“হিন্দুস্থানের শাহানশাহ শাহ আলম সমীপেষু !

মুহতারাম মহামান্য সুলতানের পত্রটি দেখে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি। রাওবাল মুকুন্দদাস মারফত যে হাদিয়া ও উপঢৌকন আপনি প্রেরণ করেছেন তা একদিকে আমার প্রতি আপনার অপার স্নেহ-ভালবাসার প্রমাণ বহন করেছে, অপরদিকে সতীর্থদের মধ্যে আমার গৌরব ও ইজ্জতকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্যের অঙ্গিকার করছি।

এই খাদেম মুহাম্মাদ (সা.)-এর দ্বীন হেফাজতের জন্য ইংরেজ খৃস্টানদের নির্মূলে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের অপ্রতিরোধ্য নির্মূল অভিযানের সামনে ইংরেজরা টিকতে না পেরে একটি লাঞ্ছনাকর চুক্তিতে সাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে। সে ইতিহাস এতই মশহুর এ মুহূর্তে যার উল্লেখ অপ্রয়োজন বোধ করছি।

দ্বীনে মুহাম্মাদীর এই খাদেম আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের উপর ভরসা করে এখন যে মিশন হাতে নিয়েছে তা হলো, মৃত্য পর্যন্ত ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবে এবং ভারতভূমি থেকে তাদের নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষান্ত হবে না।

এই খাদেম আপনার প্রতি যে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও অশেষ আস্থা পোষণ করে তার প্রমাণ স্বরূপ আপনার খেদমতে একশ একুশটি স্বর্ণনির্মিত মোহর পাঠিয়েছি। সেগুলো গ্রহণ করে আমাকে ধন্য করবেন। মহামান্য সম্রাটের নিকট বিনীত অনুরোধ এই যে, সর্বদা অবশ্যই আপনার নির্দেশনা জানিয়ে বাধিত করবেন।

ওয়াস সালাম

টিপু সুলতান

২৩-জুন-১৭৮৫ খৃ.

 

তথ্যসূত্র:

‘সহীফায়ে টিপু সুলতান’ : মাহমুদ খান,

‘টিপু সুলতান আওর শ্রীরঙ্গিরি মঠ’ : মুহাম্মাদ গাউস মুজাভের,

‘শহীদ টিপু সুলতান’ : মুহাম্মাদ ইলয়াস নদভী