হযরত মাওলানা কারী বেলায়েত হুসাইন রাহ. : কুরআনের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ মনীষী

তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

 কারী বেলায়েত হুসাইন রাহ.-এর পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানাধীন ইবরাহীমপুর (কৃষ্ণপুর) গ্রামে। বিশ শতকের প্রথম দশকে (১৯০৭-৮ বা ১৯১০ সালে) মুন্সি আবদুল জলীল সাহেব রাহ.-এর ঔরসে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আবদুল জলীল সাহেব ছিলেন খুবই বিনয়ী, সৎ ও মহৎ মানুষ। তাঁর দুই মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে দু’জন বড়। আর ছেলে-বেলায়েত হুসাইন তাঁর জীবনের শেষ সম্পদ। দীর্ঘ স্বপ্ন-সাধ ও দুআ-মুনাজাতের পর একেবারে শেষ বয়সে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই সম্পদ দান করেন।

বিজ্ঞাপন

কারী বেলায়েত হুসাইন রাহ. মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান। ছয় বছর বয়সে হারান মাকে। ফলে শৈশব থেকেই তার জীবনের মুজাহাদা শুরু হয়ে যায়।

বাবার খুব ইচ্ছা ছিল একমাত্র ছেলেকে আলেম বানাবেন। কুরআনী শিক্ষায় গড়ে তুলবেন। বড় মেয়ের কাছে এই ইচ্ছার কথা তিনি বারবার প্রকাশ করেন। ছেলের জন্য উর্দূ তরজমাযুক্ত এক জিলদ কুরআন শরীফও সংগ্রহ করেন। কিন্তু নিজ হাতে সেই কুরআন দিয়ে যেতে পারেননি ছেলেকে।

দুই বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় মা-বাবাকে হারিয়ে কারী সাহেব রাহ. একেবারে একা হয়ে যান। তখন তাঁর চাচা মৌলবী ওয়ালিউল্লাহ সাহেব (মাওলানা কারী রহমতুল্লাহ সাহেবের বাবা) তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। কিন্তু এখানে তাঁর পড়াশোনার কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি চলে যান হাজীগঞ্জে। খালাতো বোনের বাড়িতে। সেখানের এক স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা।

কারী সাহেবের বড় বোন তাঁকে বলেছিলেন বাবার স্বপ্নের কথা। আলেম বানানোর স্বপ্নে যেই কুরআন শরীফ বাবা রেখে গিয়েছিলেন সেটিও দিয়েছিলেন তাঁকে। তাই তিনি মনে মনে কোনো মাদরাসার সন্ধানে ছিলেন। আল্লাহ্র মেহেরবানীতে একসময় চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বারোপাইকা গ্রামে একটি মাদরাসার সন্ধান তিনি পেয়ে যান। সেখানে গিয়ে ভর্তি হলে ছোট এই এতীম বাচ্চার প্রতি উস্তাযগণ খুব খেয়াল রাখেন। তার জন্য একটি জায়গির বা লজিংয়ের ব্যবস্থাও করে দেন। সেই মাদরাসা ছিল কাফিয়া জামাত পর্যন্ত। কাফিয়া পড়ার পর তাঁর উস্তায কারী সিরাজ ছাহেব রাহ. তাঁকে ঢাকার জামিয়া হুসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড়কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। সে মুতাবেক তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং বড়কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হন।

এখানে তিনি পেয়ে যান সময়ের শ্রেষ্ঠ তিন মনীষী হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর ছাহেব হুযূর) রাহ., হযরত মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযূর রাহ. ও হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহ্হাব পীরজী হুযূর রাহ.সহ দেশের বড় বড় কয়েকজন আলেমকে।

বারোপাইকা পড়াশোনাকালে তিনি সময়-সুযোগে দর্জির কাজও শিখে নিয়েছিলেন। রমযান মাসে যখন মাদরাসা ছুটি হত, তিনি টেইলার্সে কাজ করে সারা বছরের খরচ যোগাতেন। নানা প্রয়োজন ও সংকটে অনেক কষ্ট হলেও তিনি কখনো যাকাত-ফিতরা গ্রহণ করতেন না। কখনো মাদরাসার ‘ইমদাদী খাবার’ খেতেন না।

ঢাকায় আসার আগের রমযানে দর্জির কাজ করে যে টাকা তিনি জমিয়েছিলেন কয়েক মাসের মধ্যেই তা শেষ হয়ে গেলে খুব সংকটে পড়ে যান। তখন মাদরাসার পক্ষ থেকে বুড়িগঙ্গার ওপারে বেশ দূরে একটি জায়গিরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। সেখানে মসজিদে নামায পড়াতে হত। তবে কোনো ওযীফার ব্যবস্থা হত না। ব্যবস্থা হত শুধু থাকা-খাওয়ার।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইবাদত ও তাকওয়া-পরহেযগারির বিষয়ে খুব যত্মশীল ছিলেন। সেজন্য আসাতিযায়ে কেরামের নেক নযর ছিল তাঁর প্রতি। তাছাড়া নিজ থেকেও উস্তাযদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন। উস্তাযগণও তাঁকে মহব্বত করতেন।

১৯৪৬ সালে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন হলে হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ. তাঁকে গোপালগঞ্জের (তৎকালীন ফরিদপুরের) গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় নিয়ে যান। সেখানে শিক্ষকতা ও মাদরাসা-মসজিদে ইমামতির দায়িত্বে তাঁকে নিযুক্ত করেন। সে বছর তিনি পুরো এক শিক্ষাবর্ষ সমাপ্ত করে একেবারে রমযানের ছুটিতে বাড়ি যান। বার্ষিক পরীক্ষায় তাঁর পড়ানো কিতাবগুলোতে ছাত্ররা অনেক নম্বর পাওয়ায় সদর ছাহেব রাহ. খুব খুশি হন। ফলে পরের বছর উপরের জামাতের কিতাবাদি পড়াতে দেন। তিনি হুযূরের কাছে আদবের সঙ্গে বলেন, ‘আমি আরো কিছুদিন নিচের কিতাবগুলো পড়াতে চাই।’

সেখানে তিনি মুখতাসারুল কুদূরী, কানযুদ দাকায়েক, সিরাজী ইত্যাদি কিতাবের দরস দেন। সেইসঙ্গে দারুল ইফতায় ফারায়েযের দায়িত্বও পালন করেন। গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় মোট দুই বছর খেদমত করেন তিনি।

১৯৪৮-৪৯ সালে চাঁদপুরের জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূম জাফরাবাদ মাদরাসার জন্য সদর ছাহেব হুযূর রাহ.-এর কাছে একজন যোগ্য মুহতামিম চেয়ে দরখাস্ত করা হয়। সদর সাহেব রাহ. কারী বেলায়েত সাহেব রাহ.কে এই দায়িত্বের জন্য নির্বাচন করেন এবং নিজ এলাকা চাঁদপুরে খেদমতের উদ্দেশ্যে তাঁকে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ সাত বছর তিনি জাফরাবাদ মাদরাসায় মুহতামিম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় মাদরাসার সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতির জন্য সীমাহীন মেহনত করেন। আল্লাহ্র ফযলে তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছোট্ট মাদরাসা বড় আকার ধারণ করে এবং তাতে জালালাইন জামাত পর্যন্ত দরস চলতে থাকে। সেখানে তিনি তাঁর সুব্যাপ্ত মেহনতের অংশ হিসাবে মক্তবের বাচ্চাদের পেছনেও অনেক সময় দেন। অল্প সময়ে কীভাবে পড়াকে এগিয়ে নেওয়া যায় সেই ফিকির করেন এবং এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন চিন্তা-গবেষণা প্রয়োগ করতে থাকেন। প্রতিটি জটিলতার জন্য আলাদাভাবে ফিকির ও গবেষণা চালিয়ে নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতি আবিষ্কার করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে এই কাজে তিনি এতটাই বিভোর ও নিমগ্ন হয়ে যান যে, কমিটির পক্ষ থেকে অভিমানক্ষুব্ধ অভিযোগ উঠতে শুরু করে। তারা মনে করেন, মুহতামিম সাহেব শুধু মক্তবের বাচ্চাদের নিয়ে পড়ে থাকলে মাদরাসার উন্নয়ন-উন্নতি কী করে হবে? এরপরও তিনি আপন গতিতে মেহনত চালিয়ে যেতে থাকেন। এমনকি গ্রামের মসজিদগুলোতেও তাঁর গবেষণা অনুযায়ী মেহনত আরম্ভ করেন। এরই মধ্যে তিনি তাঁর উস্তায হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর অনুমতি নিয়ে জাফরাবাদের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং মুহতামিমের পদকে পিছে ঠেলে দূরের-কাছের বিভিন্ন মসজিদে বাচ্চাদেরকে কুরআন শেখানোর মেহনতে আত্মনিয়োগ করেন।

কিছুদিন পর হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. জাফরাবাদ গেলেন। সেখানে কারী ছাহেব রাহ. হযরতের সাথে দেখা করতে এলে তাঁর বর্তমান কাজের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। এর আগেই সেখানের কিছু লোক হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর কাছে কারী সাহেবের এই মেহনত বিষয়ে অভিযোগ করেন। এসব শুনে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. বেলায়েত ছাহেব রাহ.-কে বললেন, বেলায়েত! বাচ্চাদেরকে তুমি কী পড়াও? কাল আমি তোমার মক্তব দেখতে যাব।

পরের দিন হাফেজ্জী হুযূর রাহ. মক্তবে গিয়ে বাচ্চাদের পড়া শুনে এত খুশি হলেন যে, কারী সাহেব রাহ.-কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, এত সুন্দর পড়া তো এমনিতে হয় না। নিশ্চয় তুমি অনেক মেহনত কর। হাফেজ্জী হুযূর রাহ. তার জন্য অনেক দুআ করলেন।

সে সময় তিনি সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ শেখানোর সাথে সাথে বাচ্চাদেরকে জরুরি মাসায়েল ও দুআ শেখাতে শুরু করেছেন। এভাবে একটানা কয়েক বছর মেহনত করে অনেক সাফল্য লক্ষ্য করেন।

বাচ্চাদের মাঝে তাঁর এই গবেষণার সুফল দেখে তিনি শোকর ও আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে উঠেন। ভাবেন, কীভাবে এই পদ্ধতি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সে উদ্দেশ্যে তিনি মুআল্লিম প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু কে আসবে তার কাছে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে!

বহু লোকের কাছে তিনি এই নূরানী পদ্ধতির দাওয়াত পৌঁছান। বিভিন্নজন থেকে অবজ্ঞা-তিরস্কারও সহ্য করেন। অবশেষে অল্প কয়েকজন মক্তবের শিক্ষককে নিয়ে চাঁদপুর শহরে অবস্থিত আবদুল গনি হাইস্কুলের মসজিদে তিনি এই প্রশিক্ষণ শুরু করেন। সেসময় ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁকে নানাভাবে সহায়তা করেন। এভাবে আরো কিছু মানুষ তাঁকে মহব্বত করে নানা সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে। তিনি তাদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকেন। আল্লাহ তাআলা তাদের সবাইকে আজরে আযীম দান করুন- আমীন।

তাঁর এই প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ব্লাকবোর্ডে লিখে পড়ানোর তরিকা ধরিয়ে দেওয়া। কারণ কায়দার এক পৃষ্ঠায় লেখা সবগুলো হরফের মধ্য থেকে কোনো একটি হরফকে বাচ্চাদের হৃদয়ে বসানো বাস্তবেই কঠিন। তাই তিনি একটি একটি করে হরফ ব্লাকবোর্ডে লিখে লিখে বাচ্চাদের হৃদয়েও এঁকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেইসঙ্গে একটি হরফ দিয়ে অনেক হরফ তৈরি করার কৌশল শিখিয়ে দেন। একটি রেখা দিয়েই কিভাবে ب ت ث ف (বা তা ছা ফা) তৈরি করা যায় বুঝিয়ে দেন। এভাবে নুকতাযুক্ত ও নুকতামুক্ত হরফগুলোকে আলাদাভাবে চিনিয়ে দেন। তাতে বাচ্চারা খুব আনন্দের সাথে সহজেই বিষয়গুলো আত্মস্থ করতে পারে।

এছাড়া একজন শিক্ষকের পক্ষে ভিন্ন ভিন্নভাবে একেক বাচ্চাকে লম্বা সময় দেওয়া কঠিন। অথচ বাচ্চারা একা একা পড়ে তেমন আনন্দ পায় না। তাদের অলসতা আসে। ব্লাকবোর্ডের এই পদ্ধতিতে সব বাচ্চারা একজন উস্তাযকে পূর্ণ সময় ধরে পায়। সেইসাথে একত্রে পড়ার যে আনন্দ সেটা তারা খুব উপভোগ করে।

বাচ্চাদেরকে বোর্ডে লিখে পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না- সে বিষয়ে তাঁর উস্তায হযরত সদর ছাহেব রাহ. তাঁকে গওহরডাঙ্গা থাকাকালেই একবার ইশারা করেন। কোনো এক প্রসঙ্গে সদর ছাহেব রাহ. তাঁকে বলেছিলেন, বেলায়েত! বাচ্চাদেরকে একত্রে বোর্ডে লিখে পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা করা যায় না? আল্লাহ্র মেহেরবানীতে উস্তাযের সেই ইশারা ও তাওয়াজ্জুহ পরবর্তী জীবনে তাঁর চিন্তার দিগন্তকে উন্মোচিত করে দেয়।

বোর্ডে লিখে পড়াতে গিয়ে তিনি একসময় লক্ষ্য করেন, বয়সের স্বল্পতা, অবহেলা বা অন্যমনস্কতার দরুন বাচ্চাদের পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না। তখন বাচ্চাদের হাতেও চক-শ্লেট তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, মনোযোগ ছাড়াও মুখে পড়া, বলা বা আওড়ানো সম্ভব। কিন্তু ব্লাকবোর্ডের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে উস্তাযের লেখা অনুসরণ করা মনোযোগ ছাড়া সম্ভব নয়। সেজন্য পরবর্তীতে তিনি দরসের মধ্যেই বাচ্চাদের লেখার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এভাবে ধীরে ধীরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানী ও করুণায় নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে করে তিনি ‘নূরানী পদ্ধতি’র যথেষ্ট সফল ও কামিয়াব একটি রূপ দাঁড় করান। আল্লাহ তাআলা এই পদ্ধতিকে উত্তরোত্তর উন্নতি দান করুন এবং তার ফায়দাকে আরো বাড়িয়ে দিন- আমীন।

চাঁদপুরের আবদুল গনি হাইস্কুল-মসজিদে মেহনতকালে তাঁর জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলো পার হয়। একদিকে নিমগ্ন গবেষণা অন্যদিকে মানুষের ভর্ৎসনা-তিরস্কার, সেইসঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী শিক্ষকদের দস্তরখানের ইনতিযাম এবং আপন পরিবারের খোঁজ-খবর। তীব্র সংকটময় এই সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বে-ইন্তিহা সবর ও মোজাহাদার তাওফীক দান করেন; অদৃশ্য তাসাল্লী ও সান্ত¡না এবং গায়বী মদদের ব্যবস্থা করেন। সেইসব গল্প অনেক দীর্ঘ।

কারী সাহেব রাহ.-এর আহলিয়া -হাফিযাহাল্লাহু তায়ালা ও রাআহা- (এই লেখা তৈরির সময় তিনি দুনিয়ায় ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দিবাগত রাতে তিনি আখিরাতের সফরে রওয়ানা হয়ে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম নসীব করুন।)-এর একটি মরিচগাছ ছিল। এই গাছে প্রতিদিন অসংখ্য মরিচ ধরত। তিনি একদিক থেকে মরিচগুলো উঠিয়ে নেওয়ার পর দেখা যেত পরের দিন অন্যদিকের ডাল ভর্তি মরিচ। এভাবে লাগাতার চলত। বিভিন্নজনের মাধ্যমে মরিচগুলো বিক্রি করে করে তিনি সংসার চালাতেন। তাতে কারী সাহেব রাহ.-এর সংসারিক ফিকির অনেক সহজ হয়ে যেত।

ওদিকে একজন শিক্ষকের জায়গির বাড়ি থেকে যে খাবার আসত তাতে এত বরকত হত যে, কয়েকজন শিক্ষক তৃপ্তির সাথে খেতে পারতেন। এভাবে  وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِب [এবং এমন স্থান থেকে আল্লাহ তাআলা তাকে রিযিক দিবেন, যা তার ধারণার বাইরে। -সূরা তালাক (৬৫) : ৩] আয়াতের বাস্তব নমুনা ছিল তাঁর জীবন।

কয়েক বছর সেখানে মেহনত করার পর হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর নির্দেশে তিনি ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় চলে আসেন। সেটা ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়। ১৯৬৩-৬৪ সন। এখানেও তিনি তাঁর মিশন নিয়েই কাজ করবেন জেনে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. মক্তব বিভাগের পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর কাছে অর্পণ করেন। তখন তিনি তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে মক্তব বিভাগকে এত উজ্জ্বল করে তুলেন যে, ফরিদাবাদ মাদরাসা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে কুরআন শিক্ষার বিরল এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করে।

১৯৬৫ সাল মোতাবেক ১৩৪৮ হিজরীর কথা। হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. ঢাকার আশরাফাবাদে (কামরাঙ্গীরচরে) একটি নতুন জায়গা পেয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই মাদরাসার পুরো দায়িত্ব হযরত বেলায়েত ছাহেব-এর উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি হজ্ব ও বাইতুল মুকাদ্দাস সফরে রওয়ানা হয়ে যান। বেলায়েত ছাহেব রাহ. সেখানে একটি টিনের ছাপড়া তুলে কুরআনের তালীম শুরু করেন।

চার মাসের সফর শেষে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. যখন দেশে ফেরেন, মাদরাসার এই অগ্রগতি দেখে খুবই খুশি হন এবং আপন শাগরেদের জন্য অনেক দুআ করেন। ধীরে ধীরে এই মাদরাসা ‘মাদরাসায়ে নূরিয়া’ নামে অনেক বড় মাদরাসার রূপ লাভ করে। তখন আবশ্যকীয়ভাবেই শিক্ষক-সহকর্মীদের সংখ্যা বাড়ে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে নিজের মিশন অনুযায়ী কাজ করা যায় না। তখন স্বীয় উস্তায ও মুর্শিদ হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর কাছে নূরিয়া থেকে চলে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলেন। এরপর একসময় মাদরাসার সমস্ত হিসাব-পত্র বুঝিয়ে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ছুটিতে যাওয়ার মতো করে বিদায় নেন।

পরবর্তীতে হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. তাঁকে আবার নূরিয়া মাদরাসায় আসার কথা বললে তিনি বিনয়ের সঙ্গে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে নূরানী প্রশিক্ষণের খেদমত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এভাবে স্বীয় উস্তায ও মুর্শিদের অনুমতিক্রমে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেহনত শুরু করেন আর শুধু রমযান মাসে কামরাঙ্গীরচরে প্রশিক্ষণের খেদমত করেন।

এরইমধ্যে একদিন হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. তাঁকে বলেন, ‘তুমি বিকল্প ইসলামী প্রাইমারী স্কুলের ব্যবস্থা কর’। তখন তিনি এবিষয়েও স্বতন্ত্রভাবে মেহনত ও ফিকির শুরু করেন। এভাবে মোটামুটি একটি নেসাব প্রস্তুত করে বাচ্চাদেরকে আরবীর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা, অংক, ইংরেজি ইত্যাদি শেখানোও শুরু করেন। মোটকথা, হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর বোর্ডে লিখে পড়ানোর কথা ও হাফেজ্জী হুযূর রাহ-এর ইসলামী প্রাইমারী স্কুলের চিন্তার কথাকে অনুসরণ করে তিনি নূরানী পদ্ধতির মেহনত করেন। এই দুই বুযুর্গের দুআ ও নেক তাওয়াজ্জুহের বরকতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই খেদমতে অনেক কামিয়াবী দান করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে নূরানী পদ্ধতির এই মেহনত ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বীনদার মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকে এর প্রতি আগ্রহ ও কৌতূহল। ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে মুআল্লিম চেয়ে চেয়ে দরখাস্ত-আবেদনও আসতে থাকে।

১৯৭৭-৭৮ সালের কথা। কিশোরগঞ্জের হাজী মুফিজুদ্দীন সাহেবসহ কয়েকজন দ্বীনদার লোক হযরত মাওলানা কারী বেলায়েত ছাহেব রাহ.-এর কাছে একজন মুআল্লিমের আবেদন করেন। তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র হযরত মাওলানা রহমতুল্লাহ ছাহেবকে ওখানের জন্য নির্বাচন করেন। অল্পসময়েই সেখানের মেহনতে আল্লাহ তাআলা অনেক সফলতা দান করেন। ফলে ওই অঞ্চলের বহু মানুষ নূরানী পদ্ধতিকে আপন করে নেয় এবং এর জন্য স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন করে। তখন কিশোরগঞ্জ শহরের পাশেই ‘মাদরাসায়ে নূরিয়া বাগে জান্নাত’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। আজও মাদরাসাটি এই নামেই আছে এবং কুরআন শিক্ষার খেদমত করে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা ওই মাদরাসাসহ সকল দ্বীনী মাদরাসা ও মারকাযকে কবুল করুন, কামিয়াব করুন।

১৯৮০ সালের দিকে সারাদেশে যখন এই মেহনতের ব্যাপক চাহিদা ও আগ্রহ, তখন হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ. কারী ছাহেব রাহ.-কে কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ঢাকায় একটি কেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দেন। সে হিসাবে হাজ্বী সিরাজুদ্দৌলা ও হাজ্বী আবুল কাশেম প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় কেন্দ্রের জন্য মোহাম্মাদপুরে একটি জায়গা মিলে যায়। আল্লাহ্র উপর ভরসা করে কারী ছাহেব রাহ. সেখানে নূরানীর কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণ সেন্টারের কাজ শুরু করেন।

১৯৮৪ সালে বয়স্ক কোর্সের এক ছাত্র হাজী আবদুল মালেক সাহেব নূরানীর জন্য আরো কিছু সম্পত্তি ওয়াক্ফ করেন। সেখানে ‘নূরানী ওয়াক্ফ এস্টেট’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর মুতাওয়াল্লি ও কমিটিদের সাথে কিছু বিষয়ে হযরত কারী ছাহেব রাহ.-এর দূরত্ব সৃষ্টি হলে তিনি ‘ওয়াক্ফ এস্টেট’ থেকে আলাদা হয়ে ‘নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে নূরানী বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০১ সালে যাত্রাবাড়ির কাজলায় হাজী ইবরাহীম সাহেবের দেয়া বেশ বড় একটি জায়গায় তিনি আরেকটি প্রশিক্ষণ সেন্টারের কাজ শুরু করেন। এভাবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ব্যাপকভাবে নূরানীর খেদমত ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ এই খেদমতের ওসিলায় বিশুদ্ধভাবে আল্লাহ্র কালাম কুরআন মাজীদ শিক্ষা লাভ করে। আজও সেই খেদমত অব্যাহত আছে। কিয়ামত পর্যন্ত আরও উন্নতি ও অগ্রগতির সঙ্গে আল্লাহ তাআলা এই খেদমতকে অব্যাহত রাখুন- আমীন।

কারী বেলায়েত ছাহেব রাহ. হযরত হাফেজ্জী হুযূর রাহ.-এর জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গেই ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক রাখেন। হাফেজ্জী হুযূর রাহ. তাঁকে খেলাফতও প্রদান করেন। তবে এই ময়দানে স্বতন্ত্রভাবে মেহনত করার সুযোগ তাঁর হয়নি।

১৯৮০ সালে তিনি প্রথম বাইতুল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সফর করেন এবং পবিত্র হজ্ব পালন করেন। এরপর বহু বার উমরার সফরে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে ইতিকাফ করেন এবং বহুবার হজ্ব করেন।

তাঁর লিখিত রচনা বলতে ‘নূরানী পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা’ কিতাবটিই মূল। তবে নূরানী বাংলা, অংক, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও ভূগোল ইত্যাদি প্রাইমারি বইগুলো তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ড’ কর্তৃক সংকলন করা হয়েছে।

তাঁর উস্তাযদের মধ্যে রয়েছেন

হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর ছাহেব হুযূর) রাহ.

হযরত মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযূর রাহ.

হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুযূর রাহ.

হযরত মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ ছাহেব (মুহাদ্দিস ছাহেব হুযূর) রাহ.

হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ আলী রাহ. ও হযরত মাওলানা সাওয়াব আলী ছাহেব রাহ. প্রমুখ দেশবিখ্যাত উলামায়ে কেরাম।

তাঁর অসংখ্য ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন হলেন

মাওলানা কারী রহমতুল্লাহ ছাহেব রাহ.

মাওলানা হেলালুদ্দীন ছাহেব রাহ.

মাওলানা ফাহমুদ্দীন ছাহেব রাহ.

মাওলানা জাফর আহমদ ছাহেব দা. বা.

মাওলানা হুসাইন আহমদ ছাহেব দা. বা.

মাওলানা আবু সাঈদ ছাহেব দা. বা.

কারী আবদুস সোবহান ছাহেব রাহ. প্রমুখ উলামায়ে কেরাম।

তাঁর এগারোজন সন্তান। এক ছেলে ও এক মেয়ে ছোটবেলায়ই ইনতিকাল করেছে। বাকি ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে সবাই বিভিন্ন জায়গায় দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত।

তাঁর স্ত্রী গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বুধবার দিবাগত রাতে ৮৫ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মাকাম নসীব করুন- আমীন।

তাঁর পঞ্চাশের অধিক নাতি-নাতনি। সবাই আল্লাহ্র মেহেরবানীতে মাদারাসায় অধ্যয়নরত এবং দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত। ছোটরা নিজ নিজ পরিবারে দ্বীনি পরিবেশে প্রতিপালিত।

 

বিজ্ঞাপন