সীরাতুন্নবীর শিক্ষা: ভাষার জিহাদও মুমিনের আদর্শ

136

শরীফ মুহাম্মদ ।।

শ্রেষ্ঠতম ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালালাম দুনিয়াতে আগমণ ও রিহলাতের পর থেকে এ যাবত নবী জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধ এবং গ্রন্থ রচিত হয়েছে। শুরুর দিকে তা ছিল হাদীসের কিতাবের একটি অধ্যায় আকারে, তারই অংশ হিসেবে। হিজরি প্রথম শতাব্দী থেকেই শুরু হয়েছে বিন্যস্ত রচনা তৈরির মহান ধারা। পরবর্তীতে যুগে যুগে নির্ভরযোগ্য ও সমৃদ্ধ আলোচনা ও গ্রন্থে নবী জীবনের মূল জীবনপর্যায় ও জীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। চলমান ছোট্ট আলোচনাটি নবী জীবন এবং কুরআনের বর্ণনায় সাহিত্য, সাংবাদিকতা, কলম এবং ভাষার সঙ্গে সীরাতের একটি মূল্যায়ণ একটি দিক নির্দেশনা বিষয়ে আলোকপাত।

কুরআনে কারীমের সুরায়ে শুআরার দুইশত চব্বিশ থেকে দুইশত সাতাইশ নম্বর আয়াতগুলোতে কবিদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, “বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুরসণ করে। আপনি কি দেখননি যে, তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে? এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও নেককাজ করে এবং আল্লাহকে খুব স্মরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।” (শুআরা- ২২৪-২২৭)

আয়াতগুলো মাদীনায় অবতীর্ণ। এ আয়াতে কারীমাসমূহ নাযিল হওয়ার পর তিন কবি সাহাবি- হযরত হাসসান বিন সাবেত, কা’ব ইবনে মালেক এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাহ; খুবই মর্মাহত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ আয়াতের প্রথমাংশে কবিদের সম্পর্কে নেতিবাচক আলোচনা করা হয়েছে। তারা তো কবি! শুধু তাই নয়, বরং ইসলামের বিখ্যাত তিন কবি। ‘শা-ইরু রাসুলিল্লাহ’। শা-ইরুল ইসলাম হিসেবে খ্যাত। অশ্রুসজল নয়নে তারা নবীজির দরবারে এলেন। দরবারে নববীতে এসে তাদের ফরিয়াদ পেশ করেন। ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কবি। কবিদের ব্যাপারে কুরআনে পাকে আয়াত নাযিল হল। তাহলে আমাদের কী উপায় হবে? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আয়াতের শেষাংশের দিকে ইশারা করেন। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, “তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে আর নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’

নবীজির বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, এখানে সাধারণ ‘কবি’ সম্পর্কিত আলোচনায় তোমাদের কথা বলা হয়নি। এখানে অমুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষী ও উদভ্রান্ত কবিদের কথা বলা হয়েছে। যেসব কবির ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, যারা ইসলামের আদর্শ ধারণ করে না, মূলত উদভ্রান্তি ছড়ায়, তাদের কথা আলোচিত হয়েছে। আয়াতের শেষাংশে এই উদভ্রান্ত কবিদের থেকে তাদের আলাদা করে দেয়া হয়েছে, যেসব কবি ঈমান আনে, যারা নেক আমল করে, যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে এবং মজলুম হওয়ার পর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এখানে কাব্যকচর্চাকে ব্যাপকভাবে ভাষা-সাহিত্য চর্চার অর্থে গ্রহণ করা যায়। কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে যারা ইসলামের জন্য সাহিত্যকর্ম করে তারা ইসলাম বিদ্বেষী এবং ইসলামের প্রতি আক্রমণাত্মক সাহিত্যিকদের থেকে ভিন্ন। অপসাহিত্যের ফেরিওয়ালাদের ইসলাম ধারণকারী সাহিত্যিকদের সঙ্গে মেলানো এ আয়াতে মেলানো হয়নি। সেখান থেকে তাদের আলাদা করে দেয়া হয়েছে এবং মুমিন কবি-সাহিত্যিকদের কিছু গুণবৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ আয়াতের শেষাংশে মহান রব্বুল আলামীন ঈমানদার কবি, সাহিত্যিক এবং লেকখদের চারটি বৈশিষ্ট ও গুণের কথা বলেছেন, যে গুণগুলোর প্রতি ইসলামের আদর্শ লালনকারী সব লেখক-কবির মনযোগ দেয়া কাম্য। সে গুণ-বৈশিষ্ট্যগুলি হলো, ১. ঈমান আনা। ২. আমলে সালেহ করা। ৩. আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা। ৪. ইসলাম বিরোধীদের পক্ষ থেকে জুলুমের শিকার হবার পর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করা (ইসলাম বিদ্বেষী ও কাফের শক্তির আক্রমণাত্মক কবিতা ও সাহিত্যের জবাব দেওয়া)।

এ থেকে বোঝা যায়, মুমিন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক যারা -তাদের যেমন ঈমান থাকতে হবে, পাশাপাশি থাকতে হবে  নেক আমল এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহর স্মরণ। এর অর্থ দাঁড়ায় ইসলামের জন্য কলম চর্চাকারী কবি, সাহিত্যিক, লেখক এবং সাংবাদিকদের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সুসম্পর্ক কায়েম করাও জরুরি। আর সর্বশেষ গুণটি হল ইসলাম বিরোধীদের পক্ষ থেকে জুলুমের (আপপ্রচার-অবমাননা) শিকার হবার পর পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করা (কাব্য ও সাহিত্যে তাদের জবাব দেওয়া ও পাল্টা আক্রমণ করা)।

এই গুণটি একটু আলাদা করে উল্লেখ করার দাবি রাখে। ইসলামী কবি, সাহিত্যিক, লেখক এবং সাংবাদিকদের সম্পর্কে অনেকে ধারণা করেন, ইসলামের সুন্দর ইতিবাচক দিক নিয়ে সাহিত্যকর্ম করা, ইসলামের ইতিবাচক দিক নিয়ে লেখালেখি করে শুধুই ইসলামের প্রচার করাই তাদের দায়িত্ব। কিন্তু আয়াতের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, ইসলাম বিদ্বেষী কবি-সাহিত্যিকদের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে রচিত সাহিত্যের জবাবে পাল্টা সাহিত্য রচনার মাধ্যমে তাদের অপসাহিত্যের মোকাবিলা করাও ইসলামী লেখক ও সাংবাদিকদের দায়িত্ব।

সাহাবী কবি হযরত কা’ব বিন মালেক রযি.-এর ছেলে আবদুর রহমান থেকে মুসনাদে আহমদে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ( এ আয়াতের ব্যাখ্যায়) আমার বাবাকে উদ্দেশ্ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় মুমিন তলোয়ার এবং ভাষা দিয়ে জিহাদ করে। ওই সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা কবিতা ও সাহিতের যে তীর তাদের বিরুদ্ধে নিক্ষেপ কর তা তরবারির মতই তাদের আঘাত করে।”

এই হাদীসে নবীজী জিহাদের দুটি উপকরণের কথা বলেছেন। একটি হল তরবারি। অপরটি হলো ভাষা। ভাষার লিখিত এবং মৌখিক দুটি ব্যবহারই হয়। হাদীসের ব্যাপকার্থ হিসেবে উভয় ব্যবহারই এর উদ্দেশ্য হতে পারে। অতএব ভাষার মাধ্যমে অনৈসলামিক সাহিত্যের জবাব দেওয়া জিহাদেরই একটি ধাপ। কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিকগণ এ প্রতিকারমূলক সাহিত্যচর্চার বিনিময় আল্লাহ তাআলার কাছে পাবেন নিশ্চয়।

তাই এ যুগের কবি সাহিত্যিকদের জন্য বড় একটি দায়িত্ব হলো, ইসলামের ইতিবাচক ও সৌন্দর্য স্মর্কিত স্বাভাবিক প্রচারের পাশাপাশি দুশমনদের পক্ষ থেকে ইসলামের যেসব অপপ্রচার হয় তার জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। রাসুলে করীম সাহাবীদের ভাষা চর্চার মাধ্যমে জিহাদের যে সুসংবাদ দিয়েছেন এবং এর যে বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন সেই সুসংবাদ লাভের উপযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হলে এ যুগের ইসলামি কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিকদেরও এ বিষয়ে অতন্দ্র এবং সচেষ্ট থাকতে হবে।

কুরআনে বর্ণিত দাওয়াতের সাধারণ আয়াতসমুহ এবং এ বিষয়ক হাদীসে নববী দ্বারা ইতিবাচক পন্থায় সাহিত্যের মাধ্যমে দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। এটা স্বস্থানে যথাযথ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি আয়াতের ব্যাখ্যায় এই তিন সাহাবীর সঙ্গে নবীজির বক্তব্য দ্বারা বুঝে আসে, ইসলাম বিরোধীদের কাব্য ও সাহিত্যের যে আক্রমণ, তার জবাব ও পাল্টা আক্রমণও একটি প্রশংসণীয় ও দরকারি সাহিত্যপ্রয়াস।

ইসলামের পক্ষে কলম নিয়ে যেসব কবি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কাজ করতে চান, সঠিক পথে থেকে ঈমানের সঙ্গে চলতে চান, সীরাতুন্নবীর এ অধ্যায়টি তাদের জন্য একটি সুসংবাদ। এর সঙ্গে আয়াতে উল্লিখিত বৈশিষ্টাবলির প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারলে তাদের কর্মপ্রয়াসের যথার্থ  অগ্রসরতা ঘটবে এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পাওয়া যাবে উত্তম প্রতিদান।#