মুফতিয়ে আযম মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ: শিরক-বিদআতের বিরুদ্ধে অকুতোভয় সিপাহসালার

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউ সুন্নাহ মেখল মাদরাসা।

মুহাম্মদ মামুনুর রশীদ ।।

মুফতিয়ে আজম মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ. ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন কীর্তিমান আলেমেদ্বীন, আধ্যাত্মিক সাধক ও কামেল অলি। তিনি ছিলেন শিরক-বিদআতে নিমজ্জিত মানবতার পুনরুদ্ধারের এক মহান নায়ক। শয়তানিয়্যাতের বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড বিদ্রোহ। দেশকে সুশৃঙ্খল ও সুশোভিত করার মহান ব্রতে যে সকল মনীষী নিজেদের নিবেদন করেছেন মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ. তাদের অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

আল্লাহ প্রেম, খোদাভীতি, দুনিয়াবিমূখতা, শ্রুতিমধুর তেলাওয়াত প্রভৃতি মহৎ ও উন্নত গুনাবলির কারণে ছাত্র ও ভক্তদের অন্তরে মরেও অমর হয়ে আছেন তিনি। তিনিই ১৯৩১ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউ সুন্নাহ মেখল মাদরাসা’  প্রতিষ্ঠা করেন।  যা বর্তমানে সারাদেশে ‘মেখল মাদরাসা’ নামে পরিচিত হয়ে আছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউ সুন্নাহ মেখল মাদরাসা।

মুফতী ফয়জুল্লাহ রহ. আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় দক্ষ ছিলেন। বাল্যকাল থেকেই কাব্যচর্চা করতেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি পান্দে ফয়েজ নামে একটি ফারসি কাব্য রচনা করেন। কবিতা ও আলোচনা মিলে তার গ্রন্থ সংখ্যা অনেক। ফার্সি ভাষায় কবিতা লেখার পাশাপাশি মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ, আরবি ও ফারসি ভাষায়  অনেক বইও লিখেছেন।

প্রচার বিমুখ এই মহান সাধক ১৮৯২ সালের কোনো একদিনে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার মেখল নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত চৌধুরী বংশে জন্ম লাভ করেন। জন্মের আড়াই বছর পর তিনি তার মাকে হারান। তার মাতা প্রাথমিক জ্ঞানসম্পন্না ও ধর্মানুরাগি নারী ছিলেন। মাকে হারিয়ে তিনি পিতার কাছে বড় হতে লাগলেন।

দুই.

চার বছর চার মাস বয়সে তার লেখাপড়ার সূচনা হয়। তখন নিয়মতান্ত্রিক মকতবের ব্যবস্থা না থাকায় চাচা আহমদ আলী সাহেবের কাছে আলিফ-বা পড়া শুরু করেন। কিছুদিন পর ফুফু মুহতারামা পেয়ারজান সাহেবার কাছে কুরআন মাজীদসহ অন্যান্য প্রাথমিক দ্বীনী কিতাব পড়েন।

মুফতি সাহেব রহ.-এর যখন জন্ম হয় তখন বাংলাদেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা অস্তিত্ব লাভ করেনি। ১৩১৯ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৯ ঈসায়ী সনে মুফতি সাহেবের বয়স যখন নয় বছর তখন হাটহাজারী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তি বছর ১৯২০ হিজরীতে তিনি হাটহাজারী মাদরাসায় ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে দশ বছর পর্যন্ত সেখানে পড়ালেখা চালিয়ে যান।

এ সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংসারিক কাজও করতেন তিনি। এমনকি অনেক সময় হাড়িঁ-পাতিলও মাজতেন। প্রতিদিন মাগরিবের আগেই বাড়িতে পৌঁছে যেতেন। মাগরিবের সাথে সাথে দস্তরখান থেকে ফারেগ হয়ে পড়তে বসতেন। ইশার পর সাথে সাথে তিনি শুয়ে পড়তেন। এবং শেষ রাতে উঠে কিতাব মুতালাআ করতেন। এরপর ৮-৯টার দিকে নাশতা খেয়ে মাদরাসায় চলে যেতেন।

ছাত্রজীবন থেকেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সময়ানুবর্তি ছিলেন আগমী দিনেরে এই কীর্তিমান আলেমেদ্বীন। অধ্যয়ন, অধ্যাবসায় ও জ্ঞানচর্চায় ছিলেন ব্যতিক্রমী। বিগত ও পরদিনের সবক মুতালাআ ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। মাদরাসা থেকে বাড়ি বা অন্য কোন স্থানে যাওয়ার সময় বই-পস্তুক অথবা কোন নোটবই সাথেই রাখতেন। তা পড়তে পড়তে পথ চলতেন। সুযোগ পেলেই কিতাব পড়তে বসে যেতেন।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা।

আগামী দিনের এই মুফতিয়ে আযম রহ. কিতাব পড়ায় এমন নিমগ্ন থাকতেন যে, কখনো কখনো পথও ভুলে যেতেন। অন্য সাথীরা যখন অলসতায় সময় নষ্ট করতো তখনও তাকে কিতাব অধ্যয়নে মগ্ন দেখা যেত। সে সময়ে হাটহাজারী মাদরাসার উস্তাদগণ নানাবিধ সামাজিক সমস্যা প্রতিহত করতে ব্যস্ত থাকলেও মুফতি সাহেব রহ. পড়াশোনার ব্যাপারে অমনোযগী হননি।

মুফতি সাহেব রহ. সবার সাথে মিলেমিশে চলা-ফেরা করতেন। হুজুর নিজেই বলেন, আলহামদু লিল্লাহ, আমার শৈশবে ঘরে-বাইরে বা মাদরাসায় কারো সঙ্গে কোনো ‍দিন ঝগড়া-বিবাদ হয়নি। আমি ছোটবেলা থেকেই সবার সঙ্গে মিলে-মিশে চলেছি। আমার জানামতে পুরো জীবনে আমার দ্বারা কেউ কোনো কষ্ট পায়নি। জীবনে আমার পক্ষ থেকে কারো প্রতি কোনো অসদাচরণ প্রকাশ পায়নি।

মুফতিয়ে আযম রহ. একুশ বছর বয়সে হাটহাজারী মাদরাসায় মেশকাত সমাপ্ত করে আরও উচ্চ শিক্ষা লাভ করার জন্য উপমহাদেশের অন্যতম দ্বীনী বিদ্যাপিঠ দারুল উলুম দেওবন্দ যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। তারপর উস্তাদগণের পরামর্শে দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হয়ে তৎকালীন পৃথিবী বিখ্যাত শায়খুল হাদীস মাওলানা মাহমুদুল হাসানসহ আরও অনেক বুযুর্গ উস্তাদগণের কাছ থেকে হাদীস, দর্শন, ফিকহ ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন।

তিন.

আধ্যাত্মিকতার ময়দানে সাড়া জাগানো এই মহান মনীষী দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে হাটহাজারি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি যোগ দেওয়ার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো ইফতা বিভাগের সূচনা করেন। ফতোয়াদানের ক্ষেত্রে তার গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও মৌলিকত্বের কারণে সারাদেশে তিনি ‘মুফতিয়ে আযম বাংলাদেশ’ খেতাবে ভূষিত হন।

সুন্নতে নববির অনুসরনে ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ. ইসলামকে বিভিন্ন কুসংস্কার, শিরক-বিদআত ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার হাত থেকে রক্ষায় দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। নিজের জীবনকে ইসলামের সেবায় করেছিলেন উৎসর্গ।

দ্বীনের এই একনিষ্ঠ খাদেম খেলাফে শরীয়ত ও খেলাফে সুন্নাহ কাজ দেখে কোনো অবস্থায় নীরব থাকতে পারতেন না। পরিবেশ পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল থাক না কেন ন্যায় এবং সত্য কথা সমাজের সামনে তুলে ধরাকেই তার প্রধান দ্বীনি কর্তব্য মনে করতেন তিনি।

এই মহান আলেমেদ্বীনের প্রধান সংগ্রাম ছিল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরার কাজে তিনি ছিলেন নিরলস। মনগড়া নিয়ম, রুসুম-রেওয়াজ, শিরক-বিদআত ইত্যাদির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় সৈনিক।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউ সুন্নাহ মেখল মাদরাসার গেইট।

শেষজীবনে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে অবসর গ্রহণ করে নিজ গ্রাম মেখলে ‘মাদরাসায়ে হামিউস সুন্নাহ’ নামে ব্যতিক্রমধর্মী একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। মৃত্যু পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে তিনি দ্বীনি শিক্ষা প্রধান করেন। এ সুদীর্ঘ শিক্ষকতার জামানায় তার নিকট থেকে অগণিত অসংখ্য আলেম-উলামা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেন।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মহা-মনীষী ৮৬ বছর বয়সে অসংখ্য ছাত্র-ভক্তদের কাঁদিয়ে ১৯৭৬ সনের ৭ অক্টোবরে প্রেমময় প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মেখলে নিজ পারিবারিক কবরস্থানে আলমে বরযখের সুখ নিদ্রায় তাকে শায়িত করা হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের বাসিন্দা বানান।#

তথ্যসূত্র: আকাবিরে দেওবন্দের ছাত্রজীবন, বাংলার বরেণ্য আলেম, উইকিপিডিয়া

বিজ্ঞাপন