কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় কিছুক্ষণ

186
মুহাম্মদ আবদুস সালাম ।।  মিসর থেকে
গত বাইশে জানুয়ারি শুরু হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্য, আরব বিশ্ব ও ইসলামি জ্ঞান সাহিত্যের কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা। গেল শতাব্দীর ঊনসত্তরে এর সূচনা। ২০০৬ সালের সমীক্ষায় এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বইমেলার মর্যাদা লাভ করে। প্রতিবছর মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষার ছুটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই মেলা। এর আয়োজক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইজিপশিয়ান বুক অর্গানাইজেশন। গত বছর থেকে এটি নিউ কায়রোর আত্তাজাম্মুল খামিস সিটির ভৌগোলিক ও স্থাপত্য-শৈলীর অনিন্দ্য সুন্দর এলাকায় অবস্থিত কায়রো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
 
দৃষ্টিনন্দন এই প্রদর্শনী কেন্দ্রের আয়তন ৪৫ হাজার বর্গমিটার। সুউচ্চ বিশাল চিত্তাকর্ষক পাঁচটি হলঘর নিয়ে এটি ঘটিত। হলের বাইরে রয়েছে বিশাল চত্বর ও মনোমুগ্ধকর নানান সাজের পুষ্পোদ্যান আর ফোয়ারা। মেলায় এ বছর নয়শো প্রকাশনী অংশগ্রহণ করেছে। মিশরের বাইরেরও আরব অনারবের মোট ৩৮ টি দেশ থেকে আগত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এখানে স্টল পেতেছে। সুবিন্যাস্ত স্টল সারির পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন দেশ, সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরকাড়া প্যাভিলিয়ন। প্রতিদিন এসব প্যাভিলিয়নে থাকে শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিশেল বর্ণাঢ্য নানান আয়োজন। আগমন করেন এসব আসরে দেশ বিদেশের প্রখ্যাত ও বরেণ্য বোদ্ধাগণ।
মজলিসু হুকামায়িল মুসলিমিন (মুসলিম কাউন্সিল অফ ইল্ডার্স) এর প্যাভিলিয়নের আয়োজন বলা যায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও আড়ম্বরপূর্ণ। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সম্প্রতির শীর্ষ ও বরেণ্য আলিমদের আলোচনা সভা। এবারের আলোচকদের মধ্যে সবিশেষ রয়েছেন ড. আহমাদ মাবাদ আব্দুল কারিম, ড. বাশশার আওয়াদ মারুফ ও ড. আশশারিফ হাতেম আল আওনী এর মত হাল যামানার শীর্ষ বিদ্বান আলেমগণ। এই জ্ঞানময় আলোকিত প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় দিনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। পাঠকের উপচে পড়া ভিড় আর তাদের জ্ঞান পিপাসা বিমোহিত করবার মতো। বিস্মিত হতে হয় আকাশ সংস্কৃতির এই সময়েও কাগজের গন্ধকে ভালোবাসবার এত লোক দেখে। বিগত বছরগুলোতে মেলার দর্শক সংখ্যা ছিল বিশ লক্ষ। এবার মনে করা হচ্ছে তা আরো অনেক বেড়ে যাবে।
বুক স্টলের সুবিন্যাস্ত সারি আর কিতাবের পরিবেশন-সাজ যেমন মুগ্ধ করে, তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হতে হয় তাদের মূল্য ছাড়ের হার দেখে। গেলাম মজলিসু হুকামায়িল মুসলিমিন (মুসলিম কাউন্সিল অফ ইল্ডার্স) এর প্যাভিলিয়নে বর্তমান শাইখুল আযহারের রচিত একটি কিতাব কিনতে। যা এ মেলায় মোট ১৩ টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানকার দায়িত্বশীল বললেন, আজ নয় কাল এসো। বিশেষ ছাড়ে পাবে। আমি তো অবাক ! ব্যবসার ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান বিতরণে তার এই মনোবৃত্তি সত্যি অনেক অভিভূত করেছিল। তারপর গেলাম মাকতাবাতুর রুশদে। হঠাৎ পরিচয় মিলল দুই বাংলাদেশির সাথে। তারা এই মাকতাবার সৌদি রিয়াদ শাখায় চাকরি করেন। জিজ্ঞেস করলাম কেমন বিক্রি হচ্ছে। বললেন এই দুদিনে এত বেশি বিক্রি হয়েছে যে, আমরা তো পুরো অবাক। আলহামদুলিল্লাহ।
এক প্যাভিলিয়ন থেকে আরেক প্যাভিলিয়নে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরে ঘুরে কিতাব দেখছিলাম। খুঁজছিলাম প্রিয় লেখকদের কিতাব। আলহামদুলিল্লাহ সাক্ষাত মিলল অনেক কিতাবের এবং সন্ধান পেলাম লুফে নেয়ার মতো আরও অনেক কিতাবের। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখলাম লেবাননের বৈরুতস্থ মাকতাবাগুলো। সেখানের দৃশ্য দেখে তো পুরো হতবাক। তারা সুদূর অতীতে পূর্বসূরী আলেমদের রচিত ছোট-বড় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিতাবের পান্ডুলিপি দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ আর কাগজে ছাপিয়ে বিক্রি করছে। আবার দামও অনেক কম। গেলাম এক নাম্বার হলে। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। বিশেষ উদ্দেশ্য হলো, আরবি সাহিত্য সংস্কৃতি এবং প্রাচীন ও সমকালীন আরব লেখকদের সাথে পরিচিত হওয়া। মাশাআল্লাহ দেখা গেল বিগত ও বর্তমানের সাহিত্যিকদের বই আলাদা আলাদা করে সাজানো হয়েছে। একনজরেই একজন লেখকের প্রায় রচনাবলী সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। স্টলগুলোতে তাকে তাকে শোভা পাচ্ছিল মানফুলূতি, নাজিব মাহফুজ সহ অনেকেই।
গত শনিবারে আবারো গেলাম মেলা প্রাঙ্গণে। বিশেষ উপলক্ষ ছিল, ড. বাশশার আওয়াদ মারুফের মুহাযারা -আলোচনা সভা-। সেখানে গিয়ে দেখি আল আযহারে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি ছাত্রদের বিশাল জমায়েত। আশা জাগানিয়া এই দৃশ্য পুলকিত করে। ডক্টর বাশশার তার আলোচনায় অর্ধশতাব্দী কালেরও অধিক সময়ব্যাপী তার গবেষণাময় জীবনের অনেক কীর্তি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। যা একজন শিক্ষার্থীর জন্য স্বপ্ন পথে চলার অনেক বড় পাথেয় ও সঞ্চয়। তার আলোচনা, আখলাক ও তার কথা বলার, পর্যালোচনা করার আদাব দেখে সত্যিই বড় মুগ্ধ হতে হয়। তার আলোচনা পর্ব শেষ হবার পর গেলাম আবুধাবির প্যাভিলিয়নে। সেখানকার অনুষ্ঠানের আলোচ্য বিষয় ছিল, আবুধাবির এক লেখক-রচিত “মিশর ভ্রমণ” বইয়ের পর্যালোচনা। পর্যালোচক ছিলেন জাদরেল চার ব্যক্তিত্ব। একজন জাতিসংঘের অন্যতম শীর্ষ অনুবাদক। আরেকজন মিশরীয় প্রবীণ ঔপন্যাসিক তৃতীয় জন মিশরীয় সাংবাদিক। আর চতুর্থ জন আবুধাবির এক সাংবাদিক। দীর্ঘ সময়ের এই আলোচনা ছিল হৃদয়গ্রাহী আর মুগ্ধ করবার মত। সেখানকার অনুষ্ঠান শেষে গেলাম তৃতীয় হল ঘরে। এখানে স্টলগুলো শিশুদের উপযোগী বইপত্র এবং জ্ঞান ও মেধা বিকাশ-কারি নানা ধরনের খেলনার জন্য বরাদ্দ। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। উদ্দেশ্য, আরবি শিশুসাহিত্য ও শিশুতোষ কে কাছে থেকে দেখা।
শিশুদের জন্য আরবি সাহিত্যের এই অপূর্ব আয়োজন দেখে বাংলা ভাষার শিশু সাহিত্য কে বড় অসহায় গরীব মনে হল। এই মেলায় এসে আরো অনেক অনুভূতি জাগলো বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা সম্পর্কে। কবে যে তা সর্বজনীন হবে এবং বিশেষ ঘরানার সব ধরনের বন্দিত্ব থেকে থেকে মুক্তি পাবে। প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে শুরু হওয়া এই বইমেলা চলে রাত আটটা পর্যন্ত। ৫১ তম এই বইমেলা শেষ হবে ৪ ফেব্রুয়ারি। সুবিশাল বর্ণাঢ্য আয়োজনের এই মেলার সময় মাত্র দু সপ্তাহ। এত অল্প সময়ে কিছুতেই আঁশ মেটবে না। তৃষ্ণা ফুরোবে না। আর তা ফুরোবারও নয়। তাই সুযোগ হলেই জ্ঞানালোয় জ্বলে ওঠা এই প্রাঙ্গণে বারবার ফিরে আসবার সংকল্প নিয়ে বাসার পথ ধরলাম।