ইসলামী স্থাপত্য শিল্পের কীর্তিমান পুরুষ : মিমার সিনান আগা

 সাঈদ হুসাইন ।।

মধ্যযুগ ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম উম্মাহর স্বর্ণযুগ। ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় মুসলমানরা বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলো। ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন এমন অসংখ্য মনীষী। তাঁদের উদ্ভাবন ও আবিষ্কার কালের  ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে পৃথিবীর দিকে দিকে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যযুগে ইসলামী স্থাপত্য শিল্পে এমনই এক কীর্তিমান পুরুষ হলেন- মিমার সিনান আাগা।

বিজ্ঞাপন

মিমার সিনান সুলতান দ্বিতীয় বাইজিদ বিন মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ্ -এর আমলে ৮-রজব-৮৯৫ হিজরীতে (মোতাবেক ১৫-৪-১৪৮৯ খৃস্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্থাপত্যশিল্প নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে হয়ে উঠেন স্থাপত্যশিল্পের প্রাণ-পুরুষ। এখনো তাঁকে মনে করা হয়, স্থাপত্যবিদ্যা ও প্রকৌশলীর পথিকৃত। সুলতান সুলায়মানের শাসনামলে তিনি রাষ্ট্রের প্রধান স্থপতি হিসাবে নিয়োগ পান। মৃত্যু পর্যন্ত একাধারে ৫০ বছর এ পদে বহাল ছিলেন। এক একটি উপাখ্যান ও রহস্য দিয়ে নির্মাণ করেন প্রতিটি স্থাপনা।

Image result for mimar sinan aga

উসমানী খেলাফতের প্রসিদ্ধ অনেক স্থাপনাতেই মিমার সিনানের হাতের জাদুময়ী ছোঁয়া রয়েছে। এমনকি ভারতে মুসলিম শাসনের স্মৃতিবিজিড়িত ‘তাজমহলের’ নকশাতেও রয়েছে সিনানের প্রত্যক্ষ অবদান। তিনি আধুনিক যুগের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তাঁর সময়ে বসফরাসের তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গপথ নির্মানের কথা চিন্তা করেছিলেন। সেই যুগে তাঁর এমন কিছু উদ্ভাবন রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান আজও সেখানে পৌছতে পারেনি। তিনি তুরস্কে (ছোট-বড় মিলে) ১৩৬টি মসজিদ, ৫৭টি মাদরাসা, ১৭টি মক্তব, ২২টি (গম্বুজ বিশিষ্ট) বড় কবরস্থান, ৩টি চিকিৎসাকেন্দ্র, ৬টি ঝুলন্ত সেতু, ৯টি পানির বড় লাইন, ৮টি সেতু, ২০টি মেহমানখানা, ৩টি ব্যাংক, ১৮টি বিশ্রামাগার, ৩৫টি প্রাসাদ, ১৬টি লঙ্গরখানা, ৩টি বৃদ্ধাশ্রম, ৮টি গুদাম এবং ৪১টি হাম্মামসহ মোট ৪৪১টি স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।

মিমার সিনানের অন্যতম উদ্ভাবন হলো- উসমানি খেলাফতের সবচে’ বড় মসজিদ হিসাবে স্বীকৃত সুলায়মানিয়া মসজিদ। এটি স্থাপত্যশিল্পের বিচারে পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি মসজিদের একটি। মসজিদের মূল ছালাতক্ষটি দৈর্ঘ্যে ৬৯ মিটার এবং প্রস্থে ৬৩ মিটার। মসজিদে ২০-২৫ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে। সিনান কক্ষের আয়তন, ছাদের উচ্চতা, খুঁটিগুলোর দূরত্ব ও গম্বুজে এমন প্রকৌশল ব্যবহার করেছেন যেন খতীবের প্রতিটি কথা ‘লাউডস্পীকার ছাড়াই’ পুরো ছালাতকক্ষে সমান মাত্রায় শোনা যায়। মসজিদের চারটি উচু মিনার রয়েছে। প্রতিটি তিন স্তর বিশিষ্ট। আর এর গম্বুজগুলো ‘আয়াসোফিয়া’ থেকেও অনেক উচু।

উপরন্তু মুসলিম স্থপতি সিনান এ মসজিদে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন যা বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে প্রতিরোধ করবে। ভূমিকম্পে মসজিদ নৌকার মত দুলবে, কিন্তু কোন ক্ষতি হবে না। ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ বার্নাড লুইস অবশেষে বাধ্য হয়ে লিখেছেন, ‘জামে সুলায়মানিয়া হলো সিনানের সুন্দরতম স্থাপত্যকীর্তি এবং সকল ঐতিহাসিক একমত যে, তিনিই সর্বকালের সেরা স্থপতি।’

Image result for mimar sinan aga

মিমার সিনানের আরেকটি ঐতিহাসিক কীর্তি হলো- মেহরিমা সুলতান জা‘মে। মেহরিমা সুলতান মসজিদ নামে দুটো মসজিদ ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। মেহরিমা সুলতান ছিলেন সুলতান সুলায়মানের কন্যা, যিনি ১৫২২ সালে তোপকাপি প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। মেহরিমা শব্দের অর্থ হলো, সূর্যের সাথে চন্দ্র (দুটোর জ্যোতিতে আলোকিত)। মুসলিম স্থপতি সিনান এই মসজিদ নির্মাণে সুলতান কন্যার নামের মহিমা অদ্ভুতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে- তাঁকে মসজিদ নির্মাণের প্ররিকল্পনা জানালে ইস্তাম্বুলের গুরুত্বপূর্ণ স্থান উসকুদারে দীর্ঘ আট বছরের সাধনায় প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর ইস্তাম্বুলের সবচে’ উঁচু জায়গা এদিরনেকাপিতে অপর মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই দুই মসজিদের মাঝে লুকায়িত রহস্যটা হলো- মেহরিমা সুলতানের জন্মমাস তথা বছরের শুধু মার্চ-এপ্রিলের কয়েকদিন একটি মসজিদের মিনারে এসে সূর্য অস্ত যায়। আর অপর মসজিদের মিনার থেকে চন্দ্র উদিত হয়। নির্মাণ-শৈলীর ইতিহাসে একটি অপূর্ব স্থাপনা বলে ঐতিহাসিকরা মেহরিমা জা‘মে সুলতানকে উল্লেখ করে থাকেন।

মিমার সিনানের প্রতিটি নির্মাণই এমন একেকটি উপাখ্যান ও রহস্যেঘেরা। তুরস্কের অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসা আজও তাঁর স্মৃতি বহন করছে। মসজিদ-মাদরাসা ও ইসলামি স্থাপত্য-শিল্পের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় আজও অমর হয়ে আছেন মিমার সিনান রহ.। ক্রন গুরলেট  সিনানের স্থাপত্যশৈলীর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে লিখেছেন, গম্বুজ নির্মাণের ক্ষেত্রে সিনান এমন নৈপুন্যতা প্রদর্শন করেছেন স্থাপত্যের ইতিহাসে যার কোন জুড়ি নেই। তিনি চৌকা, ছয়কোনী বা আটকোণী পিলার ভিত্তি প্রস্তর করেন যার উপর ভবনের ভেতরাংশ স্থাপন করে থাকেন। দূরত্ব থাকে অনেক। বিশাল বারান্দা থাকে। ভবন থাকে সুবিন্যস্ত ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাসাদের ভেতরাংশের সবচে বেশী গুরুত্ব দিতেন। আর তাঁর হাতের ছোয়ায় বহিরাংশ হয়ে উঠত ঝলমলকপূর্ণ।

ইসলাম বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদরা তাঁর নামে অপবাদ দিয়েছে, তিনি ৫৩ বছর বয়সে সুলতানের ১৮ বছরের কন্যা মেহরিমার প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন। অথচ তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ পরহেজগার। তাহাজ্জুদগুজার ও প্রথম কাতারের মুছল্লী। ১৫২১, ১৫২২ ও ১৫৩৪ সালে উছমানী মুজাহিদ বাহিনীতে অংশগ্রহণ করে জিহাদে অসাধারণ সামরিক দক্ষতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। কীর্তিমান খোদাভিরু এ স্থপতি ১২-জুমাদাল উলা-৯৮৬ সালে (মোতাবেক ১৭-জুলাই-১৫৭৮ খৃস্টাব্দ) ইন্তেকাল করেন। সুলায়মানিয়া মসজিদের লাগোয়া কবরস্থানে সুলতান সুলায়মানের অদূরে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন। ‘আকাশ যেন তাঁর কবরে শিশির বর্ষণ করে; সবুজ গালিচা যেন সেই কবর আচ্ছাদিত করে রাখে।’

( বিস্তারিত তথ্যসূত্র : তারিখুত দাওলাতিল উছমানিয়্যা : ২য় খন্ড, হাদীক্বাতুল জাওয়া‘মে : হুসাইন আফেন্দী, তাযকিরাতুল বুনিয়ান -খাজা মিমার সিনান : মুস্তাফা সায়ী‘, দায়েরাতুল মাআ‘রিফ আল-ইসলামিয়্যা, ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা, মাদ্দা : সিনান )